ভেনেজুয়েলা আজ বিশ্বের দরবারে একদিকে পরিচিত একটি সংকটাপন্ন রাষ্ট্র ও অন্যদিকে মুক্তিকামী দেশে হিসেবে। অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মানবিক সংকট –এই সবকিছুর পেছনে দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার পাশাপাশি বহিরাগত শক্তির, বিশেষত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের, দীর্ঘদিনের হস্তক্ষেপ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। প্রশ্ন ওঠে, ভেনেজুয়েলায় কেন মার্কিনী আগ্রাসন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় তেল-রাজনীতি, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ, লাতিন আমেরিকার ইতিহাস এবং বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার গভীরে।
তেল সম্পদ ও কর্পোরেট স্বার্থ:
ভেনেজুয়েলার সবচেয়ে বড় শক্তি ও একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হল তার বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে তেল এবং খনিজ ভান্ডার। বিশ্বের সর্ববৃহৎ প্রমাণিত তেলভান্ডার ভেনেজুয়েলাতেই অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো এই সম্পদের ওপর দখলদারি চালিয়ে এসেছে। কিন্তু ১৯৯৯ সালে হুগো চাভেজ ক্ষমতায় আসার পর তেল শিল্প জাতীয়করণ করা হয় এবং তেল থেকে অর্জিত আয় সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় শুরু হয়। এর ফলে মার্কিন কর্পোরেট স্বার্থে সরাসরি আঘাত লাগে। তেলকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই দ্বন্দ্বই মার্কিনী আগ্রাসনের অন্যতম মূল ভিত্তি। বর্তমানে আবার ভেনেজুয়েলায় বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টের ভালোরকম মজুদের সন্ধান পাওয়া গেছে। বর্তমান যুগের তথ্য প্রযুক্তির বিকাশের জন্য এইসব খনিজ আমেরিকার কর্পোরেট বাহিনীর খুব বেশি করে প্রয়োজন। নাহলে এইক্ষেত্রে চীনকে টেক্কা দেওয়া যে সম্ভব নয়। তাই মাদক ব্যবসা রোখার মতো অছিলায় ভেনেজুলেয়া আক্রমণ। গ্রেনেড, মিসাইল নিক্ষেপ করছে যুদ্ধবাজ ও অস্ত্র ব্যবসার প্রধান কারিগর মার্কিন সেনাবাহিনী। এর মধ্যেই খবর পাওয়া গেছে, সামরিক বাহিনীর গোপন অভিযানে প্রেসিডেন্ট মাদুরো এবং তাঁর স্ত্রীকে অপহরণ করা হয়েছে। সম্ভবত তাঁদেরকে রাখা হয়েছে ব্রুকলিন ডিটেনশন ক্যাম্পে। আমেরিকার আদালতে তাঁদের বিচার হবে। মানবিকতার চূড়ান্ত অপমান। কোনরকম আন্তর্জাতিক নিয়ম কানুনের ধারও ধারে না ওরা।
হায়রে পোড়া কপাল! ইরানের শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের বিক্ষোভ প্রতিবাদের ওপর পুলিশি হামলার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সে কি দুশ্চিন্তা। এদিকে নিজেই আবার হামলা করে অন্য দেশে ঘাঁটি গাড়তে চায়। এই ট্রাম্প মহাশয় নাকি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ থামিয়েছে, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ থামাতেও নাকি তিনি উদগ্রীব? শান্তির দূত এই মহামানবের মুকুটে নোবেল পুরস্কারের শিরোপা উঠল বলে!
সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আদর্শগত সংঘাত:
ভেনেজুয়েলার বলিভারীয় বিপ্লব কেবল একটি অর্থনৈতিক নীতির পরিবর্তন নয়, এটি ছিল একটি আদর্শগত ঘোষণা। রাষ্ট্র নিজেকে সমাজতান্ত্রিক বা বিপ্লবী পথে পরিচালিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকারকে নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই সমাজতান্ত্রিক বা বামপন্থী সরকারগুলিকে নিজেদের আধিপত্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে। বিপ্লবী দেশ ওদের জাতশত্রু। কিউবা, চিলি, নিকারাগুয়া কিংবা বলিভিয়ার অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ। ভেনেজুয়েলাও এই তালিকায় যুক্ত হয়।
লাতিন আমেরিকায় আধিপত্য রক্ষার কৌশল:
লাতিন আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের “প্রভাব বলয়” হিসেবে বিবেচিত। ‘মনরো নীতি’র মাধ্যমে এই অঞ্চলকে কার্যত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখা হয়েছে। ভেনেজুয়েলা এই ধারণাকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানায়। তারা ALBA, CELAC-এর মতো আঞ্চলিক জোট গড়ে তোলে, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন প্রভাবমুক্ত আঞ্চলিক সহযোগিতা। ভেনেজুয়েলার এই ভূমিকা লাতিন আমেরিকায় মার্কিন একচ্ছত্র আধিপত্যকে দুর্বল করে তোলে, যা ওয়াশিংটনের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
মনরো নীতির ভয়াবহ বাস্তবতা:
১৮২৩ সালের ২ ডিসেম্বর মার্কিন কংগ্রেসে প্রেসিডেন্ট জেমস মনরো ঘোষণা করেন –ইউরোপীয় শক্তিগুলো আর আমেরিকা মহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন বা হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। এই নীতির মূল বক্তব্য ছিল –ইউরোপ কেবল ইউরোপে সীমাবদ্ধ থাকবে। আর আমেরিকা হবে সকল আমেরিকানদের জন্য (আসলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য)।
মনরো নীতির মূল চারটি ভিত্তি হল –
এক: নতুন উপনিবেশ স্থাপন নিষিদ্ধ। অর্থাৎ ইউরোপীয় শক্তিগুলো যেমন স্পেন, পর্তুগাল, ব্রিটেন, ফ্রান্স আর লাতিন আমেরিকায় নতুন উপনিবেশ গড়তে পারবে না।
দুই: লাতিন আমেরিকার সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ইউরোপ হস্তক্ষেপ করলে যুক্তরাষ্ট্র তা শত্রুতামূলক কাজ হিসেবে দেখবে।
তিন: যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল –“আমরা ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করব না। কিন্তু ইউরোপও আমেরিকায় হস্তক্ষেপ করবে না”।
চার: পশ্চিম গোলার্ধে পুরো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা কার্যত ঘোষিত হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ অধিকারভুক্ত এলাকা হিসেবে (মার্কিন প্রভাব বলয়)।
আপাতত দৃষ্টিতে মনরো নীতি ছিল উপনিবেশ বিরোধী এবং লাতিন আমেরিকার স্বাধীনতার পক্ষে। কিন্তু বাস্তবে লাতিন আমেরিকায় ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বদলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নতুন সূচনা ঘোষিত হল। কৌশলে এই আকাঙ্ক্ষাই পূরণ করতে চাইছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। এককথায় এই নীতি উদীয়মান মার্কিন পুঁজিবাদের নিজস্ব বাজার ও কাঁচামাল দখলের কৌশল। আর “আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য” স্লোগানটি শুনতে বেশ গনতান্ত্রিক হলেও এর অন্তর্নিহিত অর্থ ছিল –“লাতিন আমেরিকা ইউরোপের নয়, কিন্তু স্বাধীনও নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবাধীন অঞ্চল।” বাস্তবে এই নীতির ফলে –সামরিক হস্তক্ষেপ, লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর স্বাধীন
সরকারকে উৎখাত করে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণ সহ সবকিছুর বৈধতা তৈরি হল। তাই ১৯০৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ঘোষণা করেন –যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করবে।
চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ভেনেজুলেরার ঘনিষ্ঠতার মাশুল:
