অত:পর এপারেও মঙ্গল শোভাযাত্রা হল। সংখ্যাগরিষ্ঠ ভদ্রবিত্ত বাঙালি কম্পিত কণ্ঠে, কাজী নজরুলের কবিতার লাইনের মত বলতে শুরু করে " ফ্যাসিস্ট এরশাদের বাংলা ও বাঙালির উপর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কৃতির বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ তাঁদের কৃষ্টি কালচার তুলে ধরে রাস্তায় নেমেছিল। " বলতে শুরু করেছিল বাংলা নববর্ষ-ই বাঙালির সার্বজনীন উৎসব। কাঁধে শান্তিকেতনী ব্যাগ, পাঞ্জাবি-পাজামা, শাড়ি...বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা হয়েছে। গান,কবিতা,নাচ হয়। বাড়িতে, রেস্তোরাঁয় ইলিশ-পান্তা হয়, আরও কত ক...। নববর্ষের দিনে ভদ্রবিত্ত বাঙালিরা বাঙালিয়ানার চোঁয়াঢেকুর তু্লেছে। এদের অধিকাংশ শিক্ষিত চাকুরিজীবী। শিক্ষক, ডাক্তার,উকিল, কেরানি, মাঝারি মাপের ব্যবসাদার। একদিনের বাংলা ও বাঙালি যাপনের পরের দিন অফিস,দোকানে গিয়ে সব শেষ। পরের দিন থেকে ইসলামোফোবিয়া ছড়াবে। এদের অধিকাংশই কথায় কথায় বিশ্বাস করাবে মুসলমানরা আর বাঙালি এক নয়। মুসলমানরা বাঙালি নয়। ইসলামোফোবিয়া এদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
না, এখানেই শেষ নয়। আসামে এনআরসি নিয়ে ১৯ লক্ষ বাঙালিকে বাস্তুহীন করা বিশ্বগুরু এদের কাছে ফ্যাসিস্ট নয়। এদের কাছে আসামের ১৯ লক্ষ বাঙালি বাঙালিই নয়। শুধু এরশাদ যেহেতু বাঙালিয়ানায় আঘাত করেছিলো সেটাই স্বৈরাচার, সেটাই ফ্যাসিজম। এটার বিরুদ্ধে তাদের লড়াই। যদি আসামের বাঙালিরা সত্যিই এদের কাছে বাঙালি হতো তাহলে এরা সত্যিই সত্যিই রাস্তায় বাঙালিদের অধিকারের জন্য নামতো। এই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভদ্রবিত্ত বাঙালিকে অধিকাংশ বাসে, ট্রেনে, অফিসে বিদ্বেষ ছড়াতে দেখেছি। বাংলাজুড়ে চলা যে কোন গণআন্দোলনকে দাঙ্গা হিসেবে দাগাতে দেখেছি। যখন যখন দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে একটা জাতি আন্দোলন করতে নেমেছে তখন তখন এই ভদ্রবিত্ত বাঙালিদের অধিকাংশকে ক্ষমতাসীনদের পক্ষে কথা বলতে দেখেছি। আন্দোলনকে দাঙ্গায় রূপ দিতে দেখেছি। তাদের নিন্দার ঝড় দেখেছি। তারপর তাদেরকেই ক্লাসে গিয়ে ফরাসি বিপ্লব পড়াতে দেখেছি। দেখেছি বাংলায় এনআরসির সময়ে একটা নিদিষ্ট সম্প্রদায়কে রাষ্ট্র নেতা দাগিয়ে দিচ্ছে " পোষাক দেখে চেনা যায় ওরা কারা।" হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্থানি সার্কেলের নেতারা কথায় কথায় বলে চিড়ে,মুড়ি খাওয়া বাংলাদেশি। দেখেছি রাজ্যের বাইরে কোথাও দুর্গা পুজোতে হতে দেয়নি, কোথাও কালী পুজোতে হতে দেয়নি। কিন্তু এই ভদ্রবিত্তরা তখন চুপ করে ঘুপটি মেরে বসে থাকে, মুখ খোলে না। কিন্তু সমাজের প্রান্তিক মানুষরা যখন রাস্তায় নামে জ্যামে ফাঁসলে এদের অফিস,স্কুলেরর কথা মনে পড়ে। কথায় কথায় বলে "পশ্চিমবঙ্গটা মিনি পাকিস্থান হয়ে গেছে।" ঈদে,পুজোতে ট্রেনে ভীড় দেখলে এদের সমস্যা হয়। সারা বছর ধরে গোটা দেশজুড়ে প্রতিদিন বাঙালির লাশ ফিরছে। শুধু বাঙালি হওয়ার জন্য লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। এই নিয়ে অধিকাংশ ভদ্রবিত্তদের মুখ খুলতে দেখিনি। কোথাও বাংলা বলার জন্য জন্য বাংলাদেশি বলে আক্রান্ত হচ্ছে। হাতে প্যান কার্ড, আধার, ভোটার কার্ড থাকার পরেও জেলে, হাজতে আঁটকে রাখা হচ্ছে। কোথাও জয় শ্রী রাম বলতে বাধ্য করা হচ্ছে। না বললেই অত্যাচার করা হচ্ছে, প্রাণে মারা হচ্ছে। এরা চুপ করে সারাবছর ধরে এগুলো দেখে। এদের অধিকাংশই এটা নিয়ে কোন রকম মুখ খোলে না। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষগুলো যখন তাদের কথা বলে, অধিকার আদায়ে রাস্তায় নামে তখন ভদ্রবিত্তরা দাগিয়ে দেয়, বলে 'লুঙ্গিবাহিনী'। কথায় কথায় বলে 'পশ্চিমবঙ্গকে শেষ করে দিল, সব জেহাদি ভর্তি হয়ে গেলো'।
