এত সব কিছুর পরেও আরএসএস/বিজেপির ফ্যাসিবাদ নিয়ে বামপন্থীদের একাংশের চেতনা তৈরি হল না। এখনও কেউ কেউ বিজেপিকে একটা সাধারণ দক্ষিণপন্থী বা উগ্র দক্ষিণপন্থী দল হিসাবেই দেখছেন এবং বিজেপির বহু কার্যকলাপের গুরুত্ব বিশেষ করে তার ভয়ঙ্কর দিকটি যথেষ্ট পরিমাণে লঘু করে দেখছেন। তৃণমূলের নেতাদের গণহারে ডিম ছোঁড়া, গ্রেপ্তার হওয়া বন্দীদের প্রকাশ্যে কোমরে দড়ি বেঁধে প্যারেড করানো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে হাফপ্যান্ট পরিয়ে হাঁটানো, কান ধরিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো এগুলি যে আধুনিক বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য নয়, বরং ফ্যাসিবাদী শাসনের বৈশিষ্ট্য যা বহন করে প্রাক্ বুর্জোয়া বা প্রাক্ গণতান্ত্রিক শাসনের উপাদানগুলিকে তা বোঝার ক্ষমতাও যে কতিপয় বামপন্থীদের এখনও হল না তা সত্যিই আশ্চর্যের।
অবশ্য এর মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। বাঙলায় দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরণের তরল বামপন্থার অভ্যুদয় হয়েছে। অনেকেরই ধারনা এর সব দায়িত্ব সিপিআইএমের। কিন্তু ব্যাপারটা এত সহজ সরল নয়। সিপিএম - অসিপিএম সব মিলিয়ে গোটা বাম আন্দোলনটিই বিগত বেশ কয়েক দশক ধরে এক ধরণের চর্চাবিহীন-অনুশীলনবাদে ভুগেছে। এর ফলেই তৈরি হয়েছে এই তরল বামপন্থার রমরমা।
বৃহৎ মিডিয়া এবং বিজেপির প্রচারমেশিন প্রথম থেকে প্রচার শুরু করে এই ডিম ছোঁড়ার ব্যাপারটা আসলে গণক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। খুব শীঘ্রই এই যুক্তিটি টুপ করে ‘খেয়ে’ নেন দলমত নির্বিশেষে বেশ কিছু বামপন্থী। ধীরে ধীরে বেশ কিছু কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনা ঘটতে শুরু করে। তৃণমূলের একটা বড় অংশ গণহারে দলত্যাগ করতে শুরু করে। বাজার চলতি খবরের কাগজগুলো এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া এদের চিহ্নিত করে ‘বিদ্রোহী’ বলে। কিন্তু বাস্তব কথা সকলেই জানেন। এরা আসলে দুর্নীতিপরায়ণ সুবিধাবাদীর দল যারা নিজেদের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বাঁচাতে বাঙলায় সরকার বদল হবার পর থেকেই গণহারে বিজেপির শিবিরে নাম লেখাতে শুরু করেছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল এই যে, তথাকথিত গণরোষ তৃণমূলে এখনও থেকে যাওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে ডিম হয়ে বর্ষিত হতে থাকলেও এই দলবদলু নীতিহীন সুবিধাবাদীদের দিকে একবারের জন্যেও ধাবিত হয় নি। এটা পরিষ্কার বোঝা যায় যে, দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে এই তথাকথিত গণরোষ আসলে সাজানো ঘটনা।
কিছু বামপন্থী মানুষ আছেন, বিশেষ করে অসিপিআইএম শিবিরে, যারা মনে করেন যে ‘গণ’ যাই করুক না কেন তাই বুঝি খুবই পবিত্র জিনিস। দশটা লোক মিলে একটা ঘটনা ঘটিয়ে দিলেই বুঝি সেটা গণ-আন্দোলন হয়ে যায়। এই তথাকথিত ‘গণ-আন্দোলনের পবিত্রতা’ তত্ত্ব যে ফ্যাসিবাদের যুগে অচল সেটা তারা বুঝতে পারেন না। ফ্যাসিবাদ চিরকালই একটা গণ-আন্দোলন। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীল গণ-আন্দোলন, যার লক্ষ্য হল সমাজের প্রগতিশীল উপাদানগুলিকে সহিংস উপায়ে বলপ্রয়োগের মধ্যে দিয়ে, কখনও রক্তের বন্যায় ডুবিয়ে দিয়ে ধ্বংস করা।
