পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

তামাশা দেখব বলে

  • 15 July, 2019
  • 0 Comment(s)
  • 1576 view(s)
  • লিখেছেন : হুতোম প্যাঁচা
তামাশা নইলে কলকেতার বাবু বিবিদের জীবন নেহাত পানসে। তা নরকধাম থেকে কলকেতায় ফিরে ইস্তক অনেকরকম তামাশা দেখলেম। হুতোম প্যাঁচার নকশার--একাল

তামাশা নইলে কলকেতার বাবু বিবিদের জীবন নেহাত পানসেতা নরকধাম থেকে কলকেতায় ফিরে ইস্তক অনেকরকম তামাশা দেখলেম। এদানি তামাশা বড্ড ঘনঘন বদল হয়, আমাদের যুগে এমনধারা ছিল না। সম্পাদকরা কি নাকালটাই না হচ্চেন! রোজ নতুন তামাশার যোগান দেয়া কি চাট্টিখানি কথা! আবার এর তামাশার কথা লিখেচ কি ওই বাবু চটে লাল, বলবেন একটি পয়সার বিজ্ঞাপন দোব না। তেনার মন রাখতে যেই তেনার তামাশার কথা লিখলে, অমনই আবার এই বিবি টুঁটি টিপে ধরবেন। বিজ্ঞাপন ভুলে যান, চাই কি গারদেও পুরে দিতে পারেন। ঠ্যাকাচ্চে কে?

এই বুক ধড়ফড় সইতে না পেরেই তো এক সম্পাদক ঘুমের মদ্যে বলে ফেলেচিলেন “ইচ্ছে করে হুতোম প্যাঁচাকে সম্পাদক করে দিয়ে সিশেলস চলে যাই।” ব্যাস! আর বাছাধন যাবে কোথায়? সম্পাদক হবার সাধ যে মরার পরেও যায় না। তাই বাবুটির ঘুম ভাঙিয়ে বল্লেম “যা পালা, তোর সম্পাদনার ছুটি। আমি ভোগদখল কল্লেম।” কিন্তু কথা হচ্চে যে জিনিসের সাধ মরা মানুষের যায়নি সে জিনিস কি আর জ্যান্ত লোকে ছাড়তে পারে? তাই বাবুটি জোড় হাতে বল্লেন “রক্ষে করুন। অ্যাদ্দিনের ব্যবসা কি ছাড়তে পারি? গাড়ি, বাড়ি, উপরি। তার উপর নাম যশ নেহাত কম নয়। আপনি বরং একখানা যেমন তেমন শরীর ধারণ করুন, করে ফের নকশা লিখুন। যা যা লিখতে পারি না, লিখলে গর্দান যাবে, সেইসব লিখুন। কেউ গলা টিপে ধল্লে আমি বলব ভূতে লিখেচে। কথাটা তো মিথ্যে নয়। তবে কলকেতায় আটকে পড়লে চলবে না। বাঙালি এ যুগে গ্লোবাল কূপমণ্ডুক। এট্টু টিভি দেখুন, ইউটিউব দেখুন মোবাইল দোব, ফেসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রামে কী চলচে নজর রাখুন। নেটফ্লিক্স, হটস্টার, অ্যামাজনও ফ্যালনা নয়।এসব না কল্লে পাবলিক নকশা নেবে না।”

রাজি হয়ে গেলেম। আমার চেহারাটি এ যুগের কেউ চেনে না। তাই পুরনো শরীরটাই ধারণ করেচি। তামাশা দেখতে আর বাবু, বিবিদের হাড় জ্বালাতন কত্তে আমার এখনো চমৎকার লাগে। কদিনে তামাশা যা দেখলেম দু একটি বলি

 

রাম তামাশা

যমের সাথে খাতির থাকায় একবার নরক থেকে স্বর্গ ভিজিট কত্তে গেচিলেম। সেখানে বাল্মীকি, তুলসীদাস, কৃত্তিবাস --- সব তাবড় তাবড় রামভক্তরা ছিলেন। সব দেখলেম সাধন, ভজনে বুঁদ নিপাট ভদ্রলোক। কিন্তু মর্ত্যে এসে দেখচি একরকমের নতুন রামভক্ত বেরিয়েচে। এদের বাল্মীকির সাথে মিল নেই, আছে বিদ্যাসাগর মশায়ের বন্ধু মধুবাবুর সাথে, যিনি কিনা রামকে মোটে পছন্দ কত্তেন না।মিল অবিশ্যি সামান্যই। তিনিও কারনবারি বেজায় পছন্দ কত্তেন, এনারাও করেন, এই মাত্র। কিন্তু মধুবাবুর ন্যায় এই রামভক্তরারামায়ণ আদ্যোপান্ত পড়েচেন এমন অভিযোগ কেউ করেন না। তাই এনারা আপন বাহুবলে মর্যাদা পুরুষোত্তম রামকে বাস্তবিক মধুবাবুর “ভিখারী রাঘব” বানিয়ে ছেড়েচেন। বিধর্মী মোসলমানকে দিয়ে “জয় শ্রীরাম” না বলালে ভক্তি জমচে না। এনাদের প্রধান মোচ্ছব রামনবমী বটে, তবে সবচে বড় এন্টারটেনমেন্ট হল মাথায় ফেট্টি লাগিয়েদল বেঁধে পতাকাওলা বাইক চড়ে মসজিদের সামনে গিয়ে “জয় শ্রীরাম” বলা। সীতা বিনা রাম ছিলেন মণিহারা ফণী, কিন্তু এনারা সে মণির নাম পয্যন্ত করেন না। বোধ হচ্চে অযোধ্যায় মন্দির বানানোর তবিলে জমা করেচেন।

