যে মেঘের তৃষ্ণা আছে
আমরা ভুলে গেছি। আমরা ভুলে গেছি যে প্রতিটি শব্দের পিছনে জল আছে। প্রতিটি ছবির পিছনে জল আছে। প্রতিটি মুহূর্তের পিছনে জল আছে। আমরা যখন হোয়াটসঅ্যাপে 'হাই' লিখি, তখন পৃথিবীর কোনো না কোনো প্রান্তে জল ফুটছে। আমরা যখন ইউটিউবে ভিডিও দেখি, তখন কোনো না কোনো শহরের ভূগর্ভ শুকিয়ে যাচ্ছে। আমরা যখন চ্যাটজিপিটি-কে প্রশ্ন করি, তখন কোনো না কোনো নদীর তলদেশ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে।
ইন্টারনেটকে বলা হয় মেঘ। মেঘের রাজ্য। ভার্চুয়াল দুনিয়া। এই মেঘের কোনো দেশ নেই, কোনো সীমানা নেই, কোনো ধর্ম নেই, কোনো বর্ণ নেই। এই মেঘ শুধুই শুভ্র, শুধুই সুন্দর, শুধুই অনন্ত। এই মিথ আমাদের বলা হয়েছে বারবার। টেক কোম্পানিগুলো এই মিথ তৈরি করেছে। সরকার এই মিথ পুষেছে। আমরা এই মিথ কিনেছি।
কিন্তু মেঘের তৃষ্ণা আছে। মেঘের ক্ষুধা আছে। মেঘের দাঁত আছে। মেঘের পেট আছে। আর সেই পেট ভরতে লাগে রক্ত-মাংসের মানুষের মতো অঢেল জল, অফুরন্ত বিদ্যুৎ, অকল্পনীয় শ্রম।
এই লেখা সেই মেঘের গল্প। যে মেঘ ভারতের মাটিতে নেমে এসেছে। যে মেঘ ভারতের জল খাচ্ছে। যে মেঘ ভারতের বিদ্যুৎ খাচ্ছে। যে মেঘ ভারতের মানুষের শ্রম খাচ্ছে। আর আমরা সবাই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছি এই মেঘের দিকে, জানতেও পারছি না যে এই মেঘের পেটের ভিতর আমাদের ভবিষ্যৎ হজম হয়ে যাচ্ছে।
প্রথম খণ্ড: ১৮৯৪ সালের সেই অমোঘ আইন
অধ্যায় ১: একটা আইনের জন্ম
১৮৯৪ সাল। ভারত তখন ব্রিটিশ শাসনের অধীনে। লন্ডনে বসে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতারা একটা আইন তৈরি করছেন, যা ভারতের ভূগর্ভস্থ জলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তাদের ধারণা ছিল না যে তাঁরা ১৩০ বছর পরের ভারতের ভাগ্য লিখছেন। তাদের ধারণা ছিল না যে তাঁদের লেখা আইন একদিন বিশ্বের সবচেয়ে বড় টেক কোম্পানিগুলোর হাতে অস্ত্র হয়ে উঠবে।
আইনটা খুব সহজ ভাষায় লেখা। খুব ব্রিটিশ স্টাইলে। খুব ক্লিয়ার। "যার জমি, তার নিচের জলও তার।"
১৮৯৪ সালে এই আইনের কোনো সমস্যা ছিল না। তখন জমির নিচের জল ব্যবহার করত জমির মালিক। কৃষক। জমিদার। তাঁদের প্রয়োজন ছিল সেচের জন্য, গৃহস্থালির জন্য, গোয়ালের জন্য। জল ছিল স্থানীয়, ব্যবহার ছিল স্থানীয়, প্রভাব ছিল স্থানীয়।
১৮৯৪ সালে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে একদিন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কোম্পানিগুলো এসে ভারতের মাটিতে বিশাল বিল্ডিং বানাবে। কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে সেই বিল্ডিং ঠান্ডা রাখতে লাগবে অকল্পনীয় পরিমাণ জল। কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে জল হয়ে উঠবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি সম্পদ। কেউ কল্পনা করতে পারেনি যে জল নিয়ে যুদ্ধ হবে।
কিন্তু আইন থেকে গেল। ব্রিটিশরা চলে গেল ১৯৪৭ সালে। স্বাধীন ভারত এল। সংবিধান লেখা হল। নতুন আইন তৈরি হল। পুরোনো আইন বদলানো হল। কিন্তু ১৮৯৪ সালের এই আইন বদলানো হল না।
কেন?
অধ্যায় ২: কেন বদলানো হল না সেই আইন?
এই প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই। কিছু ঐতিহাসিক বলেন, কৃষকদের কথা ভেবে এই আইন রাখা হয়েছিল। কৃষক যাতে নিজের জমির জল নিজে ব্যবহার করতে পারে, তার জন্য। কেউ বলেন, তখন ভাবা যায়নি যে এই আইন নিয়ে কোনো সমস্যা হবে। কেউ বলেন, অলসতার জন্য। কেউ বলেন, অজ্ঞতার জন্য। কেউ বলেন, রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাবে।
কিন্তু যে কারণেই হোক, আইনটা টিকে গেল। টিকে গিয়ে একদিন বিপদ ডেকে আনল।
আইনটা এখনও বলছে, যদি তুমি কোনো জমি কেনো, তাহলে সেই জমির ওপরের আকাশ তোমার, সেই জমির নিচের মাটি তোমার, সেই জমির নিচের জলও তোমার। সরকারের কিছু বলার নেই। প্রতিবেশীর কিছু বলার নেই। সমাজের কিছু বলার নেই।
এখন ভাবুন, অ্যামাজন যদি হায়দ্রাবাদের আউটস্কার্টে ১০০ একর জমি কেনে, তাহলে সেই ১০০ একরের নিচে যত জল আছে, সব আইনত অ্যামাজনের। অ্যামাজন সেটা তুলতে পারে, ব্যবহার করতে পারে, নিঃশেষ করতে পারে। কাউকে জিজ্ঞেস করতে হবে না। কারও কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে না।
এই হলো ১৮৯৪ সালের আইনের মর্মকথা।
অধ্যায় ৩: কৃষকের জল কীভাবে কর্পোরেটের সম্পদ হলো?