জার্মানি বা ইতালির কথা ছেড়ে দিন। ইন্দোনেশিয়ার ঘটনার কথা মনে করে দেখুন। আমাদের শিক্ষার্থীজীবনে ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিষ্ট হত্যা ছিল একটি অত্যন্ত আলোচিত বিষয়। আজকাল এই আলোচনাগুলো বাম মহলে অবলুপ্ত হয়ে গেছে। ফলে অধিকাংশ তরুণ বাম ক্যাডাররা এই ঘটনাগুলো সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। এটা তাদের সমস্যা নয়। সমস্যাটা হল গোটা আন্দোলনের। তৎকালীন পৃথিবীতে ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টি ছিল সর্ববৃহৎ পার্টি। ক্ষমতা দখলের খুব নিকটে ছিল তারা। কিন্তু তাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ভুল সিদ্ধান্ত এমনভাবে তাদের বিরুদ্ধে চলে যায় যে ইন্দোনেশিয়ার ফ্যাসিবাদীরা জেনারেল সুহার্তোর নেতৃত্বে কমিউনিষ্টদের গণনিধণ যজ্ঞ সংগঠিত করার সুযোগ পেয়ে যায়।
১৯৬৫ সালের ঘটনা। সে সময়কার বিশ্বপরিস্থিতিতে মার্কিন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বেশ কোনঠাসা অবস্থায়। বিশ্ব আয়তনে ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে তার দুই শতক আগেই। কিন্তু ফ্যাসিবাদ জিনিসটা যেহেতু পুঁজিবাদের সংকট থেকে বারেবারেই জন্ম নেয় তাই পুঁজিবাদ থাকা মানেই ফ্যাসিবাদের বিপদ থাকা এবং তা উপযুক্ত ক্ষেত্রে উপযুক্ত সময়ে বারংবার আত্মপ্রকাশ করে। ইন্দোনেশিয়া ছিল তেমনই একটা উপযুক্ত ক্ষেত্র যেখানে কমিউনিষ্টদের কিছু মারাত্মক ভুল ফ্যাসিবাদের বিপদকে ডেকে আনল এবং ফলস্বরূপ কমিউনিষ্ট আন্দোলনটিই একটা বড় সময়ের জন্য সেদেশ থেকে প্রায় মুছে যায়।
১৯৬৫ সালের ৩০শে সেপ্টেম্বর ইন্দোনেশিয়ার সৈন্যবাহিনীর একটি ছোট কিন্তু প্রভাবশালী অংশ একটি ভয়ঙ্কর মারাত্মক চক্রান্তে লিপ্ত হয়। এরা সেনাবাহিনীর ছয় জন শীর্ষস্থানীয় জেনারেলকে হত্যা করে এবং এটিকে কমিউনিষ্টদের কাজ বলে প্রচার করে। সেনাবাহিনীর এই প্রতিক্রিয়াশীল ফ্যাসিবাদী অংশটি 30 September Movement (সংক্ষেপে G30S) নামে পরিচিত ছিল। এরপরেই ইন্দোনেশিয়ায় ফ্যাসিস্টদের প্রত্যক্ষ মদতে প্রতিক্রিয়াশীল গণ-আন্দোলনের ঢেউ গড়ে ওঠে। বিভিন্ন ফ্যাসিবাদী সংগঠন এবং ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃত্বে হাজার হাজার সাধারণ জনতা কমিউনিষ্ট নিধন যজ্ঞে সামিল হয়। ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিষ্ট পার্টি, সংক্ষেপে, পিকেআই-এর দশ লক্ষ সদস্য সমর্থককে স্রেফ হত্যা করা হয়। নারী কমরেডদের ওপর ভয়ঙ্কর যৌন সন্ত্রাস কায়েম হয়। বিপুল গণহত্যা, যৌন সন্ত্রাস, অগ্নি সংযোগ চলতে থাকে ১৯৬৫ সাল থেকে ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত। এর ফলে কমিউনিষ্ট পার্টি কার্যত মুছে যায়। সকর্ণের পতন ঘটে এবং জেনারেল সুহার্তোর নেতৃত্বে একটি ফ্যাসিবাদী চক্র ক্ষমতা দখল করে একনায়কতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে। কমিউনিষ্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় প্রগতিশীল আন্দোলন বিরাট ধাক্কা খায়। পরবর্তীকালে এই ঘটনার ওপর সংরক্ষিত ফাইলগুলি প্রকাশ্যে এলে জানা যায় যে, পশ্চিমী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির, বিশেষ করে আমেরিকার, প্রত্যক্ষ মদত ছিল এই ঘটনায়এবং এই চক্রান্ত করা হয়েছিল তাদেরই নেতৃত্বে।
