পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রক্ত-মাংসের ইশতিহারঃ সঙের ছড়া-গানে হিন্দু-মুসলমান

  • 17 January, 2021
  • 0 Comment(s)
  • 1725 view(s)
  • লিখেছেন : কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত
দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাবার ফন্দি এঁটেছে সরকার। এই হিন্দুত্ববাদীরা এখন বাংলাকে 'টার্গেট' করেছে। বিষ ছড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতিকে উচ্ছন্নে পাঠাতে উঠেপড়ে লেগেছে তারা। এই সময়ে বিপন্ন সংস্কৃতিকে অস্ত্র করেই রুখে দিতে হবে সবরকম অপচেষ্টা। বাঙালির মনে আর শরীরের কোষে কোষে বহুকাল ধরেই যে 'ধর্মীয়'প্রেক্ষিত জীবন্ত আছে তাকে উন্মুক্ত করেই দাঙ্গাবাজদের মুখোমুখি শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। এই লক্ষ্যেই আগমন ইশতিহারের। লিখলেন কৃষ্ণপ্রিয় দাশগুপ্ত ছবি আঁকলেন পার্থ দাশগুপ্ত

ভূমিকা

আমাদের দেশ এখন এক ঘোর সংকটে নিমজ্জিত। খুবই অস্থিরতার মধ্য দিয়ে চলেছে ভারত। প্রকৃতপক্ষে দেশের সংবিধান বিপন্ন। মানুষের দৈনন্দিনতার উপর সরাসরি আঘাত হানছে দেশের সরকার আর সরকারের দল। কে কী খাবে বা কী পরবে কিংবা কে কাকে ভালোবাসবে অথবা বিয়ে করবে, তা-ও ঠিক করে দিচ্ছে এই দল। এবং এই দল পরিচালিত গোটাকতক রাজ্যসরকার ইতিমধ্যেই এই মর্মে আইনও করে ফেলেছে। দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্র বানাবার ফন্দি এঁটেছে সরকার। এই হিন্দুত্ববাদীরা এখন বাংলাকে 'টার্গেট' করেছে। বিষ ছড়িয়ে বাংলার সংস্কৃতিকে উচ্ছন্নে পাঠাতে উঠেপড়ে লেগেছে তারা।

এই সময়ে বিপন্ন সংস্কৃতিকে অস্ত্র করেই রুখে দিতে হবে সবরকম অপচেষ্টা। বাঙালির মনে আর শরীরের কোষে কোষে বহুকাল ধরেই যে 'ধর্মীয়'প্রেক্ষিত জীবন্ত আছে তাকে উন্মুক্ত করেই দাঙ্গাবাজদের মুখোমুখি শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। এই লক্ষ্যেই আগমন ইশতিহারের।

বাংলাদেশ কেবল সজল সবুজই নয়, সুরেলাও বটে। এর হাওয়ায় হাওয়ায় সংগীত। গান। বাংলার মনে গান। প্রাণে গান। শরীরময় গান। যত উৎসব-পালা-পার্বণ--- সবটাই সংগীতমুখর। আর সেইসব গানে গানে ছড়িয়ে রয়েছে মিলনের মাধুর্য, যা বাংলার অন্তরের সত্য। অস্তিত্বের ভিত্তি। দাঙ্গাবাজদের ফন্দি ফিকির এই ইমারতকে টলাতে চাইছে। আমাদের অন্তরের সেই সত্যটাকে এইবার প্রকাশ করার সময় হয়েছে।

কেবল নির্বাচনের জন্য আমাদের কাছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতিহার হাজির হয়। এই রীতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় আছে। ইশতিহার সম্পর্কে আমাদের সম্যক ধারণা আছে। সেই ধারণাকে পাথেয় করেই আমিও এখানে এই ইশতিহারের অবতারণা করেছি। তবে, খানিক তফাৎ আছে। এই ইশতিহার মিথ্যাচারের ফুলঝুরি নয়। এ হল বাঙালির অন্তরের রক্তক্ষরণের আক্ষরিক দলিল--- রক্ত-মাংসের ইশতিহার অথবা লোকমুখে বাঙালির ধর্মচিন্তা