এই আইন যখন তৈরি হয়, তখন কৃষক ছিল কেন্দ্রীয় চরিত্র। কৃষকের জমি, কৃষকের জল। ব্রিটিশরা চেয়েছিল জমির মালিকানা স্পষ্ট হোক, যাতে রাজস্ব আদায় সহজ হয়। জলের মালিকানা তখন গৌণ বিষয় ছিল।
কিন্তু সময় বদলাল। কৃষকের জমি কমতে লাগল। কর্পোরেটের জমি বাড়তে লাগল। শিল্পায়ন বাড়ল। নগরায়ণ বাড়ল। জমির মালিকানা বদলাতে লাগল। কিন্তু আইন বদলাল না।
ফলে একসময় দেখা গেল, যে আইন কৃষকের জন্য লেখা হয়েছিল, সেই আইন এখন কাজ করছে কর্পোরেটের জন্য। যে আইন সেচের সুবিধার জন্য ছিল, সেই আইন এখন ডেটা সেন্টারের সুবিধার জন্য কাজ করছে। যে আইন গরিবের কথা ভেবে রাখা হয়েছিল, সেই আইন এখন ধনীদের সম্পদ বাড়াচ্ছে।
এটা কোনো ষড়যন্ত্র নয়। এটা একটা সিস্টেমের স্বাভাবিক বিবর্তন। একটা আইন তৈরি হয় একটা সময়ে, একটা উদ্দেশ্যে। সময় বদলায়, উদ্দেশ্য বদলায়, পরিস্থিতি বদলায়। কিন্তু আইন বদলায় না। আইন বদলাতে অনেক সময় লাগে, অনেক শক্তি লাগে, অনেক রাজনৈতিক ইচ্ছা লাগে। আর সেই রাজনৈতিক ইচ্ছার অভাবে আইন থেকে যায়। থেকে থেকে একদিন ভয়ংকর রূপ নেয়।
১৮৯৪ সালের আইন এখন ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
দ্বিতীয় খণ্ড: তিনটি শহরের করুণ ইতিবৃত্ত
অধ্যায় ৪: হায়দ্রাবাদ - সতর্কবার্তা যেটা কেউ শোনেনি
২০১১ সাল। হায়দ্রাবাদ তখন আইটি বিপ্লবে মত্ত। সাইবারাবাদে [সাইবার আরাবাদ(ফার্সি প্রত্যয় যার অর্থ “স্থান” বা অঞ্চল)-এর সমন্বয়ে গঠিত। এটি মূলত কল্পবিজ্ঞান ও সামাজিক ভবিষ্যৎবাদী ধারণায় ব্যবহৃত একটি পরিভাষা, যা এমন একটি ভবিষ্যতের সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নির্দেশ করে যেখানে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তা এবং সাইবার প্রযুক্তি মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে।] নতুন নতুন বিল্ডিং উঠছে। মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যামাজন, সবাই এসেছে। চাকরি হচ্ছে। টাকা আসছে। অর্থনীতি বাড়ছে। সবাই খুশি।
কিন্তু ২০১১ সালেই কেন্দ্রীয় ভূগর্ভস্থ জল বোর্ড একটা সতর্কবার্তা দিয়েছিল। সেটা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। সতর্কবার্তাটা বলছিল, হায়দ্রাবাদের জলস্তর 'ওভার-এক্সপ্লয়টেড' পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মানে, যে পরিমাণ জল তোলা হচ্ছে, প্রকৃতি যে পরিমাণ জল ফিরিয়ে দিচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি। মানে, জল ফুরিয়ে আসছে।
এই সতর্কবার্তা কে নিয়েছিল গুরুত্বের সঙ্গে? কেউ না। সংবাদমাধ্যমে খবর হয়েছিল কয়েক লাইন। সরকার কিছু করেনি। কোম্পানিগুলো কিছু করেনি। মানুষ কিছু জানতে পারেনি।
২০২৬ সাল। পনেরো বছর কেটে গেছে। হায়দ্রাবাদে এখন আরও ডেটা সেন্টার হয়েছে। জল আরও নিচে নেমে গেছে। এখন জল তুলতে হলে গভীর থেকে গভীরতর কূপ খুঁড়তে হয়। বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে। জলের গুণগত মান কমেছে। কিন্তু কে থামায়? আইন তো ১৮৯৪ সালের, তাই জল তোলার অধিকার আছে।
হায়দ্রাবাদের এক কৃষকের কথা বলি। নাম রাজু। বয়স ৫৫। হায়দ্রাবাদ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে তার পাঁচ একর জমি ছিল। ২০১০ সালে তার কূপে জল ছিল ৪০ ফুট নিচে। ২০২০ সালে গিয়ে দেখে, জল ১২০ ফুট নিচে। এখন কূপ প্রায় শুকিয়ে গেছে। সে জমি বিক্রি করে দিয়েছে। এখন সে ওই এলাকারই একটা ডেটা সেন্টারে নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি করে। মাসে বারো হাজার টাকা বেতন। তার ছেলে আইটি কোম্পানিতে চাকরি করে। ছেলে গর্বিত। বাবা নীরব।
রাজু জানে না, যে ডেটা সেন্টারে সে পাহারা দেয়, সেই ডেটা সেন্টারের জল খরচের জন্যই তার কূপ শুকিয়ে গেছে। সে জানে না ১৮৯৪ সালের আইনের কথা। সে জানে না, তার নিজের জমির জল অন্য কেউ নিয়ে গেছে। সে শুধু জানে, জল নেই। ফসল নেই। জমি নেই।
অধ্যায় ৫: পুনে, হিঞ্জেওয়াড়ি - পাঁচ বছরে ১২ মিটার নিচে
পুনের কাছে হিঞ্জেওয়াড়ি। একসময় ছিল শান্ত গ্রাম। ধানের জমি। আম গাছ। মাটি উর্বর। জল সহজলভ্য। ২০০০ সালের দিকে এখানে আইটি পার্ক এল। ইনফোসিস এল। টেক মহিন্দ্রা এল। আরও অনেক কোম্পানি এল। বিল্ডিং উঠল। রাস্তা হল। লোক এল। দোকান এল। মল এল। হোটেল এল।
পাঁচ বছরের মধ্যে কী হল?
জলস্তর ১২ মিটার নিচে নেমে গেল। বারো মিটার। একটা প্রায় চারতলা বিল্ডিংয়ের সমান গভীরতা। কল্পনা করুন, আপনার বাড়ির কুয়ো থেকে জল তুলতে হলে আপনাকে এখন চারতলা বিল্ডিংয়ের মাথা থেকে দড়ি ফেলে জল তুলতে হবে।
গ্রামের কৃষকেরা প্রথমে বুঝতে পারেনি কী হচ্ছে। তারা ভেবেছিল, বৃষ্টি কম হয়েছে। পরের বছর আরও কম। তারপর বুঝল, ব্যাপারটা অন্যরকম। ওপারে যে বিশাল বিল্ডিংগুলো উঠেছে, তাদের ভিতর থেকে দিনরাত শব্দ হচ্ছে। সেই শব্দের মানে তারা বুঝতে পারেনি। শুধু দেখেছে, তাদের কুয়োর জল কমছে। তাদের পুকুরের জল কমছে। তাদের জমি ফাটছে।
২০২৫ সালে হিঞ্জেওয়াড়ির এক বৃদ্ধ কৃষক বলছিলেন, "আমার বাপ-দাদারা এই জমিতে চাষ করতেন। তাঁদের সময়ে হাত দিলেই জল পেতেন। এখন ২০০ ফুট নিচে গিয়েও জল পাই না। ডেটা সেন্টারগুলো রাত-দিন চলে। আমরা রাত-দিন জেগে থাকি।"
ডেটা সেন্টার রাত-দিন চলে। কৃষকেরা রাত-দিন জেগে থাকে। একই সময়, একই জায়গা, দুটো ভিন্ন বাস্তবতা।
অধ্যায় ৬: বেঙ্গালুরু, হোয়াইটফিল্ড - ভারতের সিলিকন ভ্যালির জলকষ্ট
বেঙ্গালুরুকে বলা হয় ভারতের সিলিকন ভ্যালি। এখানে আছে হাজার হাজার আইটি কোম্পানি। আছে লক্ষ লক্ষ আইটি কর্মী। আছে অসংখ্য ডেটা সেন্টার। আর আছে ২০২৩ সালের একটা পরিসংখ্যান—হোয়াইটফিল্ড এলাকায় ৪০% মানুষ মিউনিসিপ্যাল জল পাচ্ছে না।
মিউনিসিপ্যাল জল মানে সরকারি জল সংযোগ। সরকারি জল সংযোগ না থাকার মানে, জল কিনতে হবে বেসরকারি ট্যাঙ্কার থেকে। বেসরকারি ট্যাঙ্কারের জল অনেক দামি। ২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুতে জলের ট্যাঙ্কারের দাম বেড়ে গিয়েছিল দ্বিগুণ। সাধারণ মানুষকে জলের জন্য অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছিল।
কিন্তু ডেটা সেন্টারগুলো? ওরা তো জরুরি পরিষেবা। জরুরি পরিষেবা মানে হাসপাতাল, ফায়ার ব্রিগেড, পুলিশ স্টেশন—এদের মতো। ডেটা সেন্টার এখন সেই তালিকায়। তাই জল সংকটের সময়েও তাদের জল দেওয়া বন্ধ হয় না। তারা ২৪ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন জল পায়।
২০২৩ সালে বেঙ্গালুরুর এক গৃহবধূ বলছিলেন, "আমাদের বাড়িতে তিন দিন পর পর জল আসে। ট্যাঙ্কার কিনতে হয় ১০০০ টাকা দিয়ে। অথচ ওই দিকে দেখুন, ওই বিল্ডিংটায় দিনরাত জল পড়ছে। ওরা কী করে?"
ওই বিল্ডিংটা ছিল একটা ডেটা সেন্টার। আর ১৮৯৪ সালের আইন।
তৃতীয় খণ্ড: ডেটা সেন্টারের শারীরস্থান ও শারীরতত্ত্ব (মানচিত্র এবং সেই মানচিত্রে চলা গতিবিধি ও কার্যকলাপ)
অধ্যায় ৭: ডেটা সেন্টার দেখতে কেমন?
