পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আমার ছেলেবেলার শবেবরাত

  • 09 April, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 603 view(s)
  • লিখেছেন : আশরাফুল আমীন সম্রাট
ছেলেবেলার শবেবরাতগুলো ছিল বেশ আদরের। সকালে শীতের আমেজ। রোদ ঝলমল। বিকেলে হাল্কা ঠান্ডার উলের হাফ সোয়েটার। রমজান মাস আসছে।তারই আনন্দমুখর ট্রেলার শবেবরাত। স্মৃতিগুলো আজও মনে বাসা করে আছে। ক্ষণে ক্ষণে ঝিলিক দেয়। মনের অতল গভীরে আবার মিলিয়েও যায়। মধুর স্মৃতি, আবার বেদনারও বটে। এ বেদনা মধুরতাগুলো নতুন করে ফিরে না পাবার বেদনা। এ বেদনা কাঁদায় না। শিহরণ জাগিয়ে যায়।

ছেলেবেলার শবেবরাতগুলো ছিল বেশ আদরের। সকালে শীতের আমেজ। রোদ ঝলমল। বিকেলে হাল্কা ঠান্ডার উলের হাফ সোয়েটার। রমজান মাস আসছে।তারই আনন্দমুখর ট্রেলার শবেবরাত। স্মৃতিগুলো আজও মনে বাসা করে আছে। ক্ষণে ক্ষণে ঝিলিক দেয়। মনের অতল গভীরে  আবার  মিলিয়েও যায়। মধুর স্মৃতি, আবার বেদনারও বটে। এ বেদনা মধুরতাগুলো নতুন করে ফিরে না পাবার বেদনা। এ বেদনা কাঁদায় না। শিহরণ জাগিয়ে যায়।

শৈশবটা গ্রামে কাটিয়েছি। মুসলিমপ্রধান গ্রাম। নাম শাহনগর। ধর্মীয় গোঁড়ামি তেমন ছিল না। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গানবাজনা, নাটক, যাত্রাপালা সবকিছুই হত বিভিন্ন উপলক্ষ্যে।  গ্রামের এক প্রান্তে ছিল অন্ত্যজ শ্রেণির হিন্দু গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস। মুসলিমদের পালপার্বণে ওরা আসত। হাত লাগাত। শবেবরাতেও আসত। দিনের শেষে কেটলি ভরে চালের রুটি, পায়েস, হালুয়া এসব নিয়ে যেত। কখনই ওদের আলাদা মনে হয় নি। এখন ওরা আর তেমন আসে না বলে শুনেছি। কেন আসে না জানি না।

গ্রামে শবেবরাতের সকালগুলো বড্ড আলসে ছিল। ঘুম থেকে তাড়াতাড়ি ওঠার তাড়া ছিল না। পড়তে বসার হিড়িক ছিল না। স্কুলে যাওয়ার তাড়া ছিল না। উল্টে পড়তে না বসার অলিখিত একটা লাইসেন্স ছিল। বড়রাও কিছু বলত না। দিনের শুরুটাই খোশ মেজাজে। আজ তো আমাদের ছুটি।

জলখাবার বেলা থেকেই মা আর দাদির ব্যস্ততা দেখতাম। হেঁসেল থেকে ঘিয়ে ভাজা  বুটের হালুয়া, ডিমের হালুয়া, সুজির হালুয়ার গন্ধ চারদিকে তখন ছড়িয়ে পড়েছে। পাশের বাড়ি থেকে পোলাও এর সুগন্ধ নাকে ঢুকে সোজা পাকস্থলীতে ভুড়ভুড়ি কাটতে শুরু করেছে তখন । হেঁসেলে উঁকি মেরে দেখতাম গামলায় গম আর চালের রুটির পাহাড় জমে আছে। এই যে চালের রুটি আর গোস্তের পাতলা ঝোল, এটাই শবেবরাতের পেটেন্ট। রং বেরঙের হরেক কিসিমের হালুয়া দেখে হাত নিসপিস করত। কিন্তু ছোঁয়া যাবে না। সংযম। খেলে পেটে ব্যাথা হবে। বড়রা বলত। তবে, সন্ধেবেলায় আমেজ করে খাওয়ারও একটা ব্যাপার ছিল। আগেভাগে খেয়ে জিভ মেরে দিলে হবে না। আমেজের কৌলিন্য হারিয়ে যাবে। ভয় ছিল।