স্বর্গধামে আমার যে খোঁচড়টিকে রেখে এসেচি সে খবর দিল চিত্রগুপ্ত নতুন জাবেদা খাতা বানাতে দিয়েচেন “জয় শ্রীরাম” না বলার অপরাধে রামভক্তরা কজনকে যমের বাড়ি পাঠাল তার হিসেব রাখবেন বলে। এদিকে শুনতে পাচ্চি পুলিশ,উকিল, জজ, সম্পাদকেরা তাক থেকে ঝুল পড়া মোটা মোটা ডিকশনারি আর আইনের কেতাব নাবিয়ে দাড়ি চুলকে তক্ক করচেন গণপিটুনি কাকে বলে, পিটুনি খেয়ে মরলে তাকে খুন বলতেই হবে নাকি ভিরমি খেয়ে মরেচে বল্লেই ল্যাঠা চুকে যায় ইত্যাদি।

তা বলে কোন বাবু, বিবিরই যে দয়ামায়া নাই তা ভাববেন না। সক্কলেই যে রামভক্তদের পক্ষে আচেন তেমনটি নয়। অনেকবাবু, বিবিফেসবুকে জব্বর লড়চেন। কেউ কেউ আবার লড়বার একটি নতুন রাস্তা বার করেচেন। রাস্তা বলতে আরেক তামাশা আর কি। এনাদের কথা হল তামাশাজব্দ কত্তে তামাশাই লাগে। সেই তামাশাটির কথাই এবার বলচি।

 

বাংলা তামাশা

রামের পরে বাংলা দেখেই যে বাবুরা জানালা দিয়ে আকাশ দেখচেন আর ভাবচেন বুঝি বিষ্টি আসচে তাই হুতোম বোতল, গেলাস নিয়ে বসবার তাল কচ্ছে আর আপনাদেরও বসার পরামর্শ দিচ্চে তেনাদের সুখ হবে না।বাংলা বলতে বলার বাংলা, লেখার বাংলা। গেলার বাংলা নয়। অবিশ্যি আপনাদের দোষ দেয়া যাবে না। ভাষাটির এমনি হাঁড়ির হাল যে নাম কল্লে আগে গেলার জিনিসটির কথাই মনে আসে বৈ কি।

তা এই হতভাগিনী ভাষাটির কদিন হল বাবু, বিবিদের কল্যাণে হুট করে কপাল খুলেচে মনে হচ্চে। বীর সেনানীরা ভেবে বার করেচেন রামভক্তদের সাথে লড়তে কেবল বাংলাভক্তরাই পারবে। তাই ফেসবুক কি টুইটার খুললেই দেখবেন “এই যে বাংলার সংস্কৃতির উপর আক্রমণ, এর বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে...” বলে চেঁচিয়ে কম্পুটার মাথায় কচ্ছেন অনেক বাবু, বিবি। ঘুরেফিরে চাট্টি রামমোহন, বিদ্যাসাগর মশায় আর দেবেন ঠাকুরের কনিষ্ঠ পুত্রের উক্তি সম্বল। সাথে রামভক্তদের চে এনারা যে বড় হিঁদু সেটি প্রমাণ কত্তে দক্ষিণেশ্বরের পাগল ঠাকুর আর তেনার বিশ্বখ্যাত বিলের কথা এদিক সেদিক গুঁজে দেয়া দস্তুর। বাস রে! কি জোর লড়াই রামভক্তদের সাথে!

