পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

এই নজরদারির গণতন্ত্র কি আমরা চাই?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 201 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
যন্তর মন্তরে যখন ছাত্ররা অবস্থান করছিলেন এবং পরবর্তীতে যখন সংসদ চলো অভিযানে সামিল হয়েছিলেন তখন একটা দৃশ্য দেখা গেছে যা নিয়ে হয়ত সেই সময়ে আমরা অনেকেই হাসাহাসি করেছি তা হল অনেকেই নানান মুখোশ, নানান ভাবে সেজে ঐ বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন। তখন হয়ত আমরা বুঝতে পারিনি, যে ছাত্রযুবরা কি শুধুমাত্র মজা করার জন্য ঐরকম সেজে এসেছিলেন? না একেবারেই তা নয়। সবকিছুই রেকর্ড করা হচ্ছিল। তা থেকে বাঁচবার জন্যেই অনেকেই ঐরকম সেজে এসেছিলেন।

মোহাম্মদ জুনায়েদকে এতদিনে আমরা অনেকেই চিনে গেছি। ৩৫ দিন ধরে যন্তর মন্তরে যখন ছাত্ররা অবস্থান করছিলেন তখন গাজিয়াবাদের বাসিন্দা এবং আইনের  ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র এই বিক্ষোভে তাঁর কোনো আনুষ্ঠানিক ভূমিকা না থাকলেও একটা বড় ভুমিকা ছিল। নীট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কেলেঙ্কারির জেরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী বিক্ষোভ দেখাচ্ছিল, তখন তিনি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে অন্যদের খাবারের ব্যবস্থা করছিলেন।

২৪ জুলাই রাতে, যখন বিক্ষোভ কর্মসূচি স্তিমিত হয়ে আসছিল, তখন জলাতঙ্ক-প্রতিরোধী টিকা নিয়ে রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতাল থেকে ফিরছিলেন জুনায়েদ। তিনি জানান, দিল্লি থেকে পুলিশ কর্মকর্তারা তাঁকে তুলে নিয়ে একটি গাড়িতে বসান এবং তাঁর চোখ বেঁধে দেন। এরপর টানা পাঁচ-ছয় ঘণ্টা ধরে তাঁরা তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন যে, বিক্ষোভকারীদের জন্য খাবারের জোগান কারা দিচ্ছে। তিনি তাঁদের মুখ, নাম বা ইউনিফর্ম—কিছুই দেখতে পাননি। তাঁরা তাঁর ফোনটি নিয়ে সেটির লক খোলান এবং ফোনের তথ্য যাচাই-বাছাই করেন। তারপর তাঁকে ঐ স্থান থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে দেরাদুন-মুসৌরি রাস্তার পাশে একটি জঙ্গলাকীর্ণ ফাঁকা জায়গায় নামিয়ে দেওয়া হয়। সেখান থেকে তিনি একটি ক্যাব ভাড়া করে ফিরে আসেন।

গাজিয়াবাদের মুসৌরিতে অবস্থিত তাঁর পারিবারিক বাড়িতে ইতিমধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। তাঁর বাবাকে আটক করা হয় এবং নাবালক ভাইকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। আধার, প্যান কার্ড ও ব্যাঙ্ক পাসবুকের মতো ব্যক্তিগত নথিপত্রও বাজেয়াপ্ত করা হয়। মিরাটে তাঁর বিবাহিত বোনের স্বামী ও শ্বশুরকেও হেফাজতে নেওয়া হয়েছিল। অবশ্য পরে তাঁদের সবাইকেই ছেড়ে দেওয়া হয়। জুনায়েদ বলেন, "আমার সমস্ত তথ্যই তাঁদের কাছে ছিল। এমনকি মিরাটে আমার বোনকেও তাঁরা রেহাই দেননি। কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমনটা ঘটা উচিত নয়।" এরপর জুনায়েদ সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন; আরজেডি সাংসদ মনোজ কুমার ঝা-র দায়ের করা একটি বিচারাধীন রিট পিটিশনের প্রেক্ষিতে 'ইন্টারভেনশন অ্যাপ্লিকেশন' বা হস্তক্ষেপের আবেদন দাখিল করে তিনি বেআইনি আটক ও হেনস্থার অভিযোগ তোলেন।