আমারা ছোটরা শবেবরাতকে বলতাম 'দিলদিলে'। কেন বলতাম জানি না। ক্ষুদেদের ছিল অন্য একরকমের ব্যস্ততা। গ্রামের দক্ষিণ দিকে বড় দিঘীর মতো একটা পুকুর আছে। পরিষ্কার টলটলে জল। গ্রামের লোক বলে 'বাঁধ'। সেখানে আমরা ভাইবোন ও পাড়ার ছেলেমেয়েরা দলবেঁধে যেতাম। পুকুর পাড়ের এঁটেল মাটির খোঁজে। দলা পাকানো এঁটেল মাটি সবার হাতে হাতে। হুল্লোড় করতে করতে ফিরতাম।

পাড়ায় একটা কুয়ো ছিল। কুয়োর চারপাস সিমেন্ট প্লাস্টার করা। সেখানে আমরা ক্ষুদেরা জড়ো হতাম। দাদা-দিদি গোছের বড়রা আমাদের চিরাগ বানিয়ে দিত। চিরাগ হল মাটির প্রদীপ। তাতে মোমবাতি রেখে আমরা ক্ষুদেরা সন্ধ্যাবেলা দলবেঁধে বেরোতাম। এটা রেওয়াজ ছিল। সেই গল্পে পরে আসছি।

চিরাগ বানানো হয়ে গেলে ঘরের আঙিনায় শুকোতো দিতাম। তারপর মাগরিবের আজান ও নামাজ অব্দি অপেক্ষা। তখন শবেবরাতের দিন আব্বার অফিস ছুটি থাকত না। আব্বা সেদিন একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরতেন। অফিস ফেরত আব্বার ব্যাগ থেকে বেরতো রংবেরঙের ছোট ছোট মোমবাতির প্যাকেট, ফলমূল, মিষ্টান্নের খাপে নানা মিষ্টান্ন। পেড়া, ছানার কেক, সাদা রসগোল্লা, অরেঞ্জ মিষ্টি, সন্দেশ, আরও কত কী।

সন্ধ্যেবেলা মাগরিবের আজানের পর বাড়ির আঙিনায় আমি, আমার দিদি, আমার তুতো ভাইবোনেরা মোমবাতি জ্বালাতাম। ছোট ছোট পুঁচকে পুঁচকে মোমবাতি বাড়ির সারা আঙিনা জুড়ে, বাড়ির পাঁচিলে, জানালার ধারে। জ্বালানোর পরেও শান্তি ছিল না। কোথাও কোন পুঁচকে কুপোকাত হয়ে হয়ে গেছে কি না, কেউ দুষ্টুমি করে নিভে গেছে কি না ঘুরে ঘুরে দেখে বেড়াতে হত।

ইসলামের মারফতি মাজহাবের বিশ্বাস শবেবরাতের রাত বরকতের রাত। আল্লাহতালা অনেক জাহান্নামবাসীকে ক্ষমা করেন। বরকত দিয়ে তাদের জান্নাতবাসী করেন। সে সরল বিশ্বাসেই মোমবাতি জ্বালিয়ে শবেববরাতের রাতকে আলোয় ভরিয়ে তোলা। অনেকে সেই বিশ্বাস থেকে মরহুম আত্মীয়ের উদ্দেশে কবর জিয়ারত করতেন। এই মাজহাবের অনুসারীগণ এশার নামাজের রাতে দীর্ঘ সময় নফল নামাজ পড়তেন। ছোটবেলায় অবশ্য এতসব জানতাম না। আমরা বলতাম দিলদিলের বড় নামাজ।

মাগরীবের পর বাড়িতে মোমবাতি জ্বালানোর কাজ শেষ হলে পাড়ার ক্ষুদেরা ও আমরা ভাইবোনেরা জড়ো হতাম কোনও এক বাড়িতে। প্রত্যেকের ডান হাতে জলন্ত মোমবাতিসহ চিরাগ। কেউ কেউ অন্য হাতে বড় কেটলি ধরে থাকত। কারো মাথায় থাকত বড় ঝুড়ি। কারো মাথায় গামলা। এরপর হাসতে হাসতে সবাই মিলে দলবেঁধে ফকিরী সাজে বেরিয়ে পড়া। পাড়ায় পাড়ায় টইটই করে। দাদি বলত, "মোমবাতি গলা ভাল করে ধরিস, গায়েপায়ে লাগাইস না"।

বাড়ির চৌহদ্দি থেকে বেরিয়েই সুর করে কিন্তু চেঁচিয়ে আমাদের মোমবাতি মিছিল গান ধরত,

"দিলদিলে মুহম্মদ হজরত আলী,
যে দিবে মুরগীর রাণ তার হবে সুনার চাঁদ"