আপনি যদি কোনো ডেটা সেন্টারের সামনে দাঁড়ান, আপনি কিছু বুঝতে পারবেন না। দেখতে একটা বড় গুদামের মতো। চারপাশে উঁচু দেয়াল। কাঁটাতারের বেড়া। সিসিটিভি ক্যামেরা। নিরাপত্তারক্ষী। গেট। ভিতরে কী আছে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।
ভিতরে ঢুকলে দেখা যায় বিশাল বিশাল হলঘর। সারি সারি র্যাক। প্রতিটা র্যাকে বসানো অসংখ্য সার্ভার। সার্ভারগুলো ছোট ছোট বাক্সের মতো। ভিতরে আছে হার্ড ডিস্ক, প্রসেসর, মেমোরি চিপ। তারের জটলা। এলইডি লাইট জ্বলছে। ফ্যান চলছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চলছে। আওয়াজ হচ্ছে। গরম লাগছে।
এই সার্ভারগুলো ২৪ ঘন্টা, ৩৬৫ দিন জ্বলে। এরা কখনো ঘুমায় না। কখনো বিশ্রাম নেয় না। কখনো ছুটি নেয় না। এরা সব সময় হিসেব করছে, ডেটা পাঠাচ্ছে, ডেটা নিচ্ছে, ডেটা সংরক্ষণ করছে।
এই নিরন্তর কাজের ফলে এরা প্রচণ্ড গরম হয়। এত গরম যে সাধারণ তাপমাত্রায় রাখলে এরা গলে যেতে পারে। সার্কিট পুড়ে যেতে পারে। প্রসেসর অকেজো হয়ে যেতে পারে। সব ডেটা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তাই এদের ঠান্ডা রাখতে হয়। সারাক্ষণ ঠান্ডা রাখতে হয়। আর ঠান্ডা রাখার সবচেয়ে সস্তা উপায় হল জল।
অধ্যায় ৮: জল কীভাবে ঠান্ডা করে সার্ভার?
একটা পদ্ধতি আছে, নাম ইভাপোরেটিভ কুলিং। পদ্ধতিটা খুব সহজ। গরম পৃষ্ঠের ওপর জল ছিটানো হয়। জল গরম হয়ে বাষ্প হয়। বাষ্প হতে গেলে তাপ( লীন তাপ)লাগে। সেই তাপ নেয় গরম পৃষ্ঠ থেকে। ফলে পৃষ্ঠ ঠান্ডা হয়।
ডেটা সেন্টারে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় বিরাট আকারে। হাজার হাজার সার্ভারের ওপর জল ছিটানো হয়। জল বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। সার্ভার ঠান্ডা হয়।
কিন্তু এতে ব্যবহৃত জলের প্রায় ৮০ শতাংশই বাষ্প হয়ে উড়ে যায়। ফিরিয়ে আনা যায় না। পুনর্ব্যবহার করা যায় না। সেই জল চলে যায় বায়ুমণ্ডলে। মেঘ হয়ে যায়। সেই মেঘ আবার বৃষ্টি হয়ে ফিরবে, কিন্তু এখানে নয়, অন্য কোথাও। হয়তো অন্য দেশে। হয়তো অন্য মহাদেশে। বা কোথায় কেউ জানেনা।
অধ্যায় ৯: কেন বিশুদ্ধ জলই প্রয়োজন?
এখন প্রশ্ন হল, কেন সাধারণ জল নয়, বিশুদ্ধ জলই প্রয়োজন? পুকুরের জল, নদীর জল, বৃষ্টির জল—ওগুলো দিয়ে কাজ চলে না?
চলে না। কারণ সাধারণ জলে দ্রবীভূত খনিজ পদার্থ থাকে। ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম—এসব থাকে। এই খনিজগুলো জলের সঙ্গে থাকে। যখন জল বাষ্প হয়, তখন খনিজগুলো থেকে যায়। জমা হতে থাকে। একসময় শক্ত আস্তরণ তৈরি হয়। তাকে বলে লাইমস্কেল।
এই লাইমস্কেল একটা পুরু কম্বলের মতো কাজ করে। তাপ আটকে রাখে। ফলে ঠান্ডা করার যন্ত্রগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যায়। বেশি বিদ্যুৎ খরচ হয়। যন্ত্র নষ্ট হয়। মেরামত খরচ বেড়ে যায়।
তাই ডেটা সেন্টারগুলো চায় বিশুদ্ধ জল। যে জলে কোনো খনিজ নেই। যে জল বিশুদ্ধ H2O। যে জল মানুষও পান করতে পারে। সেই জল তারা সার্ভার ঠান্ডা করতে ব্যবহার করে।
অর্থাৎ, আপনি যখন মিনারেল ওয়াটার কিনে পান করেন, আপনি যে মানের জল পান করেন, প্রায় সেই একই মানের জল চলে যাচ্ছে ডেটা সেন্টারের সার্ভার ঠান্ডা করতে।
অধ্যায় ১০: বিদ্যুতের অদৃশ্য পিপাসা
শুধু জল নয়, ডেটা সেন্টারের আরেক বড় খোরাক হল বিদ্যুৎ।
একটা ডেটা সেন্টারে কয়েক হাজার সার্ভার ২৪ ঘন্টা চলে। তাদের সঙ্গে চলে কুলিং সিস্টেম, লাইটিং, সিকিউরিটি সিস্টেম, নেটওয়ার্কিং ইকুইপমেন্ট—সব মিলিয়ে বিপুল বিদ্যুৎ খরচ হয়।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (আইইএ) মতে, ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য ভারতের বিদ্যুৎ ব্যবহার ২০২৪ সালে ছিল দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ০.৫ থেকে ১ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা বেড়ে হবে ১ থেকে ২ শতাংশ। সংখ্যায় বললে, ১০-১৫ টেরাওয়াট আওয়ার।
এই ২ শতাংশ খুব ছোট মনে হতে পারে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই ২ শতাংশের জন্য সরকার নিশ্চিত করছে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ। এই ২ শতাংশ কখনো কমে না, কখনো বন্ধ হয় না, কখনো লোডশেডিং হয় না। অথচ একই দেশের গ্রামগুলোতে এখনও লোডশেডিং হয়। এখনও ভোল্টেজ কমে যায়। এখনও বিদ্যুৎ আসে-যায়।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিস-এর দক্ষিণ এশিয়া পরিচালক বিভূতি গর্গ সতর্ক করেন, এর অর্থ হতে পারে জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি। কারণ বর্তমানে এমন কোনো নিয়ম নেই যা ডেটা সেন্টারগুলোকে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করতে বাধ্য করে।
সুতরাং, ডেটা সেন্টার চাইলে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে পারে। কয়লা পোড়াতে পারে। কার্বন ছড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনে অবদান রাখতে পারে। কেউ বাধা দেবে না।
চতুর্থ খণ্ড: সংখ্যার আড়ালে বাস্তবতা
অধ্যায় ১১: অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৫-২৬-এর অধ্যায় ১৭
প্রতি বছর সরকার একটা অর্থনৈতিক সমীক্ষা প্রকাশ করে। সেটা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে আলোচনা হয়, বিতর্ক হয়, বিশ্লেষণ হয়। কিন্তু ২০২৫-২৬-এর সমীক্ষার ১৭ নম্বর অধ্যায়টা কেউ তেমন আলোচনা করেনি।
ওই অধ্যায়ে লেখা ছিল, একটি এআই ডেটা সেন্টার প্রতিদিন ২০ লক্ষ লিটার জল ব্যবহার করতে পারে।
২০ লক্ষ লিটার। হিসেব করি। এক পরিবার যদি দিনে ২০০ লিটার জল ব্যবহার করে (ভারতে গড় ব্যবহার তার চেয়ে কম), তাহলে ওই একটি ডেটা সেন্টারের জল দিয়ে ১০,০০০ পরিবার চলতে পারে। দশ হাজার পরিবার। একটা ছোট শহর।
এই জল যদি কৃষিতে ব্যবহার করা হতো, তাহলে কত জমিতে সেচ দেওয়া যেত? কত ফসল ফলানো যেত? কত কৃষকের মুখে হাসি ফোটানো যেত?
