পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা ‘দ্বিচারিতা’: এন্তোনিও কস্তা'র আহ্বান ও একপাক্ষিক বিশ্বব্যবস্থার সমীকরণ

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : আশিস গুপ্ত
ইরানের চারপাশ ঘিরে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়, এটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনায় একটি অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন বা আমিরাতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে যখন হাজার হাজার মার্কিন সেনা, অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং বিশাল নৌবহর অবস্থান করে, তখন ইরানের জন্য এটি একটি ‘ভার্চুয়াল অবরোধ’ হিসেবে কাজ করে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পরিষদ ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও লুইস সান্তোস দা কস্তা'র ইরানকে 'আক্রমণ বন্ধ করার' সাম্প্রতিক বক্তব্যটি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জটিল দিককে উন্মোচিত করে। যখন কোনো বৈশ্বিক নেতা একটি নির্দিষ্ট রাষ্ট্রকে লক্ষ্য করে ‘আক্রমণ বন্ধের’ ডাক দেন, তখন সেই আহ্বানের নৈতিক ভিত্তিটি মূলত নির্ভর করে আন্তর্জাতিক আইনের সর্বজনীন প্রয়োগের ওপর। কিন্তু বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ‘পাওয়ার পলিটিক্স’ বা ক্ষমতার রাজনীতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ‘আক্রমণ’ এবং ‘প্রতিরক্ষা’র সংজ্ঞা নির্ধারিত হচ্ছে ভূ-রাজনৈতিক মিত্রতার ওপর ভিত্তি করে। পশ্চিমা বিশ্বের এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি বিশাল ব্যবধান তৈরি করেছে—যেখানে এক পক্ষ বা ইসরায়েলি পদক্ষেপকে প্রায়শই ‘প্রি-এম্পটিভ সেলফ ডিফেন্স’ বা আগাম আত্মরক্ষা হিসেবে বৈধতা দেওয়া হয়, অন্যদিকে ইরানের যেকোনো পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপকে ‘আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই দ্বিমুখী মানদণ্ডই মূলত বিশ্ব রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ইরানের চারপাশ ঘিরে থাকা মার্কিন সামরিক অবকাঠামো কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক কোনো বিষয় নয়, এটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা ভাবনায় একটি অস্তিত্বগত সংকট তৈরি করে। কাতার, কুয়েত, বাহরাইন বা আমিরাতের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে যখন হাজার হাজার মার্কিন সেনা, অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান এবং বিশাল নৌবহর অবস্থান করে, তখন ইরানের জন্য এটি একটি ‘ভার্চুয়াল অবরোধ’ হিসেবে কাজ করে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নিজের সীমানা রক্ষার অধিকার থাকলেও, ইরান যখন তার দোরগোড়ায় থাকা এই বিশাল সামরিক হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করে, তখন তাকে বৈশ্বিক ব্যবস্থার জন্য হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, আরব দেশগুলোর ভূমি ব্যবহার করে যখন বিদেশি শক্তিগুলো ইরানের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি চালায় বা সাইবার হামলা পরিচালনা করে, তখন সেই দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব নিয়ে পশ্চিমা নেতাদের উদ্বেগ দেখা যায় না। কিন্তু ইরান যখন তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ছায়াযুদ্ধ বা প্রক্সি লড়াইয়ের কৌশল নেয়, তখন তাকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
# কাতার: এখানে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বৃহত্তম সামরিক ঘাঁটি 'আল উদেদ এয়ার বেস', যেখানে প্রায় ১০,০০০ মার্কিন সেনা এবং বি-১ বোমারু বিমান মোতায়েন থাকে।

# কুয়েত: প্রায় ১৩,৫০০ সেনা নিয়ে এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর প্রধান লজিস্টিক হাব, যেখানে শত শত ট্যাঙ্ক ও প্যাট্রিয়ট মিসাইল সিস্টেম রয়েছে।

# বাহরাইন: এখানে মার্কিন নৌবাহিনীর '৫ম ফ্লিট' (Fifth Fleet)-এর সদর দপ্তর অবস্থিত, যেখানে ৯,০০০ সেনা এবং একাধিক বিমানবাহী রণতরী ও ডেস্ট্রয়ার জাহাজ সার্বক্ষণিক মোতায়েন থাকে।

# সংযুক্ত আরব আমিরাত: আল ধাফরা এয়ার বেসে থাকা ৩,৫০০ সেনা এবং অত্যাধুনিক এফ-৩৫ (F-35) স্টিলথ ফাইটার জেট সরাসরি ইরানের আকাশসীমার খুব কাছে অবস্থান করছে।

# সৌদি আরব: প্রিন্স সুলতান এয়ার বেসে কয়েক হাজার সেনা এবং অত্যাধুনিক রাডার সিস্টেম ইরানের প্রতিটি গতিবিধির ওপর নজর রাখছে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র - ইসরায়েল বনাম ইরানের এই দ্বন্দ্বে আন্তর্জাতিক নীরবতা বা একপাক্ষিক সরবতা একটি গভীর কূটনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছে। ২০২৪ এর ১ এপ্রিল সিরিয়ার দামাস্কাসে ইরানি কনস্যুলেটে হামলা ছিল সরাসরি ভিয়েনা কনভেনশনের লঙ্ঘন, যা কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়। সেই মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের কঠোর নিন্দার পরিবর্তে যখন সংযম প্রদর্শনের উপদেশ দেওয়া হয়, তখন এটি পরিষ্কার হয়ে যায় যে বিশ্বব্যবস্থা এখন আর সমতার ভিত্তিতে চলছে না। ইসরায়েল যখন লেবানন বা সিরিয়ার আকাশসীমা যথেচ্ছভাবে ব্যবহার করে হামলা চালায়, তখন সেটি ‘নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ’ হিসেবে গণ্য হয়; অথচ ইরান যখন তার মিত্রদের মাধ্যমে এই প্রভাব বলয় ভাঙতে চায়, তখন তাকে ‘সন্ত্রাসবাদে মদত’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়। এই যে শব্দের মারপ্যাঁচ এবং সংজ্ঞার রাজনৈতিকীকরণ, এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির পরিবর্তে ক্ষোভ এবং অনাস্থাকেই বেশি উসকে দিচ্ছে।

এন্তোনিও কস্তার মতো প্রভাবশালী নেতাদের বক্তব্য তখনই কার্যকর হতো, যদি তাতে সংঘাতের মূল কারণগুলোর একটি সুষম প্রতিফলন থাকত। কেবল ইরানকে আক্রমণ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনা অসম্ভব, যতক্ষণ না পর্যন্ত এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির আধিক্য এবং ইসরায়েলের একতরফা সামরিক কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করা হচ্ছে। শান্তি স্থাপনের জন্য প্রয়োজন একটি ‘নিওট্রাল গ্রাউন্ড’ বা নিরপেক্ষ অবস্থান, যেখানে আক্রমণকারী কে আর আক্রান্ত কে—তার বিচার কোনো নির্দিষ্ট বলয়ের স্বার্থে হবে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যখন নীতিবোধের চেয়ে কৌশলগত স্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়ায়, তখন কূটনৈতিক আহ্বানগুলো কেবল শক্তিশালী পক্ষের স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইরানকে দেওয়া এই সতর্কবার্তা তাই অনেক ক্ষেত্রে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের টিকে থাকার লড়াইকে অগ্রাহ্য করার নামান্তর, যা সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থাকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
 
 
 
 
0 Comments

Post Comment