যখন শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবীতে দেশের রাজধানী উত্তাল হয়েছে, তখন আমরা দেখেছি দেশের নানান প্রান্তে ছাত্রযুবরা এই বিক্ষোভে সামিল হতে। বিহার, আসাম, মুম্বাই এমনকি বাংলার কলকাতাতেও মিছিল হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু শহরে দেখা গেছে পুলিশ লাঠি চালিয়েছে, কাঁদানে গ্যাস চালিয়েছে। পাটনাতে গুলি চালাতে দেখা গেছে পুলিশকে। ছড়রা গুলি বা পেলেট গানে আহত যুবকদের ছবি তো অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু আরো একটা দৃশ্য দেখা গেছে যা নিয়ে হয়ত সেই সময়ে আমরা অনেকেই হাসাহাসি করেছি তা হল অনেকেই নানান মুখোশ, নানান ভাবে সেজে ঐ বিক্ষোভে সামিল হয়েছিলেন। তখন হয়ত আমরা বুঝতে পারিনি, যে ছাত্রযুবরা কি শুধুমাত্র মজা করার জন্য ঐরকম সেজে এসেছিলেন? না একেবারেই তা নয়। সবকিছুই রেকর্ড করা হচ্ছিল। ২০ জুন যখন অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়, তখন থেকেই যন্তর মন্তর এলাকাটি কঠোর প্রবেশ-নিয়ন্ত্রিত একটি অঞ্চলে পরিণত হয়। প্রতিটি প্রবেশপথে ব্যাগ তল্লাশি করা হতো—কখনও কখনও দুবার করে। ব্যারিকেডের একাধিক স্তরের মধ্য দিয়ে মানুষের চলাচলের পথ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। মাথার ওপর ড্রোন উড়ছিল এবং রিয়েল-টাইমে পুরো জনসমাবেশের ওপর নজর রাখছিল। সিসিটিভিগুলো মাটির ওপরের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছিল। উঁচু পর্যবেক্ষণ টাওয়ার থেকে বসানো স্থির ক্যামেরাগুলো অবিরাম ও একদৃষ্টিতে পুরো এলাকার ওপর নজরদারি চালাচ্ছিল। তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ১,৫০০ টাকা পারিশ্রমিকে নিয়োগ করা ভিডিওগ্রাফাররা পালাক্রমে কাজ করতেন এবং তাঁরা সেই ফুটেজ সরাসরি দিল্লি পুলিশের কাছে জমা দিতেন। রাজধানী জুড়ে মোতায়েন করা প্রায় ৭০ জন ভিডিওগ্রাফারের মধ্যে ৩০ জনই ছিলেন কেবল যন্তর মন্তরে। সঙ্গে ছিল ‘ঈক্ষনা’ । দিল্লি পুলিশের প্রতীক এবং 'ঈক্ষণা' (হিন্দি শব্দ, যার অর্থ 'দৃষ্টি') লেখা একটি পুলিশ ভ্যান প্রথমে বিক্ষোভস্থলের প্রবেশপথের কাছে রাখা হয়েছিল; পরে সেটিকে কেরালা হাউসের আরও কাছে সরিয়ে নেওয়া হয়। ভ্যানটির ভেতরে একটি টেলিস্কোপিক মাস্ট বা দণ্ডের ওপর বসানো আটটি এআই-চালিত ক্যামেরা ৩৬০-ডিগ্রি দৃশ্যপট পর্যবেক্ষণ করছিল; এগুলোর মাধ্যমে ভিড়ের মধ্যে থাকা মানুষের মুখ শনাক্ত করে পুলিশের ডেটাবেসের তথ্যের সাথে মিলিয়ে দেখা হচ্ছিল। ভেতরে থাকা মনিটরে শনাক্ত করা মুখগুলোর চারপাশে সবুজ রঙের আয়তাকার ফ্রেম ভেসে উঠছিল এবং তার পাশাপাশি 'ফেস একিউরেসি' বা মুখ শনাক্তকরণের নির্ভুলতা নির্দেশকারী একটি সংখ্যাসূচক স্কোরও দেখা যাচ্ছিল।

জুনায়েদের ঘটনা এবং সমস্ত এই নজরদারির বিষয়টা এমন একটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে যার উত্তর বিক্ষোভকারী জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার মাধ্যমে পাওয়া যায়নি: যন্তর মন্তরে সংগৃহীত ডেটার কী হচ্ছে, কাদের কাছে এর নাগাল রয়েছে এবং কতদিন পর্যন্ত তা সংরক্ষিত থাকবে? ভবিষ্যতেও কি রাষ্ট্র ঐ ডেটা বা তথ্য নিয়ে যে কোনও ব্যক্তিকে বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে?

