পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

রাজনৈতিক মীম – প্রতিবাদ না আমাদের দমিত ইচ্ছার কেরামতি?

  • 10 August, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 1059 view(s)
  • লিখেছেন : সম্রাট সেনগুপ্ত
আমরা দুর্নীতিবাজদের মাধ্যমে ঘটা বহু মানুষের জীবিকা ও জীবনের ক্ষতিকে লঘু রসিকতায় মেতে ভুলে গিয়ে তাঁদের যৌনজীবনের কটাক্ষে নিমগ্ন। সেই মীম রসিকতাগুলো আবার সাধারণভাবে নারীবিদ্বেষী। একদিকে বয়স্ক মানুষের যৌনতা নিয়ে তামাশা, অন্যদিকে তাঁর সাথে সম্পর্কিত নারীর লালসা ও তথাকথিত মন্দ চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ এই হল মীমগুলোর বিষয়। এই সব মেয়েদের সাজগোজ করা ছবি ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে তাতে নানা অশ্লীল বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা যোগ করে তৈরি এই সব মীম আমাদের মনের গভীরের সংস্কার ও নারীবিদ্বেষকেই সূচিত করে।

সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ১৯০৫ সালে প্রকাশিত জোকস এন্ড দেয়ার রিলেশন টু দা আনকনশাস গ্রন্থে চুটকি অথবা হাস্যকৌতুকের সাথে মানব মনের নিশ্চেতনের সম্পর্ক স্থাপন করেন। যা কিছু সমাজে প্রত্যক্ষভাবে অবদমিত থাকে তা পরোক্ষে সঞ্চিত থাকে নিশ্চেতন অথবা আনকনশাসের অন্তরালে। ক্ষেত্র বিশেষে তা প্রকাশিত হয় কারণ সেই সব অবদমন কখনোই সম্পূর্ণ নয়। নিশ্চেতন অনেকটা ছেঁড়া কাঁথার মতো যার থেকে মাঝেমধ্যেই সেলাই খুলে বেরিয়ে আসে তুলো। আমাদের আজকের পৃথিবীতে রাজনৈতিক হাস্যকৌতুকের বিবর্তিত রূপ মীম। আমরা সকলেই প্রায় হোয়াটসআপ, ফেসবুকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অন্তর্জালে মীম সংস্কৃতির অংশ । কৌতুককে ব্যাখ্যা করার একটি তত্ত্ব নিশ্চেতনের অবদমিত কথার তাৎক্ষণিক প্রকাশ যার সহসা উদ্ভাসে সমাজের নিয়মের রক্তচক্ষু এড়িয়ে মুখে ফোটে ছিঁচকেপনা দুষ্টু হাসি, যেখানে বাজে অসভ্য ইতর কথা বলাটাই দস্তুর, এতে মজাও পাওয়া যায় আবার মজার ছলে বলা হয় বলে নিন্দাও হয় না কারণ ব্যাপারটা সিরিয়াস মোটেই নয়। আরেকটি তত্ত্ব অবশ্য সেফটি ভালভের। সমাজের গুরুতর সমস্যাগুলো নিয়ে মজা করা গেলে আরাম পাওয়া যায়, ক্ষোভ প্রশমিত হয়। এই দুই মতই আমরা দেখবো সাম্প্রতিককালে এ রাজ্যের একদা শিক্ষামন্ত্রী ও পরবর্তীতে শিল্পমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর সম্ভাব্য প্রেমিকা অথবা প্রেমিকাদের নিয়ে লঘু যৌন রসিকতাকে কেন্দ্র করে। একদম সঙ্গত কারণেই অনেকে বিব্রত ও চিন্তিত কারণ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের অধীনে ঘটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়োগ দুর্নীতি ও বিরাট অঙ্কের কালো টাকা উদ্ধারের অভিযোগের মতো গুরুতর বিষয় নিয়ে তৈরি হওয়া সস্তা মীম আমাদের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিচ্ছে না তো।