সঙের ছড়া-গানে হিন্দু-মুসলমান


বাংলাদেশের সঙের দল কেবল রসিকতা কিংবা ব্যঙ্গ আর বিদ্রূপ দিয়েই তাঁদের ছড়া-গান সাজিয়ে আসর জমান নি; তাঁরা তাঁদের নিজস্ব ঢং-এ সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে বারবার সোচ্চার হয়েছেন। স্বাধীনতা-আন্দোলনের সময়ে একশ্রেণির ঘৃণ্য রাজনৈতিক দলের নেতা কর্মীদের প্রকাশ্যেই বিদ্বেষ ছড়াতে দেখা গেছে। সঙের গানে-ছড়ায়ও তার বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রতিবাদ দেখা গেছে। এবং এই প্রচেষ্টা বৃথা যায় নি। বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর 'বাংলাদেশের সঙ প্রসঙ্গে' বই-এ লিখেছেন---

অনেক জায়গায় সংঘবদ্ধ পল্লীবাসীরা হিন্দু-মুসলমানের মিলনের প্রয়োজনীয়তার উল্লেখ করে সঙের মাধ্যমে গান গেয়ে প্রচার চালিয়েছিলেন। এইসব গান শোনার জন্য সকল সম্প্রদায়ের মানুষের ভিড় হত।

সেকালের কলকাতায় মুসলিম কোচোয়ানের আধিক্য ছিল। বস্তুত ঘোড়ার গাড়ির চালক ও কোচোয়ানের প্রায় অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান। সঙের মিছিলে তাঁদেরও দেখা যেত। কোনও কোনও এলাকায় সঙের মিছিলে মুসলমান গায়ক-বাদকেরা রীতিমতো ভালো সংখ্যায় হাজির থাকতেন। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির লোকের এটা ভালো চোখে দেখেননি। তবুও সঙের গতিরোধ করা যায়নি।

কলকাতার হ্যারিসন রোডে তখন অনেক 'ব্যান্ডপার্টি' দল ছিল। দলের কর্মীরা বা বাদকেরা প্রায় সকলেই ছিলেন মুসলমান। গোটা বাংলাদেশ জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় সঙের মিছিলে এঁদের ডাক পড়ত।

কলকাতার খিদিরপুর মনসাতলার মুসলমান যুবকেরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে অগ্রণী ভূমিকা নিতেন। বীরেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় মনসাতলার দুটো সঙের ছড়া উদ্ধার করেছিলেন। সেকালে দেশের জন্য সঙের ভূমিকা কোনও রাজনৈতিক নেতাদের থেকে কম ছিল না। ছড়া দুটো দেখছি। কলকাতার সঙের ছড়া---

এক।

হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার যত বিদেশী তস্কর,

সজাগ হয়েছে দেশবাসী, মজুর-চাষী লস্কর।

আমরা হয়েছি এক, কেরাণী, উকিল, মাস্টার,

আমরা তোমাদের লুটতে দেব না আর।

হিন্দু-মুসলমান গায় স্বরাজের গান,

আমরা সবাই হয়েছি এক প্রাণ।

দুই।

বছরের শেষে গাও ভাই হেসে হেসে,

স্বরাজের গান, হয়ে একপ্রাণ,

গোলামী আর সহে না।

শত বিরোধের বাণী, নিয়ে যারা করে কানাকানি,

তাদের চোখে যেন পড়ে শুধু ছানি,

একতা ছাড়া স্বরাজ হবে না।

হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ খ্রীষ্টান,

সবার এই দেশ, সবার এই স্থান,

সবার তরে মোরা স্বরাজ চাই।

কোরো না আর অভিমান,

হয়ে মোরা একপ্রাণ,

স্বরাজের গান গাই।।

এখনকার এই সময়েও মনসাতলার সঙের ছড়া কী সাংঘাতিক প্রাসঙ্গিক

0 Comments

Post Comment