পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

দিল্লিতে বিজেপির পরাজয় তারপর বাংলার রাজনীতি কোন পথে যাবে?

  • 19 February, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 580 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গে আগামী দুটো বিধানসভা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লিতে বিজেপির পরাজয়ের কোনও প্রভাব কি পড়বে পূর্বভারতের দুই রাজ্যের নির্বাচনে?


 


 

অমিত শাহ, যাকে বিজেপির অনেকে চাণক্য বলে থাকেন, তিনি দিল্লি নির্বাচনে পরাজয়ের পর বলেছেন যে ওই ‘গোলি মারো’ কথাটা হয়ত বলাটা ঠিক হয়নি। এই জন্যই হয়ত দিল্লির ভোটারেরা বিজেপির থেকে মুখ ফিরিয়েছেন। এই বোধহয় চাণক্যের পিছু হটা শুরু হল। যদি কেউ ভাল করে অমিত শাহের কথাগুলো খেয়াল করেন তাহলে দেখতে পাবেন, তিনি কিন্তু তাঁর মন্তব্য, ‘ইভিএমের বোতাম এতো জোরে চাপতে হবে, যাতে সেখান থেকে কারেন্ট শাহীনবাগে পৌঁছে যায়’— তার বিরোধিতা করেননি। তার মানে কি এটা দাঁড়ালো যে এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, অমিত শাহ নিজেকে এই হারের দায় থেকে সরিয়ে নিলেন? হালকা করে বিষয়টা অনুরাগ ঠাকুর, প্রকাশ জাভারেকর আর অন্যান্যদের ঘাড়ে ফেলে দিলেন? আরও খুঁটিয়ে খেয়াল করলে দেখা যাবে যে অমিত শাহ কিন্তু যোগী আদিত্যনাথের করা শাহীনবাগের সবাই বিনা পয়সায় বিরিয়ানি খাবার লোভে এই আন্দোলন করছেন, সেটারও বিরোধিতা করেননি।

কিন্তু যে কথাগুলো বলেছেন অমিত শাহ, সেগুলো একটু ভাল করে বোঝা জরুরি। সিএএ-এনআরসি নিয়ে যে কথাগুলো বলেছেন সেগুলো শুনে তাঁদের নিজেদের দলের লোকজনই বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছেন, সাধারণ নাগরিক তো কোন ছাড়। উনি একবার বলেছেন, এনআরসি করা নিয়ে এখনও অবধি কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়নি। আবার বলেছেন, তাঁর দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে এনআরসির কথা বলা আছে, সুতরাং তা হতে বাধ্য। সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের দলের সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট থেকে তা ট্যুইট করা হয় পরপর দুটি। তাহলে মানুষ কি বুঝবে? আদৌ এনআরসি হবে না হবে-না? যদিও এনআরসি হবে সেই ট্যুইটটি মুছে ফেলা হয়েছে কিছুক্ষণ পরেই।

আসলে এটা করা হলো, বা বলা হলো কেন? একই সঙ্গে যাতে যাঁরা সিএএ-র সমর্থক তাঁদেরও খুশী রাখা যায় আর পাশাপাশি নীতিশকুমারদের মতো বিজেপির জোটসঙ্গীদেরও খুশী রাখা যায়। নীতিশকুমারের এমনিতেই খুব সুনাম আছে রাজনৈতিক ডিগবাজি খাওয়ার, আর ইদানীং আবার তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করেছেন। প্রশান্ত কিশোর, যাকে এই মাত্র কিছুদিন আগে জনতা দল (সংযুক্ত) থেকে বহিষ্কার করেছেন, তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই অমিত শাহ এবং মোদীর কাছে ক্রমাগত অপমানিত হওয়াটা নীতিশকুমার মেনে নিতে পারছেন না। নীতিশ কুমার বিজেপির সঙ্গে সামনের বিহার নির্বাচনের জন্য দর কষাকষি করবেন। বলবেন, যেহেতু দিল্লির নির্বাচনে এই ঘৃণা বিদ্বেষের রাজনীতি পরাজিত হয়েছে তাই বিহারেও এটা চলবে না, তাই বিজেপিকে একটু চাপে রাখার চেষ্টা তো নীতিশ করবেন। মুসলমান ভোট পেতে গেলে তাঁকে এনআরসির বিরোধিতা করতেই হবে। এছাড়া সংরক্ষণ মৌলিক অধিকার নয় বলে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, নীতিশ কুমার চাইবেন যে সরকার যেন সংসদে এই রায়ের বিরোধিতা করে।