আমরা দুর্নীতিবাজদের মাধ্যমে ঘটা বহু মানুষের জীবিকা ও জীবনের ক্ষতিকে লঘু রসিকতায় মেতে ভুলে গিয়ে তাঁদের যৌনজীবনের কটাক্ষে নিমগ্ন। সেই মীম রসিকতাগুলো আবার সাধারণভাবে নারীবিদ্বেষী। একদিকে বয়স্ক মানুষের যৌনতা নিয়ে তামাশা, অন্যদিকে তাঁর সাথে সম্পর্কিত নারীর লালসা ও তথাকথিত মন্দ চরিত্র নিয়ে কটাক্ষ এই হল মীমগুলোর বিষয়। এই সব মেয়েদের সাজগোজ করা ছবি ইন্টারনেট থেকে নামিয়ে তাতে নানা অশ্লীল বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা যোগ করে তৈরি এই সব মীম আমাদের মনের গভীরের সংস্কার ও নারীবিদ্বেষকেই সূচিত করে। কিন্তু সমস্যা আরো গভীরে। মীমে যা প্রকাশিত হয় তা মানুষের মনের গোপন অথচ একান্তস্বর। তাঁরা নারীর সাজগোজ, একাধিক সম্পর্ক, অর্থের বিনিময়ে সঙ্গিনী হওয়া নিয়ে যা মনে করেন তাই লেখেন মীমে। সেগুলো কোনো অবদমিত কথা নয়। কিন্তু এই লঘু রসিকতায় কি মানব মনের অবদমিত সেই ভাবগুলোই প্রকাশিত হয় না যেগুলো আসলে তাঁরা নিজেরাও কামনা করেন? বিশেষ করে যখন নয়াউদারনৈতিক ভোগবাদের বিশ্বায়ন প্রতিদিন এই যৌন কামনাবাসনা, অর্থ ও সীমাহীন ভোগের প্রতি লালসাকে ত্বরান্বিত করে। অপরপ্রান্তে কাজ করে রক্ষণশীল মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের তানানানা – বিবিধ নিষেধ। মীমগুলো কি তাহলে একই সাথে সেই নিষেধ ও বাসনার প্রকাশ নয়? এতে মরালিটির সাপও মরে আবার ভালোমানুষির লাঠিও ভাঙে না।

মানুষের যৌনতা ভারী অদ্ভুত জিনিস, নিষেধের মধ্যে দিয়ে কাজ করে। যেমন হিন্দি বি গ্রেড সফটপর্ণ ছবিতে দেখায় একটি যৌন অপরাধের গল্প - অজাচার, পরকীয়া, অবৈধ সম্পর্ক, বিবিধ অমূলস্রোত কামদৃশ্য ও পরিশেষে তার কুফল। যৌনতার ন্যারেটিভকে আমরা নিষেধের বাইরে ভাবতে পারি না, এমনকি প্রেমের গল্পেও নিষেধ ও লঙ্ঘন, ন্যায় অন্যায়ের জটিল ক্রিয়াবর্ত কাজ করে। আজ পার্থ অর্পিতা নিয়ে যে খিল্লি, তামাশা, ছিঁচকেপনা, মীম বানানো, অর্পিতার ফ্ল্যাটে সেক্স টয় পাওয়া নিয়ে বাঁকা হাসি, নোংরা কথা সেটিকে অনেকে আমজনতার যৌন মরালিটির প্রকাশ মনে করছেন, কেউ আবার নারীর যৌনতা নিয়ে মধ্যবিত্ত ছুঁতমার্গ মনে করেছেন। কিন্তু এ কথা কেউ বলছেন না যে এই অনিয়ন্ত্রিত, অবাধ, সমাজবহির্ভূত সম্ভাব্য যৌনসুখের আনন্দও এভাবেই উপভোগ করছেন অনেকে - নিন্দার মধ্যে দিয়েই। একই সাথে সমাজের নিষেধের নিয়মগুলো সত্যি হতে দেখে, অবাধ সুখের মুখে ইডির শাসন দেখে স্বস্তিতে থাকা যায়, আবার নিজের ফ্যান্টাসিগুলোকেও নেয়া যায় ঝালিয়ে। যে পুরুষ বহুগামিনী নারীর স্বপ্নে বিভোর থাকে রাতভর, সেই পাশের বাড়ির চটুল বাক্য বিলাসী সদ্যবিবাহিতাকে নিয়ে নিন্দায় মুখর হয়, তার ঘরে কখন কে ঢুকছে সেই নিয়ে চণ্ডীমণ্ডপি তরজা করে।

