পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের মামলার প্রেক্ষিতে ভারতের বিচার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্র উন্মোচিত

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : মিলি মুখার্জী
এ দেশে দু ধরণের আইন আছে- একটা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য আর একটা রাজনৈতিক এক্টিভিস্টদের জন্য। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে চিকিৎসার কারণে ধর্ষণ মামলার অভিযুক্ত আশারামের সাজা ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে গুজরাট হাইকোর্ট। ২০১৩ সালের ধর্ষণ মামলায় আশারামকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে।

পুনরায় আরও একবার উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের জামিন নাকচ করল সুপ্রীম কোর্ট। এবারের বিচারে সুপ্রীম কোর্টের যা অবজারভেশন ব্যক্ত হয়েছে তাতে ওদের মুক্তি বা জামিন বিশ বাঁও জলের অতলে তলিয়ে গেল।  উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের এর আগে  ২১ বার জামিনের আবেদন খারিজ হয়েছে। এদিনও জামিন খারিজ হলো।

আসলে এ দেশে  দু ধরণের আইন আছে- একটা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জন্য আর একটা রাজনৈতিক এক্টিভিস্টদের জন্য। অন্যদিকে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে চিকিৎসার কারণে ধর্ষণ মামলার অভিযুক্ত আশারামের সাজা ৬ মাসের জন্য স্থগিত করে গুজরাট হাইকোর্ট। ২০১৩ সালের ধর্ষণ মামলায় আশারামকে দোষী সাব্যস্ত করে সাজা দেওয়া হয়েছে।

ধর্ষণ মামলায় দোষী সাব্যস্ত গুরমিত রাম রহিম সিংকে আরও ৪০ দিনের প্যারোল মঞ্জুর করা হয়েছে। ২০১৭ সালে, সিবিআই আদালত রাম রহিমকে তার দুই মহিলা অনুসারীকে ধর্ষণের অভিযোগে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। এই তিনটে মামলা বিচার ব্যবস্থার দুটো ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে স্পষ্ট করে দিচ্ছে। আশারাম এবং রাম রহিমের মতো গুরুতর অপরাধীদের বারবার প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে, অথচ উমর খালিদ এবং শারজিল ইমামের মতো এক্টিভিস্টরা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে জামিন পাচ্ছেন না, বিচারের শুনানিও এগোচ্ছে না ।সুপ্রিম কোর্ট বলছে যে দীর্ঘদিন ধরে জেলে থাকার কারণে তাদের জামিন দেওয়া যাবে না। আজ যা কিছু সুপ্রীম কোর্ট করেছে তা সাধারণ মানুষের বিচার ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাস ভেঙে  দেবে, হতাশ করবে । কুলদীপ সেঙ্গার এবং আরাবল্লী রায়ের সময় থেকেই বোঝা গিয়েছিল যে সুপ্রীম কোর্ট ন্যায়কে দমন করবে। বিচার ব্যবস্থা রাষ্ট্র-এর পক্ষেই থাকবে, মানবিকতা এখানে উপেক্ষিত।

 

উদারনৈতিক রাষ্ট্রতত্ত্ব দাবি করে, আইন ও বিচারব্যবস্থা শ্রেণি-নিরপেক্ষ, তারা কেবল রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য “ন্যায়” প্রতিষ্ঠা করে। অথচ আমরা দেখতে পাই, আদালতের ভূমিকা হচ্ছে  শাসক শ্রেণির ‘নীরব অংশীদারীত্ব’ করা। উদারনৈতিক ধারণা অনুসারে,  আদালত রাষ্ট্রের শোষণ-বঞ্চনার হাত থেকে নাগরিককে বাঁচায়।মার্কসবাদী চিন্তা অনুসারে আমরা বুঝি,  আদালত সংকটের সময়ে শেষমেশ রাষ্ট্রের পাশেই দাঁড়ায়। তার মানে, আদালতের ভূমিকার মধ্যেই শ্রেণিচরিত্র ধরা পড়ে।  কার্ল মার্কস স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন—

“The executive of the modern state is but a committee for managing the common affairs of the bourgeoisie.”

— The Communist Manifesto

অর্থাৎ আধুনিক রাষ্ট্র, তার আইন, পুলিশ, আদালত এসবকিছুই মূলত শাসক শ্রেণির যৌথ স্বার্থ রক্ষার যন্ত্র। এই মৌলিক তত্ত্বের আলোকে যদি ভারতের Unlawful Activities (Prevention Act (UAPA) এবং উমর খালিদ–শারজিল ইমামের মামলাকে দেখা হয়, তবে স্পষ্ট হয় যে, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন বিচারের ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্র ও শ্রেণি-শাসনের এক উন্মোচিত রূপ।

 

১. রাষ্ট্র  বলতে শ্রেণি-শাসনের সংগঠিত রূপ এক কাঠামোকে বোঝায় যার দ্বারা বিপুল জনগণের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা যায়। লেনিন তাঁর ক্লাসিক গ্রন্থ State and Revolution-এ রাষ্ট্র সম্পর্কে লিখেছিলেন—

“The state is a product and a manifestation of the irreconcilability of class antagonisms.”

