পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পর্দার ওপারে যে মানুষ

  • 04 September, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 305 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
শহরটির নাম ছিল জনপদ। শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যেত একটি প্রশস্ত নদী। নাম তার মত। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর নদীর ওপর একটি সেতু তৈরি হতো। সেতুটির নাম—ব্যালট। সেতু পার হয়ে মানুষ যে দিকে যেত, পরবর্তী পাঁচ বছর শহরটি সেদিকেই চলত।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেতুটি কে বানায়, তার নকশা কোথায় হয়, আর নদীর স্রোত কোন দিকে ঘোরানো হয়—শহরের মানুষ তা জানত না।

শুধু শহরের উত্তরে একটি বিশাল প্রাসাদ ছিল। তার জানলা ছিল না। দরজার ওপরে লেখা—

“পরামর্শকেন্দ্র”।

সেখানে বসে থাকত কিছু মানুষ। শহরের লোক তাদের বলত তাঁতি।

তাঁতিরা কখনও মিছিল করত না। তাদের হাতে পতাকা থাকত না। তারা ভোট চাইত না। অথচ শহরের প্রতিটি নির্বাচনের আগে তাদের ব্যস্ততা বেড়ে যেত।

কারণ তারা কাপড় বুনত।

কাপড়টি চোখে দেখা যেত না।

তার নাম ছিল—রাজনীতি।


এক


প্রধান তাঁতির নাম ছিল নকশাকার।

একদিন তার সামনে শহরের বিশাল মানচিত্র খুলে রাখা হলো।

মানচিত্রে রাস্তা নেই, বাড়ি নেই, নদী নেই। আছে শুধু বিন্দু।

প্রতিটি বিন্দু একজন মানুষ।

নকশাকার বলল,

—“এরা কী চায়?”

সহকারী বলল,

—“চাকরি।”

আরেকজন বলল,

—“নিরাপত্তা।”

তৃতীয়জন বলল,

—“সম্মান।”

নকশাকার মাথা নাড়ল।

—“এসব জানা আমাদের কাজ নয়।”

সবাই অবাক।

—“তাহলে?”

সে বলল,

—“আমাদের জানতে হবে, কোন সুতো টানলে কোন মানুষ নড়বে।”

তারপর সে একটি যন্ত্র চালু করল।

যন্ত্রটির নাম অ্যালগরিদম।

শহরের মানুষের কথাবার্তা, পছন্দ, ভয়, রাগ, হাসি, ধর্ম, জাত, পেশা, বয়স, কেনাকাটা—সবকিছু যন্ত্রের ভেতর ঢুকতে লাগল।

মানুষ আর মানুষ রইল না।

কেউ হলো ‘রাগী’।

কেউ ‘ভীত’।

কেউ ‘আশাবাদী’।

কেউ ‘দ্বিধাগ্রস্ত’।

কেউ ‘সহজে প্রভাবিত’।

নকশাকার বলল,

—“এখন তাঁত বসাও।”


দুই

 

তাঁতিদের একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল।

তারা কোনো দলের লোক ছিল না।

একদিন তারা এক রাজাকে জেতাতে কাপড় বুনত।

পরের দিন অন্য রাজাকে।

তারপর তৃতীয়জনকে।

শহরের মানুষ বলত,

—“তোমরা তাহলে কার?”

তাঁতিরা হাসত।

—“আমরা কারও নই। আমরা শুধু জানি কীভাবে জেতাতে হয়।”

একসময় এক তরুণ তাঁতি এই কাজেই এত দক্ষ হয়ে উঠল যে একের পর এক রাজা তার কাছে এল।

সে কখনও বলল, “এই রাজা ভালো।”

বরং বলল,

“এই রাজাকে এই ভাষায় মানুষের সামনে দাঁড় করাও।”

কোথাও সে উন্নয়নের ছবি বুনল।

কোথাও গরিবের পাশে দাঁড়ানো নেতার ছবি।

কোথাও শক্তিশালী রাষ্ট্রের।

কোথাও আঞ্চলিক গর্বের।

রাজারা বদলাল।

তাঁতিটি থেকে গেল।

শেষে সে নিজেই বলল,

—“এবার আমি তাঁতঘর থেকে বেরোব।”