কিন্তু সেটা হচ্ছে না। সেই জল যাচ্ছে ডেটা সেন্টারে। সার্ভার ঠান্ডা করতে। আমাদের চ্যাটজিপিটি প্রশ্নের উত্তর দিতে। আমাদের ইনস্টাগ্রাম রিল দেখাতে। আমাদের ইউটিউব ভিডিও চালাতে।
অধ্যায় ১২: গুগলের ৬১০ কোটি গ্যালন
গুগল প্রতি বছর পরিবেশ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে একটা সংখ্যা আছে—৬১০ কোটি গ্যালন।
৬১০ কোটি গ্যালন বিশুদ্ধ জল গুগলের ডেটা সেন্টারগুলো ব্যবহার করেছে ২০২৩ সালে। আগের বছরের তুলনায় ১৭% বেশি।
এই পরিমাণ জল দিয়ে কী করা যেত? আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের ৪১টি গল্ফ কোর্সে এক বছর ধরে জলসেচ করা যেত। ৪১টি গল্ফ কোর্স। যেখানে ধনীরা গল্ফ খেলে। তাদের সবুজ ঘাসের জন্য জল।
ভারতের কথা চিন্তা করুন। এই জল দিয়ে কত শুকনো জমিতে ফসল ফলানো যেত? কত গ্রামে পানীয় জলের সংস্থান করা যেত? কত স্কুলে টয়লেট তৈরি করা যেত? কত হাসপাতালে জল সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত?
কিন্তু সেটা হচ্ছে না। গুগলের ডেটা সেন্টার জল খাচ্ছে। আর আমরা গুগল ব্যবহার করছি। আমরা নিজেরাই এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছি, না জেনে, না বুঝে।
অধ্যায় ১৩: ৭ হাজার ৬০০ মানুষের এক বছরের জল
এবিপি লাইভের একটা রিপোর্টে আরও বিস্তারিত হিসেব আছে। একটি মাঝারি সাইজের ডেটা সেন্টার বছরে প্রায় ৪১ কোটি ৬৪ লক্ষ লিটার জল ব্যবহার করে। এই জল অন্তত ৭ হাজার ৬০০ মানুষ এক বছর ধরে ব্যবহার করতে পারে।
৭ হাজার ৬০০ মানুষ। একটা ছোট শহরের জনসংখ্যা। একটা ব্লকের জনসংখ্যা। একটা থানার এলাকার জনসংখ্যা।
এই ৭ হাজার ৬০০ মানুষ যদি পাশের গ্রামে থাকেন, আর তাঁদের জল না থাকে, আর ডেটা সেন্টারে জল থাকে, তাহলে কী দাঁড়ায়? এটা কি ন্যায়বিচার? এটা কি সামাজিক ন্যায়? এটা কি কোনও উন্নয়নের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে?
অধ্যায় ১৪: ২০৩০ সালের পূর্বাভাস
এস অ্যান্ড পি-র গ্লোবাল একটা সমীক্ষা করেছে। তাদের পূর্বাভাস, এই দশকের মধ্যেই ভারতের ৬০-৮০ শতাংশ ডেটা সেন্টারকে সীমিত জল সরবরাহের চাপে পড়তে হবে।
মানে কী? যেসব এলাকায় ডেটা সেন্টার বসছে, সেখানেই জল সংকট আরও চরম আকার ধারণ করবে। ডেটা সেন্টার এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে জলের জন্য প্রতিযোগিতা হবে। সেই প্রতিযোগিতায় কে জিতবে? ডেটা সেন্টার। কারণ তারা জরুরি পরিষেবা। কারণ তাদের কাছে টাকা আছে। কারণ আইন তাদের পক্ষে।
২০৩০ সালের মধ্যে এই সংঘাত স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে তার আভাস মিলছে। বেঙ্গালুরুতে জলের ট্যাঙ্কার নিয়ে মারামারি হচ্ছে। হায়দ্রাবাদে কূপ খুঁড়তে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটছে। পুনেতে কৃষক আন্দোলন হচ্ছে। কিন্তু ডেটা সেন্টারগুলো চুপচাপ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের জল আসছে। তাদের বিদ্যুৎ আসছে। তাদের ব্যবসা চলছে।
পঞ্চম খণ্ড: উন্নয়নের নামে শোষণ
অধ্যায় ১৫: সস্তা ভারত, আকর্ষণীয় ভারত
কোটাক মিউচুয়াল ফান্ডের একটা রিপোর্ট বলছে, ভারতে ১ ওয়াটের ডেটা সেন্টার তৈরি করতে খরচ হয় মাত্র ৭ ডলার। জাপানে এই খরচ ১৪ ডলার। ব্রিটেনে ১১ ডলার। আমেরিকায় ১০ ডলার। শুধু চীন আমাদের চেয়ে কিছুটা পিছিয়ে, সেখানে খরচ ৬ ডলার।
কেন ভারত সস্তা? জমি সস্তা। নির্মাণ খরচ কম। শ্রম সস্তা। বিদ্যুৎ সস্তা। জল প্রায় বিনামূল্যে। নিয়ম-কানুন কম। আর সরকারি ভর্তুকি আছে।
তামিলনাড়ু ২০২১ সালে ডেটা সেন্টার নীতি এনে বিদ্যুতের ওপর ১০০ শতাংশ ভর্তুকি দিচ্ছে। মহারাষ্ট্র ২০২৩ সালে আজীবন বিদ্যুৎ ছাড় আর পাঁচ বছরের জন্য প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ভর্তুকির ঘোষণা দিয়েছে। উত্তরপ্রদেশ দিয়েছে ওপেন অ্যাক্সেস বিদ্যুৎ ট্রান্সমিশন চার্জে সম্পূর্ণ ছাড়। তেলেঙ্গানাও পিছিয়ে নেই, সৌর ও বায়ু শক্তির মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।
এই সব ছাড়ের অর্থ কী? সরকারি রাজস্ব কমছে। সরকারি কোষাগার ফাঁকা হচ্ছে। সেই ফাঁকা টাকা পূরণ করতে সাধারণ মানুষের ওপর কর বাড়ছে। বা পরিষেবা কমছে। বা উন্নয়ন ব্যয় কমছে।
অর্থাৎ, ডেটা সেন্টার কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ আরও দরিদ্র হচ্ছে।
অধ্যায় ১৬: আমেরিকা যেখানে থামে, ভারত সেখানে শুরু করে
আমেরিকার অ্যারিজোনা(Arizona)রাজ্য। মরুভূমি। সেখানে ডেটা সেন্টার বসানোর প্রস্তাব হলে স্থানীয় মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। তারা প্রতিবাদ করছে। তারা বলছে, আমাদের জল শেষ হয়ে যাবে। তারা মামলা করছে। তারা সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছে।
আয়ারল্যান্ডে ডেটা সেন্টারের প্রতিবাদ হচ্ছে জোরেশোরে। নেদারল্যান্ডসে ডেটা সেন্টার নির্মাণে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছিল। জার্মানির কিছু অঞ্চলে ডেটা সেন্টার বসতে দেওয়া হচ্ছে না। ফ্রান্সে কঠোর নিয়ম তৈরি করা হয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলো এখন বুঝতে পেরেছে ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব। তারা এখন সতর্ক হচ্ছে। তারা এখন নিয়ম কঠোর করছে। তারা এখন ডেটা সেন্টার কোম্পানিগুলোকে জবাবদিহি করতে বলছে।
আর ভারত? ভারত তখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ডেটা সেন্টার আনার জন্য। যেখানে পশ্চিমা দেশগুলো থামছে, সেখানে ভারত শুরু করছে। যেখানে তারা 'নো' বলছে, সেখানে ভারত বলছে 'কাম, কাম'।
এই নিয়ে একটা বিড়ম্বনা আছে। আমরা যাকে উন্নতি মনে করছি, সেটা হয়তো পশ্চিমা দেশগুলোর বর্জ্য গ্রহণ করছি। তারা যে প্রযুক্তি নিজেদের দেশে রাখতে চাইছে না, সেই প্রযুক্তি আমরা নিয়ে আসছি। তারা যে পরিবেশ দূষণ নিজেদের দেশে চায় না, সেই দূষণ আমরা নিচ্ছি।
অধ্যায় ১৭: কর্মসংস্থানের মিথ
ডেটা সেন্টার প্রকল্প ঘোষণা করার সময় একটা কথা বারবার বলা হয়—চাকরি হবে। প্রচুর চাকরি হবে। হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।
একটা ডেটা সেন্টার তৈরি হওয়ার পর সেখানে নিয়মিত কাজ করার জন্য মাত্র ২০ থেকে ১০০ জন মানুষের প্রয়োজন হয়। হ্যাঁ, যখন সেন্টারটা তৈরি করা হয়, তখন অনেক শ্রমিক লাগে। নির্মাণ শ্রমিক, ইলেকট্রিশিয়ান, প্লাম্বার, রাজমিস্ত্রি—তাঁরা কয়েক মাস বা কয়েক বছর কাজ পান। কিন্তু সেন্টার তৈরি হয়ে গেলে তাঁরা চলে যান। তখন শুরু হয় স্থায়ী কর্মীদের যুগ। আর সেই সংখ্যা খুবই কম।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ত্রিপুরায় এয়ারটেলের নতুন ডেটা সেন্টার প্রকল্পে প্রায় ২০০ জনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানানো হয়েছে। বিনিয়োগ ২০০ কোটি টাকা। ২০০ জন কর্মসংস্থান। প্রতি কোটি টাকা বিনিয়োগে একজন মানুষের কর্মসংস্থান।
এই হিসাবে, একই অর্থ যদি কোনো ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টরে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে কত চাকরি হতো? পোশাক শিল্পে? ইলেকট্রনিক্সে? খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে? সেখানে প্রতি কোটি টাকায় অনেক বেশি চাকরি হয়।
তাহলে ডেটা সেন্টারকে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে? কেন এত ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে? কেন এত জমি দেওয়া হচ্ছে? কেন এত জল দেওয়া হচ্ছে?