এদিকে বিদ্যাসাগর মশায়ের নিজের প্রতিষ্ঠা করা ইশকুলটির এখন তখন অবস্তা। পাড়ায় পাড়ায় বাংলা মাধ্যম ইশকুলগুলিতে মাস্টারে মাছি তাড়ায় আর সরকারে মাস্টার তাড়িয়ে অন্য ইশকুলে পাঠায়সরকারে হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয় খুলচে, এদিকে বাবু বিবিরা হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে জব্বর লড়চেন। কেমনধারা? না তিন পুরুষ বাংলায় বাস করা বিহারী দোকানদারকে ধমকাচ্চেন “বাংলায় থাকতে গেলে বাংলা শিখতে হবে।” সরকারকে বলচেন বাংলায় যেন বাঙালিই চাকরি পায় তার ব্যবস্তা কত্তে হবে। নিজের ছেলেপুলেকে পাঠাচ্চেন সায়েবি ইশকুলে, দ্বিতীয় ভাষা হিন্দি। ওদিকে ফেসবুকে অতুলপ্রসাদ সেন কপি পেস্ট হচ্চেন দেয়ালে দেয়ালে “মোদের গরব মোদের আশা, আ মরি বাংলা ভাষা।” দুর্জনে বলচে এক বাবুকে নাকি কে জিগেস করেচিল এটি কার লেখা? নেহাত মূর্খ লোকটির প্রশ্নে বাবু তো রেগে কাঁই। শেষে বল্লেন “তোর ফোনে গুগল নেই?”

সে যা হোক, বাবু বিবিদের দমের শেষ নাই দেখে আমাদের সেই সম্পাদককে বল্লেম “ভায়া,আমাদের সেই বিদ্যোৎসাহিনী সভা আবার চালু কল্লে হয় না? বাংলা ভাষাটাকে বাঁচানো যে দরকার সে তো ঠিক। নইলে পিণ্ডি চটকাবো কোন ভাষার?”

ছোকরা আমার দিকে এমনি করে চাইলে যেন জেলেপাড়ার সং দেখেচে। বল্লে “বিদ্যায় আবার কার উৎসাহ দেখলেন আপনি? ট্রেনে বাসে কদিন ঘুরে দেখে আসুন দেখি বই পড়চে কে? পাড়ায় পাড়ায় রবীন্দ্র নজরুল সন্ধ্যা বন্ধ,লাইব্রেরি না হানাবাড়ি বোজা দায়, জাপানি কার্টুনের কাচে দক্ষিণারঞ্জন, যোগীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার ফেল পড়ে গেলেন, কবিরা সব পেটের দায়ে আবোল তাবোল সিনেমায় ইনিয়ে বিনিয়ে প্রেমের গান লিখচে, সন্ধ্যে হলেই ভদ্রলোকের মেয়ে বউরা টিভি খুলে এক বাবুর দুই বিয়ে হাঁ করে গিলচে, বাবুরা রাতে খেতে খেতে চ্যানেলে চ্যানেলে মুখে মারি আর ঠুকে মারি দেখচেন। আর উনি এসেচেন বিদ্যোৎসাহিনী সভা কত্তে।”

আমি থতমত খেয়ে বল্লেম “সে কি হে! তালে বাংলা বাঁচে কেমনে?”

সম্পাদক বল্লে “আপনাকে কে বাঁচাতে বলেচে? তামাশা দেখচেন দেখুন না।”

কথাটা হচ্চিল সম্পাদকের আপিসে বসে। এক মোটা চশমার বাবু বসেচিলেন। ইনি প্রায়ই আসেন। কী কত্তে আসেন সে সম্পাদক জানে, তবে এসে হাজির হবার আগেই তেনার গেলা মদের গন্ধ এসে হাজির হয়। আমাদের কথাবার্তা শুনে তিনি যারপরনাই হাসলেন। তারপর বল্লেন “রামে আর বাংলায় এত গোল কিসের ভাই? তিনদিন রাম, তিনদিন বাংলা করে নিলেই তো মিটে যায়। আর রবিবারে শুদু স্কচ।”

 

মূর্তির তামাশা

কথাটা সামান্য, তবু ভাবচি বলেই ফেলি। সম্পাদকের মুখেইখবর পেয়েচি কদিন আগে বিদ্যাসাগর মশায়ের কালেজে ঢুকে একদল হনুমান তেনার মূর্তি টুর্তি ভেঙে ছত্রখান করেচে। তা সেদিন নকশা লিখব বলে মুখরোচক দৃশ্য খুঁজে বেড়াচ্চি, দেখি তেনার কালেজের সামনে একখানা নূতন মূর্তি। সম্পাদকের দেয়া মোবাইলে ছবি তুলে টেলিপ্যাথি করে যাঁর মূর্তি স্বর্গে তাঁর কাচে পাঠালাম। তিনি অট্টহাস্য করে বল্লেন, বাঙালির অনেক উপকার করেচি বোঝা যাচ্চে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে আমাকে বেশ লম্বা চওড়া বানিয়ে দিয়েচে


0 Comments

Post Comment