এই রাজ্যে দল পাল্টানো কোনো নতুন কথা নয়, বর্তমান সময়ে তা নিয়মে পরিণত হয়েছে, সেটা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের ক্ষেত্রেই হোক বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের ক্ষেত্রেই হোক। তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পরে তথাকথিত বামপন্থী সাংস্কৃতিক দিগ্গজদের হৈ হৈ করে মমতাদেবীকে বন্দনা করতে দেখেছি। সেটার ব্যাপ্তি ক্রমাগত চওড়া হয়েছে। তৃণমূলের বাইরে থেকেছে গুটি কয়েক, মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়িয়েছিলেন প্রয়াত শঙ্খ ঘোষ, নবারুণ ভট্টাচার্যরা, ছিলেন এবং আছেন অপর্ণা সেন, কৌশিক সেনের মত মানুষজন, যাঁরা নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর কাল পর্যায়ে কৃষকদের অধিকারের দাবীতে সরব হয়েছিলেন। নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরে দলবদলে পরিপক্ক রুদ্রনীল, পাপিয়া অধিকারীরা গৈরিক সংস্কৃতির ধ্বজা ধরেছে। অন্য মমতা(শঙ্কর) এখন এনকাউন্টারের পক্ষে সওয়াল করছেন, যা এরাজ্যের সংস্কৃতির গতিপথকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। এদেশে বিজেপির শাসনকালে সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকের মাপকাঠিতে ভারতের স্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫৭ তম, একাডেমিক স্বাধীনতা সূচকের মাপকাঠিতে ১৫৬ তম। ফলে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কী প্রবল স্বাধীনতা রয়েছে তা বোধগম্য। কোনো ব্যক্তিরই ধর্ম বিষয়ে রসিকতা বা বিরূপ মন্তব্য করার জো নেই, করলেই বিশ্বাসে আঘাতের দায়ে এফআইআর, গ্রেফতার, হাজতবাস। মরণোত্তর এফআইআর দায়ের করার কোনো ধারা ভারতীয় ন্যায় সংহিতায় থাকলে লক্ষণের শক্তিশেল বা মেঘনাদ বধ কাব্য লেখার জন্য প্রয়াত সুকুমার রায় বা মাইকেল মধুসূদনের নামে তা করা অনিবার্য ছিল; পরশুরাম বা শিব্রামরাও বাদ যেতেন না।
এরকম এক ‘মুক্ত’ চিন্তার দেশে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিন। যে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম হাসিনাও দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এদেশেই আশ্রয় নিয়েছেন, রাজানুগ্রহে, দুজনাই। তসলিমার নির্বাসনের পরে ২০ বছরের বেশি সময় বেগম হাসিনা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি তসলিমার নির্বাসনকে প্রত্যাহার করেননি; প্রকারান্তরে তিনি নির্বাসনের দণ্ডের অন্যতম সহায়ক। দিল্লিশ্বরের কী অপরিসীম লীলা, দণ্ডদাতা ও দণ্ডিত একইসঙ্গে তার অনুগ্রহভাজন।
সেই ‘মুক্ত’ হাওয়ায় শ্বাস নিতে নতুন বঙ্গে ১৯ বছর বাদে পদার্পণ করলেন তসলিমা নাসরিন, যাঁকে ২০০৭ সালে ত্যাজ্য করেছিল বামফ্রন্ট, সিপিআইএমের প্রতিটি কাজের চরম বিরোধী তৃণমূল সেই কাজের কখনো বিরোধ করেনি। না, ২০০৭ সালে তৃণমূলের প্রতাপশালী নেতা শুভেন্দু অধিকারীও করেনি, পরবর্তীতে তৃণমূল সরকার ক্ষমতায় থাকার ১৫ বছরেও মমতা (ব্যানার্জী) করেননি, ১০ বছরে শুভেন্দু করেনি। আজ শুভেন্দুবাবু এরাজ্যে ‘মুক্ত’ হাওয়ার ‘অগ্রদূত’, যেখানে তাঁর সামনেই কবি জয় গোস্বামীকে আওয়াজ দিয়ে মঞ্চে ওঠা থেকে বিরত করা হয়। তসলিমা তবু বুঝতে পারেন না, কী ‘মুক্ত’ সুপবন বয়ে চলেছে পশ্চিমবঙ্গে! তিনি ভাষন দেন. কবিতা পড়েন, আপ্লুত হন। তিনি সেকুলার মিশনের ডাকে সাড়া দিয়ে এসেছিলেন এই রাজ্যে। জানিনা সেকুলার কথাটিকেই যে রাজনৈতিক দল বর্জন করতে চায়, যে দলের সমর্থকরা সেই শব্দকে ‘সিক্যুলার’ বলে ব্যঙ্গের বস্তুতে পরিণত করেছে, সেই দলের নেতা মন্ত্রী সান্ত্রীদের সাড়ম্বর উপস্থিতি ও আবাহনে কোন ধর্মনিরপেক্ষতার বার্তা তিনি উপভোগ করলেন।