অধ্যায় ১৮: যেসব চাকরি হয়, সেগুলো কেমন?
ডেটা সেন্টারে যেসব চাকরি হয়, সেগুলোর বেশিরভাগই উচ্চ দক্ষতার। ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, ম্যানেজার—এদের জন্য। স্থানীয় সাধারণ মানুষের জন্য চাকরি বলতে নিরাপত্তারক্ষী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ক্যান্টিন কর্মী—এই কয়েকটা।
ইনফোসিসের একটা ডেটা সেন্টারে গিয়ে দেখুন। ভিতরে যারা কাজ করেন, তাঁরা অধিকাংশই বাইরে থেকে আসা, বড় শহর থেকে আসা, উচ্চ শিক্ষিত। আশপাশের গ্রামের মানুষ সেখানে কাজ পান না। পান শুধু সো- কল্ড নিচু পর্যায়ের কাজ।
এক নিরাপত্তারক্ষী বলছিলেন, "আমার ছেলে আইটি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ও চায় এই কোম্পানিতেই চাকরি করতে। কিন্তু ওকে ঢুকতে দেয় না। বলে, ওর স্কিল নেই। আমি ভাবি, এই বিল্ডিংয়ে আমার ছেলে ঢুকতে পারছে না, অথচ আমি এই বিল্ডিং পাহারা দিই।"
এই হলো ডেটা সেন্টারের কর্মসংস্থানের বাস্তবতা। সংখ্যায় কম, গুণগত মানে অসম, স্থানীয় মানুষের জন্য অধরা।
ষষ্ঠ খণ্ড: ডিজিটাল জমিদারির উত্থান
অধ্যায় ১৯: আদানি-আম্বানি ও ডেটা সেন্টারের নতুন দুনিয়া
ভারতে যখনই কোনো বড় ব্যবসার কথা ওঠে, তখনই দুটি নাম আসে—আদানি ও আম্বানি। ডেটা সেন্টারের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি। দিল্লিতে এআই ইমপ্যাক্ট সামিট। মঞ্চে মুকেশ আম্বানি। তিনি ঘোষণা করছেন, আগামী সাত বছরে এআই পরিকাঠামো ও এজ কম্পিউটিং-এ ১০ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে রিলায়েন্স।
তিনি বলছেন, "আমি ঘোষণা করতে চাই ভারতের এআই পরিকাঠামো তৈরিতে তুলনামূলক আরও বড় ভূমিকা পালন করবে রিলায়েন্স জিও। এটা কোনও জল্পনা নয়, কোনও নির্দিষ্ট আর্থিক লাভবানের জন্য নয়। এটা একটা এমন পরিকল্পনা যা আগামী ৬ দশকের জন্য অর্থনৈতিক মূল্য ও কৌশলগত স্থায়িত্ব বজায় রাখার জন্য তৈরি করা হবে।"
ইতিমধ্যে জামনগরে(গুজরাট) তারা একটা মাল্টি গিগাওয়াটের ডেটা সেন্টার তৈরি করেছে, যা এআই প্রযুক্তির কাজে ব্যবহার করা হবে।
অন্যদিকে আদানি গ্রুপ জানিয়েছে, ২০৩৫ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে নবায়নযোগ্য শক্তিচালিত এআই ডেটা সেন্টার তৈরি করবে তারা। ওই সভায় উপস্থিত জিৎ আদানি বলছেন, অন্য কোনও দেশের উপর নির্ভরশীল না থেকে ভারতের উচিত নিজেদের এআই ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরি করা।
আদানি ইতিমধ্যেই গুগলের সাথে হাত মিলিয়েছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপট্টনমে গুগলের এআই ডেটা সেন্টার প্রকল্পে ৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে আদানি গ্রুপ।
অধ্যায় ২০: ডিজিটাল জমিদারি কী?
এখন একটু গভীরে তাকাই। আদানি বা আম্বানি—কেউই কিন্তু নিজেদের কোনো বিশেষ এআই চিপ বা প্রসেসর তৈরি করছেন না। তাঁরা তৈরি করছেন না কোনো সফটওয়্যার। তাঁরা তৈরি করছেন না কোনো অ্যালগরিদম।
তাঁরা তৈরি করছেন জায়গা। বিল্ডিং। পরিকাঠামো। তাঁরা বিদ্যুৎ সংযোগ দিচ্ছেন। জল সংযোগ দিচ্ছেন। নিরাপত্তা দিচ্ছেন। তারপর গুগল বা মাইক্রোসফটের মতো বিদেশি কোম্পানিগুলো সেই পরিকাঠামো ভাড়া নিয়ে সেখানে নিজেদের সার্ভার বসাচ্ছে।
আদানি হচ্ছেন মালিক, গুগল হচ্ছেন ভাড়াটে। আদানি মাসে মাসে ভাড়া তুলছেন। গুগল ব্যবসা করছে। আদানির টাকা আসছে জমি ও পরিকাঠামো থেকে, প্রযুক্তি থেকে নয়।
এটাকে ডিজিটাল জমিদারি বলা যেতে পারে। জমিদার যেমন জমির মালিক হয়ে খাজনা তুলতেন, তেমনি আদানি-আম্বানিরা ডিজিটাল পরিকাঠামোর মালিক হয়ে ভাড়া তুলছেন। তাঁরা উৎপাদন করছেন না, তাঁরা শুধু মালিকানা তৈরি করছেন।
অধ্যায় ২১: মুকেশ আম্বানি ও জলের ব্যবসা
এখানে আরেকটা বিষয় আছে। মুকেশ আম্বানি একদিকে যেমন ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ করছেন, অন্যদিকে তিনি পানীয় জলের ব্যবসাতেও প্রবেশ করেছেন। রিলায়েন্স এখন বোতলবন্দি জল বাজারে এনেছে, বেশ কিছুদিন হলো।
একটা ছবি আঁকা যাক। ডেটা সেন্টার ভূগর্ভস্থ জল শেষ করে দিচ্ছে। সাধারণ মানুষের জলের সংকট বাড়ছে। তখন বাজারে আসছে বোতলবন্দি জল। সেই জল কিনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আর সেই জল বিক্রি করছে সেই কোম্পানি, যার ডেটা সেন্টার জল শেষ করছে।
এটা কোনো ষড়যন্ত্র তত্ত্ব নয়। এটা বাস্তব সম্ভাবনা। যখন সরকারি জল সরবরাহ ব্যাহত হবে, যখন কূপ শুকিয়ে যাবে, তখন বোতলবন্দি জলের বাজার বাড়বে। আর সেই বাজারের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় হবেন আম্বানি-আদানিরা।
জলশূন্য ডিজিটাল মানে শুধু ডেটা সেন্টারের জন্য জলশূন্য নয়। জলশূন্য ডিজিটাল মানে সাধারণ মানুষের জন্য জলশূন্য। আর জলশূন্য মানুষকে জল কিনতে হবে। আর জল বিক্রি হবে বড় কোম্পানির দ্বারা।
সপ্তম খণ্ড: অদৃশ্য শ্রম, অদৃশ্য যন্ত্রণা
অধ্যায় ২২: ডেটা অ্যানোটেশন কী?
