যারা কোনোদিন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিল না, ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করল না, বরং জেলে বসে ইংরেজের কাছে মুচলেকা দিয়ে ঘোষণা করল যে, ছাড়া পেলে জীবনভর ব্রিটিশদের সেবা করবে, তাদেরই উত্তরসূরীরা আজ ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে এমন ভক্তি দেখাতে শুরু করেছে যে ঐ পুরনো প্রবাদটা আবার জনমানসে ফিরে আসছে —- “অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ!”
২০১৪ সালে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই তারা দুটি কাজ নিষ্ঠার সাথে চালিয়ে যাচ্ছে। একটি হল দেশের সমস্ত সম্পদ দেশি-বিদেশি কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়া। সেখানে অবশ্যই আদানির মত তাদের প্রিয়পাত্র কেউ কেউ রয়েছে। ভারতের অর্থনীতির চরম সর্বনাশ করে ছাড়ছে বিজেপি। আর এই সমস্ত কাজের যাতে কার্যকরী প্রতিবাদ প্রতিরোধ হতে না পারে তার জন্য লাগাতার ধর্মীয় বিদ্বেষ চালিয়ে যাওয়া, ধর্মীয় বিভাজন চালিয়ে যাওয়া এবং এভাবে মানুষের সমস্ত মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা। বন্দে মাতরমের মধ্যে বিজেপি হঠাৎ করে মুসলমান দলনের নতুন অস্ত্র পেয়েছে। ফলে শুরু হয়েছে বন্দে মাতরমের কপট বন্দনার ঘনঘটা।
এই গানে ‘মা’ হলেন দেশমাতৃকা। পরাধীনতার শৃংখলে আবদ্ধ দেশকে দুখিনী মা-এর কল্পনা এবং তাকে মুক্ত করার জন্য সন্তানদের দৃঢ়প্রতিজ্ঞা ব্যক্ত হয়েছে গানে। দেশের সৌন্দর্য, তাঁর অগাধ ঐশ্বর্য নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে উচ্ছ্বাস। তারই সাথে তাঁর শক্তির কথা বলা হয়েছে। এমন একটি গান নিয়ে হঠাৎ বিজেপির এমন মাতোয়ারা হবার কী কারণ? ‘দেশবিরোধী’ যাদবপুরকে শিক্ষা দিতে এসে ‘'দশ হাজার কন্ঠে বন্দে মাতরম” গাওয়ার হুংকার কেন? রাখী পূর্ণিমার দিনে মুখ্যমন্ত্রীর যাদবপুরে কর্মসূচিতে দশ হাজার কেন, দুই হাজার লোকও হয় নি, সে অন্য কথা। কিন্তু বন্দে মাতরম নিয়ে এই দাপাদাপির কী কারণ? বামপন্থীদের ‘'আজাদি” স্লোগানের বিরোধিতা করে এই শুভেন্দুই তো বললেন, “আবার আজাদি কীসের? দেশ তো স্বাধীন হয়ে গেছে!” কত সালে স্বাধীন হয়েছে সেটা অবশ্য তিনি গুলিয়ে ফেলেছিলেন কিন্তু দেশ স্বাধীন হয়ে যাওয়ার পর যদি ‘'আজাদি” স্লোগানের আর কোনো মাহাত্ম্য না থাকে তাহলে “বন্দে মাতরম” গান নিয়ে হঠাৎ এত আদিখ্যেতা বাড়ল কেন? কারণ গানটির ইতিহাস। ব্যাপারটা সকলেই জানেন।