শুধু এটাই নয়, বিভিন্ন ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের ইন্সটাগ্রাম প্রোফাইল থেকে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের ক্ষোভ উগড়ে দিয়েছেন, সেটাও দেখা গেছে। যে সময়ে এই আন্দোলন চলছিল, তখন এই সমস্ত ছোট ছোট রিল আমরা দেখেছি এবং আনন্দও পেয়েছি, কিন্তু নতুন প্রজন্মের এই ‘আন্দোলনের উৎসব’ যে তাঁদের বিরুদ্ধেই অস্ত্র হিসেবে প্রয়োগ করা হবে, তখন কিন্তু অনেকেই ভাবেননি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছে, কোনও ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনও পুলিশী প্রক্রিয়া করা যাবে না, কিন্তু তাঁদের রায়ের মধ্যেও একটা ‘কিন্তু’ আছে। বলা হয়েছে এই আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যদি কোনও ব্যক্তির পুরোনো ফৌজদারি মামলায় নাম থাকে, তাঁদের বিরুদ্ধে কিন্তু পুলিশী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। এখন কোনও একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ আছে কি না, জানা যাবে কী করে? সেখানেই প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে তা বোঝা যাচ্ছে। বিক্ষোভে থাকা লোকজনের লাইভ সিসিটিভি ফুটেজ থেকে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে সেই ব্যক্তিদের সঙ্গে আগের তোলা কোনও অপরাধীর মুখাবয়বের সাদৃশ্য পাওয়া যায় না কি! যদি পাওয়া যায়, ঐ আদালতের নির্দেশ মত কাজ হবে বলে সরকারের মুখপত্ররা এবং নেতা মন্ত্রীরা জানিয়েছেন।

পাশাপাশি আরো বেশ কিছু দৃশ্যের কথা বলা জরুরি। ‘সংসদ চলো’ মিছিলের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, বিক্ষোভ চলাকালীন যন্তর মন্তরে দায়িত্বরত এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ‘স্মার্ট গ্লাস’ সদৃশ চশমা পরে আছেন—যার বৈশিষ্ট্য হলো এর মোটা ফ্রেম এবং কবজার কাছে বসানো একটি ছোট লেন্স। পুলিশের ঐ কর্মকর্তাকে সন্দীপ লাম্বা হিসেবে শনাক্ত করা হয়, যিনি পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার পদে কর্মরত ছিলেন; পরবর্তীতে ২০ জুলাই এক নারী বিক্ষোভকারীকে চড় মারার ঘটনায় তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়, কিন্তু তাঁর সেই চশমাতেও বহু তথ্য বা ডেটা সংরক্ষিত আছে।

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী ও ‘আইসা’ র সদস্য অঞ্জলি—যিনি আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন একটি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, নজরদারির বিষয়টি প্রায় শুরু থেকেই অত্যধিক বলে মনে হচ্ছিল। তিনি বলেন, "আমরা পুলিশের মুখোমুখি হয়েছি এবং তাদের একটাই উত্তর—নিরাপত্তা। কিন্তু নিরাপত্তার প্রয়োজনে আমার ২০০টি ছবি কেন দরকার?" শিক্ষার্থীদের তাঁবুতে যখনই নতুন কোনো মুখ দেখা যেত, পুলিশ এসে জানতে চাইত তারা কারা এবং কোথা থেকে এসেছে। অথচ অঞ্জলির কথায়, আন্দোলনের জায়গার ভেতরেই মোবাইল ফোন ও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাচ্ছিল। অর্থাৎ, ঠিক সেই জায়গাতেই যেন তাদের ‘নিরাপত্তা’ ব্যবস্থা আর কাজ করছিল না। ছাত্রনেত্রী ও জেএনইউ  ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সভানেত্রী ঐশী ঘোষ ওই পুলিশ অফিসারকে 'স্মার্ট গ্লাস' বা বিশেষ প্রযুক্তিসম্পন্ন চশমা পরা অবস্থায় দেখেছিলেন। তিনি বলেন, "২০ জুলাই আমরা যখন মিছিলের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলাম, তখন অভিজিৎ দীপকে ও অন্যদের সঙ্গে আমিও একটি মিনি-ট্রাকে ছিলাম। আমাদের আটক করার জন্য যখন ওই পুলিশ অফিসার ট্রাকের ভেতরে ঢুকলেন, তখন আমি তাঁকে ক্যামেরা-যুক্ত একটি চশমা পরা অবস্থায় দেখি।" তিনি আরও বলেন, "তাঁরা কতটা খুঁটিনাটি তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন, তা আমরা কেবল অনুমানই করতে পারি। এমনকি আটক করার সময়ও তাঁরা আমাদের সম্মতি ছাড়াই ছবি বা ভিডিও তুলেছেন। আমরা জানি না, ভবিষ্যতে এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কী ধরনের দমন-পীড়ন চালানো হতে পারে।"

