পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

যোগ্য

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : দেবাশিস মজুমদার
প্রমিত হতক্লান্ত হয়ে বাড়িতে নিজের ঘরে এসে শুয়ে পড়ল। স্কুলে প্রচণ্ড খাটুনি গেছে, আগেও সে একইভাবে প্রতিটা ক্লাসে একইরকম পরিশ্রম করত। কিন্তু এইরকম ক্লান্তি তাকে কখনও গ্রাস করত না। এখন শরীর একেবারেই ছেড়ে দেয়।

একটু পরেই ঘরের দরজা ফাঁক করে বাবা এলেন। প্রমিতকে শুয়ে থাকতে দেখে বললেন, ‘তোদের চাকরির ওই ব্যাপারটার কোনও সুরাহা হল? আর নতুন কিছু জানতে পারলি?’

প্রমিত উঠে বসল খাটের ওপর, মাথা নেড়ে বলল, ‘না, আর কিছু হয়নি, পিটিশনের পরবর্তী শুনানি আগামী সপ্তাহে’।

প্রমিতের বাবার মুখ দিয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে গেল, ‘এদিকে কোর্টের আদেশের মেয়াদও ত ফুরিয়ে আসছে, আরেকটা এক্সটেনশন দেবে নাকি?’

প্রমিত বলল, ‘বাবা, চাকরিটা কি এত খেটে পরীক্ষা দিয়ে পেয়েছিলাম শুধু এক্সটেনশন পাওয়ার জন্য? আমার, আমাদের দোষটা কোথায় বলতে পারো? কিন্তু এখন টেনিস বলের মত হয়ে গেছি, শুধু কোর্টের এপারে আর ওপারে’।

বাবা চলে যাচ্ছিলেন, ঘুরে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘পৃথার বাড়ির কেউ ফোন তুলছে না, একবার খোঁজ নিবি, মানে বিষয়টা নিয়ে ওরা কি ভাবছে? একটা ত সিদ্ধান্তে পৌছানো দরকার’।

প্রমিত বলল, ‘আমার কলও পৃথা রিসিভ করেনি, আমি গতকাল স্কুল থেকে ফেরার পথে নয় একবার ওদের বাড়ি হয়ে আসবো, আমারও জবাব চাই’। বাবা চলে গেলেন, প্রমিত আবার বিছানায় নিজের শরীরটাকে এলিয়ে দিল।

পরদিন স্কুলে একটা অনুষ্ঠান ছিল, এইরকম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে প্রমিত শুরু থেকেই দারুণ উৎসাহ নিয়ে থাকত। কিন্তু এবারে সে আর কোনও উৎসাহ পেল না। সহকর্মীরা কেউই তাকে বিশেষ কেউ ঘাঁটাননি, সবাই ভালো কথাই বলেছেন, যেমন শান্তিদা বললেন, ‘প্রমিত এটা ত প্রমাণ হয়ে গেছে যে তুমি যোগ্য, তাহলে দুশ্চিন্তা করছ কেন? আগে আর পরে, ঠিক একটা ব্যবস্থা হবেই’।

গেম টিচার অনাদিবাবু বললেন, ‘বি এ স্পোর্টসম্যান প্রমিত, তুমি ত ছাত্রজীবনে নিজেও খেলোয়াড় ছিলে, তাহলে এখন এত স্পিরিট হারাচ্ছ কেন? চিয়ার আপ বয়, একটা খারাপ সময়, দেখবে ঠিক কেটে যাবে, আরে বাবা অযোগ্য গুলো ত বিদায় হয়েছে, তোমরা যোগ্য, তোমাদের খারাপ কিছু হবে না’।

সংস্কৃতের দিদিমণি ইলোরাদি বললেন, ‘আসলে ঈশ্বর তোমার পরীক্ষা নিচ্ছেন প্রমিত, দেখবে ঠিক সময়ে ভালো কিছু ঘটবে, ঈশ্বর যা করেন মঙ্গলের জন্যই করেন’।

পরীক্ষা? এই শব্দটাই এখন প্রমিতের জীবনের যাবতীয় যন্ত্রণার উৎস। একটা পরীক্ষা, একটাই, নিজেকে যোগ্য প্রমাণ করার জন্য কতবার সেই একই পরীক্ষার গণ্ডি পেরোতে হয়? আর তারপরেও প্রশ্ন থেকেই যোগ্য-অযোগ্য দোলাচলের, চাকরির, জীবনের জীবিকার? জীবনে কোনও পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়নি প্রমিত, কিন্তু এই পরীক্ষা এই একটাই পরীক্ষা যেন তাকে এক অদ্ভুত যন্ত্রণার সামনে এসে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, সবকিছুর মধ্যেও সে কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। ছাত্রছাত্রীদের কাছেও ভীষণ প্রিয় স্যার এই প্রমিত, ক্লাসরুমে ঢুকলেই এক অদ্ভুত শান্তি এক অদ্ভুত পূর্ণতা খুঁজে পেত সে, কিন্তু সেই ক্লাসরুমে ঢুকলেই এখন তার মনে হয় সে ক্ষণিকের অতিথি, সে অপূর্ণ।

