পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

ফসল চেনে না ধর্ম

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 202 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস মিথিয়া
বিভাজনের রাজনীতি বৃদ্ধিকে থমকে দেয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে দেশের মাঠপর্যায় পর্যন্ত—সর্বত্রই কৃষি উন্নয়ন, মাটির সুরক্ষা ও পরিবেশবান্ধব চাষে মুসলিম চাষিদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ প্রশাসনিক স্বীকৃতিতে যখন তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হয়, তখন তা অর্থনৈতিক প্রগতির পথকেই রুদ্ধ করে। স্বাধীনতা দিবসের দিন, রাজ্যপালের কৃষকদের সম্মান জানানোর সময়ে, না হলে বাংলার একজনও মুসলমান কৃষক পাওয়া যায় না, তা কি হতে পারে?

কোনও রাষ্ট্র যখন তার উৎপাদকদের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আলাদা করে দেয় কিংবা ধর্মের নিরিখে তাঁদের কাজের মূল্যায়ন করে, তখন তা শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে বঞ্চিতই করে না, বরং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতাকেও ধ্বংস করে। পাশাপাশি অর্থনৈতিক বিকাশের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়। বর্তমান ভারতে এই ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি ক্রমশ প্রকট হয়ে উঠছে। জাতীয় স্তরের সেই প্রবণতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজ্য সরকারগুলোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও বৈষম্যের ছায়া স্পষ্ট হচ্ছে।

প্রতি বছর স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গের লোকভবনে (পূর্বতন রাজভবন) রাজ্যপাল ‘অ্যাট হোম’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এই অনুষ্ঠানে সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানিত করা হয়। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সদ্য উদযাপিত স্বাধীনতা দিবসে সমাজের নানা গুণীজনের পাশাপাশি ‘পরিবেশবান্ধব ও স্থিতিশীল’ কৃষিকাজে যুক্ত কৃষকদেরও সম্মানিত করা হয়েছে। সেই উদ্দেশ্যে রাজ্যের কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন দপ্তর থেকে যে ৬০ জনের তালিকা পাঠানো হয়েছিল, তার মধ্যে থেকে ৫০ জনকে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়—অথচ অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে সেই তালিকায় একজনও মুসলিম কৃষকের নাম ছিল না। মালদা ও মুর্শিদাবাদের মতো মুসলিম-প্রধান জেলাগুলোতে সিংহভাগ মানুষই কৃষিজীবী। জমিতে ক্ষতিকর রাসায়নিকের বদলে বিষমুক্ত জৈব সার ও প্রাকৃতিক কীটনাশক ব্যবহার করে পরিবেশ ও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষিক্ষেত্রে এমন অনন্য ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও মুসলিম কৃষকদের সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই ধরনের উপেক্ষা আসলে ‘বাদ দেওয়ার রাজনীতি’র (Politics of Exclusion) এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। তেভাগা আন্দোলন থেকে শুরু করে আধুনিক টেকসই কৃষি—সর্বত্রই হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের কৃষিজীবী মানুষের কায়িক শ্রম ও যৌথ অবদান রয়েছে। তাই স্বীকৃতি প্রাপকদের তালিকা থেকে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে পুরোপুরি বাদ দেওয়া প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও নীতিগত স্বচ্ছতাকেই বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

অথচ ইতিহাস বলে, আমাদের দেশে কৃষকদের সাফল্য কিংবা অধিকার আদায়ের লড়াই কোনও দিনই ধর্মের সংকীর্ণ গণ্ডিতে আটকে ছিল না। ১৯৪৬ সালের শেষভাগে যখন অবিভক্ত বাংলা মারাত্মক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার দাবানলে জ্বলছিল, ঠিক সেই কঠিন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশেই জন্ম নিয়েছিল ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কৃষক সভার নেতৃত্বে ভাগচাষীদের ন্যায্য অধিকার এবং ফ্লড কমিশনের সুপারিশ (১৯৪০ সালে গঠিত এই কমিশন ভাগচাষীদের উৎপন্ন ফসলের দুই-তৃতীয়াংশ পাওয়ার সুপারিশ করেছিল) বাস্তবায়নের দাবিতে হিন্দু ও মুসলিম কৃষক যৌথভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন। সেই সংগ্রাম স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে, মাটির টান, পেটের খিদে আর শ্রমের অধিকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলে না। স্বাধীনোত্তর ভারতে, বিভিন্ন রাজ্য বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালে এই ঐতিহাসিক সত্যের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিফলন অত্যন্ত স্পষ্ট।