ছাত্রদের এই আন্দোলন একটা আশ্বাস দিয়ে শেষ হয়েছিল যে অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে কোনও এফআইআর দায়ের করা হবে না। কিন্তু তারপর থেকে বিহার এবং আসামের মতো রাজ্যে আটক ও মামলা নথিভুক্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে এবং জুনায়েদের অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় যে ডেটা ট্রেল ইতিমধ্যেই ব্যবহার করা হয়েছে। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের অপার গুপ্তা’র কথা অনুযায়ী এই নজরদারির বেশিরভাগই কোনো সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত আইনি কাঠামো ছাড়াই পরিচালিত হয়। ডেটা সংরক্ষণ করে রাখা একটি স্পষ্ট আইনি অনুমোদন ছাড়া ঘটছে এবং তা করা হচ্ছে ২০২২ সালের ফৌজদারি কার্যবিধি (আইডেন্টিফিকেশন) অ্যাক্টকে সামনে রেখে৷ আইনটি ৭৫ বছর পর্যন্ত বায়োমেট্রিক ডেটা সংরক্ষণ করার অনুমতি দেয়, এনসিআরবিকে কাস্টোডিয়ান হিসাবে রেখে। জামিন বা বেকসুর খালাসের ক্ষেত্রে মুছে ফেলার ব্যবস্থা হয়ত আছে — তবে সেই নিয়মটিতে বলা হয়েছে:  আদালত লিখিতভাবে কারণ রেকর্ড করার পরেও ডেটা ধরে রাখার নির্দেশ দিতে পারে। আইনটি অবশ্য সক্রিয় ফৌজদারি তদন্তের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য - এমন পরিস্থিতিতে যেখানে একটি এফআইআর নথিভুক্ত করা হয়েছে। এটাই সেই ফাঁক, যার মধ্যে দিয়ে যন্তর মন্তরে ছাত্রছাত্রীদের একটি আইনানুগ সমাবেশকেও রাষ্ট্র রেকর্ড করে রাখতে পারে। যাঁদের অধিকাংশের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই, তাহলে তাঁদের তথ্য কেন সংরক্ষণ করছে রাষ্ট্র? ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট এখনও বলবৎ না থাকায়, এবং এখানে আসলে কোন আইন প্রযোজ্য তা স্পষ্টতার অভাব রয়েছে, তাই এটা করেছে রাষ্ট্র। সাধন হালদার মামলায় ২০১৭ দিল্লি হাইকোর্টের আদেশের পর - নিখোঁজ শিশুদের খুঁজে বের করার জন্য মুখের স্বীকৃতি প্রথম দিল্লিতে চালু করা হয়েছিল। সেই থেকে, ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লির দাঙ্গা, ২০২১ সালের লাল কেল্লার ঘটনা এবং ২০২২ সালের জাহাঙ্গীরপুরী সহিংসতার সময় একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি স্থাপনার মূল ব্যবহারের কেসকে তার সূচনা বিন্দু থেকে আরও প্রসারিত করেছে। এই প্রযুক্তির কিছু খামতিও আছে এবং এই প্রক্রিয়া ১০০ শতাংশ সঠিক নাও হতে পারে।

সুতরাং ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ প্রযুক্তিটি এমনভাবে ব্যবহার করার পূর্ণ সম্ভাবনা ও সুযোগ রয়েছে, যার মাধ্যমে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ব্যক্তিদের শনাক্ত বা ভুলভাবে শনাক্ত করে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। স্লোগান স্তিমিত হয়ে যাওয়ার এবং ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলার পরেও যা অবশিষ্ট থাকে, তা হলো—নাগরিকদের মুখচ্ছবি, আঙুলের ছাপ ও মেটাডেটার এক বিশাল সংগ্রহ। এই তথ্যগুলো এমন সব সিস্টেমে জমা রাখা হয়েছে যার কার্যপদ্ধতি বা নিয়মকানুন কখনোই জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি;  এবং আমরা জানিও না, কী করা হচ্ছে আমাদের তথ্য নিয়ে। সাংবিধানিক অধিকার চর্চাকারী নাগরিকদের কাছ থেকে সংগৃহীত এই তথ্য সংরক্ষণের কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা নেই। আসলে এটি একটি প্রতিবন্ধক বা ভীতিপ্রদ ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। মানুষ ভবিষ্যতে প্রতিবাদে শামিল হওয়ার আগে দুবার ভাববে। আর তাই, এই ব্যবস্থাকে আমাদের রুখে দিতে হবে। বলতে হবে এই নজরদারি আসলে গণতন্ত্রের গলা টিপে ধরতে পারে।  

 

0 Comments

Post Comment