অর্থাৎ শ্রেণি-বিভক্ত সমাজে রাষ্ট্র নিরপেক্ষ হতে পারে না। যখন শ্রেণি-সংঘাত তীব্র হয়, তখন রাষ্ট্র তার প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে; দমন, পুলিশি ক্ষমতা ও ব্যতিক্রমী আইন প্রয়োগের মাধ্যমে।

সমকালীন ভারতীয় প্রেক্ষিত

বর্তমান ভারতের রাজনৈতিক অর্থনীতি, নব্য-উদারনৈতিক কাঠামো এক গভীর সংকটে যেখানে বেকারত্ব, অসাম্য, কৃষি-সংকট ও মূল্যবৃদ্ধিতে জর্জরিত

কর্পোরেট পুঁজি ও রাষ্ট্রের পারস্পরিক নির্ভরতা তীব্র,

এই অবস্থায় রাষ্ট্রের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে জনগণের সংগঠিত প্রতিবাদ। CAA বিরোধী আন্দোলন সেই চ্যালেঞ্জকে বাস্তবে রূপ দেয়। তাই দমননীতি অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 

২. UAPA (Unlawful Activities Prevention Act)  সেই ধরনের একটি আইন, যা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে নাগরিক অধিকারকে স্থায়ীভাবে দমন করে রাখার আইনি মান্যতা দেয়। মার্কসবাদ আইনকে কখনও সমাজের উপরের কোনও নৈতিক কাঠামো হিসেবে দেখে না। মার্কস Critique of the Gotha Programme-এ লিখেছিলেন—

“Law can never be higher than the economic structure of society and its cultural development conditioned thereby.” UAPA-ও তার ব্যতিক্রম নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে শ্রেণি-স্বার্থ রক্ষার আইনি রূপ মাত্র ।

 

৩. আলথুসার এর মতানুসারে দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র ও আদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্রই হচ্ছে শ্রেণিশোষণের হাতিয়ার। লুই আলথুসার তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ Ideology and Ideological State Apparatuses-এ রাষ্ট্রকে দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেন—

“The State Apparatus contains two bodies: the Repressive State Apparatus, and the Ideological State Apparatuses.”

 

Repressive State Apparatus (RSA): পুলিশ, সেনা, কারাগার, আদালত এসবই। Ideological State Apparatus (ISA): শিক্ষা, মিডিয়া, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি।

UAPA হলো এমন একটি আইন বৈধতা,  যা এই দুই যন্ত্রকে যুক্ত করে দেয়। পুলিশ ও আদালত দমন করে,

মিডিয়া ও রাষ্ট্রীয় ভাষ্য সেই দমনকে বৈধতা দেয়।

 

৪. UAPA-র ধারাগুলি যেমন,

(ক) ধারা 2(O): বেআইনি কার্যকলাপ এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে “প্রশ্ন” করে এমনকিছু করলেই তা রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ।

মার্কসবাদী ব্যাখ্যায়, রাষ্ট্র হচ্ছে শাসক শ্রেণির কাঠামোগত রাজনৈতিক রূপ; অতএব রাষ্ট্রকে প্রশ্ন মানে শাসক শ্রেণিকে প্রশ্ন করা ।

মার্কস লিখেছিলেন—

“The ruling ideas of each age have ever been the ideas of its ruling class.”

— The German Ideology।

এই ধারা আসলে বিরোধী রাজনৈতিক চিন্তাকেই অপরাধী সাব্যস্ত  করে।

 

১৫ এর(খ) ধারা অনুযায়ী সন্ত্রাসবাদ

এই ধারায় “ভীতি” ও “অস্থিতিশীলতা”-র ধারণা এতটাই প্রসারিত যে গণআন্দোলনও এই হিসাবে সন্ত্রাস হিসেবে বিবেচিত  হতে পারে। চিরকালই রাষ্ট্রের বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কেঁদে চলেছে।

লেনিন বলেছিলেন—

“Those who oppose dictatorship accuse us of terrorism. But we accuse them of hypocrisy.”।

ঐতিহাসিকভাবে শাসক শ্রেণি সব প্রতিরোধকেই “অরাজকতা” বা “সন্ত্রাস” বলে চিহ্নিত করেছে, সে হোক তা শ্রমিক আন্দোলন বা ছাত্র রাজনীতি।

 

ইউএপিএ-র ১৮ এর (গ) ধারা মোতাবেক ষড়যন্ত্রই শুধু  নয়, ষড়যন্ত্রের চিন্তাও অপরাধ। আলথুসারের ভাষায়— এটি আদর্শগত স্তরে আগাম দমন (pre-emptive repression)।