অনুষ্ঠানের জন্য স্কুল একটু আগেই ছুটি হয়ে গেল। প্রমিত সোজা চলে পৃথার বাড়িতে, পৃথার বাবা বাড়িতেই ছিলেন, প্রমিত সোজাসাপ্টা তার আর পৃথার সম্পর্কের বিষয়ে প্রশ্নটা করে ফেলল। পৃথার বাবা বললেন, ‘এখন এই অবস্থায়…………’। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে প্রমিত বলল, ‘সম্বন্ধটা কিন্তু আপনাদের তরফেই প্রথমে এসেছিল, আপনারা জানতেন আমি কি চাকরি করি, আপনাদের কথাতেই বাগদানটা সম্পূর্ণ হয়েছিল’।

পৃথার বাবা কর্পোরেশনে ক্লার্কের পদে থেকে রিটায়ার করেছেন, তিনি বললেন, ‘আসলে সরকারি, আধা সরকারি চাকরির মধ্যে আমাদের মত ফ্যামিলিতে শিক্ষকতাকেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ধরা হয়, অলোকবাবুর কাছে তোমার কথা শুনেছিলাম, তুমি চরিত্রে ভালো, ভদ্র, সরকার পোষিত স্কুলের সহকারী শিক্ষকের চাকরি হয়ে গেছে পাঁচ বছরেরও বেশি, নির্ঝঞ্ঝাট পরিবার, ভেবেছিলাম আমাদের একমাত্র মেয়ের জন্য এর চেয়ে ভালো আর কি হতে পারে, আসলে সরকারি চাকরি এভাবে………এরকমটা ত কোনও সময় দেখিনি শুনিওনি, কিন্তু এখন যা পরিস্থিতি, না বাবা, কিছু মনে করো না, তুমি সর্বতভাবে যোগ্য, তোমার যোগ্যতা নিয়ে আমার কিচ্ছু বলা নেই, কিন্তু আমরাও ত সন্তানের বাবা-মা, আমরা কি করে নিজের মেয়েকে এই অবস্থায়, তাছাড়া পৃথার জন্য অলোকবাবু আরেকটা সম্বন্ধ এনেছেন, ছেলে একটা বেসরকারি কোম্পানির এইচ-আর ম্যানেজার, আসলে একটা সময় মনে হত সরকারি চাকরির বিকল্প কিছুই না, সুরক্ষা ত আছে, কিন্তু এখন ভাবছি বেসরকারি ত বোধহয় এর থেকে খারাপ হবে না, মানে তোমাকে দেখেই………পৃথার ও মত আছে, আসলে কোন মুখ তোমার বাবাকে জানাবো, তাই……………’

আর কিছু শোনার দরকার পড়ল না, প্রমিত বেরিয়ে এল ওদের বাড়ি থেকে, গেটের থেকে বেরিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকালো সে, দোতলার সামনের ঘরটা পৃথার, জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সে ফোনে হেসে হেসে কারও সাথে কথা বলছে, নীচে একবার দৃষ্টি পড়তেই সে প্রমিতকে দেখে দ্রুত জানালা থেকে সরে গেল, প্রমিতও আর সেদিকে চাইল না, পিছন ঘুরে দ্রুত বেরিয়ে এল সেখান থেকে।