শহরের মানুষ ভাবল, তাঁতি এবার রাজা হবে।

কিন্তু সে রাজা হতে চাইল না।

সে বলল,

—“আমি এমন একটি তাঁত বানাব, যার কাপড় আমিই পরব।”

তার নাম হলো জনপথ।

তার পতাকায় কোনো পুরনো রাজচিহ্ন নেই। তার মুখে ছিল সাধারণ মানুষের কথা, তার পথে ছিল দীর্ঘ পদযাত্রা।

কিন্তু তাঁতঘরের অভ্যাস সহজে যায় না।

সিদ্ধান্ত এখনও ওপরের ঘরে তৈরি হয়।

মানুষের কাছে যাওয়ার আগেই মানুষের মানচিত্র তৈরি হয়।

জনপথ তাই পুরনো রাজদরবারের মতো নয়, কিন্তু পুরোপুরি জনতার ঘরও নয়।

এটি ছিল নতুন ধরনের তাঁতঘর।


তিন

শহরের দক্ষিণে ছিল আরেকটি জায়গা।

কেউ সেটিকে তৈরি করেনি।

নাম ছিল মিমের কারখানা।

একজন সেখানে ছবি আঁকত।

অন্যজন বাক্য লিখত।

তৃতীয়জন সেটিকে আরও বিদ্রূপাত্মক করত।

চতুর্থজন ছড়িয়ে দিত।

কোনো মালিক নেই, কোনো বেতন নেই, কোনো নির্দেশ নেই।

শাসকের তাঁতঘর কোটি টাকা খরচ করে যে ছবি বুনত, মিমের কারখানা কখনও এক রাতেই সেটিকে ছিঁড়ে ফেলত।

একদিন শাসকেরা ঘোষণা করল—

“শহর আগের চেয়ে অনেক সুখী।”

সেই রাতে মিমের কারখানা একটি ছবি বানাল।

এক বিশাল রাজা সোনার মুকুট পরে বলছে—

“আমি সব জানি।”

তার পাশে একটি ছোট পিঁপড়ে—

“তাহলে আমার জুতোর সাইজটা বলুন।”

শহর হেসে উঠল।

শাসকেরা প্রথমে বলল,

—“এগুলো ছেলেমানুষি।”

তারপর বলল,

—“ষড়যন্ত্র।”

তারপর বলল,

—“বিদেশি প্রভাব।”

কিন্তু হাসি থামল না।

হাসি ধীরে ধীরে রাগে পরিণত হলো।

আর রাগ একদিন রাস্তায় নেমে এল।


চার

 

সেদিনের মিছিলের কোনো নেতা ছিল না।

কেউ ডাক দেয়নি।

কেউ অনুমতি নেয়নি।

ছাত্র এল।

চাকরিপ্রার্থী এল।

শ্রমিক এল।

শহরের মধ্যবিত্ত যুবক এল।

কেউ হাতে পতাকা আনেনি।

শুধু একটি বাক্য লেখা ছিল—

“আমাদের জীবন কোনো ডেটা নয়।”

হাজার মানুষ হলো দশ হাজার।

শহরের কেন্দ্রের পুরনো চত্বরে তারা দাঁড়াল।

তাঁতিরা প্রথমবার বুঝল, তাঁতের বাইরে এমন একটি সুতো তৈরি হয়েছে, যা তাদের হাতে নেই।

সেটির নাম—স্বতঃস্ফূর্ততা।

তারা দ্রুত নতুন নকশা করতে বসে গেল।

—“ওদের নেতা কে?”

—“কেউ নেই।”

—“তাহলে একজন বানাও।”

কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কয়েকজন সামনে এল।

কেউ বলল,

“এই আন্দোলন আমার ধারণা।”

কেউ বলল,

“আমিই এর প্রতিনিধি।”

কেউ বলল,

“আমরা বাম নই, ডানও নই। আমরা মতাদর্শহীন।”

মিছিলের মধ্যে তখন এক বৃদ্ধ ঘড়িওয়ালা দাঁড়িয়ে ছিল।

তার নাম ধ্রুব।

সে এক তরুণকে জিজ্ঞেস করল,

—“তুমি কী চাও?”

—“ন্যায়।”

—“কার জন্য?”

