পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

প্রাচীন বঙ্গের নদীরূপা সরস্বতী পাড়ের কথা

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 210 view(s)
  • লিখেছেন : মুকুট তপাদার
ত্রিবেণীতে সেনাপতি জাফর খাঁর দরগায় একাধিক দেব দেবীর নিদর্শন রয়েছে। একটি স্তম্ভের গায়ে ভূমিস্পর্শ বুদ্ধমূর্তি খোদিত আছে। এখানে জৈন মূর্তির নিদর্শন দেখা যায়। এরথেকে প্রমাণিত একসময় স্থানীয় এইসব অঞ্চলে বৌদ্ধ বিহার ও জৈন ধর্মের কেন্দ্র ছিল বলে মনে করছেন গবেষকরা। হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে দরগায় আসেন। যা দীর্ঘ ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিচায়ক।

রাঢ়বঙ্গ নদীমাতৃক অঞ্চল। এখানকার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, অর্থনীতি, ইতিহাস নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। হুগলির পূর্ব ও পশ্চিম পাড় ধরে বৈষ্ণব ধর্মের ভিত্তি স্থাপন হয়। নবদ্বীপ পেরিয়ে হুগলি নদী আরো দক্ষিণে এগিয়েছে। পশ্চিমি শক্তি তাদের বাণিজ্য কেন্দ্র নদীকে ঘিরেই গড়ে তুলেছিল। বঙ্গদেশে হুগলি নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরস্বতী নামক এক শাখা নদীর নাম।

হুগলি জেলার মধ্যেই পাশাপাশি অবস্থিত ত্রিবেণী ও সপ্তগ্রামে অতীতে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের এক তীর্থ গড়ে ওঠে। একেবারে নদীর পাড় ধরে ধর্মস্থানটিতে কেন্দ্র করে একাধিক দেবালয় নির্মাণ হয়েছিল। ত্রিবেণীর কাছে হুগলি থেকে সরস্বতী, যমুনা ও কুন্তী নামে তিনটি শাখা নদী বেরিয়েছে। এরমধ্যে হুগলি নদী, সরস্বতী ও যমুনা নিয়ে দক্ষিণের ত্রিবেণী সঙ্গম বলা হয়। যা মুক্তবেণী নামেও পরিচিত। মূল হুগলি নদী থেকে উৎপন্ন হওয়া নদীগুলো মুক্ত বা আলাদা হয়েছে।

পৌরাণিক কাহিনি আছে যে, কনৌজের রাজা প্রিয়বন্তের সাত সন্তান এখানে আসার পর সরস্বতী নদীর তীরে একটি করে গ্রামে তাঁরা বাস করতেন। তাই এই জায়গার নাম সপ্তগ্রাম। আর ত্রিবেণী নামের অর্থ হলো তিনটি নদীর মিলনস্থল।

পশ্চিমে বাংলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে সরস্বতী প্রবাহিত হয়ে হাওড়ায় এসে হুগলি নদীর সঙ্গে আবার মিশে গেছে। প্রাচীন কালে বলা হতো সরস্বতীর দুই অর্থ, "নদীরূপা" ও "দেবীরূপা"।