‘বন্দে মাতরম্’ গানটির জন্ম ১৮৭৫ সালে। ঐ বছরের ৭-ই নভেম্বর ‘বঙ্গ দর্শন’ পত্রিকায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়। রচয়িতা ছিলেন বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। সেই হিসাবে গত বছরের ৭-ই নভেম্বর তার ১৫০ বছর সম্পূর্ণ হয়েছে। গানটির প্রথম দুটি স্তবকই চিরকাল দেশের সমবেত সঙ্গীত হিসাবে গাওয়া হয়েছে। যেহেতু পরেকার স্তবকগুলিতে নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিষয় এসেছে তাই গানটি যাতে সকল ধর্মের মানুষের সমবেত সঙ্গীত হয়ে উঠতে পারে তাই ১৯৩৫ সাল থেকেই কংগ্রেস প্রথম দুটি স্তবকই গাইছে। এর পেছনে সকলেই জানেন রবীন্দ্রনাথের স্পষ্ট নির্দেশ ও মতামত ছিল। বস্তুত রবীন্দ্রনাথের পরামর্শেই কংগ্রেস প্রথম দুটি স্তবককে গ্রহণ করেছিল। স্বাধীনতার পর বন্দে মাতরম যখন জাতীয় মন্ত্র হিসাবে গৃহীত হয় তখনও সেই অবস্থাতেই তা ছিল। ব্যস, বিজেপি পেয়ে গেছে তার হাতিয়ার। তারা এখন সম্পূর্ণ গানটি গাইতে হবে বলে কেন্দ্রীয় স্তরে ফরমান জারি করে করে দিয়েছে। বাংলায় চলছে শুভেন্দুদের লাফালাফি। এর মধ্যে তারা মুসলমানদের টাইট দেবার আর একটা রাস্তা খুঁজে বের করেছে।
এদিকে আবার শুরু হয়েছে গেরুয়া নিয়ে বিতর্ক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপির ঘোষিত এবং প্রকাশ্য তান্ডব চালানোর পরের দিন ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ যখন প্রথম পাতায় খবর করে ‘'গেরুয়া গুন্ডামী” শিরোনাম দিয়ে তার দুদিন পরেই রাখি পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যাদবপুর সহ কলকাতা শহরের বিভিন্ন জায়গায় যে সমস্ত অনুষ্ঠান করলেন (কোথাও আবার ঢোল বাজিয়ে সংকীর্তনও নাকি করেছেন) তাতে উক্ত পত্রিকাকে ক্ষমা চাওয়ার হুমকি দিলেন। তারপরেই শুরু হল পত্রিকা অফিসে গিয়ে আবারো তান্ডব। গেরুয়া রঙ লাগানো হল পত্রিকা অফিসের দেওয়ালে। “গেরুয়া” নামের বিরুদ্ধে নাকি কিছু বলা যাবে না, গেরুয়া নাকি অতি-পবিত্র। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে গেরুয়া জিনিসটি যদি এত পবিত্রই হয়ে থাকে তাহলে গেরুয়া পতাকা হাতে নিয়ে তারা সমস্ত ধরণের কুৎসিত কাজগুলো করছে কেন? সেদিন মধ্যরাতে যাদবপুর বিধানসভার বিধায়ক “সারা রাত তান্ডব চলবে” বলে হুঁশিয়ারী দিলেন কেন? কেন সেদিন বিজেপির গুন্ডাবাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে তান্ডব চালালো? কেন তার পরের দিনও গেরুয়া হাতে নিয়ে আক্রমণ হল বিশ্ববিদ্যালয়ে? গেরুয়ার প্রতি যদি এত ভক্তি তাহলে গেরুয়া হাতে নিয়ে সমাজবিরোধী আচরণ করতে তাদের লজ্জা হচ্ছে না কেন? এরও কারণ হল তাদের গেরুয়া প্রেম প্রকৃত প্রেম নয়, তা নকল প্রেম মাত্র।
