পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ভয় আর ভয়

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 205 view(s)
  • লিখেছেন : অনুপম প্রামাণিক
পশ্চিমবঙ্গে নতুন গুন্ডা দমন বিল আসছে। প্রশাসন যদি মনে করে কেউ জনহিতকর কার্যকলাপের সাথে যুক্ত তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা যাবে। প্রথম তিন সপ্তাহ অভিযুক্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেনা। পরে কর্তৃপক্ষের ( বিশেষ কমিটির) অনুমতি সাপেক্ষে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে। এক বছর তাকে এই আইনে আটক রাখা যাবে। এটাও তো সেই ভয় দেখানোই। যখন শাসকদল নিজেরাই ভীড়তন্ত্রকে মদত দিচ্ছে, তখন এই ভয় দেখানোর উদ্দেশ্য কী?

আমি ভয় পাই। এই কথাটা বলতে আমার অনেক সময় লেগেছে। কারণ আমাকে এটাই শেখানো হয়েছিল যে ভয় মানে দুর্বলতা। ছোটবেলায়, বড় হতে হতে, রাস্তায়, বাড়িতে, বইয়ের মধ্যে, সব জায়গায় একটা কথাই শুনেছি, “ভয় পেলে চলবে না।” কিন্তু কেউ কখনও বলেনি  যদি ভয় পাই, তাহলে কী করব?

 

আমরা সবাই ভয় নিয়ে জন্মাই, বিশেষ করে মৃত্যু ভয়। এই ভয় থেকেই আমরা সমাজ গড়ি, রাষ্ট্র তৈরি করি, আইন মানি। যে রাষ্ট্রকে আমরা ভয় থেকে বাঁচার জন্য তৈরি করি, সেই রাষ্ট্রই অনেক সময় ভয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে ওঠে। ভয় কেবল শাসনের ফল নয়—এটা শাসনের পদ্ধতি। ভয় তৈরি করা হয়, ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যাতে আমরা প্রশ্ন না করি।যখন আমরা চুপ করে যাই, যখন অন্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে ভাবি, “এটা আমার বিষয় না”, তখন ভয় তার কাজ সম্পন্ন করে। ভয় তখন আর বাহ্যিক নয়। ভয় তখন আমার ভিতরে বসবাস শুরু করে। আমি ভয় পাই, নিজেকেও। রাষ্ট্র আমাদের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আমরা নিজেরাই নিজের উপর নজরদারি করি। রাষ্ট্রের ভয় নিয়ে বাঁচতে বাঁচতে আমরা ধীরে ধীরে নাগরিক থেকে শুধু “অনুগত দেহ” হয়ে যাই। এই জায়গায় এসে ভয় একটা নতুন রূপ নেয়। এটা আর শুধু শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়। এটা নৈতিকতা ও  স্মৃতির প্রশ্ন। স্মৃতি কখনও শুধু অতীত নয়। স্মৃতি ফিরে আসে, প্রশ্ন করে, দায় চাপায়।

 

 ভয় পাওয়া আর ভয় দেখানো—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য শুধু অবস্থানের নয়, নৈতিকতারও। একজন ভয় পায় কারণ সে নিজেকে অনিরাপদ, ক্ষতিগ্রস্ত বা অসহায় ভাবে। আর একজন ভয় দেখায় কারণ সে অন্যকে অনিরাপদ, ক্ষতিগ্রস্ত বা অসহায় করতে চায় অথবা নিজের ভয় ঢাকতে চায়। ভয় পাওয়া হলো অভিজ্ঞতা। ভয় দেখানো হলো ক্ষমতার প্রয়োগ। কিন্তু দুটোই মানুষের স্বাধীনতাকে সংকুচিত করে। যে ভয় পায়, সে ধীরে ধীরে নিজের কথা হারায়। যে ভয় দেখায়, সে ধীরে ধীরে নিজের মানবিকতা হারায়। ফলে শেষে দুজনের মাঝখানে একটা শূন্যতা জন্মায়,যেখানে সম্পর্ক নেই, বিশ্বাস নেই, শুধু সতর্কতা আছে। সেই সতর্কতার নামই ভয়। রাষ্ট্র এই ভয়কে ব্যবহার করে আনুগত্য তৈরি করে। পরিবার ব্যবহার করে নিয়ন্ত্রণের জন্য। ভয়টাই পড়ে থাকে। শেষ পর্যন্ত ভয় এমন এক ছায়া, যা ভুক্তভোগী ও অত্যাচারী—দুজনের শরীরেই লেগে থাকে।