ওদিকে অমিত শাহের কি উদ্দেশ্য সেটা বোঝাটাও জরুরি। অমিত শাহ এখন চাইবে সিএএ-এনআরসি হবে, হবে-না এই করে যতটা পারা যায় হিন্দু ভোটের মেরুকরণ। অমিত শাহ চাইবেন যেন তেন প্রকারে বিহার এবং বাঙলায় জিততে। তাই কখনও তিনি বলবেন এনআরসি হবে না, কখনও চাইবেন যাতে শাহীনবাগের মানুষজন তাঁর সঙ্গে কথা বলেন, আবার কখনও বলবেন এটা তো ক্রনোলজি, এনআরসি হবেই। একবার বলবেন, কাশ্মীরে সব কিছু  ঠিক আছে। আগামী বছরের শুরুর দিকে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আইন সংসদে আনবে। তার ফলে মুসলমানদের আরও কোণঠাসা করা যাবে। তখন আবার জোরকদমে অমিত শাহ এনআরসি-র ঘোড়া ছোটাবে যাতে হিন্দু ভোটের আরও মেরুকরণ হয়। আবার কিছুদিন দেখা যাবে পাবলিক মুখ হিসেবে মোদী সামনে আসবে আর বাঙলায় নজর দিতে অমিত শাহ বারবার বাঙলায় আসবে।


তাহলে কি করে বাঙলাকে বিজেপি মুক্ত রাখা সম্ভব হবে?


আদৌ কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পারবেন তাঁর উন্নয়নের রাজনীতি দিয়ে বা তাঁর নরম হিন্দুত্ব দিয়ে বিজেপির এই উগ্র হিন্দুত্বকে ঠেকাতে? প্রশান্ত কিশোর কি পারবেন মমতাকে জেতাতে? কারণ এই গত ৫ বছরে কোনও রাজনৈতিক বিরোধিতা না থাকায় আরএসএস সারা বাঙলায় যেভাবে বেড়েছে সেটা যথেষ্ট উদ্বেগের। কারণ, সরকারীভাবে টাকা ছড়িয়ে ক্লাব দখলের যে রাজনীতি মমতা করেছেন তার থেকে অনেক বেশি টাকা ছড়িয়ে ক্লাব দখল করে ফেলছেন অমিত শাহ এবং আরএসএস। মমতা শুধুমাত্র বিজেপির ওপরটা দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু নীচে শিকড় কতটা গভীরে গেছে এবং তাঁর দলেরই কোন কোন কর্মী যে তলে তলে আরএসএস করছেন সেটা উনি বুঝতেই পারছেন না। উনি হয়তো ‘দিদিকে বলো’ কর্মসূচীর মধ্যে দিয়ে নিজের ভাবমূর্তি পরিচ্ছন্ন করছেন কিন্তু তাতে কি গোটা সমস্যার সমাধান হবে? বরং উনি যদি আরও বেশী গণতান্ত্রিক হতে পারেন, যত সংগঠনের যত রকমের সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন চলতে দেন, তাহলে মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা কিছুটা হলেও চরিতার্থ হয়। পঞ্চায়েত ভোটে বিরোধী শূন্য করার প্রবণতার মধ্যে দিয়ে আসলে গণতন্ত্রকে গলা টিপে মারা হয়, এটা যদি উনি এখনও না বোঝেন তাহলে সেটা বাংলার মানুষের জন্য বড় বিপদ আনতে পারে। আদর্শ হওয়া উচিত, বিজেপির বিরুদ্ধে সার্বিক বিরোধী ঐক্য এবং তাতে সব দলের নমনীয় মনোভাব, কিন্তু তা যদি না হয়, তাহলে কি করণীয়? অমর্ত্য সেন  বলেছেন বিরোধী ঐক্য না হলেও সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া উচিত। তা হলেই একমাত্র মানুষের ঐক্য তৈরি হবে। দিল্লিতে জিতে কেজরিওয়াল বলেছেন যে সিএএ-র কোনও দরকার নেই, এটা হিন্দু মুসলমান উভয়ের জন্যই সমান খারাপ, তাই হিন্দুদের মধ্যে এই প্রচারটা নিয়ে যাওয়া জরুরী। তার জন্য ছোট ছোট নাগরিক উদ্যোগের ভুমিকা অনস্বীকার্য, সেগুলোকে যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অগণতান্ত্রিক ভাবে বন্ধ করে দিতে চেষ্টা করেন তাহলে উল্টে বিজেপিরই সুবিধা হবে। যদি বাম-কংগ্রেসের যৌথ আন্দোলন একটা চেহারা পায় এবং আগামী পুরসভা নির্বাচনে যদি মোটামুটি একটা ভোট পেয়ে তাঁরা সব জায়গায় দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসে তাহলেও এখনকার রাজ্য শাসকের লাভই হবে। কারণ মমতাও জানেন যে আরএসএসের রাজনীতিকে মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাঁর দলের কর্মীদের নেই। কিন্তু এ সমস্ত কিছুই নির্ভর করছে কত বেশী সংখ্যক সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা এই সিএএ-এনআরসি বিরোধী আন্দোলনে সামিল হচ্ছে, তার ওপর। শেষ বিচারে এই ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে, তাঁদের এই উগ্র হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে আওয়াজটা তাঁদের পরিবারের মানুষের কাছে নিশ্চিত পৌছবে, এই আশা করাটা কি খুব অন্যায় হবে?

0 Comments

Post Comment