আনুমানিক ২২০ বছর আগে এক ইংরেজ কবি ফরাসী বিপ্লবের উন্মেষ দেখে বলে উঠেছিলেন
"Bliss was it in that dawn to be alive,
But to be young was very heaven!"
এই সময়ে দাঁড়িয়ে যন্তর মন্তরের দিকে তাকিয়ে এরকমটাই হয়তো অনেকের মনে হচ্ছে। আজ তরুণ প্রজন্মকে দেখে শেখার দিন। যাদের মনে করা হয়েছিল বরফকুচি প্রজন্ম ,শুধু ভেসে ভেসে যায়, শিকড় নেই কোনো কিছুর। তারাই আজ রাহুগ্রাস থেকে মুক্তি দিল দেশকে।
যন্তরমন্তরের আন্দোলন আমাদের শেখালো বহুকিছু। কিন্তু সবার আগে এনে দিল ভরসা। ভয় থেকে মুক্তি দিল। এ দেশের কোণে কোণে প্রতিদিন স্বৈরাচারী চোখরাঙানি আর গুপ্ত তর্জনের ভয়ে মানুষ শুধুই মেনে নিচ্ছিল যে কোনো অন্যায়। মৌনতা নিয়ে, অতি সাবধানী হয়ে, কেবলই ঘাড় নেড়ে নেড়ে কিংবা অদ্ভুত কিছু লোভের জন্য যে মধ্যবিত্ত সমাজ মৃতপ্রায়, হঠাৎ সেই আধমরাদের ঘা মেরেই বাঁচার পথ দেখালো একদল আরশোলা।
আরশোলা সহজে মরে না। তুষার যুগ বা ডাইনোসরের চেয়েও পুরানো তার ইতিহাস। হয়তবা সেকথা ভুলে গিয়েই সর্বোচ্চ ন্যায়াধীশ এদেশের তরুণ সমাজকে আরশোলা হওয়ার গালি দিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য মেটামরফসিস সম্পূর্ণ করে আরশোলারাই আজ বীরবিক্রমে দাঁড়িয়েছে ইতিহাসের সামনে। এই আরশোলারা মালিকের প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়েই মালিকের ঘর ভাঙতে পারে। এরা যে আজ মারের সাগর পাড়ি দিচ্ছে তাদের ভয়-ভাঙা নায়ে। একশ দশ বছর আগে এই ভয় ভাঙ্গানোর কাজ করেছিলেন প্রবাস থেকে আসা সেই একজন। দেশের সবচেয়ে হতভাগ্য মানুষের মনে সাহস এনে দিয়েছিলেন। চম্পারণের অন্নহীন, বস্ত্রহীন, শিক্ষাহীন ক্ষয়ে যাওয়া মরে যাওয়া কৃষক নীলকরের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল, হ্যাঁ, সম্পূর্ণ নিরস্ত্র, সম্পূর্ণ অহিংসায়।
আজ যন্তর মন্তরে এদেশের তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে সরাসরি শাসকের দিকে আঙুল তুলছে। যাকে সামান্য একটি স্থানিক প্রতিবাদ আন্দোলন ভাবা হয়েছিল, এক লহমায় তা গোটা দেশের আন্দোলন হয়ে উঠেছে । কীভাবে যেন এই ছেলেমেয়েরা গোটা দেশ থেকে এসে ভরে দিল দিল্লির সব পথ। সেই যে বিনা টিকিটে জেনারেল কম্পার্টমেন্টে চেপে চলে এসেছে মেয়েটি বাড়িতে না বলে, কাউকে চেনে না এখানে, কিংবা সেই ছেলেটি যার গোল টিফিন বক্সে শেষ সম্বল কয়েকটি চিনে বাদাম নিয়ে পথের ধারে বসে আছে, এদের এমন সাহস হবে কেউ কি কখনো ভেবেছে? সেই ছোট ছেলেটি যার দারুণ কষ্ট কারণ তার আনা ভগৎ সিং এর ছবি পুলিশ ভেঙে দিয়েছে। এরাই এসে পরস্পরের বন্ধু হয়েছে, লাঠির ঘা থেকে অচেনা বন্ধুকে বাঁচিয়েছে, হাতে হাত ধরে অথবা মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পুলিশকে