—“সবার জন্য।”

ধ্রুব হাসল।

—“তাহলে তোমার মতাদর্শ তৈরি হয়ে গেছে।”

ছেলেটি চুপ।

ধ্রুব বলল,

—“মতাদর্শ মানে শুধু পতাকা নয়। তুমি যখন বলো সম্পদ কয়েকজনের হাতে থাকা অন্যায়, তখন তুমি একটি অবস্থান নিচ্ছ। তুমি যখন বলো রাষ্ট্র সবার, তখনও। মতাদর্শকে অস্বীকার করলেও তার বাইরে থাকা যায় না।”

পাঁচ

কিন্তু মিছিলটি এক জায়গায় এসে থেমে গেল।

কারণ সবাই একসঙ্গে হাঁটছিল, কিন্তু সবাই একই দিকে যেতে চাইছিল না।

কেউ বলল,

—“শুধু এই দাবি।”

আরেকজন বলল,

—“না, রাষ্ট্রের কাঠামো বদলাতে হবে।”

তৃতীয়জন বলল,

—“আমরা কোনো রাজনীতি চাই না।”

চতুর্থজন বলল,

—“রাজনীতি ছাড়া এই সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে?”

সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মধ্যেই তর্ক শুরু হলো।

যে হাতগুলো এতদিন তাঁতিদের বিরুদ্ধে ছিল, সেই হাতগুলো এবার একে অন্যের দিকে উঠল।

মিছিলের সবচেয়ে শক্তিশালী সুতোটি হয়ে উঠল তার সবচেয়ে দুর্বল সুতো।

ধ্রুব দূর থেকে বলল,

—“স্বতঃস্ফূর্ততা আগুন জ্বালাতে পারে। কিন্তু আগুনকে আলো বানাতে হলে কাঠামো লাগে।”


ছয়

 

এর মধ্যেই নির্বাচন এসে গেল।

শহরের প্রতিটি দেওয়ালে পোস্টার।

একজন বলল—

“আমি তোমাদের কথা শুনি।”

অন্যজন—

“আমি তোমাদের ভবিষ্যৎ জানি।”

তৃতীয়জন—

“আমি তোমাদের মতোই।”

পোস্টার তিনটি আলাদা।

কিন্তু নকশা তৈরি হয়েছে একই ধরনের ঘরে।

তাঁতিরা এবার আরও উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করল।

শহরকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করা হলো।

কোথাও নিরাপত্তা।

কোথাও উন্নয়ন।

কোথাও ধর্মীয় গর্ব।

কোথাও জাতিগত পরিচয়।

কোথাও যুবকদের স্বপ্ন।

কোথাও ভয়ের স্মৃতি।

একজন মানুষের ফোনে যে বার্তা পৌঁছল, পাশের মানুষের ফোনে তার সম্পূর্ণ বিপরীত বার্তা।

রাজনীতি আর একটি জনসভায় বক্তৃতা নয়।

রাজনীতি হয়ে গেল—

ব্যক্তিগত পর্দায় ব্যক্তিগত গল্প।


সাত

 

শহরের লোক ভাবল, ডিজিটাল প্রচার বুঝি বিনা খরচের।

তাঁতিরা হাসল।

তাঁত চালাতে সুতো লাগে।

ডেটা কিনতে টাকা লাগে।

সমীক্ষা করতে টাকা লাগে।

হাজার হাজার মানুষকে কাজে রাখতে টাকা লাগে।

ভিডিও বানাতে টাকা লাগে।

বিজ্ঞাপন চালাতে টাকা লাগে।

অ্যালগরিদম চালাতেও টাকা লাগে।

শহরের নির্বাচনে টাকার স্রোত বাড়তে লাগল।

২০১৯-এর নির্বাচনে যে পরিমাণ অর্থ নদীর মতো বইছিল, ২০২৪-এ তা প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছল—প্রায় ১.৩৫ ট্রিলিয়ন টাকা, অর্থাৎ ১ লক্ষ ৩৫ হাজার কোটি।

২০১৯-এ অনুমিত ব্যয় ছিল প্রায় ৬০,০০০ কোটি টাকা। তার প্রায় ৪৫ শতাংশ এককভাবে শাসক শক্তির ব্যয় বলে অনুমান করা হয়েছিল।

শহরের মানুষ শুনে অবাক হলো।

কারণ তাদের মাথাপিছু বার্ষিক আয় তখনও……….।

একটি সাধারণ নির্বাচনের কাপড় এত দামি হয়ে উঠেছে যে শহরের বহু মানুষ ভাবতে লাগল—

এই কাপড় কি সত্যিই আমাদের জন্য বোনা হচ্ছে?