ভেনেজুয়েলার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক। ঋণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সামরিক সহযোগিতা, সবক্ষেত্রেই এই দুটি রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ায়। মার্কিন দৃষ্টিতে এটি ছিল সরাসরি ভূ-কৌশলগত চ্যালেঞ্জ। নিজেদের প্রভাব বলয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্র কখনোই সহজভাবে মেনে নেয়নি। ফলে বারবার করে সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ দেখা গেছে আমেরিকার তরফে। বলাই বাহুল্য, মার্কিনী আগ্রাসন কেবল সামরিক বা অর্থনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল না। বরং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপও ছিল সুস্পষ্ট। ভেনেজুয়েলার নির্বাচিত সরকারকে “অবৈধ” ঘোষণা করা, বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে “অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, এসবই ছিল সরাসরি সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ। এর লক্ষ্য ছিল একটাই –সরকার পরিবর্তন (Regime Change)। এবারের হামলাও বর্তমান মাদুরো সরকারের পতনের নীল নকশা নিয়েই শুরু হয়। আপাতত প্রথম দফার আগ্রাসী অভিযান শেষ করে মিস্টার ট্রাম্পের ঘোষণা –আপাতত আমেরিকাই ভেনেজুয়েলা শাসন করবে। এটাও বলতে ভোলেন নি যে, ভেনেজুয়েলার তেল ভান্ডারগুলো আমেরিকাই তদারকি করবে। আসল কথা, আসল উদ্দেশ্য খুব স্পষ্ট করেই জানিয়ে দিয়েছে ট্রাম্প এন্ড কোম্পানি।
ভেনেজুয়েলাকে ভাতে মারতেও তৎপর হয়ে ওঠে মার্কিন প্রশাসন। ফলে বারংবার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। স্বভাবতই ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি কার্যত পঙ্গু হয়ে পড়ে। তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয়, বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়, খাদ্য ও ওষুধ আমদানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। পরবর্তীতে এই মানবিক সংকটকেই আবার ভেনেজুয়েলার সরকারের ব্যর্থতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে আরও হস্তক্ষেপের যুক্তি তৈরি করা হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আসলে শাঁখের করাত, দু দফাতেই কেটে ফালাফালা করে।
ভেনেজুয়েলা দেখাতে চেয়েছিল যে, মার্কিন আধিপত্য ও নিও-লিবারাল পুঁজিবাদ ছাড়াও একটি বিকল্প উন্নয়ন পথ সম্ভব। সহযোগিতা মূলক সামাজিক উৎপাদনের দিকে হাঁটা সম্ভব। আমেরিকার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই কিউবা এই বিকল্প পথ বাস্তবায়িত করেছে। আগামীতে দেশে দেশে এই বিকল্প সফল হলে, তা শুধু লাতিন আমেরিকা নয়, সমগ্র উন্নয়নশীল বিশ্বের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারত। এই সম্ভাবনাই ছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। কারণ, সাম্রাজ্যবাদী আওতার বাইরে বেরিয়ে দেশে দেশে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র বা দেশ গঠিত হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কারিকুরি চালানো বড্ড মুশকিল হয়ে পড়বে।
শেষের গুরুত্বপূর্ণ কথা:
ভেনেজুয়েলায় মার্কিনী আগ্রাসন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার একটি ধারাবাহিক প্রবণতার অংশ। তেল ও খনিজ সম্পদের দখল, সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দমন, ভূ-কৌশলগত আধিপত্য রক্ষা এবং বিকল্প উন্নয়ন মডেলকে ধ্বংস করাই এর মূল উদ্দেশ্য। ভেনেজুয়েলার সংকট তাই কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়। এটি সাম্রাজ্যবাদ বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্বের এক গভীর সংঘাতের প্রতিফলন।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিনী আগ্রাসন প্রমাণ করে – সাম্রাজ্যবাদ কেবল বন্দুক নয়, অর্থনীতি ও আদর্শের মাধ্যমেও কাজ করে। রাষ্ট্র ও শ্রেণীর প্রশ্ন আজ আর শুধু একটি দেশের জাতীয় বিষয় নয়। প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সমানভাবে সক্রিয়। তাই আন্তর্জাতিক পুঁজি ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে শ্রমিক কৃষক সহ সকল মেহনতি মানুষ ও ছাত্র যুবদের সংগঠিত ঐক্যবদ্ধ লড়াই আজ ভীষণ প্রয়োজন। এই লড়াই দিকে দিকে দানা বাঁধছে। এখানেই ওদের আতঙ্ক। প্রতিটি হামলার মতো এবারেও আমেরিকার সাধারণ জনগণ যুদ্ধের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভে পথে নেমেছেন। রাজপথ কাঁপিয়ে স্লোগান উঠছে –“তেলের জন্য রক্ত চাই না। খনিজ সম্পদ দখলের জন্য যুদ্ধ চাই না”।আন্তর্জাতিক স্তরেও অধিকাংশ দেশ আমেরিকার এই হামলার তীব্র নিন্দা করেছে। তাই, ভেনেজুয়েলার লড়াই আসলে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের দুঃস্বপ্ন এবং বিশ্ব শ্রমজীবী মানুষের লড়াইয়ের এক অগ্নিশিখা।