সেই সুলতানী আমল থেকে এখন পর্যন্ত আমরা ইতিহাস দেখে বুঝতে পারি কারা বাঙালি। আদতে কারা বাংলা ও বাঙালির দরদী। কারা মনসাতলা,চড়কতলা,শিবতলা,বসন্ততলা, পঞ্চাননতলা, ধর্মতলা টিকিয়ে রেখেছে। অন্যদিকে আমরা দেখছি সেখানে সুযোগ পেলেই কারা বালাজি মন্দির করেছে। আমরা জানি কারা আউল-বাউল-ফকির, জারি-সারি-মুর্শিদি টিকিয়ে রেখেছে। কারা বনবিবি-সত্যপীর,সত্যনারায়ণ টিকিয়ে রেখেছে। আমরা জানি বাংলার ভাটির গান, উজানের গান কারা টিকিয়ে রেখেছে। কারা পীরের গান, শিবের গাজন টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের ভাদু,টুসু,ছৌ কারা টিকিয়ে রেখেছে। অদ্ভুত ভাবে, বাংলার এই সংস্কৃতি ভদ্রবিত্তের কাছে প্রয়োজনে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হয়, প্রয়োজন ফুরালেই কিভাবে এগুলো ছোটো লোকের সংস্কৃতি হয় সেটা চোখের সামনে দেখেছি। তবুও আমার নানির মুসলিম বিয়ে গীতে বাঙালিয়ানা বেঁচে আছে। তপতী কাকিমার কীর্তনে বাঙালিয়ানা বেঁচে আছে। এদের পরিবারের কেউ লুঙ্গিপরা,কেউ সালু পরা। খরা,বন্যা, সাম্প্রদায়িকতা,কাঁটাতার বুকে নিয়ে এরাই মাছে-ভাতে বাঙালিকে টিকিয়ে রেখেছে। সেই ঔপনিবেশিক আমল থেকে ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে কিভাবে বাংলার কারিগরী শিক্ষা শেষ হয়ে তাদের উত্তরসূরীরা অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকে পরিনত হয়েছে। থাক সে কথা, সংখ্যাগরিষ্ঠ ভদ্রবিত্ত বাঙালিরা কাদের দাসত্ব করেছে যা ইতিহাস ঘাঁটলেই খুঁজে পাওয়া যাবে। বাংলায় আমাদের লুঠ হয়ে যাওয়া সম্পদের ইতিহাস এখনও আমাদের মা,মাসি,দাদি, নানি,ঠাকুমার গলায় ছেলে ভুলানো ছড়া হয়ে বেঁচে আছে। এখনও ঘুম পাড়াতে গিয়ে বাড়ির মহিলা বলে ওঠে " ছেলে ঘুমালো পাড়া জুড়ালো বর্গী এলো দেশে..." এখনও আমরা জানি কারা বর্গীদের,মাড়োয়ারিদের দাসত্ব করে। হিন্দু হিন্দি হিন্দুস্থানিদের কারা এই বাংলায় অক্সিজেন দেয়। বাংলা ভাষা প্রসারে কোন ফান্ড থাকে না। তবুও এই ভদ্রবিত্ত বাঙালিরা মুখ খোলে না। আমরা অতীতে দেখেছি উর্দু আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ লুঙ্গি পরে রাইফেল,লাঠিসোঁটা নিয়ে একটা দেশকে 'বাংলাদেশ' তৈরি করেছে। গোটা পৃথিবীতে ভাষার ভিত্তিতে একটাই দেশ আছে তার নাম বাংলাদেশ। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জাতি ও জন সমাজ গঠনের যা একমাত্র উদাহরণ। সেখানে ঘাত-প্রতিঘাত থাকলেও বাংলাটা বেঁচে আছে। ভালো নেই কেউ। তবুও লড়াইয়ে আছে। অত:পর এপারেও মঙ্গল শোভাযাত্রা হয় হয়। একদিকে বর্ণাঢ্য যাত্রায় হাতি-পেঁচা-ঘোড়ার মুখোশ, গান, নতুন জামা কাপড় পরে আনন্দ যাত্রা করছে। যে কোন কিছুই ঘটেনি। আর অন্য দিকে এই গরমে লক্ষ লক্ষ খেটে খাওয়া শ্রমিক,কৃষক, অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া বাঙালি SIR এর কাগজ হাতে বিডিও অফিস,এসডিও অফিস ছুটে বেড়াচ্ছে। তারা জানে না কিভাবে উদ্ধার ভাবে। তাদের কান্ডারী নেই। একটা অসহায় জাতির একটা বৃহৎ অংশের মানুষ যারা মাঝ দরিয়াতে ফেঁসে আছে।বাঁচার প্রার্থনা করছে। এ জেরক্সের দোকান থেকে ও জেরক্সের দোকানে ছুটছে। এ উকিলের কাছ থেকে ও নেতার বাড়ি যাচ্ছে। অধিকাংশ ভদ্রবিত্ত বাঙালিরা এদের বলে ছোটলোক। আমিই সেই ছোটলোকদের একজন। আমিই সেই ছোটলোকদের প্রতিনিধি বলছি 'সব মনে রাখা হবে। সব কিছুই মনে রাখা হবে।'