পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বিশ্বগুরু থেকে বিশ্ব শর্মা - এদের বিরুদ্ধে সচেতন ভারতবাসী আর কবে একস্বর হবে?

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : সুব্রতা ঘোষ রায়
বিদ্বেষকে অনুঘটক করে রাজনৈতিক ক্ষমতা গুছিয়ে নেবার জন্য ধর্মীয় মেরুকরণের কৌশল এক নিম্ন শ্রেণীর রাজনৈতিক অপচর্চা ! এর আগে জব্বলপুর দাঙ্গা, গুজরাট দাঙ্গা, শিখ গণহত্যা, দিল্লী দাঙ্গা ইতিহাস দেখেছে। ভারত ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দেশ, আমরা কোন মূল্যেই দাঙ্গা চাই না। অথচ বিশ্বগুরু থেকে বিশ্বশর্মা আমাদের সেই পথেই টেনে নিয়ে চলেছেন।

হেট স্পীচ! স্যুট ডাউন দ্য ট্রেটরস - দেশ কে গদ্দারকো / গোলি মারো সাঁলোকো … ভাল কাজের জন্য খ্যাত না হয়ে এই শ্লোগান বলে কুখ্যাত হয়ে গেলেন অনুরাগ ঠাকুর, তৎকালীন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী। এই শ্লোগান প্রথম বলা হয়েছিল রিথালার একটি  নির্বাচনী প্রচারের জনসভায়। তারপর সাহিনবাগে, আন্টি সিএএ  প্রটেস্টারদের সভা লক্ষ্য করে, ত্রিরঙ্গা  মার্চেও এই স্লোগান ব্যবহার হয়েছে । কিন্তু এর বিরুদ্ধে তেমন কোন শাস্তি হয়নি। পরবর্তিতে এই ধরনের উস্কানিমূলক মন্তব্য থেকে নিজেকে মুক্ত করা নয়। বরং, যা বলেছি আবার বলব, আমরা ধরাছোঁয়ার  বাইরে। ন্যায়ালয়ের হস্তক্ষেপ দাবি করা হলে হয়তো বলা হবে - নিশ্চয় দেখবো, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বলা হবে - কেউ রিপোর্ট করে নি। ফলে, ফল যে তিমিরে সে তিমিরেই থেকে যায় । অথচ বিনা ঘটনায় বিনা প্রমাণে বিনা সাক্ষ্যে মিথ্যে সাজানো কেসে কত মানুষকে দিনের পর দিন বছরের পর বছর জেলের ঘানি কাটতে হয়, কাটাতারেরর ওপারে ফেলে আসা হয়, সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়, তার হিসেব নেই, ইয়ত্তাও  নেই!


কথায় আছে “হিন্দু” যখন “মুসলমান” হয় তখন তারা গোমাংস খাওয়ার যম হয়!  কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে  আসা মানে কনভার্টেড বিজেপি, বিশ্ব শর্মা-বাবুর জীবনে হেমন্ত আসুক বা না আসুক কিংবা জীবনে হিমের অন্ত হোক বা না হোক ইদানীং  মুখে তার বড়ই  কড়া গ্রীষ্মের গরম গরম বুলি ছিটকে ছিটকে পড়ছে যা আমাদের দেশের সংবিধান তো দূরের কথা, ন্যূনতম  চৈতন্যে ও মানবিক  বিধান, শিষ্টাচারের  ধার ধারছে না । আর আমরা আশ্চর্য হয়ে দেখছি দেশের সর্বোচ্চ আদালত যেখানে নিজে থেকে এই ব্যাপারে শাস্তিমূলক কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে সেখানে তারা ভাবছে কে কখন তাদের এই বিষয়টি অবগত করবে। তবু মন্দের ভাল তারা শেষ পর্যন্ত কিছু কিছু কেস দেখতে রাজি হয়েছে ...।

হিমন্ত এখন সুতো  জোড়া দেওয়া লঙ্কা বোমের বারুদ-সিরিজ । শুধু মুখেই নয় সোশ্যাল  মিডিয়ায় সহিংস ভিডিও পোষ্ট করে সে চাইছে ওপরমহলকে  সন্তুষ্ট করে টিঁকে থাকতে। ভিডিওর নাম ছিল 'পয়েন্ট ব্ল্যাংক শট'। ভিডিওতে দেখা যাচ্ছিল আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিরো হিমন্ত বিশ্বশর্মা রাইফেল তাক করে আছে  দুই ব্যক্তির মধ্যে, যার একজনের মাথায় টুপি অন্য জনের মুখে লম্বা দাড়ি - যা মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু মানুষের পোশাক ও চেহারার সঙ্গে মিলে যায়। হেমন্ত ট্রিগারে চাপ দিতেই গুলি ছুটে যায় স্যাটাস্যাট! দুদিকে,  দুজনের দিকে । উত্তেজক ভিডিও! এ  হেন ভেবেচিন্তে করা উস্কানিমূলক ভিডিও অসম  বিজেপির তরফে পোষ্ট করে তারপর কার্যকারণে মুছে দেওয়া হলেও  এই নিয়ে বিতর্ক থামার নয়, থামে নি। মামলা দায়ের হয়েছে । প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখে  শুনানির তারিখ  স্থির করবেন বলে শেষমেশ জানিয়েছেন । 


