পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিশে জুলাইয়ের কথকতা... প্রবীর দত্তকে মনে রেখে...

  • 19 July, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 632 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস চক্রবর্তী
এখন এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে আমরা অসম্ভব খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়েছি। সত্তর একাত্তর বাহাত্তর নয়, এ আরো আরো আরো নির্মম জঘন্য অবস্থা। এই সময় আমাদের একত্রিত হওয়া দরকার। প্রতিবাদ করা দরকার, সাধারণ মানুষের সামনে যাওয়া দরকার, থিয়েটার করা দরকার। করতেই হবে। তা নাহলে বাঁচানো যাবে না। এই দেশকে বাঁচানো যাবে না, এই পৃথিবীকে বাঁচানো যাবে না। এই প্রবীর দত্ত স্মরণ শুধু স্মরণ নয়। স্মরণ করে কী হবে? স্মরণ করছি সেই জন্যই, যাতে আমরা কাজ করতে পারি। তবেই তার স্মরণটা সার্থক হবে।

রক্তের দাগ তখনো মুছে যায়নি। ৭০-৭১ এ যে রক্ত ঝরেছে সে দাগ তখনো আছে এই বাংলার মাটিতে। বাতাসে বারুদের গন্ধ। ঠিক সেই সময় সিল্যূয়েট নাট্যগোষ্ঠী তাদের মঞ্চে নাটক করতে না পেরে চলে আসে কার্জন পার্কে। সেখানে তারা খোলা মাঠে নাটক শুরু করে। আস্তে আস্তে প্রচুর লোক জমায়েত হতে শুরু করে। তাদের আবৃত দশমিকের টুকরো টুকরো অংশ অভিনয় করে, কখনো কবিগান করে, এবং খবরটা ছড়িয়ে পড়ে চতুর্দিকে যে কার্জন পার্কে নিয়মিত, প্রতি শনিবার, নাটক হচ্ছে। ওরা বলত ওপেন এপিক থিয়েটার। সেখানে আমরাও আসলাম  শ্রীবিদূষক।

, সেখানে নাটক করতাম। এভাবে আস্তে আস্তে দলের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেল, দর্শকও প্রচুর বাড়তে শুরু করল। এখন দলের সংখ্যা বেড়ে গেলে একই দিনে, একই শনিবার তো অত নাটক করা যায় না। তখন আমরা ছড়িয়ে পড়লাম। বাটানগর থিয়েটার ওয়ার্কশপ অভিনয় করত ওয়েলিংটন স্কোয়ারে প্রত্যেক শনিবার, আমরা শ্রীবিদূষক কখনো শহীদ মিনারের তলায়, সেখান থেকে ফিরে এসে আবার কার্জন পার্কে, কখনো হাজরা পার্কে গিয়ে করলাম, শিয়ালদা স্টেশনের সামনের চত্বরে করলাম। কখনো তিনটে চারটে অভিনয়ও করতাম একেক শনিবার। এইভাবে থিয়েটারটা ছড়িয়ে পড়ল। তার গন্ধ গিয়ে পড়ল শাসকের নাকে। তারা বুঝতে পারল এ নাটকের কথা, এ নাটকের সুর, এ গানের সুর কোথায় যেন আজও নকশালবাড়ি আন্দোলনের একটা রেশ বয়ে চলেছে। হ্যাঁ বাধা দিয়েছে। বহু জায়গায় এসে বাধা দিয়েছে, অনেক সময় এসে বাধা দিয়েছে। পুলিশ এসেছে, বারণ করেছে, আমরা বারণ শুনিনি। তখন অল্প বয়স, কে কার বারণ শোনে? “আপনারা দাঁড়ান, আমরা নাটক শেষ করি, তারপর যাচ্ছি। এইভাবে সেই সময়ে চতুর্দিকে নিয়মিত শনিবার করে থিয়েটার হচ্ছে।  সিল্যূয়েট  করছে, শ্রীবিদূষক করছে, নটসেনা করছে --- এরকম বিভিন্ন দল। শতাব্দী এসে গেছে। বাদলদা খবর পাওয়া মাত্রই নিজে নিজেই চলে আসেন কার্জন পার্কে দেখতে। তারপর শতাব্দী ওখানে স্পার্টাকাস নাটকটা করে। সে এক অসাধারণ প্রযোজনা। এইভাবে ওখানে নাটক চলতে থাকে। তারপর আসে ১৯৭৪ এর ২০শে জুলাই।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দিবস সেবার একই দিনে পড়েছিল, ঐ শনিবার। তখন এক দল রাজনৈতিক কর্মী পার্কের বাইরে একটা কোণায় জমায়েত হতে শুরু করেছে, আমরাও আমাদের নাটকের জন্য কার্জন পার্কে গাছের তলায় জমায়েত হয়ে গেছি, লোকজন গোল হয়ে বসে গেছে, নাটক শুরু হবে, হঠাৎ ওদিকে গণ্ডগোল। তাকিয়ে দেখলাম ওখানে পুলিশ এসে গেছে, পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে। কাউকে কাউকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। প্রায় লাঠালাঠি, মারামারি।এই দেখতে দেখতে পিছনদিকে তাকিয়ে দেখি চতুর্দিক থেকে ফেন্সিং পেরিয়ে পুলিশ লাঠি হাতে এগিয়ে আসছে। এগিয়ে এসে বেধড়ক মারতে শুরু করল, লাঠিচার্জ করতে শুরু করল দর্শকদের উপর, আমাদের উপর। আমরা ছুটে পালালাম, অনেকে আহত হয়ে ওখানেই রাস্তায় পড়ে থাকল। আমরা ফেন্সিং টপকে --- তখন মেট্রো সিনেমা হলের উল্টোদিকে একটা মার্কেট ছিল। সেই মার্কেটের মধ্যে দিয়ে গিয়ে মেট্রো সিনেমা হলের নীচে দাঁড়ালাম। সব ওখানে আস্তে আস্তে একত্রিত হলাম। ওদিকে তাকিয়ে দেখলাম… কোণা দিয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখি বীর সেনকে, নরেশকে ধরে নিয়ে তুলছে পুলিশ ভ্যানে। আমরা ঠিক করলাম “না, এবার বাড়ি চলে যাওয়াই উচিৎ। এখানে থাকাটা ঠিক হবে না।” এমন সময় খবর আসল যে ওখানে প্রবীর দত্তকে মেরে ফেলা হয়েছে।