নতুন পাঠ পড়িয়েছে। এরকম অহিংস আন্দোলন এ দেশেই হয় বার বার। মারো আরো মারো, তরুণের আহ্বানে সশস্ত্র পুলিশ বিহ্বল হয়ে যায়। রক্তেভেজা মানুষ বলে কতবার মারবে? এদেশ শহীদের, বার বার জন্মাবো আর আসবো। না, এ কোনো সিনেমার সংলাপ নয়। উদ্যত শস্ত্রের সামনে এ প্রজন্ম দাঁড়াতে জানে। পুলিশকে ডেকে বলতে পারে বাড়ি ফিরে সন্তানকে জানিও কত মার দিয়ে এলে।
একদিকে সরকারি পুলিশ, ভয়ঙ্কর অস্ত্র নিয়ে। কাঁটা লাগানো ডান্ডা, এমনকি পেলেট গান যা কাশ্মীরের ছয় হাজার যুবকের চোখ জখম করেছিল। তার উপর কাঁদানে গ্যাস চোখ জ্বলিয়ে দেয়। তারও উপর সঙ্ঘী আতঙ্ক। সাদা পোশাকে লাঠি হাতে শাখার বিদ্যে নিয়ে রণক্ষেত্রে। একশ বছরের আর এস এসের আজ শুধু ডান্ডাই পুঁজি। তার সাথে সেইসব নেমপ্লেট লুকানো পুলিশ। হায় রাষ্ট্র! কিন্তু এর সামনে অবিস্মরণীয় প্রদর্শন, ছেলেমেয়েদের অহিংস প্রতিরোধ। চোখ জ্বলে যায় তবু ঘৃণা নেই সেই চোখে। হেরে গেলেন নফরতের দোকানদারেরা। ভালোবাসায় উজ্জ্বল হয়ে উঠছে এই প্রজন্ম। যন্তর মন্তর সব অর্থে এক অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য নিয়ে উপস্থিত। এই সেই ভারত যা নিয়ে ছোটবেলায় রচনা লিখতে হতো, বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য।
বুড়োরা যখন গান্ধী আর আম্বেদকারের বিরোধ নিয়ে সদা চিন্তিত, এদের হাতে হাতে ঘুরছেন দুই জনেই। আছেন অবশ্যই ভগৎ সিং, আছেন সাবিত্রীবাঈ ফুলে। বাংলা থেকে পৌঁছেছেন রবীন্দ্রনাথ। যে বন্দেমাতরমের ঠেকা নিয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্র, সে স্লোগান ও তো আছে। আর এমন লক্ষকন্ঠে সমবেত জনগণ শেষ কবে শোনা গেছে! এইখানে এটাও ভাবতে হবে এই ছেলেমেয়েরা বহন করছে সেই লিগ্যাসীকে যা এই মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের ফলে কারাবন্দী। সেই আজাদি স্লোগান আজও উঠছে।
যখন দেশ জুড়ে বিভাজনের রাজনীতিই প্রায় শেষ কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন এই আন্দোলন প্রমাণ করলো যে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ এই সবের উর্ধ্বে আছেন মানুষ। কী আশ্চর্য মেয়েরা সব। শুধু দিল্লি নয় সবখানে। পুলিশের গাড়ি থামিয়ে দিতে পারে একাই। দিল্লি শহর যেখানে পদে পদে নারীর নিরাপত্তা বিঘ্নিত সেখানে এত বড় জমায়েতে কোনোরকম সমস্যা তৈরি হয়নি। কিন্তু বীভৎস অত্যাচার করছে পুলিশ। সরাসরি মেয়েদের উপর এমন হামলা ভাবা যায় না! শিউরে উঠছেন সবাই। এই পুলিশ না কি রক্ষক! বেছে বেছে মেয়েদের উপর আক্রমণ চলছে। শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। রাষ্ট্রের সমস্ত মুখোশ খুলে গেছে।