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী রাজ্যের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম। রাজ্যের গ্রামীণ পরিকাঠামো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতিতে এই সম্প্রদায়ের ভূমিকা কতখানি বিস্তৃত। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, পশুপালক এবং তাঁত ও হস্তশিল্পের মতো ক্ষেত্রে যুক্ত মানুষের এক বড় অংশই মুসলিম সম্প্রদায়ের। মূলত তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ওপর ভর করেই টিকে রয়েছে এই খাতগুলো। পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী পাট চাষ আজও যেটুকু টিকে রয়েছে, তা মূলত এই সম্প্রদায়ের কৃষকদেরই নিরলস পরিশ্রমের ফলে। নদীমাতৃক বাংলার চর অঞ্চলগুলোতে কিংবা সীমান্তবর্তী প্রান্তিক জেলাগুলোতে কঠিন প্রাকৃতিক প্রতিকূলতাকে জয় করে শস্য উৎপাদন বজায় রাখা এবং পরিবেশবান্ধব ও স্থিতিশীল কৃষিকাজকে টিকিয়ে রাখায় তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য। বিশেষ করে মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলার প্রান্তিক মুসলিম চাষিরা তুলাইপাঞ্জি ও গোবিন্দভোগের মতো বিলুপ্তপ্রায়, সুগন্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীল ঐতিহ্যবাহী দেশি ধানের জাত সংরক্ষণে মূল কাণ্ডারী হিসেবে কাজ করছেন। ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের বদলে নিম পাতা, তামাকের নির্যাস ও গোমূত্রভিত্তিক প্রাকৃতিক নির্যাস ব্যবহার করে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করা এবং বিষমুক্ত খাদ্য উৎপাদনে পথ দেখানোর ক্ষেত্রে এই কৃষকদের শ্রম ও উদ্ভাবনী কৌশলই মূল চালিকাশক্তি। বস্তুত, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর শ্রম ও প্রাকৃতিক অবদান ছাড়া রাজ্য তথা দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির গতি বজায় রাখা অসম্ভব।

বাংলার এই মাঠপর্যায়ের অবদানের মতোই জাতীয় স্তরেও টেকসই কৃষির উদ্ভাবনে মুসলিম কৃষক, গবেষক ও উদ্যোক্তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে কর্ণাটকের আহমেদ খানের কথা উল্লেখ করা যায়—তিনি জৈব বর্জ্য পুনর্ব্যবহার, কেঁচো সার ও তরল জৈব সার ব্যবহারের মাধ্যমে পুরো খামারকে ‘জিরো-ওয়েস্ট’ বা বর্জ্যহীন মডেলে রূপান্তর করে প্রথাবিরোধী কৃষির এক অনন্য দিশা দেখিয়েছেন, যা গ্রামীণ কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

কেবল জাতীয় স্তরেই নয়, বিশ্বজুড়ে মুসলিম উদ্যোক্তা, গবেষক ও প্রান্তিক কৃষকেরা টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও পরিবেশবান্ধব কৃষিতে অনন্য সাফল্য অর্জন করে চলেছেন। আন্তর্জাতিক স্তরে টেকসই কৃষির অন্যতম সেরা উদাহরণ মিশরের ড. ইব্রাহিম আবুলইশ প্রতিষ্ঠিত বিশ্বখ্যাত ‘সেকম’ (SEKEM) প্রকল্প। মিশরের অনাবাদি ও শুষ্ক মরুভূমিতে বায়োডাইনামিক কৃষি (Biodynamic Agriculture) এবং অর্গানিক চাষ পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি পুরো অঞ্চলকে উর্বর শস্যক্ষেতে রূপান্তর করেন। মরুভূমির বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় কৃষকদের স্বাবলম্বী করার এই অবদানের জন্য তাঁকে বিকল্প নোবেল হিসেবে পরিচিত ‘রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড’ (Right Livelihood Award)-এ ভূষিত করা হয়।