 

প্রবীর দত্ত! প্রবীর! কবিতা লিখত! একটা সাধারণ হাসিখুশি ছেলে! তাকে মেরে ফেলল! আমরা সহ্য করতে পারলাম না। ওরা বলল যে ওকে নিয়ে চলে গেছে মেডিকাল কলেজে। আমরা সব ছুটলাম সেখানে। আমরা গিয়ে পৌঁছতেই দেখি ওখানে কাতারে কাতারে লোক, সব খবর পেয়ে গেছে কোথা থেকে! সব এসে গেছে ওখানে। এদিকে অসিত বসু, অশোক মুখোপাধ্যায়, গুরুদাস দাশগুপ্ত, আরো অনেক মানুষ --- এঁরা সবাই এসে গেছেন। শুনলাম প্রবীর নেই। প্রবীর মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে গুরুদাস দাশগুপ্ত বললেন “আমাদের তো বসতে হবে। একটা প্রতিবাদ জানাতে হবে, একটা কিছু করতে হবে।” মৌলালির মোড়ে একটা সি পি আই এর পার্টি অফিস ছিল। সেইখানে উপরে গিয়ে বসা হল। কিন্তু ওখানে লোকজন এত বেশি হয়ে গেছে যে ওখানে আর বসা যাচ্ছে না। তখন খবর আসল নান্দীকার থেকে, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিনের শো বন্ধ করে দিয়েছেন এবং বললেন আমাদের ওখানে চলে যেতে, ওখানেই মিটিং হবে। আমরা সবাই ওখান থেকে বেরিয়ে গেলাম। চলে গেলাম নান্দীকারের রঙ্গনাতে। সেখানে মিটিং হল, ঠিক হল ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে একটা প্রতিবাদ সভা হবে। সেখানে প্রতিবাদ সভা হল, কিন্তু আমরা তখন থেকেই স্থির করে রেখেছি, না, প্রতিবাদ যদি করত হয় ঐ কার্জন পার্কেই করব। নাটক করে, গান করে আমরা আমাদের প্রতিবাদ জানাব। হ্যাঁ, স্থির হল সেটাই। তখন ঠিক হল যে একটা নাটক করা হবে। কী নাটক? তখন অসিত বসুই সিদ্ধান্ত নেয় বাদলদার সাথে কথা বলে যে মিছিল নাটকটা --- ঐ বছরই এপ্রিল মাসে ওটা নেমেছে --- ঐ নাটকটাই করা হবে, বিভিন্ন দল থেকে অভিনেতারা আসবে। তারা সম্মিলিতিভাবে ঐ নাটকটা করবে। ব্যাস! আমরা চলে গেলাম অঙ্গন মঞ্চে। তখনকার অঙ্গন মঞ্চ অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের চার তলায়।