প্রথমেই নবী (সঃ) ও  হজরত আলীকে স্মরণ। এরকম একটি রাজকীয় ব্যাপার থেকে ধপাস করে নেমে ভাল ভাল খাবারের জন্য দ্বিতীয় লাইনেই তদবীর। যে বাড়ি 'মুরগীর রাণ' দেবে সেই বাড়িতে 'সুনার চাঁদ' ছেলে জন্মাবে। 'মুরগীর রাণ' মানে দেশী মুরগীর লেগ পিস। তখন ব্রয়লার পোল্ট্রি বাজারে আসে নি। মুরগী বলতে আমরা তখন গৃহস্থের দরমায় পোষা শীর্ণকায় দেশী মুরগীই বুঝতাম। জমাটি শীত থাকলে ধুকীর সাথে হাঁসের গোস্থের ঝোল। আহ! যেন অমৃত। আর হ্যাঁ, 'সুনার চাঁদ' মানে হল চাঁদপনা মুখের সুদর্শন পুত্র সন্তান। সোনার ছেলে আর কি।

গাঁয়ে রেপুটেড কিপটের অভাব ছিল না। সেই কিপটে বাড়ির দরজার কাছেই সজোরে চেঁচিয়ে --

"এইকুন ঐকুন কোচ্ছে গোসের হাঁড়ি লুকোয়ছে,
গোস দিবার ডরে খিল মাচ্ছে ঘরে"

কিপটে বাড়ির লোক গুলোকে নিয়ে মোটা দাগের ব্যাঙ্গ। ভিখারীকে শুধু এক মুঠো চাল দিয়ে অথবা না দিয়ে ভাগিয়ে দেওয়ার 'সুনাম' ছিল সেসব বাড়ির। আমরা ক্ষুদে কৃষ্ণরা আসছি, সেই ভয়ে মাঝবয়সী চাচী যেন এ ঘর ও ঘর করে মাংসের হাঁড়ি লুকানোর চেষ্টা করছে। যাতে করে আমরা বাড়িতে হানা দিয়েও হাঁড়ির হদিস পেতে না পারি। এমনকি রান্নাঘরে তারা তালাচাবিও মারতে পারে যাতে আমরা রান্না ঘরে ঝটিকা হানা দিতে না পারি।

কোন বাড়ির সদ্য বিবাহিতা ভাবী হয়তো মজা করে আধখানা চালের রুটি আমাদের ধরিয়ে দিত। রুটি নেওয়ার জন্য মাথায় ঝুড়ি নিয়ে থাকা নাদুস নুদুস ক্ষুদে চেঁচিয়ে গান ধরল,

"যে দিবে ছেঁড়া রুটি
তার হবে কানা বেটি।"

সঙ্গে সঙ্গে সুর মিলিয়ে সবাই মিলে একসঙ্গে বার বার ছড়া রিপিট। সরাসরি "অভিশাপ অন দ্য স্পট" যাকে বলে। ছেঁড়া রুটি দিলেই অন্ধ মেয়ে জন্মাবে ঘরে। দেখ কান্ড! হাসতে হাসতে ভাবী অনেক কিছু ঢেলে দিত গামলায়। হালুয়া, মিষ্টি আরও কত কী। দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হত আশীর্বাদ বর্ষণ। সবাই মিলে নকল দোয়া চাইতাম " ভাবীর কোলে বছর বছর সুনার চাঁদ আসুক", অমুক হোক, তমুক হোক, হ্যান ত্যান করে নানা কিসিমের শুভ কামনা করতে করতে বেরিয়ে যাওয়া।

এবার অন্য পাড়ার কোন এক গলি দিয়ে সমস্বরে গান ধরে মোমবাতি মিছিল এগিয়ে যাচ্ছে। কোন এক চাচী ঘরের দরজা খুলে মিছিল থামিয়ে গামলায় কয়েকটা হালুয়ার টুকরো দিয়ে যেত আদর করে। গানের সুর বদলে মিছিল একসঙ্গে,

"যে দিবে হালুয়া
তার হবে কালুয়া"।

এই কালুয়া কে, আমি ঠিক জানি না। গ্রামের বেশ কিছু ছেলের নাম ছিল কালুয়া। তাদের গায়ের রং ছিল কালো। তবে কালুয়া মানে কালো পুত্রসন্তান হলেও এটা অভিশাপ নয়, আশীর্বাদই। কি জানি, এই কালুয়া মানে কৃষ্ণ কিনা। যার গায়ের রং কালো কিন্তু দ্য মোস্ট কিউট বেবি, দ্য আর্থ হ্যাজ এভার সিন। অর্থাৎ, যে হালুয়া দেবে সে কৃষ্ণের মতো পুত্রসন্তান লাভ করবে।