ফেরা যাক, পশ্চিমবঙ্গের ঘটনায়—একদিকে রাজ্যের কৃষিতে মুসলিম চাষিদের অবদান, আর অন্যদিকে রয়েছে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব বা অনগ্রসরতাকে যখন রাজনৈতিক স্বার্থে ধর্মীয় রূপ দেওয়া হয়, তখন তা কেবল সমাজে ফাটল তৈরি করে না, দেশের উন্নতির মূল ভিত্তিকেই নষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের পর থেকে বাজারে বৈষম্য ও অসন্তোষ বেড়ে যাওয়ায় এই রাজনীতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। কাজের সুফল যখন নির্দিষ্ট কিছু সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর হাতে আটকে থাকে, তখন পিছিয়ে পড়া মানুষের রাগ ও ভয়কে রাজনৈতিক কাজে লাগাতে ধর্মের মোড়ক পরিয়ে দেওয়া হয়, যা সরাসরি সাম্প্রদায়িকতার জন্ম দেয়।

তবে, কৃষি বা অন্য কোনও অর্থনৈতিক উৎপাদনে জাতি, ধর্ম বা জনগোষ্ঠীর পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক বর্জনের (Institutional Exclusion) এই ঘটনা শুধু আমাদের দেশ বা রাজ্যে নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই ঘটেছে। কিন্তু সেই ইতিহাস প্রমাণ করে, যখনই রাষ্ট্রীয় নীতিতে দক্ষতার বদলে পরিচয়ভিত্তিক বিচার চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন তা কৃষিসহ সামগ্রিক অর্থনীতির অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনে। চলুন একটু দেখে নেওয়া যাক এই ধরনের বিভাজন কৃষিতে কী ক্ষতি করতে পারে—

 প্রথমত, এই বৈষম্যের সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের সামগ্রিক ফসল উৎপাদনের ওপর। অভিজ্ঞ ও দক্ষ কৃষকদের যদি কোনো বিশেষ পরিচয়ের কারণে জমি বা প্রযুক্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়, তবে গোটা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাই ধসে পড়ে। যেমন, ২০০০-এর দশকে জিম্বাবোয়েতে যথাযথ পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতা ছাড়াই কেবল বর্ণভিত্তিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করে রাতারাতি জমির মালিকানা বদলে দেওয়া হয়। ফলস্বরূপ, কিছু বছরের মধ্যে গমসহ প্রধান শস্যের উৎপাদন ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ কমে যায়। একসময়ের “আফ্রিকার শস্যভাণ্ডার” হিসেবে পরিচিত দেশটি হঠাৎ করেই খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হয়। একইভাবে, ১৯১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন করে কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের সবচেয়ে অনুর্বর জমিতে ঠেলে দেওয়ায় দেশটির কৃষি উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়।

দ্বিতীয়ত, বর্জনের এই রাজনীতি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা কৃষিজ্ঞান ও জলবায়ু-সহনশীল উদ্ভাবনকে ধ্বংস করে দেয়। কোন মাটিতে কোন ফসল ভালো হবে, দেশি বীজের বৈচিত্র্য কেমন বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে—এই ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান বহু প্রজন্মের অভিজ্ঞতায় গড়ে ওঠে। কিন্তু বৈষম্যের কারণে কৃষকেরা যখন জমি হারান, তখন সেই অর্জিত জ্ঞানও হারিয়ে যায়। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের (USDA) বর্ণবাদী নীতির কারণে গত এক শতাব্দীতে কৃষ্ণাঙ্গ কৃষকদের জমির পরিমাণ ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে। এর ফলে আফ্রিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়ের শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে তোলা পরিবেশবান্ধব কৃষিকৌশল মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

তৃতীয়ত, বৈষম্যের কারণে কৃষিতে প্রয়োজনীয় ব্যাংক ঋণ ও সরকারি অনুদান পৌঁছায় না। ফলে পিছিয়ে পড়া কৃষকেরা অর্থসংকটে ভুগে জৈব চাষ বা ড্রিপ সেচের মতো আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারেন না। উপরন্তু, সরকারের নিরপেক্ষতার অভাব দেখলে কৃষকেরা চাষবাসে নতুন কোনো ঝুঁকি বা আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণের আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