রাষ্ট্র ধরে নেয়, তোমার চিন্তা, ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হতে পারে, তাই বর্তমানেই তুমি বন্দি জীবন যাপন কর। রাষ্ট্রের চোখে ক্ষুদিরাম থেকে খালিদ সবায়ই সন্ত্রাসবাদী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে।

 

ইউএপিএ-র ৪৩ ঘ (৫)  ধারায় জামিন নাকচ,এই ধারা আইনের অন্তর্গত সবচেয়ে নগ্ন শ্রেণি-পক্ষপাত। পুলিশি চার্জশিট মানেই অভিযোগ  সত্য। এই ধারার বলে অভিযুক্ত  প্রায় ক্ষেত্রেই দোষী প্রমাণিত হয়ে যায়।

লেনিনের ভাষায়—“Law is a political measure; it is politics.”

এখানে আইন সরাসরি রাষ্ট্রীয় রাজনীতির অস্ত্র।

 

৫. উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম : ‘অর্গানিক বুদ্ধিজীবী’ হিসেবে বিবেচিত হয়। গ্রামশি যে ধারণাটি দেন, ‘organic intellectual’

তার সঙ্গে এই দুই নাম গভীরভাবে যুক্ত। গ্রামশি লিখেছিলেন—

“Every social group... creates organically one or more strata of intellectuals which give it homogeneity and an awareness of its own function.”

উমর খালিদ ও শারজিল ইমাম—

সংগঠক,বক্তা। ছাত্র ও যুব সমাজের সঙ্গে যুক্ত রাষ্ট্রের কাছে এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানকারী ব্যক্তিত্ব । তাই লক্ষ্যবস্তু শুধু ব্যক্তি নয়, তাদের প্রতীকী ভূমিকা।

 

৬. আদালত -এর ভূমিকা শ্রেণি নিরপেক্ষ নাকি শ্রেণি-রাষ্ট্রের অংশ?

বুর্জোয়া ধারণা বলে, আদালত রাষ্ট্রের বঞ্চনার হাত থেকে নাগরিককে সুরক্ষা দেয়, আইনি বিচার দেয় । মার্কসবাদ বলে, সংকটের সময় আদালত রাষ্ট্রের পাশেই দাঁড়ায়। আলথুসার স্পষ্ট করে বলেন, আদালতও Repressive State Apparatus-এর অংশ।

উমর–শারজিল মামলায় আদালতে সরকারি উকিলদের বক্তব্য, “এই পর্যায়ে প্রমাণ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়”। বিচারের ভার্ডিক্ট এই ধারণাকে মান্যতা দেয়।  এই ভার্ডিক্ট আসলে রাষ্ট্রীয় বয়ানকে স্বীকৃতি দেওয়া।

 

৭. ‘না-বিচার’ একটি শাস্তিরই প্রক্রিয়া।

মার্কসবাদী বিচারধারায় এটিকে বলা হয়,Punishment as deterrence and example. কারাবাস এখানে বিচার্য নয়, এটি রাজনৈতিক নীরবতার কৌশল, আন্দোলন থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি পদ্ধতি। ব্যক্তি দমনের দ্বারা সমষ্টিগত জনগণের জন্য ভয় উৎপাদন।

 

৮. ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি বিষয়ে

লেনিন লিখেছিলেন—

“History repeats itself, first as tragedy, then as farce.”

জরুরি অবস্থা, ভিমা কোরেগাঁও, UAPA জাতীয় কালাকানুন রাষ্ট্রীয় দমননীতির ধারাবাহিকতা ছাড়া কিছু নয়। তাই তাঁর নিদান ছিল আইন ভাঙা নয়, ভাঙতে হবে আইনের শ্রেণি-চরিত্র। মার্কস লিখেছিলেন;

“Between equal rights, force decides.”। আজ ভারতীয় রাষ্ট্রে—

নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের শক্তির সামনে অসহায় উমর খালিদ ও শারজিল ইমামের মামলা আমাদের শিক্ষা দেয় যে, বিচার ব্যবস্থার ভেতর মুক্তির আশা তাদের সীমিত। মার্কসবাদ আমাদের ধারণা দেয় যে, মুক্তি আসে সংগঠিত সংগ্রাম থেকে। আসলেই যতদিন রাষ্ট্র পুঁজির দাস হয়ে থাকবে ,ততদিন UAPA থাকবে,এবং তা নানা নামে ব্যক্ত হবে ।

যতদিন শ্রেণি সংঘাত চলবে,

ততদিন এই ‘না-বিচার’-এর বিরুদ্ধেই

রাজনীতি ও ইতিহাস লিখিত হবে। উমর খলিদদের জন্য কারান্তরালই বিবেচিত হবে সংগ্রামী চেতনার রুদ্ধ আশ্রয় হিসাবে।

0 Comments

Post Comment