ইন্দোনেশিয়ার এই গোটা ঘটনাটাতেই দেখবেন জনতার একটা ভূমিকা ছিল। সেই সময়ে তাদের একটা অংশ যেমন প্রগতিশীল আন্দোলনের শরিক ছিল তেমনই অন্য আর একটি অংশ ফ্যাসিবাদীদের প্রচারে বিভ্রান্ত হয়ে প্রগতিবিরুদ্ধ গণ-আন্দোলনের শরিক হয়ে পড়ে। সুতরাং, গণ অংশগ্রহণ থাকলেই সেই ঘটনাগুলি পবিত্র হয়ে যায় না৷ বা গরিব মানুষের অংশগ্রহণ থাকলেই যে কোনো কাজ প্রগতিমূলক বলে বিবেচিত হতে পারেনা। সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের ঘটনাবলীও এর একটা প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মানুষের ক্ষোভকে পুঁজি করে যে মবতন্ত্র চালু করা হয়েছে তার প্রত্যক্ষ ফল কী হচ্ছে তা খেয়াল করে দেখুন। তৃণমূল দলটা যাদের নিয়ে তৈরি তারা প্রায় অধিকাংশই ক্ষমতালোলুপ, দুর্নীতিপরায়ণ এবং ফলত সুবিধাবাদী। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। দল ক্ষমতার বাইরে গেলেই কিছু লোক যে দল ছাড়বে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। অনেকেরই মনে থাকবে ২০২১ সালের আগেও একটা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল যে, বিজেপি নির্বাচনে জিততে পারে এমন একটা সম্ভাবনা খুব জোরদার ছিল। সেই সময়েও নির্বাচনের আগেই তৃণমূল ছাড়ার হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনে দল জিতে যেতে সেই নির্লজ্জ সুবিধাবাদীরা অধিকাংশই আবার একে একে এসে পুরনো দলে যোগ দিয়েছিল। আর এবারে তো তৃণমূল হেরেই গেছে। সুতরাং দলত্যাগ ঘটতই। কিন্তু বাস্তবে যা হচ্ছে তা একেবারেই অভাবনীয়। হাতে গোনা দু'একজন ছাড়া বাকী সব নেতাই দল ছেড়েছেন। বিধায়কদের অধিকাংশই বেরিয়ে গেছে। সাংসদদের অধিকাংশও দলের সাথে নেই। মমতার অতি বিশ্বস্ত বলে যাদের ভাবা হত তারাও পালিয়ে গেছে। একদিকে ইডি সিআইডি, অন্যদিকে ডিম থেরাপী। দল ছেড়ে যারা বেরিয়ে যাচ্ছে তারা অমনি ধোয়া তুলসিপাতা হয়ে যাচ্ছে। ইডিও নেই, সিআইডিও নেই, ডিমও নেই, ‘জনরোষ’ও নেই। সব বিলকুল হাওয়া। জীবন সুন্দর। আর অন্যদিকে সংসদে সংখ্যা বাড়ছে বিজেপির। রাজ্যে সরকারও তারা চালাচ্ছে, বিরোধী দলও তারা চালাচ্ছে। একটা ফ্যাসিবাদী এক পার্টি ব্যবস্থার দিকে ধীরে ধীরে এগোচ্ছি আমরা। এক দেশ, এক নির্বাচন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হচ্ছে ক্রমশ।
এই শতাব্দীর আধুনিক ফ্যাসিবাদকে এই কারণেই অনেকে Creeping Fascism বলে চিহ্নিত করেন। রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে রাতারাতি ক্ষমতায় এসে সমস্ত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করে দেওয়া, অন্য সব দলগুলিকে নিষিদ্ধ করার যে মডেল আমরা গত শতকে দেখেছিলাম আজকের ফ্যাসিবাদের মডেল সেখান থেকে অনেকটাই আলাদা। জল যেমন পা থেকে একটু একটু করে উপরে মাথার দিকে ওঠে, তেমনই ধীরে ধীরে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কুক্ষিগত করে, ফোঁপড়া করে কিন্তু বহিরঙ্গে চালু রেখে, অন্য দলগুলিকে সরাসরি নিষিদ্ধ না করে কিন্তু সে দল যাতে কেউ করতে না পারে এমন সব ব্যবস্থা পাকা করে, সমাজে একটু একটু করে সইয়ে সইয়ে ফ্যাসিবাদকে স্বাভাবিক (normalize) করে তুলতে তুলতে এই ফ্যাসিবাদ এগোয়। চোখের সামনে সেটাই দেখছি আমরা। ডিম তার একটা অস্ত্র হিসাবে দেখা বাঙলার পথে ঘাটে। একে ফ্যাসিবাদ বলে চিনতে পারে না যে বামপিন্তিরা তাদের ভবিঢ্যত অন্ধকার।