পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

একটি ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলি নির্বাচন

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 200 view(s)
  • লিখেছেন : পার্থ রায়
একটি "ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলি" নির্বাচনের আজ শেষ দিন। আজ পরীক্ষার ফল বেরোবে। এসআইআর থেকে শুরু করে, আজকের এই যাত্রা পথের আজ অন্তিম দিন। বাঁচলো কি গণতন্ত্র, সংবিধান এই প্রশ্নগুলো আজ করা দরকার। ফলাফলের আগে এবং পরেও।
পশ্চিমবঙ্গের ভদ্রলোক সম্প্রদায় যখন " আহারে, কি সুন্দর ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলি নির্বাচন হচ্ছে" বলে তেড়ে হাততালি দিচ্ছেন তখনই বিজেপির লোকেরা নির্বাচন কমিশনের ছোটভাইকে নিয়ে স্ট্রং রুম খুলছে। এটা হচ্ছে অন‍্যান‍্য রাজনৈতিক দলগুলির অনুপস্থিতিতে। তৃণমূল এই অভিযোগ আনার পর ইলেকশন কমিশনের সিইও অভিযোগের সত্যতা কার্যতঃ স্বীকার করে সাফাই দিয়েছেন: না,না, ও কিছু না। পোস্টাল ব‍্যালটগুলো সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।
 
ফেয়ার অ্যাণ্ড লাভলি ইলেকশনের এটা প্রায়-অন্তিম ধাপ। এর আগে হয়েছে ১) কোনো কারণ ছাড়া লক্ষ লক্ষ জীবিত নাগরিককে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া ২) আড়াই লক্ষ সেনা, সাঁজোয়া গাড়ি, গুপ্তহত্যায় দক্ষ স্নীপার ( মার্কসম‍্যান), এক্সট্রা জুডিশিয়াল গণহত্যায় হাতপাকানো এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট দিয়ে বাংলাকে ঘিরে ফেলা এবং এই বাহিনীকে ব‍্যবহার করে চিহ্নিত বিজেপিবিরোধী ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে মারধোর এবং   ভয় দেখানো ৩) প্রচুর পরিমাণে সম্পদ ও অর্থ ( নগদ  টাকা ও ই প্লাটফর্মের মাধ্যমে বাহিত অর্থ)  ব‍্যবহার ৪) একটি ফেডারেল রাষ্ট্রের ভিতরকার একটি নির্বাচিত রাজ‍্যসরকারের প্রশাসনকে অকেজো করে একগুচ্ছ অস্বচ্ছ প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা ৫) একজন আর এস এস প্রচারককে রাজ‍্যপাল বানিয়ে তাকে হিংস্র ভাবে বিজেপির প্রচারে নামিয়ে দেওয়া এবং তার পর এই পোস্টাল ব‍্যালটগুছিয়ে রাখার অজুহাতে বিজেপির লোকজন কে নিয়ে স্ট্র রুম খোলা। কতগুলো ইভিএম এখনো অবধি ট‍্যাম্পারিং করা হলো তা অবশ্য ইলেকশন কমিশনের বিবৃতি থেকে জানা যায় নি‌ ।
 
আমার একাংশ বামপন্থী বন্ধু এখনো ভাবছেন এই লড়াইটা ইসি ভার্সাস পিসি। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। লড়াইটা বাংলার জনগণের বিরুদ্ধে, সমগ্ৰ ভারতের জনতার বিরুদ্ধে হিংস্র স্বৈরাচারী হিন্দুত্ববাদী বিজেপি আর এস এস-এর। নরেন্দ্র মোদির  পোষা ইলেকশন কমিশন এখানে নিমিত্ত মাত্র।
 
সুতরাং, পরিস্থিতি যথেষ্ট জটিল। 
 
নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রহসনে পরিণত হয়েছে তখনই যখন ভোটার তালিকায় ৬৪ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দেওয়ার পরে নির্বাচন কমিশন কোনো কারণ ছাড়া, সভ‍্যজগতে গ্রহণযোগ্য কোনো যুক্তি ছাড়া, দৃষ্টান্ত বিহীন এবং অভূতপূর্বভাবে লজিক্যাল ডিসক্রেপেন্সি নাম দিয়ে একটা ক‍্যাটাগরি তৈরি করে (যা ভারতের অন্য কোনো রাজ‍্যে হয়নি) ভোটার তালিকা নতুন করে আরো ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ দিলো। পৃথিবীর ইতিহাসে, সম্ভবতঃ এই প্রথম, অনায়াসে, এবং নির্লজ্জভাবে কারচুপিকে (ডিসক্রেপেন্সি) যুক্তিপূর্ণ(লজিক্যাল) বলে বর্বরতার বিজয়কেতন ওড়ালো কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কোনো বিধিবদ্ধ গণতান্ত্রিক সংস্থা। এই নির্বাচনকে মুখরোচক কুনাট‍্যরঙ্গে রূপান্তরিত করার ক্ষেত্রে এ হলো সাম্প্রতিক সময়ের প্রথম পদক্ষেপ।
 