ভারতের ইতিহাসে বৌদ্ধ আন্দোলনের পূর্ববর্তী সময়ে গেরুয়া বা হলুদ এই ধরণের রঙের প্রতি আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায় না। বৌদ্ধ এবং পরবর্তীকালে জৈনরাই প্রথম রঙকে দার্শনিক অর্থে প্রবর্তন করেন। গৌতম বুদ্ধ যখন সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা করলেন তখন প্রথম প্রথম তাঁদের পরিধান ছিল সেলাই করা বস্ত্রের এক বিচিত্র চীবর। সঙ্ঘের নিয়ম ছিল গোটা কাপড় বা ভালো কাপড় পরিধান করা চলবে না। গৌতম নিজেও সেলাই করা কাঁথা পরিধান করতেন বলে বৌদ্ধ সাহিত্যে উল্লেখ আছে। এরপর ধীরে ধীরে হলুদ বা গেরুয়া এই ধরণের রঙ বৌদ্ধদের ব্যবহৃত চীবরের প্রধান রঙ হয়ে দাঁড়ায়। হয়ত, এই রঙের সাথে মাটি এবং (পাকা) ফসলের রঙের সাদৃশ্য থাকার কারণে। বৌদ্ধ আন্দোলন যেহেতু গভীরভাবে ভারতের শ্রমজীবি মানুষের মধ্যে প্রোথিত ছিল তাই খুব সম্ভবত সেই কারণেই এই রঙের প্রতি বৌদ্ধদের এই পৃষ্ঠপোষকতা লক্ষ্য করা যায়। প্রাচীন সূর্য উপাসকরাও নবসূর্যের দীপ্তিকে মননে রেখে এই ধরণের রঙ ব্যবহার করতেন বলে কেউ কেউ মনে করেন। পরবর্তীকালে জৈন আন্দোলন দ্বিখন্ডিত হলে বস্ত্র ব্যবহারকারীরা বিভিন্ন কারণে শ্বেত বস্ত্র ব্যবহার করতেন। কিন্তু গেরুয়া ধরণের রঙের বহুল ব্যবহার বৌদ্ধদের দ্বারাই ব্যাপকভাবে প্রবর্তিত হয়। গৌতম বুদ্ধ এবং বৌদ্ধসঙ্ঘের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে এই রঙের চীবর, উত্তরীয় প্রভৃতিরও সম্মান বৃদ্ধি পেতে থাকে। বৌদ্ধ সাহিত্যে উল্লেখ আছে যে ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি বা ‘অসামাজিক’ ব্যক্তিরাও (বিশেষ করে ডাকাত অঙ্গুলীমালের গৌতম বুদ্ধের সরাসরি উদ্যোগে বৌদ্ধ হয়ে ওঠার পরবর্তীতে) হলুদ বা গেরুয়া চীবর ধারণ করে বাঁচার চেষ্টা করত। রাজা বিম্বিসার বুদ্ধভক্ত হওয়া সত্ত্বেও এই ধরণের কিছু ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়েছিলেন। এই নিয়ে সঙ্ঘ এবং রাজশক্তির একটি সাময়িক সংঘাতও হয়। গৌতম বিম্বিসারকে কড়াভাবে গৈরিক চীবর ধারণকারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন।
বৈদিক ব্রাহ্মণদের কখনই কোনো রঙের প্রতি বিশেষ মনোভাব ছিল না, বা কোনো ইউনিফর্ম জাতীয় পোশাক ছিল না। কিন্তু সমাজে গেরুয়া বা হলুদ রঙের সামাজিক সম্মান বৃদ্ধির সাথে সাথেই তারা কোনো একসময়ে এটিকে আত্মসাৎ করে নেয়। রঙটি আদতে ছিল শ্রমের সঙ্গে যুক্ত, শ্রমজীবি মানুষের সঙ্গে যুক্ত। ব্রাহ্মণ্যধর্মের লোকেরা একে পবিত্র, ত্যাগ ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করতে শুরু করল। সে যাই হোক কিন্তু মুখে ত্যাগ তিতিক্ষার কথা বলেও কার্যক্ষেত্রে এই গেরুয়াধারী ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ছিল আত্মসাৎকারী এবং ভোগী। গেরুয়ার প্রতি তাদের কখনই কোনো প্রেম বা নিবেদিতপ্রাণ মনোভাব ছিল না, গেরুয়া চিরকালই ছিল এদের হীন কার্যাবলীকে ঢেকে রাখার প্রয়াসকে মসৃণ করার জন্য একপ্রকার নকল প্রেম। শেষ পর্যন্ত অবস্থা এমন জায়গায় যায় যে, মধ্যযুগে এসে সন্ত কবীরকে বলতে হয়, “হে যোগী, বসন না রাঙায়ে আগে মন রাঙাও!”