এআই শেখে ডেটা থেকে। কিন্তু সেই ডেটা তৈরি হয় কীভাবে? কে শেখায় এআই-কে যে এটা বিড়াল, ওটা কুকুর? কে শেখায় যে এই বাক্যটা ইতিবাচক, ওই বাক্যটা নেতিবাচক? কে শেখায় যে এই ছবিটা সুন্দর, ওই ছবিটা আপত্তিকর?
উত্তর হল, মানুষ। হাজার হাজার মানুষ। তাঁরা সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে ছবি দেখেন, ভিডিও দেখেন, লেখা পড়েন। তাঁদের কাজ হল সেগুলোকে লেবেল দেওয়া, ক্যাটাগরাইজ করা, ট্যাগ করা। এই কাজের নাম ডেটা অ্যানোটেশন।
ভারতে এই ইন্ডাস্ট্রি এখন বিরাট আকার নিচ্ছে। তামিলনাড়ুর ছোট ছোট শহরে ডেটা অ্যানোটেশন সেন্টার গজিয়েছে। কর্ণাটকের গ্রামে গ্রামে এই কাজ ছড়িয়ে পড়ছে। উত্তরপ্রদেশের মফস্বলে মেয়েরা এই কাজ করছে।
বেতন? ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। শিক্ষাগত যোগ্যতা? গ্র্যাজুয়েট। কাজের চাপ? বেশি।
অধ্যায় ২৩: ৭০% নারী
এই ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৭০% কর্মীই নারী। কেন? কারণ কোম্পানিগুলো বলছে, নারীরা বেশি ধৈর্যশীল। নারীরা বেশি মনোযোগী। নারীরা কম বেতনে কাজ করে। নারীরা বিক্ষোভ করে না। নারীরা ইউনিয়ন করে না।
এই কাজকে বলা হয় 'হোয়াইট কলার ফ্যাক্টরি'। অফিসে বসে কাজ, কিন্তু ফ্যাক্টরির মতো শৃঙ্খলা। টার্গেট। সময় বাঁধা। ছুটি কম। কাজের চাপ বেশি।
বাড়ির কাছের অফিস, ফ্লেক্সিবল টাইমিং—এই সব টোপ দিয়ে শিক্ষিত কিন্তু প্রান্তিক নারীদের এই কাজে আনা হচ্ছে। তারা আসছে। কাজ করছে। বেতন নিচ্ছে। পরিবার চালাচ্ছে। কিন্তু তার মূল্য দিচ্ছে নিজের মানসিক স্বাস্থ্য দিয়ে।
অধ্যায় ২৪: বিষাক্ত কন্টেন্টের ভয়াবহতা
এখন সবচেয়ে কঠিন অংশে আসি। গার্ডিয়ান পত্রিকায় সম্প্রতি একটা চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট বেরিয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, এআই-কে শেখাতে হয় কোনটা খারাপ কন্টেন্ট, কোনটা আপত্তিকর, কোনটা হিংসাত্মক, কোনটা যৌন নিপীড়নমূলক। এই শেখানোর জন্য দরকার মানুষ, যারা এই কন্টেন্টগুলো দেখবে, বিশ্লেষণ করবে, লেবেল দেবে।
এই কাজ করা নারীদের প্রতিদিন গড়ে ৮০০টি অত্যন্ত কুরুচিকর, যৌন হিংসাত্মক, বীভৎস ভিডিও বা ছবি দেখতে হয়। ৮০০টি। প্রতিদিন।
ধরুন আপনি একটা ভিডিও দেখছেন। দেখতে খারাপ লাগলো, বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু এদের বন্ধ করার উপায় নেই। এদের দেখতেই হবে। লেবেল দিতেই হবে। টার্গেট পূরণ করতেই হবে।
সারাদিন এই ধরনের কন্টেন্ট দেখার পর কী হয়? ঘুম আসে না। খাবার ইচ্ছে করে না। মানুষকে বিশ্বাস করা যায় না। সম্পর্কে সমস্যা হয়। দুঃস্বপ্ন আসে। আতঙ্ক হয়। বিষণ্নতা আসে।
কিন্তু কোম্পানি কি কিছু করে? না। কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নেই। কোনো কাউন্সেলিং নেই। কোনো ছুটি নেই। শুধু কাজ, কাজ, কাজ।
একজন ডেটা অ্যানোটেশন কর্মী বলছিলেন, "আমি প্রতিদিন দেখি মানুষ মানুষকে কী করছে। এরপর আমি আমার বাচ্চাদের নিয়ে ভয় পাই। আমি আমার স্বামীকে নিয়ে ভয় পাই। আমি রাস্তায় বেরোতে ভয় পাই। কিন্তু চাকরি ছাড়তে পারি না। টাকা লাগে।"
এই নারীরা এআই-এর পেছনের অদৃশ্য শ্রমিক। তাঁরা এআই-কে শেখাচ্ছেন। তাঁরা এআই-কে সভ্য করছেন। তাঁরা এআই-কে ভালো করছেন। কিন্তু তাঁদের কেউ দেখছে না। তাঁদের কষ্ট কেউ জানছে না। তাঁদের জন্য কেউ কিছু করছে না।
অধ্যায় ২৫: এটা কি ডিজিটাল দাসত্ব?
প্রশ্ন উঠতেই পারে। এটা কি ডিজিটাল দাসত্বের একটা রূপ?
দাসত্ব মানে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা নয়। দাসত্ব মানে কাজ করানো, মজুরি কম দেওয়া, স্বাস্থ্যের কথা না ভাবা, ভবিষ্যতের কথা না ভাবা। দাসত্ব মানে মানুষকে যন্ত্রের মতো ব্যবহার করা।
এই নারীদের সঙ্গে কি তাই হচ্ছে না? তাঁদের দিনরাত বসিয়ে রাখা হচ্ছে বিষাক্ত কন্টেন্ট দেখানোর জন্য। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট হচ্ছে। তাঁদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাঁদের কোনো নিরাপত্তা নেই। তাঁদের কোনো ইউনিয়ন নেই। তাঁদের কেউ শোনে না।
একদিকে এআই বিলিয়নিয়াররা বড় বড় কথা বলছেন। অন্যদিকে আমাদের দেশের হাজার হাজার নারী খুব কম বেতনে নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য বাজি রেখে এই প্রযুক্তির আবর্জনা পরিষ্কার করে চলেছেন।
এটাই কি ডিজিটাল দাসত্বের নতুন রূপ নয়?
অষ্টম খণ্ড: বিকল্প পথের সন্ধানে
অধ্যায় ২৬: বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
এত সব সমস্যা দেখার পর প্রশ্ন জাগে, এর সমাধান কী? বিশেষজ্ঞরা কিছু পরামর্শ দিয়েছেন।
প্রথম, জলের পুনর্ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা। বেঙ্গালুরুর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্সের বিশেষজ্ঞ প্রবীণ রামমূর্তি বলেন, ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করার জন্য অবশ্যই অ-পানীয় বা পরিশোধিত বর্জ্য জল ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। যে জল পান করার যোগ্য নয়, সেই জল দিয়ে সার্ভার ঠান্ডা করা যেতে পারে। এতে পানীয় জল বেঁচে যাবে।
দ্বিতীয়, শূন্য-জল প্রযুক্তি ব্যবহার করা। বিশ্বব্যাপী উন্নত হওয়া শূন্য-জল প্রযুক্তি(বা জিরো লিকুইড ডিসচার্জ হল একটা পদ্ধতি যাখানে শিল্প কারখানায় বর্জ্যজল সম্পূর্ণভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয় এবং কোনো তরল বর্জ্য ফেলা হয় না।) আছে। এই প্রযুক্তিতে জল ব্যবহার করতে হয় না। কিন্তু এটা খরচ বেশি। কোম্পানিগুলো সেটা নিতে চায় না। তাই সরকারকে বাধ্য করতে হবে।
তৃতীয়, সবুজ জ্বালানি বাধ্যতামূলক করা। বিভূতি গর্গ (এনার্জি ইকোনমিস্ট) জোর দেন, ডেটা সেন্টারগুলোর কার্বন ফুটপ্রিন্ট কমানোর জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। তাহলেই এই ডিজিটাল উন্নয়ন আরও টেকসই হবে।
চতুর্থ, ১৮৯৪ সালের আইন বদলানো। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভূগর্ভস্থ জলকে সরকারি সম্পদ ঘোষণা করতে হবে। কারও জমির নিচের জল তার ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—এটা একটা সাধারণ নীতি হওয়া উচিত। জলের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত।
পঞ্চম, ছোট এআই-এর দিকে যাওয়া। অনেক বিশেষজ্ঞ এখন বলছেন যে, দুনিয়ার সব তথ্য গিলে খাওয়া লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের বদলে নির্দিষ্ট এবং ছোট ডেটা সেটের ওপর ভিত্তি করে এআই তৈরি করা সম্ভব। যেমন, একটি এআই কেবল একটি নির্দিষ্ট কাজের জন্য তৈরি করা, তার জন্য হাজার কোটি লিটার জল বা মেগাওয়াট বিদ্যুতের প্রয়োজন নেই।
অধ্যায় ২৭: কেন বিকল্প পথে যাওয়া হচ্ছে না?