আট

আগে নির্বাচনের অন্ধকার মানে ছিল নগদ টাকা।

এখন অন্ধকার বদলে গেছে।

তাঁতিরা ব্যাংকের মাধ্যমে বেতন পায়।

কর দেয়।

অফিস চালায়।

কম্পিউটার কেনে।

চুক্তি করে।

সবকিছু দেখতে বৈধ।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—

সুতোটা এল কোথা থেকে?

কোন পুঁজি কোন তাঁতঘরে ঢুকল?

কার অর্থে কোন নকশা তৈরি হলো?

কোন রাজা কতটা কাপড় পেল?

এমনকি একসময়ের গোপন অর্থের পথ বন্ধ করার চেষ্টা হলেও তাঁতিরা নতুন পথ খুঁজে নিল।

ধ্রুব বলল,

—“চোরকে দরজা বন্ধ করে আটকানো যায়। কিন্তু যদি বাড়ির নকশাটাই এমন হয় যে সে জানে কোন জানলা দিয়ে ঢুকতে হবে, তাহলে শুধু তালা বদলালে হবে না।”


নয়

 

শহরের মানুষ তখনও বুঝতে পারছিল না, আসল সমস্যা কোথায়।

কারণ তারা যা দেখছে তা হলো মঞ্চ।

বিশাল জনসভা।

আলো।

মাইক।

টেলিভিশন বিতর্ক।

নেতার আবেগঘন ভাষণ।

স্লোগান।

পতাকা।

এটাই ছিল ফ্রন্টস্টেজ।

কিন্তু মঞ্চের পেছনে আরেকটি ঘর ছিল।

সেখানে তাঁতিরা বসে।

কে কোথায় যাবে।

কী বলবে।

কাকে কী প্রতিশ্রুতি দেবে।

কোন কথায় কার মন নরম হবে।

কোন ভয়কে কতটা বাড়াতে হবে।

সব সেখানে ঠিক হয়।

সাধারণ মানুষ মঞ্চ দেখে।

তাঁতিরা মঞ্চের চিত্রনাট্য দেখে।

এই ব্যবধান যত বাড়তে থাকে, রাজনীতি তত বেশি অভিনয়ে পরিণত হয়।


দশ

 

একদিন শহরের এক তাঁতি বলল,

—“আমরা তো কোনো দল করি না। আমরা শুধু পেশাদার।”

নকশাকার উত্তর দিল,

—“পেশাদার হওয়া যায়। নিরপেক্ষ থাকা যায় না।”

তাঁতি অবাক।

নকশাকার বলল,

—“যে দলকে তুমি জেতাচ্ছ, তার ক্ষমতা কী করবে—সেটিও তোমার কাজের অংশ।”

সেদিন প্রথমবার তাঁতিদের ঘরে নীরবতা নেমে এল।

কারণ তারা বুঝল—

দক্ষতা কখনও রাজনীতির বাইরে থাকে না।

তুমি যদি ঠিক করো কার কণ্ঠস্বর বেশি শোনা যাবে, তবে তুমি ইতিমধ্যেই ক্ষমতার অংশ।


এগারো

 

নির্বাচনের আগের রাতে অ্যালগরিদম শেষ হিসাব দিল।

পর্দায় লেখা উঠল—

জয়ের সম্ভাবনা: ৯৪ শতাংশ।

নকশাকার হাসল।

ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল।

সমস্ত পর্দা অন্ধকার।

অন্ধকারের মধ্যে বাইরে থেকে মানুষের কণ্ঠ শোনা গেল।

“চাকরি কোথায়?”

“মজুরি বাড়ল না কেন?”

“ওষুধ এত দাম কেন?”

“জমি গেল কোথায়?”

“আমার ছেলে কাজ পাবে কবে?”

“আমাদের স্কুল?”

“আমাদের হাসপাতাল?”