অন্যদিকে এই আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছেন সব স্তরের মানুষ। এই প্রজন্মের যে মোবাইল সর্বস্বতা বার বার নিন্দিত, সেটিই আজ সবচেয়ে বড় সংবাদ মাধ্যম। বড় বড় কোম্পানির খবরের কাগজ ফেলে লোকে চোখ রাখছেন অজস্র ছোট ছোট চ্যানেলে, চুড়ান্ত বিকেন্দ্রীকরণ। গোটা দেশ থেকে খাবার পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন অ্যাপে, থাকার জন্য ঘর খুলে দিচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। বিখ্যাত ব্যক্তিত্বরাও পৌঁছে গেছেন। এক কোণে দাঁড়িয়ে আছেন নাসিরুদ্দিন শাহ আর অনশন ভাঙাচ্ছেন শাবানা আজমী।ছোট ছোট ইউটিউবার, ইনফ্লুয়েন্সার সবাই হাজির।
শিক্ষামন্ত্রী বর্তমান সরকারের কাছে না কি বিশেষ নির্ভরযোগ্য কারণ তিনি ওবিসি নেতা কিন্তু যন্তরমন্তরে জাতের নামে বজ্জাতি নেই। অভিজিৎ দীপকে হয়তো দলিত, ওয়াংচুক আদিবাসী। সব মিলেমিশে একাকার। মুসলমানদের আন্দোলন থেকে দূরে থাকার পরামর্শ এসেছিল পাছে ভেদবিভেদের রাজনীতি হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু জুনায়েদ এর মত মানুষ দিনের পর দিন খাবার যুগিয়ে গেছেন। ২০ জুলাই টিয়ারগ্যাস এ আক্রান্ত ছেলেদের আশ্রয় দিয়েছে পাশের মসজিদ। শিখ গুরুদ্বার থেকে খাবার আসছে। হনুমান মন্দিরের খবর অবশ্য জানা নেই। জানা আছে, তাঁদের দরজা বন্ধ।
শাসকদলের সমস্যা আরো জটিল। ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা মেনে নিলে শাসকদলের প্রিয় প্রকল্প গোটা নয়া শিক্ষানীতির উপরেই প্রশ্ন উঠবে। ব্যর্থ হবে পরীক্ষা নেওয়ার কেদ্রীভূত প্রকল্প। আর এতকাল ধরে যুবসমাজকে যে বোঝানো হল, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যে কোনো প্রতিবাদ আসলে দেশদ্রোহিতা, সেকথাও যে খাটছে না। কে দেশদ্রোহী সবাই জানে এখন। আর সেই দিনও দেখতে হল, সকাল থেকে রাত যে চ্যানেলগুলিতে গোয়েবেলসীয় মিথ্যা পরিবেশন করা হয়, তাদের দেখলেই মানুষ তেড়ে যাচ্ছে। আজ সবচেয়ে বড় সাংবাদিক তাঁরাই যাঁরা সব ছেড়ে সত্যের পাশে ছিলেন। মানুষ তাঁদের দুহাতে জড়িয়ে ধরছেন।
দীর্ঘ সময় ধরে যে অদ্ভুত হিন্দি হিন্দু হিন্দুস্তান প্রকল্প নির্মাণ করা হচ্ছিল যার মাথায় একমেবাদ্বিতীয়ম প্রধানমন্ত্রী যিনি নাকি অযোনিসম্ভূত, যিনি কোনো সমালোচনার তোয়াক্কা করেন না, সাংবাদিক বৈঠক করেন না, মানুষকে বিদেশ না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েই নিজে ছয়টি দেশে মেডেল নিতে ছোটেন, যার জীবনপঞ্জী মহাভারতের গল্পকেও হার মানায়। মাসের পর মাস এই ছাত্র ছাত্রীদের তিনি পরীক্ষা পে চর্চা শুনিয়েছেন ইস্কুলের বড় স্ক্রিনে। ১৫২ বার প্রশ্ন ফাঁস হলেও তিনি ভাবলেশহীন। কেননা ভারতীয় ন্যায় দন্ডবিধি তাদের