একইকথা হিন্দুধর্মের ক্ষেত্রেও সত্য। বিজেপির হিন্দুপ্রেমও নকল প্রেম। হিন্দু হকারদের তাঁদের জীবন জীবিকা থেকে উৎখাত করে দেওয়া হচ্ছে। দেশজুড়ে হিন্দু কৃষরা আত্মহত্যা করছে। বিজেপির ভ্রুক্ষেপ আছে? এমনকি এরা যে রাম রাম করে অস্থির, “জয় শ্রীরাম” যাদের রণধ্বনি তারা রামলালার মন্দির থেকে বিপুল মূল্যের প্রণামী এবং সোনাদানার উপহারগুলি পর্যন্ত চুরির দায়ে ধরা পড়েছে। এদিকে দিন দিন দেশ রসাতলে যাচ্ছে। অর্থনীতির নাকি বিরাট অগ্রগতি হচ্ছে! এদিকে দুদিন ছাড়া ছাড়া প্রধানমন্ত্রীকে ভাষন দিতে হচ্ছে কৃচ্ছসাধন করার জন্য। “সোনা কিনবেন না”, “ বিদেশ যাবেন না”, কারণ সামনে দিন খুব খারাপ আসছে। সরকারি শিক্ষার হাল এত খারাপ হয়ে পড়েছে দেশজুড়ে যে, সদ্যগঠিক ককরোচ পার্টির লোকেরা যখন রাজস্থানে একটি সরকারি স্কুল পরিত্যক্ত গুদামঘরে চলছে খবর পেয়ে পরিদর্শনে যান তখন তাদের ওপর নির্মম আক্রমণ হল। এখন জানা যাচ্ছে অধিকাংশ বিজেপি শাসিত রাজ্যেই বহু সরকারি স্কুলেরই স্কুলবাড়ি নেই। কেন্দ্রের সরকারের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ক্রমশ কমছে। ২০১৩-১৪ সালে ইউপিএ-২ এর শেষ বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দ ছিল বাজেটের ৪.৭৭ শতাংশ, মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে তা ক্রমশ কমেছে। মোদি-১ এর শেষ বছরে তা দাঁড়িয়েছিল ৩.৪৮ শতাংশে, মোদি-২ এর শেষ বছরে তা দাঁড়িয়েছিল ২.৫১ শতাংশে, বর্তমানে তা আরও খানিকটা কমেছে। আর্থিক বৃদ্ধির হার ৭.৮ শতাংশ বলে ঢাকঢোল পেটানো হচ্ছিল, এই দেশকে ছাড়িয়ে গেছি, ওই দেশকে ছাড়িয়ে গেছি বলে প্রচার চালানো হচ্ছিল, পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতি বলে গোদি মিডিয়াকে দিয়ে প্রচার চালানো হচ্ছিল, এখন নিরপেক্ষ সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন আর্থিক বৃদ্ধির হার ২.৮ শতাংশের বেশি নয়। ওদিকে শিল্পপতিদের ঋণমকুবের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। ব্যাঙ্ক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে এরা ইচ্ছাকৃতভাবে শোধ না করে পার পেয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি বিজেপির সদস্য জি মিডিয়ার কর্ণধার সুভাষচন্দ্রকে ২২০০০ কোটি টাকার দায় মাত্র ৬,৫০০ কোটিতে নিষ্পন্ন করে মুক্ত করা হয়েছে। ২০১৪-১৫ থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত কর্পোরেট কোম্পানিগুলিকে ৯ লক্ষ ৯৫ হাজার কোটি টাকা মকুব করে দেওয়া হয়েছে, অর্থাৎ লুটে নেবার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
আর এই নিয়ে যখনই কথা হচ্ছে, আন্দোলন হচ্ছে, দেশের ক্ষিপ্ত ছাত্রছাত্রী ও যুবসমাজ যখন আন্দোলনে নামছে তখন হয় হিন্দু, নয়তো বন্দেমাতরম নয়তো গেরুয়া এই নিয়ে এই নকল দেশপ্রেমিকরা আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলছে। তাও বোঝা যেত যদি তাদের এসব নিয়েও কোনো সত্যিকারের আদর্শবোধ থাকত, নিবেদন থাকত। তা-ও তো নেই! দেশের ওপর যাদের ভালোবাসা নেই, মানুষের প্রতি যাদের প্রেম নেই তারা গেরুয়া পড়ল না বন্দেমাতরম গাইল তাতে কার কী যায় আসে! কবীরের ভাষাতেই বলি :
কহৈ কবীর, শুন সখী মোর
প্রেম হোয় সো জানে
নিজ প্রীতম কী আস নহী হৈ
নাহক কাজর পারে।।
(কবীর বলে, শোন সখী, প্রাণে যদি না থাকে প্রেমের আকুলতা / বৃথা এ কাজলপারা, বৃথা অঙ্গসাজ।)