অন্তরের ভয় খুব সূক্ষ্ম। সে সবসময় চিৎকার করে আসে না। কখনও আসে ক্লান্তি হয়ে। কখনও নীরবতা হয়ে। কখনও অকারণ রাগ হয়ে। কখনও মানুষের থেকে দূরে সরে যাওয়ার ইচ্ছা হয়ে। ভয় শুধুমাত্র একটা ব্যক্তিগত আবেগ নয়; এটা এক জটিল সামাজিক নির্মাণ, এক নৈতিক পরিস্থিতি, এবং এক রাজনৈতিক অস্ত্র। ভয় একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। ভয়, বিপদের মুখে শরীর ও মনের সজাগতা। কিন্তু সমাজ এই ভয়কে ব্যবহার করতে শেখে। ভয় মানুষকে অন্যের দুঃখ থেকে দূরে সরিয়ে  দেয়। ভয় মানুষকে চিন্তা করা থেকে বিরত রাখে। মানুষ যখন চুপ করে তখন শুধু নিজেকে বাঁচায় না,ভয়কে জায়গা করে দেয়।

 

আইন, শাস্তি, হিংসা এইগুলো সরাসরি ভয় তৈরি করে। এর চেয়েও শক্তিশালী হলো সেই ব্যবস্থা, যেখানে মানুষকে সরাসরি দমন করা হয় না, বরং এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয় যেখানে সে নিজেই নিজেকে থামায়। মানুষ জানে না কী হবে—এই অনিশ্চয়তা নিজেই ভয় উৎপন্ন করে।  ফলে মানুষ স্বেচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ মেনে নেয়। মানুষ ধীরে ধীরে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নীরবতাই নিরাপত্তা। আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হলো একা হয়ে যাওয়া। কারণ একা মানুষ নিজের ভয়কে যাচাই করতে পারে না।সে তখন ভয়কেই সত্যি বলে মেনে নেয়।

আমি বা আমরা ভয় পাই। এটা সত‍্য। ভয়টা যতটা বাহ‍্যিক ততটাই অন্তরের। আমরা ভয় পাই। রাষ্ট্রকে ভয় পাই। মানুষকে ভয় পাই। নিজেকেও ভয় পাই। ভয় তখন আরও সূক্ষ্ম। কখনও তা থাকে নীরবতার ভিতরে। কখনও মনে হয়, চারপাশে সব ঠিক আছে, মানুষ কথা বলছে, বাজার যাচ্ছে, ট্রেন চলছে, কিন্তু ভিতরে কোথাও একটা আতঙ্ক ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু ভয় আসে বাস্তব থেকে। কিন্তু কিছু ভয় আমাকে শেখানো হয়েছে। সমাজ বলেছে, রাষ্ট্র বলেছে, ইতিহাস বলেছে। আমি বুঝতে পারি সব ভয় আমার নিজের নয়। ভয় অনেকটা এই ক্ষয়িষ্ণু তরঙ্গের মতো। একসময় তীব্র, তারপর স্তিমিত, আবার হঠাৎ ফিরে আসে। মানুষ ভাবে ভয় কেটে গেছে, অথচ তা ভেতরে জমে থাকে স্মৃতি হয়ে, অভ্যাস হয়ে। মানুষ হাসে, কাজ করে, তবু তার ভিতরে কোথাও ভয় বেঁচে থাকে। ভয় কখনও সম্পূর্ণ চলে যায় না। শুধু রূপ বদলায়। 

পশ্চিমবঙ্গে নতুন গুন্ডা দমন বিল আসছে। প্রশাসন যদি মনে করে কেউ জনহিতকর কার্যকলাপের সাথে যুক্ত তাহলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা যাবে। প্রথম তিন সপ্তাহ অভিযুক্ত কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেনা। পরে কর্তৃপক্ষের ( বিশেষ কমিটির) অনুমতি সাপেক্ষে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারে। এক বছর তাকে এই আইনে আটক রাখা যাবে।

মানুষের মৌলিক অধিকার ভুলুন্ঠিত। সবচেয়ে বড় কথা মানুষের পেছনে সবসময় তাড়া করে বেড়াবে ভয়। রাষ্ট্র যখন তখন  তার মর্জিমাফিক কাউকে একবছরের জন‍্য জেলে পুরে দিতে পারে। ভয়ের চাষ করবে এই আইন। ভয় শুধু লাঠির আঘাতে জন্মায় না। ভয় জন্মায় সম্ভাবনায়। যখন মানুষ জানে, আজ নয়তো কাল, কোনো স্পষ্ট অপরাধ প্রমাণ ছাড়াই রাষ্ট্র তাকে আটক করতে পারে, তখন ভয় তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে ওঠে। ভয় তখন আর কোনো দুর্ঘটনা নয়; রাষ্ট্রীয় নকশা। মানুষ নিজের কথাকে ছাঁটাই করে, প্রতিবাদকে গিলে ফেলে, বন্ধুর সঙ্গে কথোপকথনেও সাবধান হয়ে যায়। কারণ শাস্তি নয়, শাস্তির সম্ভাবনাই তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