হাতে, বিচারব্যবস্থার মাথা পর্যন্ত কেনা আর সংবাদমাধ্যম তো গোদী মিডিয়া। এই দেশের মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠছিল মন্দির মসজিদের নামে লড়াই, অবৈজ্ঞানিক বিজ্ঞানচর্চা আর যুদ্ধ এবং জেহাদির গল্প। এই নয়া প্রজন্ম সেই সব ভেঙে চুরে সত্যকে এনেছে সামনে। প্রধানমন্ত্রীর বিপুল জনপ্রিয়তা, মোদী হ্যায় তো মুমকিন হ্যায় এর বেলুন ফেটে গেছে। শিক্ষামন্ত্রীর চেয়েও বড় খলনায়ক আজ তিনি, একথা স্পষ্ট।
আজ প্রশ্ন শুধু পরীক্ষা কেলেঙ্কারিতে আবদ্ধ নেই, গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই অবশেষে কাঠগড়ায়। শুধু যারা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হবে, তারা নয়, আজ এখানে এসে দাঁড়িয়েছে যাদের কোনোদিন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখতে দেওয়া হয়নি তারাও। লেখাপড়া নয়, যে তরুণের উপর কঠিন শ্রমের বোঝা চাপানো, যার সঠিক মজুরি মেলে না, সেও আজ প্রশ্ন করছে গোটা ব্যবস্থা নিয়ে,একটা প্রশ্ন থেকে হাজারটা প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। আজ তার জন্য দল লাগছে না।
এই সেদিনও ভাবা হয়েছে এই অন্ধকার থেকে মুক্তি নেই। নির্বাচনের গোটা ব্যবস্থাই যখন হাতের মুঠোয় তখন এদের সরাবে কে? কিন্তু যে দেশের প্রায় অর্ধেক মানুষ কম বয়সী সে দেশে বিকল্প হীনতা কখনো হতে পারে না। এই ছেলেমেয়েরা শুধু নিট কেলেঙ্কারি নয়, গোটা শিক্ষা ব্যবস্থাকেই প্রশ্ন করছে। নয়া শিক্ষা নীতি ২০২০ আজ সবচেয়ে বড় প্রশ্নের সামনে। এরা শুধু ব্যবস্থা নয়, প্রশ্ন করছে নিজের ঘরের লোকদের, যারা অন্ধভক্ত সেই আত্মীয় বন্ধুদের যারা এই বিভাজনের রাজনীতিতে মত্ত।
কীভাবে বদলাবে, বদল আদৌ হবে কি না জানা নেই। কিন্তু কোথাও যে শুরু করতেই হবে সেকথা আজ স্পষ্ট। ক্ষমতার জোরে পরিসীমন বা ডিলিমিটেশন ইত্যাদি করে নির্বাচনে এর পরেও বিপুল জয় আসতেই পারে, কিন্তু তা যে সম্পূর্ণ মেকি সেকথা স্পষ্ট হয়ে যাবে। এক দেশ, এক নির্বাচন যাই হোক, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বাইরে থেকে যাবে আর এক বিশাল জনমত যারাই শেষপর্যন্ত গণদেবতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে। মনে আছে দার্শনিক অধ্যাপক অম্লান দত্ত, যিনি গুজরাত গণহত্যার পর একা একা অনশন করেছিলেন, তিনি আশ্বাস দিয়েছিলেন এদেশের মানুষ গণতন্ত্র রক্ষা করতে জানে। দেশজুড়ে ছোট ও বড় প্রতিটি শহরে ছেলেমেয়েরা আজ সত্যের জন্য লড়ছে। ন্যায়ের জন্য সম্পূর্ণ অহিংস পথে। এরা নিশ্চয় যুক্ত হবেন কৃষকের আন্দোলনের সাথে কিংবা শহর থেকে বহুদূরে নদী খাতে চিতায় শুয়ে থাকা প্রতিবাদী মেয়েদের সাথে। ভারত ভাগ্যবিধাতা এমনি করেই বারবার জয়যুক্ত হন।