পাড়ায় যখন এসে পৌছেছে তখন মোবাইলে একটা মেসেজ এল। অঞ্জন স্ট্রোক হয়ে মারা গেছে। তাদেরই সংগঠনের তরফ থেকে শোকবার্তা সহযোগে খবরটা মেসেজ করে পাঠানো হয়েছে। অঞ্জন আর প্রমিত একই কলেজে পড়েছে, একই সাথে চাকরি পেয়েছিল দুইজনে, যদিও আলাদা আলাদা স্কুলে। অঞ্জনের র‍্যাঙ্ক একটু পিছনের দিকে থাকায় বাড়ি থেকে অনেকটা দূরে কাউন্সিলিং-এ স্কুল পেয়েছিল অঞ্জন। কিন্তু তাও কি দারুণ খুশি ছিল সে। কলেজ থেকেই তার সাথে মিতিনের প্রেম। চাকরিটা পেয়েই তাই আগে বিয়ে করেছিল, কারণ মিতিনের বাড়ি থেকে ততক্ষণে সম্বন্ধ দেখা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বছর দেড়েকের মধ্যেই ওদের কোল আলো করে এসেছিল ছোট্ট বাবলু। স্কুলের কাছাকাছি একটা জমি কিনে একতলা বাড়িও তৈরি করেছিল অঞ্জন, ব্যাঙ্ক লোন রয়েছে তার মাথায়, অঞ্জন সেই কলেজ জীবন থেকেই খুব অপটিমিস্টিক ছেলে ছিল, সবসময় বলত, ‘আরে ভাই সব হয়ে যাবে, সব প্ল্যান করা আছে, চিন্তা কি? দশ-বারো বছর চাকরি করলেই লোন শোধ’। কিন্তু সেও বোধহয় আর সামনে কোনও আশার আলো দেখতে পাচ্ছিল না, শেষবার যখন দুইজনের দেখা হয়েছিল এই প্রসঙ্গে আন্দোলনে, তখনই দেখেছিল কি অদ্ভুতরকমভাবে ভেঙে পড়েছে অঞ্জন, তখনই তার মধ্যে প্রবল হতাশা দেখেছিল সে, এবারে সেই অঞ্জনও সবকিছুর বাইরে চলে গেল।

পাড়ায় ঢোকা বেরনোর পথে অনেকের সাথেই দেখা হয়, অনেকেই অনেকেই ভালো কথা বলেন, স্বান্ত্বনা দেন, আশার কথা শোনান, মাতব্বর সৈকতবাবু ত বলেই দিলেন, ‘চিন্তা নেই, এবারে সব ঠিক হয়ে যাবে, একদম ন্যায় করা হবে এবার, একজন যোগ্যকেও আর ভুগতে দেওয়া হবে না, শুধু একবার আদালতের অনুমতিটা আসুক, ব্যাস দ্রুত সব পেন্ডিং প্রসেস কমপ্লিট হয়ে যাবে’।

সুনন্দা কাকিমা নিজের ছেলের কাছে কানাডাতে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সিতে উঠছিলেন বিমানবন্দরে যাওয়ার জন্য, তিনিও প্রমিতকে দেখে ধৈর্য রাখতে বললেন, সেইসঙ্গে কানাডাতে তার নাতিনাতনীরা কি দুষ্টু হয়েছে আর তার ছেলে কি মডেলের নতুন গাড়ি কিনেছে সে দেশে তাও বললেন, তারপর ট্যাক্সি ছেড়ে দিল। প্রমিত ফিরে এল বাড়িতে, পৃথার বাবার কথাগুলো বাবাকে জানিয়ে দিল, বাবা শুধু বললেন, ‘তুই যোগ্য এটা জানার পরেও………’

প্রমিত বলল, ‘যোগ্য আর অযোগ্যের মধ্যে পার্থক্য তৈরির প্যারামিটারটা ঠিক কোথায় বসানো আছে বলবে বাবা?’

বাবা চুপ করে রইলেন, প্রমিত নিজের ঘরে চলে, কিন্তু শান্তি পেল না, যোগ্য, অযোগ্য, অঞ্জনের মৃত্যু, পৃথা, স্কুল, জীবিকা, অনিশ্চয়তা, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি, সোশ্যাল মিডিয়ার কটাক্ষ, নিজেকে প্রমাণের দুশ্চিন্তা এক ভয়ংকর ভুলভুলাইয়া তৈরি করছে প্রমিতের চারধারে, তার মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল, দম নিতে পারছে না সে, কষ্ট হচ্ছে, বাবার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠছে, আশার আলো নিভে আসছে, এক গাঢ় হতাশা কালো ছায়ার মত যেন তাকে গ্রাস করতে চাইছে। না সে আর পারছে না, আর পারছে না, একছুটে ঘর থেকে, বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল প্রমিত, ছুটে চলল রেল স্টেশনের দিকে, প্রমিতদের বাড়ি থেকে স্টেশনের দূরত্ব খুব বেশি নয়।

প্রমিত এখন এসব থেকে অনেক দূরে, অনেক দূরের গ্রহে যেন সে পাড়ি দিয়েছে, জীবনের অনিশ্চয়তা থেকে অনেক দূরে চলে এসেছে সে। যোগ্য-অযোগ্যের কড়াকড়ি নেই সেখানে, সবরকম বিধিনিষধের উর্দ্ধে নিজেকে নিয়ে গিয়েছে সে, আর তাকে শুনতে হবে না সে যোগ্য কিন্তু তবুও…………সব পরীক্ষা সব যোগ্যতার দোলাচলকে পিছনে ফেলে দিয়েছে প্রমিত।

0 Comments

Post Comment