 চতুর্থত , যেকোনো ধরনের বিভাজন খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে (Food Inflation and Instability) বাড়িয়ে দেয়বাড়িয়ে দেয়। বাজারে সরবরাহ কমলে খাদ্যদ্রব্যের দাম হু-হু করে বাড়ে। একই সাথে, জমি ও সরকারি স্বীকৃতির বৈষম্য সাধারণ উৎপাদকদের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম দেয়, যা দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক অশান্তি তৈরি করে জাতীয় বৃদ্ধিকে থমকে দেয়।

এই আলোচনা থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার— বিভাজনের রাজনীতি বৃদ্ধিকে থমকে দেয়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করে দেশের মাঠপর্যায় পর্যন্ত—সর্বত্রই কৃষি উন্নয়ন, মাটির সুরক্ষা ও পরিবেশবান্ধব চাষে মুসলিম চাষিদের অবদান অনস্বীকার্য। অথচ প্রশাসনিক স্বীকৃতিতে যখন তাঁদের  নাম বাদ দেওয়া হয়, তখন তা অর্থনৈতিক প্রগতির পথকেই রুদ্ধ করে। আমাদের রাজ্যের মালদা, মুর্শিদাবাদ, দুই ২৪ পরগনা ও উত্তর-দক্ষিণ দিনাজপুরের মতো জেলাগুলোতে তাঁদের হাত ধরেই কৃষিতে  রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমেছে, জৈব পদ্ধতির বিস্তার ঘটেছে এবং খরা-সহনশীল কৃষির প্রসার ঘটেছে। তাছাড়া, ঐতিহ্যবাহী দেশি ধানের সংরক্ষণ এবং সমন্বিত কৃষির (Integrated Farming) মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও তাঁদের  ভূমিকা অপরিসীম।

অথচ এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করে রাজনৈতিক স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিতে যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বোনা হচ্ছে, তা কেবল সামাজিক সৌহার্দ্যই নষ্ট করছে না, বরং গ্রামীণ বাজার ব্যবস্থা ও কৃষির যোগান শৃঙ্খলকে (Supply Chain) ভেঙে দিয়ে সামগ্রিক অর্থনীতিকে সংকুচিত করছে। জল, জমি বা কৃষিপণ্যের বিপণনে যখনই ধর্মীয় রঙ লাগানো হয়, তখন তা কৃষিনির্ভর জীবিকাকে সরাসরি সংকটের মুখে ঠেলে দেয়।

মাঠপর্যায়ে মাটির যত্ন নেওয়া ও পরিবেশবান্ধব চাষবাসে এই অবদানের পরও যখন সরকারি তালিকায় মুসলিম কৃষকদের ছেঁটে ফেলা হয়, তখন রাষ্ট্রের ওপর থেকে শ্রমজীবী মানুষের আস্থা চলে যায়। আধুনিক অর্থনীতির মূল কথাই হলো—সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এগোনো (Inclusive Development)। কোনো সরকারি সম্মান বা সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে যখনই ধর্মকে মাপকাঠি করা হয়, তখন তা উৎপাদক সমাজকে মানসিকভাবে শেষ করে দেয়। যে সমাজ তার আসল উৎপাদকদের স্বীকৃতি দিতে কার্পণ্য করে, সে দেশ কখনো স্থায়ী উন্নতি করতে পারে না।

সামাজিক বৈষম্য যেখানে জাতীয় সম্পদ নষ্ট করে, সেখানে সবাইকে সমান চোখে দেখাই অর্থনীতির চাকা সচল রাখার একমাত্র উপায়। আসল বিকাশ কোনো ধর্মীয় পরিচয় চেনে না—তা চেনে শুধুই মানুষের ঘাম, নতুন চিন্তাভাবনা আর শ্রমের মূল্য। লোকভবনের এই বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক সংকীর্ণতা থেকে সরকারকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। তেভাগা আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক অসাম্প্রদায়িক কৃষক ঐক্যের ঐতিহ্যকে ফিরিয়ে আনা এবং দেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষকে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ ছাড়া সম্মান জানানোই একটি সুস্থ, সবল ও বৈষম্যহীন দেশ গড়ে তোলার একমাত্র পথ।

0 Comments

Post Comment