প্রশ্ন হলো, এই বিকল্পগুলো নিয়ে এত কম কথা হয় কেন? কেন সরকার এই পথে হাঁটছে না? কেন কোম্পানিগুলো এই পথে আসছে না?
কারণ বড় এআই মডেল মানে বড় ব্যবসা। বড় মডেল তৈরি করতে খরচ বেশি, কিন্তু সেই খরচ কোম্পানিগুলো সহজেই তুলে নিতে পারে। আর সেই খরচের একটা বড় অংশ হচ্ছে ইনফ্রাস্ট্রাকচার তৈরির খরচ—জমি, বিল্ডিং, বিদ্যুৎ, জল। এই খরচ যত বেশি হবে, কোম্পানিগুলোর ব্যবসা তত বড় হবে।
ছোট, বিশেষায়িত এআই-এর জয়গান শুরু হলে বর্তমান টেক জায়ান্টদের হাজার কোটি ডলারের সাম্রাজ্য বিপন্ন হবে। তাদের বিনিয়োগ মডেল ভেঙে পড়বে। তাদের শেয়ারের দাম কমে যাবে। তাদের ব্যবসা মডেল প্রশ্নের মুখে পড়বে।
তাই তারা চায় আমরা যেন কেবল প্রম্পট লিখতে জানি, কিন্তু প্রশ্ন করতে না শিখি। তারা চায় আমরা যেন বড় মডেলকেই চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নিই। তারা চায় আমরা যেন বিকল্পের কথা না ভাবি।
অধ্যায় ২৮: ভারতের কী করা উচিত?
ভারতের জন্য এটা একটা ঐতিহাসিক মোড়। আমরা এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারি কোন পথে যাব।
আমরা কি পশ্চিমা দেশগুলোর বর্জ্য গ্রহণ করে তাদের পুরোনো প্রযুক্তি এনে এখানে বসাব? নাকি আমরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তি তৈরি করব?
আমরা কি ডেটা সেন্টার কোম্পানিগুলোর হাতে আমাদের জল তুলে দেব? নাকি জলের ওপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করব?
আমরা কি ডেটা অ্যানোটেশন কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা ভাবব? নাকি তাদের অদৃশ্য শ্রমিক হিসেবেই রাখব?
আমরা কি কেবল বড় কোম্পানির মুনাফার কথা ভাবব? নাকি সাধারণ মানুষের জীবনের কথা ভাবব?
একটা কথা মনে রাখতে হবে—ডেটা সেন্টার তৈরি করতে সময় লাগে ২-৩ বছর। কিন্তু জল ফিরে পেতে সময় লাগে শতাব্দী। একবার জলস্তর নিচে নেমে গেলে, তা ফিরে আসতে বহু বছর লাগে। বা কখনো ফিরে আসে না।
আমরা যে সিদ্ধান্ত আজ নেব, তার প্রভাব পড়বে আগামী প্রজন্মের ওপর। আমাদের নাতি-নাতনিরা কি আমাদের ধন্যবাদ জানাবে? নাকি অভিশাপ দেবে?
নবম খণ্ড: ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ছবি
অধ্যায় ২৯: ২০৩০ সালের এক সকাল
২০৩০ সাল। বেঙ্গালুরু।
সকাল ৬টা। সরিতা ঘুম থেকে উঠল। আগে উঠেই চা বানাত। এখন আগে দেখে, জল এসেছে কি না। গতকাল জল আসেনি। তার আগের দিনও আসেনি। আজ হয়তো আসবে। ট্যাঙ্কারে করে জল কিনতে হবে কিনা, সেটা ঠিক করতে হবে।
সে কল খুলল। কিছুক্ষণ কিছুই নেই। তারপর ফোঁটা ফোঁটা জল এল। তারপর একটু বেশি। তারপর আবার কম। সরিতা তাড়াতাড়ি বালতি এনে জল ধরল। আধ বালতি হলো। তারপর জল বন্ধ।
আজকের মতো এইটুকুই। এই জল দিয়ে রান্না, পরিষ্কার, স্নান—সব করতে হবে।
সরিতার স্বামী রাজু একটা ডেটা সেন্টারে কাজ করে। নিরাপত্তারক্ষী। সে রাতের শিফট থেকে ফিরেছে। ওখানে জল আছে। সারাক্ষণ জল চলে। সার্ভার ঠান্ডা হয়। রাজু সেখানে স্নান সেরে আসে। বাড়িতে জল না থাকলে ওখানে করে নেয়। কিন্তু সরিতা পারে না। মেয়েরা পারে না।
সরিতার মেয়ে পূজা কলেজে যায়। সে ডেটা অ্যানোটেশনের পার্টটাইম কাজ করে। প্রতিদিন ২০০টা ভিডিও দেখতে হয়। অনেক ভিডিও খারাপ। পূজা বলে না, কিন্তু সরিতা দেখে, মেয়ের চোখের নিচে কালি পড়েছে। ঘুম হয় না। খেতে চায় না।
পূজা জানে, সে যে ভিডিও দেখে, সেগুলো এআই-কে শেখায়। সেই এআই-ই হয়তো একদিন মানুষের চাকরি কেড়ে নেবে। কিন্তু আজ তার চাকরি আছে বলে সংসার চলে।
এটা ২০৩০ সালের এক সকালের সম্ভাব্য ছবি।
অধ্যায় ৩০: আরেকটা সম্ভাব্য ছবি
২০৩০ সাল। হায়দ্রাবাদ।
কিষাণ রাজু (আরেক রাজু) ২০১০ সালে তার পাঁচ একর জমি বিক্রি করে দিয়েছিল একটা ডেটা সেন্টার কোম্পানিকে। এখন সে ওই ডেটা সেন্টারেই কাজ করে। মাসে ১২ হাজার টাকা বেতন। তার ছেলে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ভালো চাকরি করে। পরিবার ভালো আছে।
কিন্তু রাজুর মন খারাপ। তার জমি ছিল। সেই জমিতে ধান হতো। গম হতো। সবজি হতো। গরু ছিল। এখন সব শেষ। জমির জায়গায় বিশাল বিল্ডিং। রাত-দিন মেশিনের শব্দ। বিদ্যুৎ খরচ। জল খরচ।
একদিন রাজু কাজ করছিল। দেখে, কোম্পানির লোকজন এসেছে কূপ খুঁড়তে। আরও গভীরে জল তোলার জন্য। রাজু জানে, ওই জলের উপর তার গ্রামের মানুষের জল পাওয়া । কিন্তু সে কিছু বলতে পারে না। চাকরি যাবে।
সে শুধু ভাবে, আমার জমি ছিল। আমার জল ছিল। আমার ফসল ছিল। এখন কিছুই নেই। শুধু এই চাকরি। আর এই চাকরিটাও কবে পর্যন্ত থাকবে, কে জানে?