গত সপ্তাহে অসম কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ কংগ্রেস দলের তদন্ত সাপেক্ষে জানিয়েছিলেন যে রাজ্যজুড়ে ১২ হাজার বিঘা জমি হিমন্ত ও তাঁর পরিবারের দখলে আছে। এই বিতর্ক শুরু হতেই হিমন্ত বিশ্ব শর্মা কংগ্রেসের বরিষ্ট নেতা জিতেন্দ্র সিং, ভূপেশ বাঘেল ও গৌরব গগৈদের  বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি টাকার মানহানির মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় মামলায় রাজনৈতিক দাবার চালে ছয়লাপ আসামের ক্রমান্বয় চিত্র।


এ তো গেল ভিডিও ও মামলার অস্থিরতা । আর  তার সঙ্গে জুড়ে গেছে হিমন্তের মুখনিঃসৃত শব্দাবলী। তিনি রাজ্যের আসন্ন ভোটের আগে হিন্দু মেরুকরণ চূড়ান্ত ও  পাকাপোক্ত করে নিতে বলেছেন। অসমের  বাঙালি মুসলিমদের চিহ্নিত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে বাংলাদেশে ভোট দিতে বলেছেন। রাজ্যের মানুষদের প্ররোচনা দিয়েছেন যাতে তারা 'মিঞা'দের এমনভাবে বিরক্ত উত্তক্ত করে যে তারা রাজ্য ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। তারা যে বাঙালি তথা মুসলিমদের বিরুদ্ধে এককাট্টা - এটাই স্পষ্ট কথা, তাতে কোন লুকোছাপা নেই। ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় তাই মিঞাদের বিরুদ্ধে বিজেপি কর্মীদের  গোছা গোছা ৭ নং ফর্ম জমা দিতে বলেছেন। ইতিমধ্যেই নাকি ৫ লাখ সাত নম্বর ফর্ম জমা পড়েছে। মূলত মুসলিমদের রাজ্যছাড়া করাই হিমন্তের লক্ষ্য। কদিন আগেই তিনসুকিয়া জেলার ডিগবয়েও তিনি মুসলিম সম্পর্কে বলেন - ওদের ভোট যেনতেন প্রকারেণ চুরি করতে হবে, যদি রিকশাভাড়া ৫টাকা হয় তাহলে মুসলিম রিকশাচালকদের ৪টাকা দিতে হবে, যাতে পেতে টান পড়লে ওরা চলে যায়। এসব কথা যুক্তরাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রকাশ্যে কী করে বলেন? আর  দেশের শাসনব্যবস্থা তাতে কী করে  নিশ্চুপ থাকে?  

ইলেকশন কমিশন এই প্রেক্ষিতে কিছু করে নি। কংগ্রেস  সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ব্যবস্থা নিতে বলেছে। গুয়াহাটি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট লেখক হর্ষ মানদের বিশ্বশর্মার ঘৃণা  ভাষণের জন্য দিল্লীতে এফআইআর দায়ের করেছেন।কিন্তু এই  হেতু হিমন্ত দুঃখ প্রকাশ তো করেননি, বরং বেশ করেছি, আরও করবো, এই রকম  ভাব। তার কারণ হয়ত তাকে এই লাইসেন্স দেশের প্রশাসনিক মাথারা দিয়ে রেখেছেন । যার জোরেই তার এই আসংবিধানিক আচরণ। 
অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস (APCR) তাদের ‘Hate Crime Report: Mapping First Year Of Modi’s Third Government’ শীর্ষক  রিপোর্টে ৭ জুন ২০২৪ থেকে ৭ জুন ২০২৫ পর্যন্ত ৯৪৭ টি ঘটনার উল্লেখ করেছে। যার মধ্যে ৬০২টি ঘৃণাজনিত অপরাধ, ৩৪৫টি ঘৃণা ভাষনের ঘটনা, ১৭৩ টি ঘটনায় শারীরিক হামলা, এবং ২৫ জন মুসলিম মানুষের প্রাণ হারানোর মতো ঘটনার উল্লেখ আছে। বিশেষ করে মুসলিম, দলিত, আদিবাসী, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেই হামলার ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই এই ছবি পরিলক্ষিত হয়েছে। এই অপরাধের হটস্পট উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র। আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদী  বিভিন্ন সংগঠনের মদত ও পরিকল্পনায় চলেছে এই সব ঘৃণাভাষণের আঁতুড়ঘরের কাজ। শুধু লোকসভা-বিধানসভা নয়, বিভিন্ন পুরসভা, সমবায় ও আঞ্চলিক নির্বাচনেও ঘৃণা ও ধমক, চমকই  হল মূল উপকরণ। মহারাষ্ট্রে বিজেপি জোটের শরিক নেতা নীতশ রানে বলেছিলেন - এরপর মসজিদে ঢুকে ঢুকে একেক করে মুসলিম মারবো । ২০২৪ সালের অক্টোবরে দেশে ঘৃণা সংক্রান্ত অপরাধের ঘটনা ছিল ৮০ টি। ২০২৫ সে তা ১০০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল।২০২৬ তো সবে পড়ল ।  বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের দিনে যেমন রাম নবমী, গণেশ চতুর্থী, নবরাত্রি, হোলি - এই সব দিনকে  ঘৃণা ছড়িয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার  দিন হিসেবে এরা ধরে নিয়েছে যেন। ধর্মীয় উৎসবের আবহে চলে ঘৃণা ও বিদ্বেষের চাষ । ‘সংখ্যালঘু’, ‘দলিত’ শ্রেণির মানুষজনকে  হেনস্থার নানা ফন্দি ফিকির!