এই নির্বাচনকে , আশ্চর্যজনকভাবে, আরো বেশি উপভোগ্য প্রহসনে রূপান্তরিত করলো ভারতের সর্বোচ্চ আদালত, সুপ্রিম কোর্ট। তারা নিশ্চিন্তে এই বিপুল সংখ্যক, সব মিলিয়ে আনুমানিক পঞ্চাশ লক্ষ নাগরিকের নাগরিক অধিকার, সরকার গঠনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায়  অংশ নেওয়ার বুনিয়াদি অধিকারকে পায়ের তলায় পিষে দিলেন। মোটের উপর মহামান্য বিচারপতিরা যা বললেন তার সারকথা হলো: কেন সবাইকেই ভোট দিতে হবে নাকি? যদিও ঐ কথাটি সোজা বলা হয়নি, ভদ্রজনোচিত ঢাকনা লাগানো ভাষায় বলা হয়েছে : কেন, কোনো নাগরিক এবার ভোট দিতে পারছে না তো কী হয়েছে, পরেই বার ভোট দেবে। এই আদালত একের পর এক রায় দানের মাধ্যমে ইলেকশন কমিশনের প্রতিটি অগণতান্ত্রিক ও বর্বর পদক্ষেপকে হোয়াইটওয়াশ করে দিয়েছেন। ভারতের গণতন্ত্রকে অন্তর্বাসহীনভাবে উলঙ্গ করার ক্ষেত্রে এ হলো দ্বিতীয় পদক্ষেপ।
সংবাদ মাধ্যম জঘন্য ভূমিকা পালন করলো। সারা বাংলা রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশীতে ভরে গেছে। টিভি চ‍্যানেলগুলি ফেক ভিডিও প্রচার করে দেখাতে লাগলো, সল্টলেকের বস্তি ফাঁকা হয়ে গেছে, বিরাটী থেকে বনগাঁ দলে দলে রোহিঙ্গা দৌড়ে পালাচ্ছে। সীমান্তে নাকি লক্ষা লক্ষ অনুপ্রবেশকারী ভিড় করে বাজার বসিয়ে দিয়েছে আর বিএসএফ এই অনুপ্রবেশকারীদের জেলে না ভরে জামাই আদর করে বাংলাদেশে পার করে দিচ্ছে। হিংস্রতায় ভরা এই মিথ্যা প্রচারে ফের টার্গেট করা হলো মুসলমান জনগোষ্ঠীকে। পশ্চিম বঙ্গের ভদ্রলোক সম্প্রদায় এই মিথ্যা প্রচার আকন্ঠ ভোজন করলেন , শারদীয়া সংখ্যার বেসিনভরানো সাহিত্যিক বললেন, বাপরে বাপ, ডেমোগ্রাফি চেঞ্জ হয়ে যাচি। ঐ যে লোকটা শব্জি বেচছে ওতো রোহিঙ্গা, ঐ যে লোকটা হোটেলে খাবার দিচ্ছে ও তো সন্ত্রাসবাদী। 
এই সবকিছুই ঘটছিলো আমাদের, বিবেকবান বামপন্থীদের চোখের সামনে। কিন্তু তৃণমূলসর্বস্ব  জগতে আমাদের চোখ এতোটাই নিবদ্ধ ছিলো, আমরা  এস আই আর এর বর্বরতা দেখতে পাইনি। আমরা এতোটাই কান খাড়া করে তৃণমূল আর বিজেপির সেটিং এর শব্দ শুনছিলাম, নাগরিক অধিকার লুঠ হয়ে যাওয়া নাগরিকদের রোদন ও আর্তনাদ আমরা শুনতে পাইনি। আমরা ইলেকশন কমিশনের হামলাকে আমরা দুহাত তুলে সমর্থন করছিলাম। বেশ হচ্ছে, হোক না। ভুয়ো ভোটার বাদ দিয়ে শুদ্ধ ভোটার তালিকা তৈরি হোক, আমাদের সুবিধা হবে।  যারা প্রতি বাদ করছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে আমরা  বলছিলাম, অযথা আতঙ্ক ছড়াবেন না।  
 
হিন্দুত্ববাদের উইপোকা যখন একটু একটু গণতন্ত্রের প্রতিটি স্তম্ভকে উপড়ে ফেলছে (স্তম্ভ বলতে বুঝছি, গণতন্ত্র ও সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ বিচার ব‍্যবস্থা, সমস্ত সর্বসাধারণ নাগরিকের অংশগ্রহণে এবং নিরপেক্ষ সংস্থার তত্ত্বাবধানে নির্বাচন, জাগরুক সংবাদ মাধ্যম এবং যুক্তি, স্বচ্ছতা এবং দায়বদ্ধতার উপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় প্রশাসন) তখন আমরা চোখ দিয়ে শুনছিলাম আর কান দিয়ে দেখছিলাম। যারা ফ‍্যাসিবাদের বিপুল বিপদের ব‍্যাপারে সতর্ক করছিলেন তাদের কে কখনো আমরা ধমকেছি, বলেছি, ফ‍্যাসিবাদের বিপদকে অতিরঞ্জিত করবেন না, কখনো বা তাদের চটিচাটা বলে গাল দিয়েছি।
 
আর এখন কী অবস্থা?
 
"পাথর আমি নিজেই তুলেছি বুকে আজ আর নামাতে পারি না"
0 Comments

Post Comment