পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কন্টেন্ট

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : মৌমন মিত্র
স্নেহ যে আজ পরীক্ষা কেমন দিল কে জানে ! এত ফোকাসের অভাব। পড়তে বসে একবার উঠবে, জল খাবে। একবার উঠবে, ওয়াশরুম যাবে। একবার উঠবে, হেড ফোন খুঁজবে। প্রতিদিন অফিসের পর ভাল লাগে এই লড়াই করতে? কিছু বলতে গেলে, শাসন করতে গেলেই ছেলের গোসা। মুখে মুখে তর্ক।আজকাল ছেলেপিলেদের এত সাহস হয় কী করে? আমরা তো…যাক গে।

ব্লাইন্ডসগুলো  সরিয়ে দিই। তেমন রোদ নেই আজ। ভোর বেলা থেকেই মেঘ। প্রতিদিন সকালবেলা স্নেহকে যখন লাঞ্চ প্যাক করে দিই ছ'টা নাগাদ। কিচেনের আলো জ্বালিয়ে রাখতে হয়। চারপাশ অন্ধকার। তার পর বেলা বাড়লে, আলো ফুটলে, যদি মেঘ করে থাকে, মন খারাপ হয় না? 

এই শুরু হল। শরৎ, হেমন্ত এখানে এমনই। বৃষ্টি, মেঘ। রোদ্দুরের দেখা নেই। সূর্য উঠছে। তবু যেন সূর্য নেই।

উঠোনের গাছগুলো আজ ঘরে ফিরে ভিতরে নিয়ে আসব। ঠান্ডা পড়ছে। ওস পড়ে পড়ে মিইয়ে যাবে পাতাগুলো।কত দিক যে খেয়াল রাখব! এত বড় ঘরটা সামলাতে সামলাতে কবে যে পুজো এসে যায় প্রতি বছর, টেরই পাই না। 

এইবার তো মাঝে স্নেহর গরমের ছুটিতে কলকাতাও যাওয়া হল না। স্নেহ বায়না ধরল। যাবে না। সামার প্রোগ্রাম আছে। কম্পিউটার ক্লাস করবে। করুক। কী বলব! ঘরে ফেরার টান তো আর বলে কয়ে হয় না।

প্রহর ছেলেকে এই বিষয়ে কিছু বলবে না। উল্টে আমার সঙ্গে রাগারাগি, ঝগড়া, ‘ বুঝতে পারো না কেন? স্নেহর এখন ক্লাস নাইন। বন্ধুবান্ধব, খেলাধুলো সবই এই দেশে। কী হবে কলকাতায় গিয়ে? সেই নোংরা রাজনীতি। সেই তো দেখনদারি কতগুলো ক্লাব কালচার। থাকুক না ও নিজের মনে…’ থাকুক তা হলে। 

 আমি আর বেশি কথা বাড়াইনি। কথা কাটাকাটি বাড়লে এই বয়সে স্নেহ মা বাবার ঝগড়াটুকুই বুঝবে। ঝগড়ার অর্থ বুঝবে না। যা হয়… 

 

‘সাহিত্যদি, আসি?’ কে? গলা তো মালিনীর মনে হয়। 

‘কয়েকটা এডিটিং শেষ। তুমি একবার দেখে দেবে। তার পর বাকিগুলো…’  

ঠিক তাই। মালিনী। হেসে বললাম, ' ভিতরে আয়। বস। এক কাপ কফি করি?’ 

ও আমার টিমে নতুন জয়েন করেছে। কয়েক মাস হল। ভীষণ চটপটে, জেদি, চতুর মেয়ে।চাপল্য রয়েছে খানিকটা। মুখের আদল বাংলা সিরিয়ালের কোন এক অভিনেত্রীর মতো। এই মুহূর্তে মেয়েটির নাম মনে পড়ছে না।

‘লেখাটার দু-এক পাতা চোখ বুলিয়ে আমি উঠলাম। কফি বিনসের নির্যাস গলায় না-গেলে মন, মাথা কাজ করবে না। 

‘দি, আই এনভি ইউ।’ মালিনী লাজুক হাসছে। 

কফি তৈরি করতে করতে ওকে প্রশ্ন ছুঁড়লাম,‘ কেন রে? ঈর্ষা করিস কেন?’ 

‘করব না? কী বলছ! আই মিন, লুক অ্যাট ইউ ! এক পিঠ ঘন চুল। টিকালো নাক। তোমার ফিগার। কে বলবে তুমি চল্লিশ? এমন তন্বী লুক মেনটেন করো কীভাবে দি? এই জন্যই প্রহরদা তোমাকে চোখে হারায়, না?’ 

 

এই ব্লক প্রিন্ট কাপ দুটো অনলাইন অর্ডার করেছিলাম। অফিসের জন্য। মালিনীকে এটাতেই কফি ঢেলে দিই। ওর কথার কী উত্তর দেব জানি না।’ ধন্যবাদ’ বলাটা কেমন যেন দায়সারা গোছের। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া বলতে ইচ্ছে করে না। ভান করলাম। তবে, এই জাতীয় কথাগুলো সব সময় মনকে আরাম দেয়। মনে প্রশান্তি হয়। 

‘নে ধর…’ এক কাপ কফি এগিয়ে দিলাম ওর দিকে। 

চেয়ার টেনে বসে হাসলাম একবার।চ্যাট দুনিয়ার স্মাইলিগুলো যতটা হাসে, ঠিক ততটা। ‘ বিয়ের এতগুলো বছর পর চোখে কেউই কাউকে হারায় না রে। একটা নির্ভরতা এসে যায়। খানিক অভ্যেস বলতে পারিস। তা ছাড়া…আমরা তো সমাজ মাধ্যমে তেমন অ্যাক্টিভ নই। একে অপরকে ভ্যালিডেট করি।কত মত মেলে না। তখন ঝগড়া। বকি। হাসি। কাঁদি এক সঙ্গে। এই আর কী!’ 

কফিতে প্রথম চমুক দিয়ে মালিনী দুষ্টু গলায় বলল, ‘ সে তুমি যাই বলো। তোমার মধ্যে কিছু আছে। অফিসে ঢুকবে যখন আমি লক্ষ করেছি সব আমেরিকানগুলো পর্যন্ত হাঁ করে তোমাকে গিলছে।বললে হবে…এশিয়ান, ব্রাউন বিউটি ফর্সাদের কাছে হার মানে?’ 

‘দূর বোকা মেয়ে ! সামান্য প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করি। মাসের শেষে কীই-বা আয়? তার মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ করে সব কিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে। লোকজন খেয়ে পড়ে বাঁচতে পারলেই খুশি। তার মধ্যে এই সব...পাগলামি যত তোর।দাঁড়া। লেখাটা পড়ি।’

মালিনীকে খুব বেশি কাছে আসতে দিই না আমি। কেন জানি না আমার মনে হয় ও খুব হিসেবি। ভেবেচিন্তে কারও মনের জায়গা করে নেয়। ভেবেচিন্তে তাকে লাথি মেরে অবলীলায় সরিয়েও দিতে জানে। ক্রুয়েলি অ্যাম্বিশাস। 

 তা ছাড়া ও আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট। বছর পাঁচেকের ছোট তো হবেই। ঘরে ফিরে রিল তৈরি করে। জীবনটা খোলা খাতা। সমাজ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। সামাজিক নয় যদিও। অনুগামী আবিষ্ট। তবুও খুব একা। রাঁধতে রাঁধতে অধিকাংশ রিলে তাই বলে যায়। কেন বুঝতে পারি না। 

হাজবেন্ড হৃদয়ের ডাক্তার। শ্বশুরের সম্পত্তি বেঁচে খুবই কম সময়ের মধ্যে বিদেশে দোতলা বাড়ি করেছে। একটি ফুটফুটে মেয়েও আছে। তবে রিলে ও যে বিবাহিত তা অপ্রকাশিত। এই সব আমি আগে জানতাম না। একদিন কমেন্ট সেকশনে কন্যার ছবি কই? লিখেছিলাম। ইনবক্সে এসে বলল, ‘ দি, আমার জটিল জীবন। তুমি বুঝবে না।মেয়ে, হাজবেন্ড কারও অস্তিত্ব নেই আমার প্রোফাইলে।’ 

কথাটা কেমন উদ্ভট, না? হাজবেন্ডের কথা ছেড়ে দিলাম। হয়তো সে লাজুক। ক্যামেরা কনশাস। কিন্তু মেয়ে বড় হয়ে যদি প্রশ্ন করে, মা তোমার প্রোফাইলের মধ্যে আমি কই? আমি নেই কেন? কী বলবে তখন মালিনী? 

কে জানে বাবা! এখনকার প্রজন্মের ভাবনাগুলো অনেকটাই স্বতন্ত্র। তবে, সেই স্বাতন্ত্র্যের সংজ্ঞা এদের নিজস্ব মনে স্পষ্ট কি? প্রহরকে বলেছিলাম মালিনীর কথা, ‘ কেন বলো দেখি মেয়েটি এরকম?’ ও যেমন জবাব দেয়। যা পারে করুক। তোমার কী? আশ্চর্য! আমার কী হবে? আমি ওর মনটা স্টাডি করতে চাই। কেন একটি মেয়ে সমাজ মাধ্যমে চির কুমারী হতে চায়? ইচ্ছে নাকি দায়? সমাজ মাধ্যম কি সমাজ নয়?স্নেহ বড় হচ্ছে। চারপাশের ভাবনাচিন্তা বুঝার চেষ্টা করব না?  

 

লেখাটা তেমন মন দিয়ে পড়লাম না। থাক আমার ডেস্কে। সন্ধেবেলা নিয়ে যেতে বলব।তার চেয়ে আজ ওকে একটু জানি। আমার পরের আর্টিকল, এআই জীবন ধারা কেমন হতে পারে? পরের প্রজন্মের কাউকে বুঝলে কে বলতে পারে, লেখাটা সাবলীল হবে।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব কতটা হতে পারে এদের মতো মেয়েদের মনে?দেখি, ওর কী মত।  

 

‘তুই ফেসবুকে এত একা কেন? আই মিন… হাজবেন্ড, মেয়ে, সংসার। সমাজ মাধ্যমে নাচ করিস ভাল। কত অনুষ্ঠানের ছবি! কত সুন্দর গান গাইতে পারিস। কবিতা, প্রবন্ধ লেখার হাত ভাল। কী ভাল ঘর সাজিয়ে রাখিস। রাঁধতে রাঁধতে রেসিপি শেয়ার করিস। সবেতেই পটু। এ সব ছবির কত ফ্যান ফলোয়ার! তোর জীবন ঘিরে তুই-ই তুই। তবু এত একা কেন? তাও এই বয়সে?’ 

‘তুমি বুঝবে না।’ মালিনী কেমন ফোঁস করে উঠল হঠাৎ। 

‘বোঝা না…ধর এই যে একটা চিরকুমারী সেট আপ তোর প্রোফাইলে এ সব কাদের জন্য? তুই সত্যিকারের সমাজেও এরকমই?’ 

 

মালিনী উঠে দাঁড়াল, ‘মাথাটা ব্যথা করছে খুব দি। কে জানে কেন! তুমি এডিট করে আমাকে জানিও।’ 

‘এড়িয়ে যেতেই পারিস। তবে প্রশ্নটা ভেবে দেখিস। মনে মনে।মেয়ে বড় হচ্ছে।সব দেখেশুনে প্রশ্ন করলে? এড়িয়ে যাবি এভাবেই?’ 

মালিনী গলা চড়িয়ে বলল, ‘এড়িয়ে যাব কেন? জবাব নেই তোমার প্রশ্নের দি।যদিও প্রশ্নটা ইন্টারেস্টিং, তবুও বলব, কখনও আশপাশে আমাদের প্রজন্মের পুরুষগুলোকে দেখো। স্টাডি করবার চেষ্টা কোরো ওদের মন। কেউ কমিটেড না। অথচ মহিলাদের কমিটমেন্ট চাই ষোলো আনা।একটা আত্মকেন্দ্রিক জাত শালা!’ গট গট করে বেরিয়ে গেল মালিনী।হাই হিলের তীক্ষ্ণ শব্দ ছড়িয়ে পড়ল করিডোর ময়।। 

ও শ্যামবর্ণা। ডাগর চোখ। লিপ ট্রিট করে পুরু লালচে ঠোঁট। ক্যামেরায় নাকি এই ট্রিটেড ঠোঁট সেক্সি দেখায়। একদিন ভাল মুডে বলেছিল। ওর সেই ঠোঁটে হাসি নেই আজ।বাইরে তখনই মেঘ ঘনিয়ে এল।

 তাড়াতাড়ি বেরোব আজ। স্নেহর ইউনিট টেস্ট আগামীকাল। আগামীকাল অনেক ভোরে অফিসেও আসতে হবে। এআই অ্যাসাইনমেন্টের শেষ ডেডলাইন।  

 

২ 

 

জানি না যেন, কে কী ভাবে, কে কী বলে! আমি বৈভব দেখাই ! ভাবে ভাবুক।তাতে কী এসে গেল আমার! মেয়ের জন্য আজ হ্যারি পটারের প্রথম খন্ড নেব। হার্ড কাভার না পেপার ব্যাক নিই? সাহিত্যদিকে একবার কল করব? ভাল সাজেস্ট করবে। দূর ! থাক….করব না ফোন। সেইদিন অফিসে এমনভাবে জিজ্ঞেস করল কথাটা। দড়াম করে মাথা গরম হয়ে গেল! তার পর থেকে সত্যি বলতে কাজের বাইরে কথাবার্তা বলতে ইচ্ছে করছে না। চটানোও যাবে না।টিম ম্যানেজার। এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। 

 

সাহিত্যদি বুঝবে না। পুরনো ধরনের মানসিকতা। সংসার, সন্তানই একটি নারীকে পূর্ণ করে টাইপ ভাবনাচিন্তা। আচ্ছা, কার কী এসে গেল যদি চিরকুমারী থাকি সমাজমাধ্যমে? না, ঠিক এসে যায় না সাহিত্যদির। একটা ডোন্ট কেয়ার অ্যাটিটিউড আছে ওর। তাই সমাজ মাধ্যমে ধোপে টিকতে পারে না। অফিসে সবাই স্নব বলে। চাপা অহংকার। কীসের এত অহংকার জানি, জানি। 

সাহিত্যদি যতই সতী সাজুক, ওর আশপাশে সারাক্ষণ কম বয়সি ছেলেপিলে ঘুরে বেড়ায়। এটা আজ বলে নয়। সাহিত্যদির কলেজ জুনিয়ার ছিল সমস্ত, আমার হাজবেন্ড। ও একদিন আমার ল্যাপটপে ই-মেলে সাহিত্যদির নাম দেখেছিল। আমাকে জিজ্ঞেস করে বসেছিল,’ তুমি ওর সঙ্গে কাজ করো?’ 

‘হ্যাঁ, কেন?’ 

‘ওয়াউ ! ইন্টারেস্টিং লেডি, না? আমরা কলেজ জীবন এর প্রথম দিকটা ওর পিছনে…’ অর্ধেক বলে জোরে হেসে দিল সমস্ত। থেমে আবার বলল, ‘ দেখতে আহামরি নয়, তবে কী যেন একটা ব্যাপার রয়েছে ওর মধ্যে।তাই না?’ প্রশ্নটা শুনে সাধারণ কোনও স্ত্রীর কী প্রতিক্রিয়া হয় বলতে পারবেন? আমি বলছি কী মনে হয়েছিল তখন। ওই মুহূর্তে ল্যাপটপ ভেঙে ফেলতে ইচ্ছে করছিল।ইচ্ছে করছিল সমস্তর কলার ধরে জানতে চাই, কী নেই আমার মধ্যে? মন দিয়ে আমাকে দেখেছ কখনও? কেন আরও চাই? ওকে চাই? তাকে ধরি।কেনননন? 

 

সব জেনেটেনে হয়তো আপনারা ভাবছেন। কী রে বাবা! কলেজ জীবনের ক্রাশ স্ত্রীয়ের সঙ্গে শেয়ার করা যাবে না? আরে এ তো আর সিরিয়াস কিছু নয়। কিংবা এর জন্য সংসার জীবন নষ্ট তো হতে দেয়নি সমস্ত। তা হলে?  

না না। শুধু কলেজ ক্রাশ হলে আমার কিছু যায় আসে না। আপনারা দেখেননি সাহিত্যদির সম্পর্কে কথা বলতে বলতে এই এতগুলো বছর পরও ও কেমন প্যাশনেট হয়ে গিয়েছিল। গলায় আলতো শিহরণ ! 

তা ছাড়া, শুধু সমস্ত কেন, অফিসেও দেখেছি। খেয়াল করেছি। যে কোনও পুরুষ বিশেষত কম বয়সি হলেই সাহিত্যদিকে অকারণ প্রেফারেন্স দেবে। দেবেই। কেন? কারণ কী? পরিশ্রমী আমিও।অফিসের পর রিল তৈরি করা, সমাজ মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ অনুগামীর সঙ্গে টিকে থাকা, কন্টেন্ট ভাবা – এগুলো পরিশ্রম নয়? তা হলে আমি কম বয়সি হয়ে সকলের বেশি আদর যত্ন পাব না কেন? 

সমস্ত কখনসখনও বলে, ‘ তুই এত মন ভুলিয়ে থাকিস কেন অনুগামীদের? কেন সিঁদুর লুকিয়ে, মেয়েটার পরিচয় লুকিয়ে থাকিস? এতে কী আনন্দ পাস? কী অর্জন করতে পারছিস? 

 মনে মনে হাসি। ও বুঝবে কী! এত অনুগামী একদিনে তৈরি হয়নি। যখন যে সময়টা তৈরি হয়েছিল সেই সময়গুলো একাকিত্ব বুনে আমি ব্যয় করেছি।ও জানে না।জানবার জন্য একটা মিনিমাম সম্পর্ক থাকতে হয় দাম্পত্যে। 

সাহিত্যদি বলে, এত ভ্যালিডেশন লাগবে কেন তোর মতো মেয়ের? রিয়ালি? আমার মতো মেয়ে? আমি কী পারি? পারো তো তুমি দি। পুরুষ নাচাতে পারো এক আঙুলে। বিয়েটাও অসীম মহিমায় ধরে রেখেছ। দিনের পর দিন তোমার রিয়াল লাইফ অনুগামীদের আকর্ষিত করতে গিয়ে ধাক্কা খেয়েছি। 

মনে মনে বুঝেছি। জীবনে সব পারলে হয় না। কিন্তু...হয় না কেন? নাচ, গান, আবৃত্তি, কবিতা লেখা, প্রবন্ধ লেখা, সংসার সাজানো, রাঁধতে শেখানো — সবই যদি পুরুষ চোখে পারি তা হলে তো আর অন্য কোনও নারীর দিকে আকর্ষিত হবে না। আমার প্রতিই কমিটেড থাকবে। তা হলে? 

কখনও রাজনীতি। কখনও নাচ। কখন সঙ্গীত। কখনও কবিতা। কখনও আবৃত্তি। কখনও রান্না। কখনও অন্দরসাজ। সবকিছুর জগাখিচুড়ি করে একটা প্রোফাইল তৈরি করেছিলাম। তার মধ্যে একে একে সন্তান, স্বামী ঢুকিয়ে কেলোর কীর্তি করে বসি আর কী ! 

অফিসের রনি, ইচ্ছেদা, ক্লড, জন… প্রত্যেকে তোমার রেফারেন্স দেয়। বলে, ক্যারিশ্মা নাকি সাহিত্যদির! কথা দিচ্ছি দি, একে একে সবগুলোকে আমি আমার ইন্সটা প্রোফাইলের অনুগামী করব। বেশি কিছু লাগবে না। এক আধটুকু ক্লিভেজ, স্লিভলেস, আর, তোমার মতন কপালে চশমা পরে ছবি —পুরুষ চক্ষুর জন্য যথেষ্ট। কী বলো? 

 তোমার সঙ্গে কিন্তু আমার কোনও প্রতিযোগিতা নেই দি। আমি সেই সব পুরুষদের অহং ভাঙতে চাই যারা পলিগ্যামি প্রাচীন যুগের নোংরামি ভেবে বন্ধ দরজার আড়ালে তোমার মতো একাধিক নারীর প্রেমে পড়ে। প্রেম করতে চায়। সেই প্রেমকে ধরেও রাখতে চায় যৌন আনন্দের জন্য। 

এদের কপালের ভাঁজে আমি স্থান পেতে চাইছি। এর জন্য তোমার মতো পরিশ্রমী হতে হয় না। কিছু শর্টকাট পদ্ধতিতে স্ট্র্যাটেজিক্যালি পথ চলতে জানতে হয়। সেইখানেই সমাজ মাধ্যমের ভ্যালিডেশন জরুরি। সরাসরি অত সামজিক, গুণী হওয়ার প্রয়োজন হয় না।

প্রহরদা তোমাকে চোখে হারায় না ছাই। ও সব তো তোমাকে তেল মেরে বলা কথা। আদতে তোমাকে খেয়াল রাখে। তোমার পা পিছলে গেলে তোমাদের সামাজিক দাম্পত্য স্টেটাসের বারোটা বাজবে! তোমাদের ন্যাকামিও কম নয়। 

 

ডাইরি বন্ধ করে আমি ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এমন সময় কখন যেন মালিনী এসে পড়েছে। জেনেবুঝেই আমাকে কি পড়তে দিল ও সব? 

পথ আটকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে মেয়েটি। বললাম, ‘ সরে যা। যাব…’ 

 ‘পড়লে দি? জানলে আমি কতটা খারাপ?’ 

কেন জানি না মালিনীকে জড়িয়ে ধরে রইলাম কিছুক্ষণ। তার পর ওর থুতনি ডান হাতের আঙুলে তুলে ওর চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘ এরকম হয়। বয়সটাই এরকম। মেনোপজের কাছাকাছি পৌঁছলে বুঝবি, সব বোকামি। হ্যাংলামি। অস্থির মনের স্বভাব। একদিন সবই হারায়।সব হারিয়ে যেতে দিতে হয়।’ 

‘তুমি রাগ করলে না?’ 

‘না। রাগ করিনি। প্রথমত, আপনজনের প্রতি রাগ হয়। দ্বিতীয়ত, এটুকু স্পষ্ট হল, তোদের প্রজন্ম ভাবছিস নারী স্বাধীনতা পেয়ে আমরা যা-খুশি-তাই করব। এখানেই গলদ। একদিন বুঝবি নারী স্বাধীনতা আমরা অর্জন করছি। কিছু অর্জন করলে মূল্য তার দিতে হয়।কোনও কিছু পেয়ে গেলে মূল্য দেওয়ার বালাই থাকে না। 

লাইটারটা দে। অফিসে আনতে ভুলে গেছি। ঝমঝমিয়ে নামবে। তার আগে ক'টা ফুঁ দিয়ে আসি।’ 

‘তুমি  নাকি অকারণ স্মোক করো না। হয় প্রচণ্ড খুশি না হয় ভিতরটা ভেঙে চুরে চুরমার হয়ে গেলে খাও।’ 

'ঠিক তাই…’

‘এখন তুমি খুব খুশি না তোমার ভিতরে সব চুরমার করে দিলাম?’  

 

আমি জবাব না দিয়ে নিজেই ওর বাঁ পকেট থেকে লাইটার বের করে নিলাম। বললাম, ‘ তুই বুদ্ধিমতী। এত কন্টেন্ট মাথায় ঘুরপাক খায়। ভেবে নে কিছু একটা। তবে হ্যাঁ, বোকার মতো অফিস ডেস্কে নিজের জার্নাল খুলে রাখিস না আর...।মনের কথা পড়ানোর হলে অন্য কোনওভাবে উপস্থাপনা করিস।শান্ত হ...ইংরেজি ভাষায় কন্টেন্ট শব্দের আর একটি মানেও হয়। ভুলে গেলে চলবে? ’ 

 
0 Comments

Post Comment