আজকের মীম কালচার প্রতিবাদের বিকল্প নয়, তাই তাকে প্রতিবাদের জায়গায় বসানো নিয়ে যারা নিন্দা করছেন সম্ভবত ভুল করছেন। এটা প্রতিবাদের ভান মাত্র, প্রতিবাদ এদের উদ্দেশ্য নয়। যৌন নৈতিকতার স্খলন দেখেও এরা মোটেই বিচলিত নয়। এরা রাতে নিজেকে পার্থ বা অর্পিতার জায়গায় কল্পনা করে, দিনে সেই কুচিন্তার পাপ ধুতে ব্যঙ্গ করতে মীম বানাতে নামে। একই সাথে নিষিদ্ধ সুখ লাভ ও নিষেধের স্থাপন এভাবেই চলতে থাকে। দুর্নীতির প্রতিবাদের সাথে এর দুর দুর কোনো সম্পর্ক নেই। তাই এই মীম কালচার সঠিক প্রতিবাদ নয় বলে নিন্দা নামিয়েও লাভ নেই। যৌন অবদমিত সমাজের এটাই লক্ষণ, বিশেষ করে যখন তার কায়েমি আদর্শের সাথে বাজার অর্থনীতির সংঘাত উপস্থিত হয়। একদিকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির অবাধ সুখের হাতছানি, অন্তর্জালে যাবতীয় ভিন্নতর কামদৃশ্য, অন্যদিকে সনাতন পারিবারিক সন্তানউৎপাদনভিত্তিক যৌন অনুশাসন - দুইয়ের মাঝে মানুষ এভাবেই নিজেকে শান্ত রাখে। ফ্রয়েড সাহেব দেখিয়েছেন রসিকতার সাথে অবচেতনের সম্পর্ক। অবদমিত যৌনতা নিষেধের মাধ্যমে প্রকাশিত হয় আর হয় রসিকতার মধ্য দিয়ে। রসিকতার মধ্যে থাকে possible ও impossible-এর ফাঁক। সেখান থেকেই উঠে আসে মাতাল হাসি। মীম সংস্কৃতি তারই উত্তরসূরি। নারীবিদ্বেষ, যৌন মরালিটির বিধিনিষেধের ঝক্কি এখানেই হেরে যায় অবচেতনের কাছে। নিন্দার ছলে আসলে বোধহয় আমরা কৃষ্ণ ভজনাই করে ফেলি। বাড়িতে না থাকলেও সকলের শরীরে ও মনে কয়েক কেজি করে সেক্স টয় যে বিদ্যমান এ তো বলাই বাহুল্যই।

এর থেকে আরো একটা ভয়ানক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। যে দুর্নীতির আমরা বিরোধিতা করছি তা আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে খেলা করে না তো? আমাদের সরকার হয়তো আমাদেরই প্রতিবিম্ব। নিজেরা কি পারছি চিনি খাওয়া ছাড়তে যে অন্যের চিনি খাওয়ার নিন্দা করবো? পারছি কি আমরা তফাৎ করতে নারী পুরুষের স্বেচ্ছায় যৌনমিলনকে নারীর যৌনতার পণ্যায়িত হওয়ার থেকে? তাহলে কিভাবে করা সম্ভব এইসব মীমের লব্জে দুর্নীতির প্রতিবাদ? মনে রাখতে হবে যে কয়েক হাজার মানুষ চাকরি লাভের জন্য ঘুষ দিয়েছেন তাঁরাও এই “গুড লাইফ” চেয়েছিলেন নিজের নিজের মতো করে। এই সমাজে মরালিটিও একটি সেক্সটয় বিশেষ। লোকে লুকিয়ে রাখে আবার প্রয়োজনে ব্যবহার করে।

লেখক সিধু কানহু বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির অধ্যাপক

0 Comments

Post Comment