এমন একটি প্রস্তাবিত আইনের আলোচনা—যেখানে প্রশাসনের মূল্যায়নের ভিত্তিতে কাউকে দীর্ঘ সময় আটক রাখার ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে—সেই প্রশ্নটিকেই সামনে আনে। আইনটির সমর্থকেরা বলবেন, এটি সংগঠিত অপরাধ দমনের জন্য প্রয়োজনীয়। সমালোচকেরা বলবেন, যদি পর্যাপ্ত জবাবদিহি, বিচারিক নজরদারি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা দুর্বল হয়, তবে ভয়ই হয়ে উঠতে পারে এর প্রধান সামাজিক ফল। তখন আইন অপরাধীকে তাড়া করে না; আইনের সম্ভাবনাই সাধারণ মানুষকে তাড়া করে। সবচেয়ে বড় কারাগার ইট-পাথরের নয়। সবচেয়ে বড় কারাগারের নাম ভয়। যে রাষ্ট্র ভয়কে চাষ করে, তাকে আর প্রতিটি মানুষের ঘরে পুলিশ পাঠাতে হয় না। মানুষ নিজেই নিজের প্রহরী হয়ে ওঠে, নিজের মুখ বন্ধ রাখে। এটাই ভয়ের সবচেয়ে পরিণত রাজনীতি।

ভয় তো থেকেই যায়। ভয় আমাদের সীমা দেখায়, আবার সেই সীমা অতিক্রম করার সম্ভাবনাও তৈরি করে। অনুভূতির সত্য তখনই পূর্ণ হয়, যখন তা প্রকাশ পায়। ঠিক তেমনই, ভয়ের সত্য তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন তা প্রতিরোধে রূপ নেয়। কারণ শেষ পর্যন্ত, প্রতিরোধ কোনো ভয়ের বিপরীত নয়। এটা ভয়েরই একটি গভীর, সচেতন রূপ। প্রতিরোধকে আমরা প্রায়ই ভয়ের বিপরীত হিসেবে ভাবি। যেন সাহস মানে ভয়হীনতা। কিন্তু দার্শনিকভাবে এটি ভুল ধারণা। প্রতিরোধ জন্ম নেয় ভয়ের ভিতর থেকেই। আমি ভয় পাচ্ছি। তবু আমি বুঝছি কেন ভয় পাচ্ছি । সেই বোঝাপড়া আমাকে প্রশ্ন করতে বাধ্য করছে। এই প্রশ্নই প্রতিরোধের সূচনা। মানুষ আঘাত, অপমান, বিলোপ এসবকে ভয় পায়। সেজন্য প্রতিরোধ গড়ে। একই সঙ্গে ভয়কে মেনে নিতেও অস্বীকার করে। ভয় যখন নীরব থাকতে অস্বীকার করে, তখনই প্রতিরোধ জন্মায়। প্রতিরোধ হোল  ভয়ের রাজনৈতিক ভাষা।

আমি ভয় পাই। কিন্তু এই ভয়টা শুধুমাত্র আমার ব্যক্তিগত নয়, এটা আমার  চারপাশের বাতাসে মিশে আছে।এটা রাজনৈতিকও। কারণ রাষ্ট্র ও সমাজ সবসময় চায় মানুষ নিজের ভয়কে ব্যক্তিগত সমস্যা বলে ভাবুক। যেন সে বুঝতেই না পারে যে লক্ষ লক্ষ মানুষ একই আতঙ্কে বাস করছে। কিন্তু “আমি ভয় পাই” যখন “আমরা ভয় পাই”-এ পরিণত হয়, তখন ভয় আর নিছক ব্যক্তিগত অনুভূতি থাকে না। তা হয়ে ওঠে সময়ের ভাষা।

ভয় এখন আমার সঙ্গে হাঁটে। শহরের ভিড়ে, নির্জন রাস্তায়,স্মৃতির ভেতরে। কিন্তু এখন আমি ভয় নিয়ে বাঁচতে পারি। ভয় জীবনের অঙ্গ। ভয়কে অস্বীকার করার মধ্যে মুক্তি নেই। মুক্তি আছে ভয়কে চিনতে পারার মধ্যে। ভয় তখন হয়ে ওঠে একটা আয়না। বুঝেছি, ভয় থেকে মুক্তি মানে ভয়হীন হওয়া নয়। ভয় থেকে মুক্তি মানে, ভয়ের মধ্যেও নিজের কণ্ঠস্বর খুঁজে পাওয়া। ভয়ের মধ্যেও নিজের অবস্থান খুঁজে পাওয়া। 

আমরা ভয় পাই। তবু আমরা প্রশ্ন করি। তবু আমরা বলি।  তবু আমরা হাঁটি। তবু আমরা বাঁচি।

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment