পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

স্ক্রিনশট

  • 09 April, 2023
  • 1 Comment(s)
  • 861 view(s)
  • লিখেছেন : মৌমন মিত্র
১ সিঁড়ি দিয়ে উঠে ডান দিকে ফ্যামিলি রুম।সুপার বোল পার্টিটা ফ্ল্যামিলি রুমে আয়োজন করেছে এলিনা।আজ নীলের অতিথিই বেশি।হর্ষ,নিখীল, প্রবীর,শেখর। মেয়ে প্রথার চারজন বন্ধু দোতলায়।প্রথা নিজের ঘরে ল্যাপটপ আর স্পিকার অন করে খেলা দেখছে।মাঝেমধ্যেই দোতলার ঘর আর ফ্যামিলি রুম থেকে তারস্বরে ' টাচডাউন...' চিৎকার ভেসে আসছে এলিনার কানে।

 

এলিনা আমেরিকান ফুটবল বোঝে না।নিউ ইয়র্কে আসার পর বেশ কয়েক বছর খেলার বিশ্লেষণ,কমেন্ট্রি শুনে খেলাটা বোঝার চেষ্টা করেছিল।কিছুই হয়নি।নীল বলে, ' ডার্লিং, তুমি হলে অ্যাডভারটাইজিং প্রফেশনাল।আমেরিকায় বসে সুপার বোল না-বুঝলে চলবে? খেলার সময় কত বিলিয়ান ডলারের অ্যাড চলে,দেখেছ? '

এলিনা হেসে বলেছিল, ' ধুস! ইটস নট মাই কাপ অফ টি।আমি এই খেলা ডি-কোড করতে বসলে নিজের কাজ ভুলে যাব।অত্যন্ত জটিল ব্যাপার।আমার ওই ক্রিকেট ব্যাডমিন্টানের স্বল্প বিদ্যাই ভাল...' 

 

নীল অর্ধেক সময় অফিস ট্যুরে বাড়ির বাইরে থাকে।কবে মেয়ে টিনেজার হয়ে গেল জানতেই পারল না।যেটুকু সময় ঘরে থাকে বন্ধুবান্ধব কলিগদের নিয়ে হইহই করতে ভালবাসে।কখনও কখনও এলিনা বিষয়টা পছন্দ করে।নীলের এ ধরণের মানবিক চাহিদাপূরণ করতে ভালবাসে।আবার কখনও প্রচণ্ড বিরক্তি প্রকাশ করে ফেলে, ' উফফ! নীল…এতটা সময় বাড়ির বাইরে থাকো।উইকএন্ডে কী পরিমাণ কাজ জমে যায়,কোনও ধারণা আছে তোমার? পার্টি বাদ দিয়ে একটু সংসারে মন দাও।প্লিজ। ' 

তখন নীল হঠাৎ করে এলিনার পাতলা কোমরে হাত রাখবে।ওর গোলাপি ঠোঁটে নিজের সুডৌল ঠোঁট বসিয়ে দীর্ঘ একটা চুমু খাবে।এ কি এলিনার উপর প্রভুত্ব কায়েম করতে চাওয়া? নীলের চুম্বন-নেশা,এক গাল দাড়ির খোঁচা সেই মুহূর্তটায় এলিনার মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষে জড়িয়ে যায়।ব্রেন সেলে মমত্ব তৈরি হয়।যা ঠিক প্রেম বা ভালবাসা নয়।স্নেহশীল হয়ে ওঠে ও।

নীল ব্যস্ত কর্পোরেট।একটা ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর।এদিক-ওদিক ছুটোছুটি লেগেই থাকে।কত চাপাবে বেচারার কাঁধে? এলিনা মুহূর্তে গলে পড়ে।নীলের ঘন চুলে হাত বুলিয়ে দেয়।

 আজ ওর মনটা এমিনিতেই চনমনে।নেভি-ব্লু শর্টসের সঙ্গে একটা পিচি লেস ক্রপ টপ পরেছে।তার উপর ডেনিমের ফুল স্লিভ জ্যাকেট।পয়ত্রিশেও এ ধরণের পোশাক ওর ছিপছিপে গড়নের সঙ্গে বেশ মানানসই। 

শুক্রবার একটা প্রমোশনের কথা মৌখিক ঘোষণা করেছিলেন এলিনার বস।অফিসিয়াল ই-মেলটা একটু আগেই ইনবক্সে প্রবেশ করেছে।এলিনা দেখল।ডাইনিং রুম থেকে নীলকে ডেকে মেল খুলে দেখাল।

ছাতি ফুলিয়ে বলল, ' লুক বেবি…পড়ে দ্যাখো। ' 

ভুরু কুঁচকে চটজলদি ই-মেলটা পড়ে ফেলল নীল।চোখ নাচিয়ে বলল, 'মোর পাওয়ার টু ইউ! উল্লাস!’

নীলের হাতে তখন মদের গ্লাস নেই।একটা ককটেল ড্রিংক।আসলে নীল মদ খেতে ভালবাসে না।টুকটাক পার্টিতে হয়তো খেল হয়তো-বা খেল না।তবে,ও মদ সার্ভ করা বেশি পছন্দ করে।এলিনাকে বলে,’ আই সোবার্লি লাভ টু সি পিপল ড্রাঙ্ক! হা হা হা!’ 

 

নীল ও ঘরে চলে গেছে।সন্ধে শুরু।খেলা জমে উঠেছে। বিশেষত এলিনার ফ্যামিলি রুমে।এলিনা একটা থ্যাঙ্কইউ লেটার অফিস ফোরামে পোস্ট করল।ফেসবুকে সেলফি সেঁটে প্রোমোশনের ঘোষণা করল।ফ্যামিলি রুমে আবার কিছুক্ষণ অমনোযোগী হয়ে খেলা দেখল।দূর! বড্ড বোরিং খেলাটা! নীলকে বলাও যায় না…

এলিনা এখন কী করবে? কতক্ষণ খেলাটা না-বুঝে নীলকে সঙ্গ দিতে পারে? 

সিঁড়ি বেয়ে ও দোতলায় নীলের স্টাডি টেবলে এল।এত অগোছালো ছেলেটা! টেবলের উপর প্রিন্টআউটের ডাঁই।ফাইলপত্র ছড়ানো-ছেটানো।চার্জারগুলো দলা পাকিয়ে রয়েছে।

এলিনা মুখটা বিষ তেতো করে সব গুছিয়ে রাখছে।হঠাৎ পকেটে ফোন বেজে উঠল। 

স্ক্রিন ভরে সৌম্য।সৌম্য? হঠাৎ ছুটির দিনে ফোন? স্পিকার অন করে এলিনা জিজ্ঞেস করল,

' খেলা দেখছ না?  '

' শাট আপ! তোর প্রজেক্টের নাম দিলাম আমি।আর থ্যাঙ্কইউ লেটারে আমার নামটাই বেমালুম চেপে গেলি?' 

' তুমি নাম দিয়েছ? তুমি তো জাস্ট একটা শব্দ সাজেস্ট করেছিলে।এরকম আমি কত...' 

' ও .... ও রিয়ালি?! সেই সেই।এখন তো এ সব বলবি-ই।এক বছরে কত সুযোগ করে দিয়েছি একবার ভেবে দেখেছিস,কখনও? এনিওয়ে..ছাড়! আমি তোর বাড়ির আশপাশেই আছি।আসব? আই নিড টু টক...' 

সৌম্যর বাগ্ ভঙ্গিতে রাগ,ব্যঙ্গ? গলায় অনেকটা শ্লেষ মেশানো মনে হয়।এলিনা কিছুতেই বুঝতে পারল না সৌম্য এত চটে গেছে কেন।এলিনা ভাবছে, ও কী নিজের অধিকার ফলানোর চেষ্টা করছে? হাউ মিন! কীসের অধিকার?..... এ সব ভাবনা মনের মধ্যে ছেপে মুখে বলল, ' চলে এসো।আমারও কথা আছে...' 

২  

মিনিট পনেরো পরই কলিং বেলের ধ্বনি।টিং টং।সৌম্য এল?এলিনা দরজা খুলতে সিঁড়ি দিয়ে নেমে দ্যাখে,সৌম্য ঝুঁকে নিচু হয়ে জুতো খুলছে।বাইরে ফেব্রুয়ারির শীত ঝরছে।অথচ ওর গায়ে একটা জ্যাকেট নেই।চুল এলোমেলো।

' কী খবর, বস?' সৌম্য জুতো খুলে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই নীল ওকে জড়িয়ে ধরল, ' অনেক দিন পর এলে...' 

সৌম্যর চোখমুখ থমথমে দেখাচ্ছে।

' হ্যাঁ, তোমার ওয়াইফ এখন অফিসের বিগ বসদের সঙ্গে ওঠাবসা করে।আমায় আর তেমন পাত্তা-ফাত্তা দেয় না ও ...'

এলিনা কথা বাড়তে দিল না।ঠোঁটে একটা কৃত্রিম হাসি ঝুলিয়ে বলল, ' নীল,আমি ওকে নিয়ে দোতলায় আমার স্টাডি রুমে বসছি।ইউ কান্টিনিউ...সৌম্য, তুমি উপরে চলে এসো।' 

নীল বলল, ' ঠিক আছে।তোমরা কথা বলো।অ্যাই সৌম্য… এক কাপ কফি? নাকি....মাঝসন্ধা…ওয়াইন-ফাইন….কী বলো? এক আধ পেয়ালা.....'

' আঃ নীল! সৌম্য একটা অফিসের কাজে এসেছে ...' 

' ওহো...সরি।ইউ গাইজ ক্যারি অন...প্লিজ… ' 

সৌম্যকে নিয়ে এলিনা উপরে উঠে এল।প্রথার ঘর থেকে আবার সেই, 'টাচডাউন' চিৎকার! শুনে ওরা দু'জন নিরস মুখে খানিক তাকাতাকি করল।সৌম্যও এই খেলা দেখে না।ইন্টারেস্ট নেই।এলিনা জানে। 

এলিনার স্টাডিটা বেশ ছিমছাম।মাঝারি সাইজের ঘর।ডেস্ক,একটা ডোকরার ল্যাম্প,কয়েকটা দুর্লভ ক্যাকটাস,বেজ রঙের বিন ব্যাগ,আর লম্বা ওয়াক-ইন ক্লজেট।সৌম্যকে একটা চেয়ার এগিয়ে এলিনা উল্টোদিকের বিন ব্যাগেটায় হেলান দিয়ে বসল।এলিনাই প্রথম মুখ খুলল,’ বলো...'   

সৌম্য অনর্গল বলে যায়, ' না… কী আর বলব রে? তোর থ্যাঙ্কইউ লেটারটা পড়লাম।সিসিতে আমায় রেখেছিস ঠিকই, কিন্তু কোথাও আমার নাম মেনশনই করলি না।দারুণ! চিঠিটা একদম পারফেক্ট! ঠিক যেমন হওয়া উচিত।কোনও আবেগ নেই।কোনও ভালবাসার ছাপ নেই! অদ্ভুত রকমের ফর্মাল!...অথচ…একসময় আমিই তোকে এই প্রজেক্টটায় কাজ করার জন্য ইন্সপায়ার করেছিলাম।বলেছিলাম,তুই ইলাবরেট প্রজেক্ট কর।তুই পারবি।এমনকি,এই প্রজেক্টের নামটাও আমিই সাজেস্ট...' 

' এক মিনিট,এক মিনিট সৌম্য… প্রথমত, এই প্রজেক্টটার নাম আমি তৈরি করেছি।তা ছাড়া আমি আজ থ্যাঙ্কইউ লেটার পোস্ট করেছি।তোমায় গতকালই জিজ্ঞেস করেছিলাম,' সৌম্য, ক্যান আই থ্যাঙ্ক ইউ অফিসিয়ালি?' তুমি স্পষ্ট 'না' বলে দিলে।আমি বুঝেছিলাম,হয়তো আমার সঙ্গে তোমার নাম জড়ালে অফিসে হাসাহাসি হবে।সকলে বলবে,হায় রে! এত সিনিয়র লেভেলে কাজ করে হাঁটুর বয়সি মেয়ের সঙ্গে লীলা করছে সৌম্য রয় ! তোমার এক্স-ওয়াইফ সেলেব্রিটি মানুষ।সুপার মডেল।তুমি কী আর যার-তার সঙ্গে জড়াতে পারো! তোমার একটা স্টেটাস আছে।…….. তুমি কী ভাবলে? থ্যাঙ্কইউ লেটারে তুমি তোমার নামটা রাখতে না-বললেও আমি তোমার নাম লিখব? তোমায় ধন্যবাদ জানাব?' 

এলিনার কথার ভিতরই সৌম্য চেঁচিয়ে উঠল, ' তোর ক্যারিয়ারে আমার কোনও কন্ট্রিবিউশন নেই, না? চমৎকার!' 

' আমি তা বলিনি।এই প্রজেক্টটার নাম তুমি দাওনি…তা ছাড়া ...'

' রিয়ালি? আমার হোয়াটস্যাপ টেক্সটগুলো এখনও রয়েছে রে, এলিনা… অফিস ফোরামে,যেখানে তুই তোর প্রজেক্ট নিয়ে বড় বড় লেকচার দিচ্ছিস, সেইখানে আমাদের চ্যাটের স্ক্রিনশটগুলো পোস্ট করব? কিংবা তোর সোশ্যাল মিডিয়া? সেখানে তো তোর লক্ষ লক্ষ ফলোয়ার! অভিনন্দন জানাচ্ছে।তোর এই সাফল্যের ছবিতে অকাতরে লাইক লাভ দিচ্ছে।সেখানে আমাদের পুরনো চ্যাটগুলো পোস্ট করব? তোকে কীভাবে পদে পদে শিখিয়েছি, সেগুলো তোর মহান ফলোয়ার-রা একটু দেখুক! ভাল লাগবে না, তোর? ‘

থতমত খেয়ে যায় এলিনা।কয়েক সেকন্ড।কাকে ভরসা করছিল সে এতদিন? সৌম্য কত প্রাইভেট চ্যাট করত এলিনার সঙ্গে! কই,এলিনার তো কখনওই মনে হয়নি এগুলো স্ক্রিনশট করে….

কয়েক মাস ধরেই সম্পর্কটা ভাঙো ভাঙো করছিল।গত বছর জানুয়ারি মাসের শুরুতে ' আনচেইন লাইফ’ অ্যাডভার্টাইজিং কোম্পানি জয়েন করে এলিনা।কয়েকদিন পরই একটা জয়েন্ট প্রজেক্টের কাজে সৌম্যর সঙ্গে আলাপ।সৌম্য তখন এলিনার বস।

ঝাঁকড়া চুল।ফ্রেঞ্চ-কাট দাড়ি।শ্যামবর্ণ লোকটার চেহারা চালচলন একটু অন্যরকম।কী ভয়েস! এলিনার কলিগ নেহা বলেছিল,’ তোর দোষ নেই।হি ইজ সো …’ 

প্রেমে পড়ে গেল এলিনা।প্রথম প্রথম কোনও অ্যাসাইনমেন্ট দেখে ঘাবড়ে গেলে সৌম্য বলত, ' আমার উপর ছেড়ে দাও।আমি আছি তো, সোনা...আমি সন্তুষ্ট হব তবেই প্রেজেন্টেশনে ফাইনাল ডিটেলগুলো অ্যাড করব।' 

এলিনা শুধু মুগ্ধ হয়েছে।দিনের পর দিন।ভাবত, সৌম্য এই কাজের জগতে অভিজ্ঞতার গুণে কয়েক ক্রোশ এগিয়ে রয়েছে।নিমেষে কত জটিল ইস্যু ঠাণ্ডা মাথায় সল্ভ করে দেয়! 

ক্রমশ সৌম্যর ব্যক্তিগত জীবনে জড়িয়ে পড়ল  এলিনা।সৌম্যর স্ত্রী ছেড়ে চলে গেছে তাও প্রায় বছর পাঁচ হয়ে গেল। ছেলে মেয়ে কলেজে পড়ে।ডর্মে থাকে।বাবার খোঁজও নেয় না।জীবনের ব্যর্থ দিকগুলো এলিনার সামনে উন্মোচন করতে গিয়ে সৌম্যর স্বর ভেঙে আসত।পলকে কাঁদো কাঁদো মুখে বলত, ' আমায় জড়িয়ে ধর,এলিনা।ছেড়ে যাস না, কোনওদিন ছাড়িস না,আমায়...' 

তবে,সৌম্যর ছাপ্পান্ন বছরের শরীর ছুঁয়ে এলিনার কোনওদিনই মন ভরেনি।শার্টের তলায় থলথলে ভুঁড়ি।এলিনার যৌবন দেখে কেমন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে পড়ত।এলিনা মনে মনে বলেছিল,’ একটু কাজ শিখিয়ে কেন যে বুড়ো লোকটা শুতে চায়, কে জানে! সৌম্যর ভারী চেহারা নয় ঠিকই কিন্তু চর্বি না-থাকলেও দেহের বিভিন্ন খাঁজে বয়সের স্বাভাবিক মেদ জমে।এ সব বোঝে সৌম্য? …কবে যে এই মাঝবয়সি মানুষটা নিজেকে যুবক ভাবা বন্ধ করবে!’ 

প্রথমদিনই বেডরুমের ভেতর দমবন্ধ হয়ে এসেছে।

এর পর বিভিন্ন অজুহাতে এলিনা আর কোনওদিন সৌম্যর বেডরুম-মুখো হয়নি।

 

আজ এলিনার বুকের ভেতর চাপ চাপ অস্বস্তি।আসলে এইমাত্র সৌম্যর কথাগুলো এক পলকে অতীত মনে করিয়ে দিল।সম্পর্কটা দু'জনের অজান্তেই খসে গেছে? এলিনা ঘরের জানলা দিয়ে বাইরে অন্ধকারের স্তব্ধতা দেখতে দেখতে আপনমনে ভাবছে।

 একটু অপ্রস্তুতভাবে হাসে ও, ' তুমি আজ এসো, সৌম্য… সোশ্যাল মিডিয়া,অফিস ফোরাম — যেখানে যা-খুশি স্ক্রিনশট আপলোড কোরো।আটকাব না।তাতে তুমি ভাল থাকলে,থাকবে।' 

 

' তুই পুরোপুরি ইগো সর্বস্ব একজন।' বলে, সৌম্য সেদিন সদর দরজাটা ঠাস করে বন্ধ করে চলে গেল।নীল চমকে উঠেছিল। দোতলায় প্রথা চেঁচিয়ে উঠল,' টাচডাউন! '  

তখন নীলের বন্ধু শেখর টিভির দিকে তাকিয়ে হাঁ করে খেলা দেখতে দেখতে বলেছিল, ' ধুস! এটা কোনও খেলা? ক্যানসাস চিফসের কোনও টেকনিক্যালিটি-ই নেই! একটা প্রপার ফর্ম নেই ! অপোনেন্ট টিমের চ্যালেঞ্জ ফেস করার ক্ষমতাই নেই...'  

                     ৩ 

' সাড়ে সাতটা বেজে গেছে,প্রথা।এবার নীচে নেমে এসো।ডাইনিং টেবলের উপরে সেই কখন থেকে ওটস আর দুধ বেড়ে রেখেছি...' সিঁড়ির মুখে দাঁড়িয়ে এলিনা একই গলায় প্রতিদিন সকালে মেয়েকে ডাকে।প্রথার চোখ তখন ফোনের স্ক্রিনে।সিঁড়ি বেয়ে নেমে কোনওমতে ওটসটুকু শেষ করে এলিনা যেই বলবে, ' প্রথা, বাড়াবাড়ি হচ্ছে।আর ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলে আমি ড্রাইভ করে স্কুলে পৌঁছে দিতে পারব না।তুমি বাসে যাও…নিউ ইয়র্কে ক'জন গাড়ি করে স্কুলে যায়,শুনি? শুধু আরাম করবে …’ অমনি প্রথা দৌড়ে গাড়িতে উঠে পড়বে।খিলখিল করে হেসে মাকে চোখ মারছে।এর পর এলিনা গজগজ করতে করতে মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেবে।

আজ এমনটা হল না।প্রথা রেডি হয়ে নেমে এসেছে।লক্ষ্মী মেয়ের মতো নিজের ব্রেকফাস্ট নিজেই বেড়ে নিল।হাতে ফোন নেই।এলিনা মেয়েকে দেখে অবাক।নীল কিচেনের ব্রেকফাস্ট নুকে বসে সকালের প্রথম কলটা শুরু করবে।ফোন অন করেনি তখনও।ঠিক সে সময় এলিনা মেয়ের দিকে চোখের ইশারা করে বলল, ' তোমার শরীর ঠিক আছে, প্রথা?' 

‘হ্যাঁ ...কেন?' 

' না, মানে তোমার হাতে সকাল সকাল ফোন নেই।এ তো অবিশ্বাস্য ব্যাপার!' 

প্রথা মুচকি হাসল, ' ডোন্ট ওয়ারি, মা। আমি ঠিক আছি।আচ্ছা,ঈশার কথা মনে আছে,তোমার?'

এলিনা মাথা নাড়ল।প্রথা জানলার দিকে তাকিয়ে বলে চলে,

' গতকাল বিকেলবেলা ঈশার কিছু বন্ধু ওর কয়েকটা চ্যাট অন্য একটা গ্রুপে পাবলিক পোস্ট করে দিয়েছে।সেই বন্ধুগুলো কতটা চিপ ভাবতে পারো, মা? এক সময় ঈশা যে সব মনের কথা শেয়ার করেছে...সেগুলো এভাবে কেউ পোস্ট করে? আমি এ সব নোংরা ব্যাপারের মধ্যে থাকি না, ইউ নো।অ্যান্ড আই থিঙ্ক ইটস আনএথিক্যাল টু! তাই আমি কাল থেকে ফোন অফ করে রেখেছি।দূর! বন্ধুদের মধ্যে এ সব ভাল লাগে,বলো ?' 

এলিনার মনের ভেতরটা আচমকা ভারী হয়ে ওঠে।মেয়েকে কী জবাব দেবে বুঝতে পারছে না সে।

নীল ল্যাপটপের দিকে তাকিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করল, ' বাট, ওরা মেয়েটার অত অত চ্যাট পোস্ট করল কীভাবে? একটা একটা করে মেসেজ ফরওয়ার্ড করেছে? বাপরে! এত সময় তোর বন্ধুদের হাতে?' 

' উফফ ড্যাড! তা কেন করবে? দে জাস্ট টুক স্ক্রিনশটস ! সিম্পল! ' 

এলিনা মেয়েকে বলতে চাইছিল, ' ব্যাপারটা অত সিম্পল নয় রে,বাবু! তুই বুঝবি না।কারও বিশ্বাস ভরসা ভাঙা সিম্পল নয়...' প্রথা এ সব কথা সত্যিই বুঝবে না।এলিনা ভাবল,না বুঝলেই ভাল।যত দিন বুঝবে না ততদিনই এথিক্যাল থাকবে মেয়েটা! 

' মা,আজ আমি তোমার মতো বলি? সাড়ে সাতটা বেজে গেল...এবার না-বেরলে... ' প্রথা হেসে গুটি গুটি পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। 

এলিনার আজ বেরোতে ইচ্ছে করছে না।হোম অফিস করবে।

' নীল, মাথাটা ধরেছে।তুমি আজ প্রথাকে ড্রপ করে দেবে স্কুলে?'  

' শিওর! কিন্তু… মাথা ব্যথা কেন? আবার রাত জাগছ?' 

এলিনা অন্যমনস্ক হয়ে উত্তর দিল, ' মে বি...' 

 

' বাই, মা… ' প্রথা স্কুলে বের হয়।গাড়ির ব্যাকসিটে বসে পিছন ফিরে তাকায়।মিষ্টি হেসে হাত নেড়ে চলে গেল।আজ বড্ড ফগ।যত দূর দেখা যায় এলিনা তাকিয়ে রইল মেয়ের দিকে।

একটা ভয়,শূন্যতা ক্রমশ চারপাশ থেকে এসে গ্রাস করছে তাকে।কোথায় যেন তলিয়ে যেতে থাকে তার অন্তরের নিস্তব্ধ এই আকাশটুকু।

 

' … কখন ঢুকছিস অফিসে?' 

' আজ ম্যানাজ করে নে।আসব না।গা ম্যাজ ম্যাজ করছে...'

' গা ম্যাজ ম্যাজ? এই তো গতকাল রাত্রে কথা বললি….আচ্ছা, তুই কি এখনও ওই বাস্টার্ড বুড়োটার কথায় মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকবি ? তোর চোখের টলটলে জল ডিজার্ভ করে, বুড়োটা? ' 

‘এমন কি হওয়ার কথা ছিল, নেহা? তুই তো সবটাই জানিস...আমি স্ট্রিম বদলে চাকরিটা নিয়েছিলাম।এই ফিল্ডে কোনও অভিজ্ঞতা নেই… তারপর সৌম্য যে কীভাবে আমার জীবনে চলে এল ...' 

‘ শোন, তুই জানিস আমি স্পষ্ট কথা বলি।প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।প্রথমদিন যে পুরুষ তোকে একলা বাড়িতে নিয়ে যায়,দু'জন দু'জনকে চিনে নেওয়ার আগেই বিছানায় আদর করতে চায়,বস,সে আর যাই হোক তোকে ভালবাসেনি..এটা তুই-ও প্রথমদিনই বুঝে গেছিস।ডিডিন্ট ইউ?'

এলিনা টেলিফোনের এপারে কাঁদছে। ঘন কুয়াশায় আরও ঘোলাটে হয়ে আসছে চারপাশ।লিভিং রুমের জানলায় চোখ রেখে দেখল আশপাশের গাছপালা বাড়িঘর কিছুই দেখা যাচ্ছে না।

' তা হলে কি আমি ভেবেচিন্তেই এগিয়েছিলাম সম্পর্কটায় ? তুই কি এটাই ইঙ্গিত করছিস? '

' শোন…আমার একটা কল আসছে, এলিনা।পরে কথা বলছি।' 

ফোন নামিয়ে এলিনা মনে মনে ভাবল,নেহা কি এড়িয়ে গেল উত্তরটা? 

…একটু আগে প্রথা ওর বন্ধুদের কথা বলেছিল না,’ সো চিপ!’

এলিনার এই মুহূর্তে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে, হ্যাঁ...একটা সস্তার বিনিময়,একটা সস্তার আদানপ্রদান ছিল সম্পর্কটায়।শুধু এলিনা নয়,সৌম্যও সে সব জানত,বুঝত।হ্যাঁ,হ্যাঁ….দু'জনে সমস্তটা জেনেবুঝেই…..

তা হলে এই সম্পর্কটার অবুঝপনা আর সমস্ত না-পাওয়ার পরিণাম কী দাঁড়াল ? কয়েকটা সস্তার স্ক্রিনশট..! 

1 Comments

Sabyasachi Bhowmick

09 April, 2023

ভালো লাগলো । সত্যি বলছি স্ক্রল করে পড়তে ক্লান্তই লাগে ... অনেক ভালো লেখাও শেষ করতে পারিনা ... কিন্তু পারলাম ... গদ্যে সপ্রতিভতা তো তোমার আছেই .... আরো যেটা ভালো লাগলো, ন্যারেশনকে অকারণ ornamentation এর রাস্তায় যাও নি .....

Post Comment