সেখানে গিয়ে দেখি অভিনয় করবে কে? কেয়া চক্রবর্তী। উনি অভিনয় করবেন। সুনীল মুখোপাধ্যায়। অভিনয় করবেন। সৌমিত্র মিত্র। অভিনয় করবেন। বাদল সরকার নিজে করবেন। রাম মুখোপাধ্যায়। তিনি অভিনয় করবেন। আর আমার মত কয়েকজন। শুরু হল সেই রিহার্সাল। টানা রিহার্সাল। কি আনন্দ! সে আনন্দের কোন সীমা নেই। নাটক তৈরি হয়ে গেল, স্থির হয়ে গেল ২৪শে আগস্ট ঐ কার্জন পার্কেই আমরা ‘মিছিল’ নাটকের অভিনয় করব এবং অন্যান্য অনুষ্ঠান হবে। ওদিকে পুলিশের সাথে কেস কামারি, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের সাথে বসা ইত্যাদির দায়িত্ব যে দুজন আহ্বায়কের উপর ছিল তাঁরা হলেন --- অসিত বসু এবং মৃণাল সেন। এরা দুজনেই ভারতবর্ষের চতুর্দিকে খবরাখবর ছড়িয়ে দিয়েছে। তারপর তো ঠিক হল ২৪ তারিখে কার্জন পার্কে অনুষ্ঠান হবে।

গিয়ে দেখি --- মানুষ! মানুষ, মানুষ আর মানুষ! হাজার দশেক? জানি না কত মানুষ! শুধুই মানুষ! আর ক্যামেরা। তখন তো আর এইসব ক্যামেরা ছিল না, তখন ফিল্মের ক্যামেরা। সামনে বসে রয়েছেন উৎপল দত্ত, মৃণাল সেন, গুরুদাস দাশগুপ্ত, অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত, বিভাস চক্রবর্তী, জোছন দস্তিদার, শেখর চট্টোপাধ্যায় --- কে নেই? পাশাপাশি আছেন সাহিত্যিক, শিল্পীরা। বসে আছেন নবারুণ ভট্টাচার্জ, গণেশ পাইন সহ অন্যান্যরা  চিত্রকররা আছেন, অনেক ছাত্র সংগঠনের ছেলেরা এসেছে। সে এক বিশাল ব্যাপার। এই অনুষ্ঠানটা পুরো পরিচালনা করলেন অশোক মুখোপাধ্যায়।

শুরুতে উৎপল দত্ত একটা কবিতা পাঠ করলেন। প্রবীর দত্তের লেখা একটা কবিতা। তারপর অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায় একটা বড় আবৃত্তি করলেন। গুরুদাস দাশগুপ্ত বক্তব্য রাখলেন, মৃণাল সেন বক্তব্য রাখলেন, অনেকেই বক্তব্য রাখলেন, বিভাস চক্রবর্তী। চেতনা গান করলেন, তাদের সেই বিখ্যাত ‘মেরিবাবা’। গণনাট্য সঙ্ঘ গান করলেন। এইভাবে বিভিন্ন অনুষ্ঠান শেষে শুরু হল নাটক ‘মিছিল’। অভিনয় করছেন কেয়া চক্রবর্তী, রাম মুখোপাধ্যায়, সুনীল মুখোপাধ্যায়। আর খোকা চরিত্রে থিয়েটার লাইভারের ধূর্জটি ভট্টাচার্য। আর আমাদের মধ্যে অপুদা, আমি, মুরারিদা – মুরারি চক্রবর্তী --- এরা। নাটক শুরু হল। সে নাটকের প্রযোজনা, অভিনয় স্বপ্নাতীত। পরবর্তীকালে কখনো হয়নি। ঐ অত মানুষ, ঐ নাটক, তারপর মিছিলের শেষ। মিছিলের শেষে সুর করে করে নতুন মানুষের মিছিলের আহ্বান জানানো হচ্ছে। সকলে উঠে আসলেন আমাদের হাত ধরে ধরে ঐ মঞ্চে --- অঙ্গন মঞ্চে। ঐ অঙ্গনে একত্রিত সব মানুষ --- আমরা শুধু সুর, সুর আর সুর গেয়েই গেলাম। সবাই গলায় গলা মেলালেন, আস্তে আস্তে অনুষ্ঠান শেষ হল।