নকশাকার জানলার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

সেই মুহূর্তে সে প্রথমবার বুঝল—

অ্যালগরিদম মানুষের আচরণ মাপতে পারে।

কিন্তু মানুষের অভিজ্ঞতা মাপতে পারে না।


বারো

 

পরদিন ব্যালট সেতু খুলে গেল।

মানুষ নদীর দিকে এগিয়ে গেল।

কেউ পুরনো পতাকা নিয়ে।

কেউ নতুন পতাকা নিয়ে।

কেউ কোনো পতাকা ছাড়াই।

কেউ রাগ নিয়ে।

কেউ আশায়।

কেউ ভয়ে।

কেউ পরিবর্তনের জন্য।

কেউ শুধু আগেরটিকে সরাতে।

নদী সবাইকে একসঙ্গে বহন করল।

সন্ধ্যায় ফল প্রকাশ হলো।

কোনো অ্যালগরিদম পুরোপুরি জিতল না।

কোনো আন্দোলনও পুরোপুরি জিতল না।

কোনো তাঁতিও শেষ কাপড় বুনতে পারল না।

কিন্তু শহরের মানুষ সেদিন একটি জিনিস বুঝল—

ভোট শুধু কাউকে নির্বাচিত করার ঘটনা নয়।

ভোট হলো জীবনের অভিজ্ঞতার একটি রাজনৈতিক হিসাব।

তেরো

বছর কেটে গেল।

তাঁতঘর বন্ধ হলো না।

বরং আরও বড় হলো।

অ্যালগরিদম আরও বুদ্ধিমান হলো।

মিম আরও দ্রুত হলো।

রাজনীতিবিদেরা আরও দক্ষ হলেন।

পরামর্শদাতারা আরও পেশাদার হলেন।

নির্বাচন আরও ব্যয়বহুল হলো।

পুরনো দল নতুন পোশাক পরল।

নতুন দল পুরনো কৌশল শিখল।

আর শহরের মানুষ?

তারা এখনও বাজারে যায়।

রিকশাচালক টাকা গোনে।

শ্রমিক মজুরি গোনে।

যুবক চাকরির অপেক্ষা করে।

বৃদ্ধ ওষুধের দাম গোনে।

এই হিসাব কোনো তাঁতঘরের পর্দায় পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

একদিন ধ্রুবের নাতি তাকে জিজ্ঞেস করল,

—“দাদু, তাহলে তাঁতিরাই কি সব ঠিক করে?”

ধ্রুব নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—“না।”

—“অ্যালগরিদম?”

—“না।”

—“টাকা?”

ধ্রুব একটু চুপ করে বলল,

—“অনেক কিছু ঠিক করে।”

—“তাহলে শেষ কথা কার?”

ধ্রুব ব্যালট সেতুর দিকে তাকাল।

—“শেষ কথা কার, সেটা জানতে হলে পর্দার দিকে তাকাস না।”

—“তাহলে?”

—“পর্দার ওপারে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, তার জীবনের দিকে তাকাস।”

তারপর সে নদীর দিকে তাকিয়ে বলল,

“মনে রাখিস—তাঁতিরা সুতো জোগাড় করতে পারে, নকশা বানাতে পারে, রং বেছে দিতে পারে। তারা মানুষের সামনে এমন এক কাপড় মেলে ধরতে পারে, যা দেখে মনে হবে পুরো শহরই সেই কাপড়ের রঙে রাঙা।”

“কিন্তু নদীর স্রোত তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।”

“কারণ নদীর নিচে আরও একটি স্রোত থাকে।”

নাতি জিজ্ঞেস করল,

—“কীসের স্রোত?”

ধ্রুব বলল,

—“মানুষের নিজের জীবনের।”

দূরে তখন ব্যালট সেতুর ওপর দিয়ে মানুষ হাঁটছিল।

কারও হাতে পতাকা ছিল।

কারও হাতে মিমের পোস্টার।

কারও হাতে ছিল শ্রমের কড়া।

আর কারও হাতে কিছুই ছিল না।

শুধু একটি আঙুলে কালির দাগ।

পর্দার আড়ালে তাঁত চলতেই থাকল।

কিন্তু তাঁতিরা যতই নিখুঁত কাপড় বুনুক, শেষ পর্যন্ত সেই কাপড়ের মূল্য ঠিক করে যে মানুষটি—

সে এখনও নদীর এপারে দাঁড়িয়ে আছে।

 

 

0 Comments

Post Comment