ক্ষুদেদের এমন একাধিক মিছিল বেরতো গোটা গ্রাম জুড়ে। তাদের মধ্যে এক অলিখিত প্রতিযোগিতাও ছিল। কারা কত হাসাতে পারল, কারা কত চেঁচিয়ে গাইতে পারল, কাদের ঝুলিতে কত জোগাড় হল -- এগুলোই ছিল এক দল অন্য দলকে টপকে যাওয়ার প্যারামিটার। পাশাপাশি দুই মিছিল পেরিয়ে যাওয়ার সময় হত খুনসুটে বাগবিতণ্ডা।

আমাদের দলে অধীর ও সুমাই থাকত। অধীর বায়েন আর সুমাই টুডু। সুমাই আর অধীর আমাদের বাড়িতে কাজ করত। ওরা আমাদের থেকে বয়সে বড় ছিল। সকালে চিরাগ বানানো থেকে শুরু করে মোমবাতি জ্বালানো এবং মোমবাতি মিছিলে অংশগ্রহণ আমাদের সর্বক্ষণের সঙ্গী ওরা। মিছিল শেষে ঘরে ফিরে বাড়ির বারান্দায় সবাই মিলে তালায় পেতে বসতাম। মাঝখানে গম ও চালের রুটির গামলা, হালুয়ার ডিব্বা, কেটলিতে মুরগীর গোস্থ, থালায় নানা রকমের মিষ্টি। সব গুলোই চেখে চেখে দেখতাম। খেতে খেতে ভাই বোনেরা খুনসুটি করতাম। যারা ভাল খেতে পারত তারা খেত।

কিন্তু এত এত খাবার খাবে কে ? বেশির ভাগটাই অধীর আর সুমাই গামছা বেঁধে নিয়ে যেত। ওদের বাড়ির লোক আর পাড়ার ছেলেদের জন্য।  আমরাও দু হাত ভরে অধীর আর সুমাইকে বেঁধে দিতাম। পাশের এক আদিবাসী গ্রাম থেকেও নারী পুরুষ শিশু কিশোরেরা দল বেঁধে আসত। বিশ্বাস করুন, শ্রীহীন ক্ষুধার্ত আদিবাসী শিশুর আনন্দ দেখে বুক ভরে যেত। আধপেটা মানুষগুলোকে গ্রামের সবাই দু হাত ভরে যা দিত তাতে আগামী কয়েকদিন খাবারের ভাবনা ভাবতে হত না। গ্রাম বাংলায় অন্ত্যজ শ্রেণির হিন্দু ও আদিবাসী মানুষের সঙ্গে মুসলিমদের এই হৃদ্যতার সম্পর্ক আজন্মলালিত শহুরে বংদের জানার কথা নয়।

শবেবরাৎ লৌকিক ইসলামের অঙ্গ। বিশ্বজোড়া ইসলামীয় বিশুদ্ধবাদ দিয়ে এর ব্যাখ্যা মেলে না। সে অন্য বিতর্ক। আজ থাক। আজ বরং একটু সরল হই। লোককথা প্রচলিত আছে যে শবেবরাতের রাতে মরহুম আত্মীয়েরা নাকি তাদের ছেড়ে যাওয়া ঘরে কিছু সময়ের জন্য আসেন। এটা কেবলই বিশ্বাস, অবশ্যই প্রশ্নযোগ্য। সেই বিশ্বাস থেকেই ঘরগুলো তাদের জন্যই আলোয় সেজে থাকে। মাজারগুলো আলোকসজ্জায় সাজানো হয়। আগরবাতির সুগন্ধে চারপাশ ম-ম করে। নানবিধ সুস্বাদু খাবারের আয়োজন থাকে। এই বিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের অধুনা বিজ্ঞানমনস্কতা হয়তো খাপ খায় না। কিন্তু কেন জানি না, সরল মন বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। আমাদের প্রিয়জন যারা আমাদের ছেড়ে জীবনের মায়া কাটিয়ে চলে গেছেন তাদের যদি আবার দেখা পেতাম! একদিনের জন্য হলেও যদি ফিরে আসত। নিদেন পক্ষে কয়েক ঘন্টার জন্য। যদি সত্যিই এমন হত। কত ভাল হত বলুন তো!  

(বছর দুয়েক আগের লেখা। এবারের শবেবরাত শব্দহীন। আলোহীন। আড়ম্বরহীন। এই শব্দহীনতা প্রমাণ করল সুবোধ বেঁচে আছে। ধন্যবাদ এলাকাবাসী)

0 Comments

Post Comment