এছাড়াও আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস সংস্থার রিপোর্ট ও হিসেব অনুযায়ী ২০২৪এ  গুজরাট, তেলেঙ্গানা, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ  ও ঝাড়খণ্ডে প্রধানমন্ত্রী ১৭৩টি বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যার  ১১০টিই  ছিল মুসলিম বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। যেখানে আমাদের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ। মুসলিমদের সম্পর্কে  বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করে হিন্দুদের বিভ্রান্ত করে তিনি চাইছেন সামাজিক অস্থিরতা ও অবক্ষয় । এই সালেই  মুসলিমদের ওপর ২৮ টি অ্যাটাক বা আক্রমণ  হয়েছে । যার ফলে ১২ জন মুসলিম পুরুষ ও একজন খ্রিস্টান মহিলা মারা গেছেন। ইলেকশন কমিশন সেইসময় তেমন কিছু করেননি, কেবল বলেছিলেন - স্টার প্রচারকরা অগ্নিগর্ভ ভাষণ থেকে বিরত থাকলেই ভালো। আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) এশিয়া শাখার মুখ্য এলয়ানে পিয়ারসন বলেছিলেন নরেন্দ্র মোদী এইসব উস্কানি ও প্ররোচনামূলক ভাষণে এলোপাথারি  মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি  মিথ্যে ও অসঙ্গত  অভিযোগ করে যাচ্ছেন। বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের বাসস্থান, কাজের জায়গা, ধর্ম পালনের জায়গা কোন আইন না মেনে  ভেঙে  গুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে ।রিপোর্টে অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদী, যোগী আদিত্য নাথ, হিমন্ত বিশ্বশর্মা, অনুরাগ ঠাকুর প্রমুখর নাম ও পদ উল্লেখ করে বলা হয়েছে  - এরা শান্তির স্থিতাবস্থায় ক্রমশ আগুণের ইন্ধন দিয়ে যাচ্ছেন। রাজস্থানের বান্সারায় মোদী বলেছেন - মুসলিম মাত্রেই অনুপ্রবেশকারী ও অধিক সন্তান উৎপাদনকারী । একটি বিশেষ শ্রেনিকে পরিকল্পিতভাবে ভাষণে এইভাবে নিয়ে আসার অর্থ বেআইনিভাবে ক্রমাগত অপদস্ত করা। HRW-র  রিপোর্টে স্পষ্টভাবে এইসব বিষয় উল্লিখিত । 


বিদ্বেষকে অনুঘটক করে রাজনৈতিক ক্ষমতা গুছিয়ে নেবার জন্য ধর্মীয় মেরুকরণের কৌশল এক নিম্ন শ্রেণীর রাজনৈতিক অপচর্চা !  এর আগে জব্বলপুর  দাঙ্গা, গুজরাট দাঙ্গা, শিখ গণহত্যা, দিল্লী দাঙ্গা ইতিহাস দেখেছে। ভারত ধর্মীয় সহিষ্ণুতার দেশ, আমরা কোন মূল্যেই দাঙ্গা চাই না। আমাদের সংবিধান সব ধর্মের সমান অধিকার ও স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। অন্য ধর্মের প্রতি  শ্রদ্ধাশীল থেকে নিজের ধর্মপালনের শান্তির বাতাবরণ ভারতবর্ষের প্রতিটি সুস্থ স্বাভাবিক নাগরিকের কাম্য । সেখানে বিশ্বগুরু থেকে বিশ্ব শর্মার জ্বালাময়ী ভাষণ ও তার প্রয়োগের  বিরুদ্ধে সচেতন   ভারতবর্ষ এখনো যদি  একস্বর না হয়, তবে আর কবে হবে?

0 Comments

Post Comment