অধ্যায় ৩১: তৃতীয় একটা সম্ভাব্য ছবি
২০৩০ সাল। বিশাখাপত্তনম।
সমুদ্রের ধারের শহর। কিন্তু এখানে জল নেই। কাছাকাছি কোনো নদী শুকিয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ জল নেমে গেছে ৩০০ ফুট নিচে। সরকার ট্যাঙ্কারে জল দেয়। লম্বা লাইন। ঝগড়া। মারামারি।
আর ঠিক তার পাশেই গুগল-আদানির ডেটা সেন্টার। বিশাল বিল্ডিং। ২৪ ঘন্টা চলছে। সার্ভার ঠান্ডা হচ্ছে। জল আসছে পাইপলাইনে। সরবরাহ বন্ধ হয় না।
স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। পুলিশ এসে সরিয়ে দিয়েছে। কেউ কেউ মামলা করতে গিয়েছিল। আদালতে হেরে গেছে। আইন ১৮৯৪ সালের। আইন বলছে, জমির মালিক জল পাবেন। গুগল জমির মালিক। তাই গুগল জল পাবে। মানুষ পাবে না।
শহরের এক বুড়ি বলছিল, "আমার বাপ-দাদারা এই শহরে জন্মেছেন। মরে যাবেন এখানেই। কিন্তু এই শহর কি আর আমাদের থাকবে? না, শহর এখন গুগলের। জল এখন গুগলের। ভবিষ্যৎ এখন গুগলের। আমরা শুধু ভাড়াটে।"
দশম খণ্ড: শেষ অধ্যায়, কিন্তু শেষ নয়
অধ্যায় ৩২: আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে?
আমরা একটা সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে ডিজিটাল বিপ্লব, অন্যদিকে জল সংকট। একদিকে প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নতি, অন্যদিকে পরিবেশের অভূতপূর্ব ক্ষতি। একদিকে বিলিয়নিয়ারদের সাম্রাজ্য, অন্যদিকে প্রান্তিক মানুষের জীবনযুদ্ধ।
আমরা যদি এখন কিছু না করি, তাহলে ২০৩০ সালের ছবি হবে প্রথমটা। সংকট আরও গভীর হবে। জল আরও দুষ্প্রাপ্য হবে। ডেটা সেন্টার আরও বড় হবে। সাধারণ মানুষ আরও কষ্ট পাবে।
কিন্তু আমরা যদি এখন সঠিক সিদ্ধান্ত নিই, তাহলে ২০৩০ সালের ছবি অন্যরকম হতে পারে। ডেটা সেন্টারগুলো শোধিত বর্জ্য জল ব্যবহার করবে। শূন্য-জল প্রযুক্তি আসবে। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে। ১৮৯৪ সালের আইন বদলাবে। ভূগর্ভস্থ জল সরকারি সম্পদ হবে। ডেটা অ্যানোটেশন কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা থাকবে।
এই দুই ছবির মধ্যে কোনটা হবে, সেটা নির্ভর করে আমাদের ওপর। আমাদের সিদ্ধান্তের ওপর। আমাদের আন্দোলনের ওপর। আমাদের সচেতনতার ওপর।
অধ্যায় ৩৩: কী করা যেতে পারে?
এককভাবে কিছু করা কঠিন। কিন্তু সম্মিলিতভাবে অনেক কিছু করা সম্ভব।
প্রথম, সচেতন হওয়া। জানা। বোঝা। জানা এবং বোঝা দুটোই বড় সমস্যা।এই সমস্যা না বুঝলে আমাদের জীবনকে এটা প্রভাবিত করবে, তখন তা মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর থাকবে না।
দ্বিতীয়, প্রশ্ন করা। সরকারকে প্রশ্ন করা। কোম্পানিকে প্রশ্ন করা। ডেটা সেন্টার কোথায় বসছে? কত জল খরচ হচ্ছে? কোথা থেকে জল আসছে? পরিবেশের কী ক্ষতি হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো করা।
তৃতীয়, চাপ দেওয়া। সরকারের ওপর চাপ দেওয়া আইন বদলানোর জন্য। কোম্পানির ওপর চাপ দেওয়া পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য। সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ দেওয়া এই বিষয়ে লেখার জন্য।
চতুর্থ, বিকল্প খোঁজা। ছোট এআই-এর গবেষণায় উৎসাহ দেওয়া। স্থানীয় প্রযুক্তি তৈরি করা। আমাদের প্রয়োজন অনুযায়ী প্রযুক্তি তৈরি করা।
পঞ্চম, সংগঠিত হওয়া। ডেটা অ্যানোটেশন কর্মীদের সংগঠিত করা। জল আন্দোলন গড়ে তোলা। কৃষকদের সঙ্গে একাত্ম হওয়া। সাধারণ মানুষের সঙ্গে একাত্ম হওয়া।
অধ্যায় ৩৪: একটা প্রশ্ন
এই লেখা শেষ করতে চাই একটা প্রশ্ন দিয়ে।
আপনি যখন পরের বার চ্যাটজিপিটি-তে কোনো প্রশ্ন করবেন, তখন কি মনে পড়বে যে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে জল খরচ হয়েছে?
আপনি যখন পরের বার ইউটিউবে ভিডিও দেখবেন, তখন কি মনে পড়বে যে এই ভিডিও দেখাতে জল খরচ হয়েছে?
আপনি যখন পরের বার ইনস্টাগ্রাম স্ক্রোল করবেন, তখন কি মনে পড়বে যে এই স্ক্রোলিং-এর পিছনে জল আছে?
আপনি যখন পরের বার কোনো টেক কোম্পানির ডেটা সেন্টার প্রকল্পের খবর পড়বেন, তখন কি মনে পড়বে ১৮৯৪ সালের আইনের কথা? বেঙ্গালুরুর জলের ট্যাঙ্কারের কথা? পুনের ১২ মিটার নিচে নেমে যাওয়া জলস্তরের কথা? হায়দ্রাবাদের কৃষকের কান্নার কথা? তামিলনাড়ুর ডেটা অ্যানোটেশন কর্মীর বিষণ্নতার কথা?
মনে পড়লে কিছু যায় আসে। না পড়লেও কিছু যায় আসে। কিন্তু জল কিন্তু পড়ে থাকবে না। জল ফুরিয়ে যাবে। জল ফুরিয়ে গেলে আর কোনো প্রশ্ন থাকবে না। আর কোনো উত্তর থাকবে না। আর কোনো ডেটা থাকবে না। আর কোনো ডিজিটাল থাকবে না।
শুধু থাকবে জলশূন্য ডিজিটালের স্মৃতি। এক বিরাট মরুভূমি। আর মরুভূমির বুকে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু ভাঙা সার্ভার। সেই সার্ভারগুলো হয়তো তখনও হিসেব করবে। হিসেব করবে কত জল ছিল, কত জল খরচ হল, কত জল ফুরিয়ে গেল।
কিন্তু তখন আর কেউ থাকবে না সেই হিসেব পড়ার।
শেষ কথা
এই লেখা লিখতে গিয়ে যদি আমি বহু মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারতাম তবে নিশ্চিত শুনতাম বলে মনে হয় যে —"আমরা জানতাম না”।
আমরা জানতাম না যে ইন্টারনেটের এত জল খরচ হয়। আমরা জানতাম না যে ডেটা সেন্টার এত জল খায়। আমরা জানতাম না যে ১৮৯৪ সালের একটা আইন আজও আমাদের জল নিয়ন্ত্রণ করে। আমরা জানতাম না যে ডেটা অ্যানোটেশন কর্মীদের এত কষ্ট।
এবার জানার পর আমাদের কী করা উচিত?
কেউ কেউ বলবেন, কিছুই করার নেই। এটা উন্নয়নের পথ। এটাই সময়ের গতি। এটাকেই মেনে নিতে হবে।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, কিছু করার আছে। আমরা চাইলে বদলাতে পারি। আমরা চাইলে আইন বদলাতে পারে। আমরা চাইলে প্রযুক্তি বদলাতে পারে। আমরা চাইলে সমাজ বদলাতে পারে। আমরা চাইলে নিজেদের বদলাতে পারি।
শুধু চাইতে হবে। সত্যি করে চাইতে হবে। আর সেই চাওয়াকে কাজে পরিণত করতে হবে।
এই লেখা যদি একজন মানুষকেও সচেতন করে, একজন মানুষকেও ভাবায়, একজন মানুষকেও সক্রিয় করে, তাহলে আমার শ্রম সার্থক।
কারণ শেষ পর্যন্ত, জলশূন্য ডিজিটাল না হয়ে, আমরা যদি একটুও জলে ভেজা ডিজিটাল তৈরি করতে পারি, সেটাই বড় কথা।
জল থাকুক। ডিজিটাল থাকুক। মানুষ থাকুক। এই তিনটেকে একসঙ্গে রাখার পথ খুঁজতে হবে। সেটাই হবে আমাদের আসল চ্যালেঞ্জ। সেটাই হবে আমাদের আসল কর্তব্য। সিদ্ধান্ত আমাদের।