সেই সময় থিয়েটার কর্মীদের মধ্যে, অন্য সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে অসম্ভব ভাব ভালবাসা, একটা বন্ধুত্ব ছিল। কে প্রসেনিয়ামে করছে, কে মাঠে করছে, কে যাত্রা করছে, কে ফিল্ম করছে --- ও নিয়ে কোন বাধা নেই। আমরা সকলে কর্মী, সকলের মধ্যে একটা ভালবাসা ছিল। যা-ই হোক, তার পরের শনিবার আবার ঐ কার্জন পার্কেই ‘মিছিল’ নাটক হল। তারপর নিয়মিত ঐ কার্জন পার্কে অভিনয় শুরু হল।

 

সেই সময় শতাব্দী, থিয়েটার লাইবর, ঋতম… আরো অনেক দল… শপথ --- এঁরা সব আসলেন, ওখানে নাটক করলেন। তারপর জরুরী অবস্থা --- সব বন্ধ হয়ে গেল। জরুরী অবস্থা যেদিন তুলে নেওয়া হল, ঠিক তার প্রথম শনিবারই ওখানে আবার অভিনয় শুরু হল ‘নির্মোক’ নাটক দিয়ে। ঋতম প্রযোজনা করল। তার সাথে নটসেনাও ছিল। নটসেনা মাঝেও কার্জন পার্কে অভিনয় করেছে। এই আবার শুরু হল নাটক। ঐ বছরই ২৩শে জুলাই, শনিবার ছিল, আমরা প্রবীর দত্তর স্মরণে অনুষ্ঠান করলাম, নাটক হল সেই নাটক যে নাটক ঐ ২০শে জুলাই চুয়াত্তরে  সিল্যূয়েট করবে বলে স্থির করেছিল। তখন সে এক ইতিহাস। সেই নাটকের অভিনয় হল, আমরা অভিনয় করলাম। শতাব্দী ‘ভোমা’ নাটকটি করলেন, অজিত পাণ্ডে গান গাইলেন, শপথ গান গাইলেন। আবার কার্জন পার্কে নাটক শুরু হল।

 

আজ খুব খারাপ লাগে, আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। এবং এখন এই মুহূর্তে আমার মনে হচ্ছে আমরা অসম্ভব খারাপ অবস্থার মধ্যে পড়েছি। সত্তর একাত্তর বাহাত্তর নয়, এ আরো আরো আরো নির্মম জঘন্য অবস্থা। এই সময় আমাদের একত্রিত হওয়া দরকার। প্রতিবাদ করা দরকার, সাধারণ মানুষের সামনে যাওয়া দরকার, থিয়েটার করা দরকার। করতেই হবে। তা নাহলে বাঁচানো যাবে না। এই দেশকে বাঁচানো যাবে না, এই পৃথিবীকে বাঁচানো যাবে না। এই প্রবীর দত্ত স্মরণ শুধু স্মরণ নয়। স্মরণ করে কী হবে? স্মরণ করছি সেই জন্যই, যাতে আমরা কাজ করতে পারি। তবেই তার স্মরণটা সার্থক হবে। সফদর হাশমি মারা গেলেন, মেরে ফেলা হল। তাঁর স্মরণও আমরা করি। কিন্তু সার্থকতা কোথায়? কাজ না করলে? কাজ না করলে কিচ্ছু হবে না। সকলে একত্রিত হওয়া দরকার। সব ভেঙে বেরোনো দরকার। তা নাহলে কোন কিছুর স্মরণে কোন কিচ্ছু হবে না।

অনুলিখন ঃ প্রতীক।

 

 

0 Comments

Post Comment