"দ্বিবিধা হি সরস্বতী বিগ্রহবদ্দেবতা নদীরূপা চ"।

সরসের আদি অর্থ জল। বৈদিক সাহিত্য অনুসারে সরস্বতী ছিল এককালে প্রধান নদী। প্রাচীন সাহিত্যে বলা আছে, সরস্বতী আসলে সিন্ধু নদীর শাখা। যেখানে ঋষিরা বসবাস করতেন। আর্যগণ সিন্ধু নদী পেরিয়ে গাঙ্গেয় ভূমিতে এসেছিলেন। সরস্বতী ছিল আর্যগণের প্রিয় নদী। প্রয়াগতীর্থে যুক্তবেণী সঙ্গমে গঙ্গা ও যমুনার সঙ্গে সরস্বতী পূর্বদিকে লুপ্ত হয়ে গিয়েছে। হুগলির নিকটে ত্রিবেণীতে গঙ্গার শাখা স্রোতস্বিনী সরস্বতী। যার প্রবাহধারা বর্তমানে ক্ষীণ। দেবীরূপা অর্থাৎ মূর্তিতত্বে সরস্বতী বীণাহস্তে দণ্ডায়মান দেখা যায়। বিষ্ণু মূর্তির নিচে বীণাহস্তে দেবীকে আগে পুজো করা হতো। দ্বিভঙ্গ বা ত্রিভঙ্গ মুদ্রায় বিষ্ণুর পাশে সরস্বতী থাকেন। সরস্বতী মূর্তির হাতে পদ্মফুল অনেক সময় দেখা যায়। বিষ্ণু মূর্তির হাতেও পদ্ম থাকে তাই তার আরেক নাম পদ্মনাভ। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিভিন্ন প্রাচীন মূর্তি ও নানাস্থান থেকে প্রাপ্ত পাথরের মূর্তিতে এমন নিদর্শন রয়েছে।

বঙ্গদেশে ত্রিবেণীর সন্নিহিত সরস্বতী এই নদী পথ ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য চলতো। ১৫৩৩ সালে চৈতন্যদেবের দেহবসান হয়। কৃষ্ণদাস কবিরাজ, লোচনদাস, জয়ানন্দর মত কবিরা বিভিন্ন ধরনের চৈতন্য অন্তর্ধান নিয়ে আলোচনা করেছেন। মহাপ্রভু লোকান্তর হবার পরে তাঁর প্রধান পার্ষদ নিত্যানন্দ প্রভু বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করতে এলেন ত্রিবেণী ও সপ্তগ্রামে। মহাপ্রভু তাকে নির্দেশ দেন হরিনাম-সংকীর্তন সকল শ্রেনীর মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে। বঙ্গে হিন্দু মুসলমান সকল মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে অপার প্রেম। সেইসময় এই অঞ্চলে বহু বণিক শ্রেণির বাস ছিল। বণিকদের মধ্যে গৌড়ীয় বা চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার পায়।

সোনা ও মুদ্রা ব্যবসায়ী সুবর্নবণিক ও কংসবণিকরা গুরুত্বপূর্ণ সপ্তগ্রাম বন্দর দিয়ে ব্যবসা করতেন। বস্ত্র, সোনা, রূপা, তামা সহ অন্যান্য ধাতু ও নানা প্রাকৃতিক সম্পদ বাণিজ্যে ব্যবহার হতো। প্রচুর বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজ আসা যাওয়া করতো। সেই জাহাজ থেকে মালপত্র ছোট নৌকা করে সরস্বতী নদী ধরে সপ্তগ্রাম হয়ে বঙ্গের বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে নগরে পৌঁছে যেতো। নদী পথে একসময়ে বিভিন্ন দেশ থেকে বণিকেরা বাণিজ্যতরী নিয়ে সপ্তগ্রাম বন্দরে আসতেন। ত্রিবেণীকে বোঝাতো পাথরে ঘেরা দেবতার মন্দির অধিষ্ঠিত নদী তীরের এক জনপদ। উড়িষ্যার স্বাধীন রাজা মুকুন্দদেব ১৫৬০ এর দশকে বঙ্গ আক্রমণ করেন। এখানকার আফগান শাসকদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ যুদ্ধ হয়। রাজা যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। এই ত্রিবেণীতে তিনি স্নানের জন্য ঘাট নির্মাণ করেও দেন।

ত্রিবেণী-সপ্তগ্রাম জুড়ে উড়িষ্যা রাজার এক বিরাট সামরিক মহড়া চলেছিল। এখানে স্থানীয় বহু পাথরের ভাস্কর্য, মন্দিরস্থাপত্য, ঘাট হিন্দু ধর্মের রাজারা নির্মাণ করে দিয়েছিলেন। সেগুলো সামরিক শক্তির আঘাতে বিপুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বহু ঐতিহাসিক দাবি জানান, চৈতন্যদেবের পর উড়িষ্যায় সামরিক শক্তির ক্ষয় হয়েছিল। কিন্ত এখানকার যুদ্ধ বিগ্রহ এক অন্য স্বাক্ষ্য বহন করছে। উড়িষ্যা রাজা সৈন্য নিয়ে একেবারে ত্রিবেণী পর্যন্ত চলে এসেছিলেন। জানা যায়, মুকুন্দদেবের সঙ্গে সুলতানী শাসকদের যুদ্ধে বহু দেবালয় ও স্থাপত্য ধ্বংস হয়ে যায়। 