তসলিমার ‘দ্বিখণ্ডিত’ যখন বামফ্রন্ট নিষিদ্ধ করেছিল, ২০০৩ সালে, তখন দুটি তরফ থেকে বিরোধিতা করা হয়েছিল। একদিকে ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিজেপি আরএসএস, যারা মতপ্রকাশে স্বাধীনতাতে বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করে না, কিন্তু তসলিমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ায়, মকবুল ফিদা হুসেনকে দেশ থেকে বিতাড়ণ করে। কারণ, তা তাদের মুসলিম বিরোধী রাজনৈতিক এজেণ্ডাকে শক্তিশালী করে। অপরদিকে ছিল এপিডিআর, গণসংস্কৃতি পরিষদ, নবান্ন পত্রিকা, শিবনারায়ণ রায় সমেত গণতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মানুষজন, যাদের নির্বাচনী লড়াইএ তসলিমাকে ব্যবহারের কোনো উদ্দেশ্য ছিল না, ছিল মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়ানোর আন্তরিক প্রয়াস। এপিডিআর-এর সুজাত ভদ্র প্রমুখ আদালতে যান, সওয়াল করেন তৎকালীন অধিকার আন্দোলনের হয়ে শীর্ষ আদালতের বর্তমান বিচারপতি মাননীয় জয়মাল্য বাগচি। ‘দ্বিখণ্ডিত’র উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয় ২০০৫ সালে। পশ্চিমবঙ্গ গণসংস্কৃতি পরিষদ, নবান্ন পত্রিকা ও অন্যান্যরা কলকাতায় মহাবোধি সোসাইটি হলে ১১ ডিসেম্বর, ২০০৩-এ ওই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে কনভেনশন করে তসলিমার উপস্থিতিতে ও প্রয়াত শিবনারায়ণ রায়ের সভাপতিত্বে। ওই সময়ে মুসলিম মৌলবাদীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, রাজানুগ্রহ ব্যতিরেকে সভামঞ্চে বিরোধিতা খুব সহজ ছিল না। যতদূর জানি ‘লজ্জা’র প্রকাশ ও তৎপরবর্তীতে তসলিমার নির্বাসনের পরে তাঁর লেখা ‘আমার মেয়েবেলা’ বাংলাদেশে বাণিজ্যিক স্বার্থের অন্তরায় বলে আনন্দ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। পিপলস বুক সোসাইটি (পিবিএস) তা প্রকাশ করে। ‘দ্বিখণ্ডিত’ও প্রকাশ করেছিল পিপলস বুক সোসাইটি। বইটি নিষিদ্ধ হওয়ায় আর্থিক সঙ্কটের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল প্রাথমিক ভাবে। এসবই মুক্ত চিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে লড়াইএর ইতিহাস। তসলিমা সেই বিরোধিতা, সেই লড়াইএর বিষয়ে কোনো কথা বলেছেন বলে শুনিনি। আশা করেছিলাম, তিনি যতই এদেশে আশ্রয়ের জন্য রাজ-প্রসাদের বন্দোবস্ত করুন না কেন, অন্তত সেই সময়ের স্বার্থহীন প্রতিবাদীদের কথা মনে রাখবেন ও বলবেন। কিন্তু তিনি ভারতের ফ্যাসিবাদীদের মধ্যে ঔদার্য দেখতে পেয়েছেন। তাই স্বার্থহীন প্রতিবাদীদের সঙ্গে তাঁর স্বার্থের সঙ্ঘাত ঘটেছে।
বাংলাদেশের ইসলামি মৌলবাদের বিরুদ্ধে কথা বলে লিখে তিনি অত্যাচারিত, নির্বাসিত হয়েছেন; তিনি সকল ধরণের ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে লিখেছেন, অতীতে মতপ্রকাশ করেছেন। আজ তিনি ভারতের ধর্মীয় ফ্যাসিবাদীদের মধ্যে, প্রতিনিয়ত যিনি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরুদের উস্কানি দিয়ে চললেছেন এমন একজনের ঔদার্যের শংসাপত্র দিচ্ছেন দেখে মনে হল, যে দলবদলের কথা প্রথমেই বলেছিলাম তা কেবল এদেশের, এরাজ্যের নাগরিকদের আক্রমণ করেনি, আক্রান্ত হয়েছেন এই উপমহাদেশের অন্যান্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বওরা, নির্বাসিত বিতাড়িত হলেও।
একটা প্রশ্ন রয়েই যায় আত্মসুখ ও আশ্রয়ের জন্য যদি নীতি-আদর্শ পরিত্যাগ করতেই হয়, যদি করতে হয় সাম্প্রদায়িক মৌলবাদীদের কাছে আত্মসমর্পণ, তাহলে তা নিজ দেশের মৌলবাদীদের কাছে করলে কি অহমিকা আহত হয়? নাকি পাশ্ববর্তী দেশের অপর ধর্মের তুলনামূলক ভাবে অধিক শক্তিশালী মৌলবাদীদের হাত ধরলে খ্যাতি যশের পাশাপাশি প্রতিহিংসা চরিতার্থের বাসনাও পরিতৃপ্ত হয?