বহু ঐতিহাসিকদের মতে, ত্রিবেণী ঘাটের কাছে এক সুবিশাল উড়িষ্যা রীতির দেউল মন্দির ছিল। যা বাংলা রীতির মন্দির নয়। রাখালদাস বন্দোপাধ্যায় ও মণি সাহেব সরস্বতী নদীর পাড় ধরে ক্ষেত্রসমীক্ষা করেছিলেন। বহু প্রাচীন নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায়। ত্রিবেণী ঘাটের ওপর আজো প্রাচীন কিছু দেব দেবীর মূর্তি আছে। যেগুলো দেখে অনুমান করা হয়েছিল ১১ ও ১২ শতকের সময়কার। ঐতিহাসিকদের দাবী ওই দেউল মন্দিরে এই সমস্ত বিগ্রহগুলো ছিল। যুদ্ধে সেই দেউল ধ্বংস হয়েছে। ত্রিবেণীতে সেনাপতি জাফর খাঁর দরগায় একাধিক দেব দেবীর নিদর্শন রয়েছে। একটি স্তম্ভের গায়ে ভূমিস্পর্শ বুদ্ধমূর্তি খোদিত আছে। এখানে জৈন মূর্তির নিদর্শন দেখা যায়। এরথেকে প্রমাণিত একসময় স্থানীয় এইসব অঞ্চলে বৌদ্ধ বিহার ও জৈন ধর্মের কেন্দ্র ছিল বলে মনে করছেন গবেষকরা। হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ একসাথে দরগায় আসেন। যা দীর্ঘ ধর্মীয় সহাবস্থানের পরিচায়ক।

হুগলি নদী থেকে উৎপন্ন সরস্বতী আরো দক্ষিণে প্রবাহিত হয়েছে। গতি পরিবর্তন করেছে। কত জৌলুস, জনপদ, নৌবন্দর, বসতি ছুঁয়ে হাওড়ার সাঁকরাইলে আবার হুগলি নদীতে মিশেছে। এই প্রবাহপথে নদীকে ঘিরে আছে পৌরাণিক, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সব স্থান। সরস্বতী নদীর পাড়ে হুগলির চণ্ডীতলা। চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে ধনপতি সওদাগরের কথা জানা যায়। শোনা যায়, তাঁর পুত্র শ্রীমন্ত সওদাগর বাণিজ্যের কারণে সরস্বতী নদী পথে নৌকায় হুগলি নদী পেরিয়ে সমুদ্রযাত্রা করতেন। যাত্রাপথে চণ্ডীতলায় দেবী চণ্ডীর ঘট স্থাপন করে পুজো করেন। সেইস্থানে মন্দির নির্মাণ করে দেন। চণ্ডীতলা, জেলেপাড়া, পর্তুগিজ নৌবন্দর বাকসা, গরালগাছা প্রভৃতি একাধিক স্থান ছোট বড় বহু ঘটনার সাক্ষী। 

পলি জমে সরস্বতী আজ শুকিয়ে গেছে। হারিয়েছে সেকালের সেই বন্দর। ক্ষীণতোয়া নদীটি শতকের পর শতক ধর্মীয় সংস্কৃতি, পৌরাণিক কাহিনি, হাজারো বিশ্বাস, মিথ, ঐতিহ্য, বাণিজ্যিক গুরুত্ব, ইতিহাস নিয়ে বাংলায় ষোড়শ শতাব্দীর এক সামগ্রিক ছবি ফুটিয়ে তুলেছে। যা অমূল্য সম্পদ।

 

0 Comments

Post Comment