"আমি যে কী পরিমাণ পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে এসেছি, তা আমার ব্যক্ত করে পারব না। ভিডিওগুলো অবিরাম চলত… শেষমেশ যৌনতার ধারণাটাই আমার ঘৃণ্য লাগতে শুরু করেছিল," জানিয়েছিলেন রায়না সিং, ডেটা কর্মী।
রায়না সিং ২৪ বছর বয়সে তথ্যভাষ্যের কাজে ঢুকেছিলেন। স্নাতক ডিগ্রী শেষ করার পর তার ইচ্ছা ছিল শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার, কিন্তু তার আগে একটি স্হায়ী আয়ের উপায় নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। তিনি ফিরে গিয়েছিলেন নিজের দেশের বাড়ি উত্তরপ্রদেশের বারেইলিতে, যেখানে তার কাজ ছিল প্রতিদিন সকালে শোবার ঘর থেকে কম্পিউটারে লগইন করা এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য চুক্তিবদ্ধ একটি থার্ড-পার্টি প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করা। এই কাজের জন্য তার বেতন ছিল মাসে প্রায় ৩৩০ পাউন্ড যা তৎকালীন পরিস্থিতিতে তার যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল। যদিও কাজের বিবরণ ছিল অস্পষ্ট, কিন্তু তার মনে হয়েছিল কাজটি সামলানো সম্ভব।
প্রাথমিকভাবে তার কাজ ছিল লিপিভিত্তিক অর্থাৎ কোন ছোট বার্তা বাছাই করে তা স্প্যাম হিসেবে চিহ্নিত করা এবং নেট দুনিয়ার প্রতারণামূলক ভাষা শনাক্ত করা। রায়না বলেছিলেন “এটাকে উদ্বেগজনক মনে হয়নি। শুধু একঘেয়ে লেগেছিল। কিন্তু এই কাজের মধ্যে একটা উত্তেজনাও ছিল। আমার মনে হতো আমি এআই-এর নেপথ্যে কাজ করছি। আমার বন্ধুদের কাছে এআই মানে ছিল শুধু চ্যাটজিপিটি। আমি দেখছিলাম কীভাবে এটা কাজ করে।” কিন্তু প্রায় ছ'মাস পর, কাজের ধরন বদলে গেল। কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই রায়নাকে একটি প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনের প্ল্যাটফর্মের সাথে যুক্ত নতুন একটি প্রকল্পে স্থানান্তর করা হল। এবার তার কাজ হল শিশুদের যৌন নির্যাতন সম্পর্কিত বিষয়বস্তুকে শ্রেণীবদ্ধ করা। রায়না জানিয়েছিলেন, “আমি কখনো কল্পনাও করিনি যে এটা আমার কাজের অংশ হবে।” তার কাজের বিষয়বস্তুগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং নির্মম। এই কাজের প্রভাবে নিজের মানসিক ও শারীরিক উৎপীড়ণের আশঙ্কা নিয়ে তিনি যখন তার ম্যানেজারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন তাকে বলা হয়েছিল: “এটা তো ঈশ্বরের কাজ – তুমি শিশুদের সুরক্ষিত রাখছ।”
এর কিছুদিন পরেই, কাজটি আবার বদলে যায়। রায়না এবং তার দলের আরও ছ'জনকে পর্নোগ্রাফিক বিষয়বস্তু শ্রেণীবদ্ধ করে আলাদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। রায়না বলেছিলেন, “আমি যে কী পরিমাণ পর্নোগ্রাফির সংস্পর্শে এসেছি, তা আমার ব্যক্ত করে পারব না। এটা চলত অবিরাম, ঘণ্টার পর ঘণ্টা।” স্বাভাবিকভাবে এই কাজটি তার ব্যক্তিগত জীবনে প্রভাব ফেলেছিল। যৌনতার ধারণা তার কাছে ক্রমশ এই ঘৃণ্য বিষয়বস্তু হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তিনি অন্তরঙ্গতা থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন এবং সঙ্গীর থেকে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন বোধ করতেন।
সিং যখন তার মানসিক ও শারীরিক দুরবস্থার কথা জানিয়ে ম্যানেজারের কাছে আবার অভিযোগ করেন, তখন অপরপক্ষ থেকে রূঢ়ভাষী উত্তর আসে, "আপনার চুক্তিতে তথ্যভাষ্যের কথা বলা আছে – এটাই তথ্যভাষ্য।" অবশেষে তিনি চাকরিটি ছেড়ে দেন, কিন্তু এই ঘটনার এক বছর পরেও তিনি জানিয়েছিলেন যে যৌনতার ধারণা তার মধ্যে বমি বমি ভাব বা বিচ্ছিন্নতাবোধ জাগিয়ে তোলে। “কখনও কখনও, যখন আমি আমার সঙ্গীর সাথে থাকি, তখন নিজের শরীরেই নিজেকে অচেনা মনে হয়। আমি ঘনিষ্ঠতা চাই, কিন্তু আমার মন ক্রমাগত দূরে সরে যেতে থাকে।”
নিজের বাড়ির বারান্দায়, দেয়ালের সাথে লাগোয়া মাটির ঢিবির ওপর ল্যাপটপ রেখে মনশুমি মূর্মূ এমন একটি জায়গা থেকে কাজ করেন যেখানে মোবাইলের সিগন্যাল পাওয়া যায়। বাড়ির ভিতর থেকে ভেসে আসে ঘরোয়া জীবনের চেনা শব্দ: থালাবাসনের ঠুনঠুন, পায়ের আওয়াজ, মানুষের কথাবার্তা। অথচ তার স্ক্রিনে চলে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃশ্য: একদল পুরুষ একজন মহিলাকে চেপে ধরেছে, ক্যামেরা কেঁপে উঠছে, চিৎকার আর ঘনঘন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ভিডিওটি এতটাই অস্বস্তিকর যে মূর্মূ ভিডিওটির চলার গতি বাড়িয়ে দেন, কিন্তু তার কাজের স্বার্ ভিডিওটি তাকে শেষ পর্যন্ত দেখতেই হবে। ২৬ বছর বয়সী মনশুমি মূর্মূ ভারতের ঝাড়খণ্ড রাজ্যের নিজের গ্রাম থেকে একটি আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সংস্থার কন্টেন্ট মডারেটর হিসেবে কাজ করেন। তার কাজ হলো সেইসব ছবি, ভিডিও এবং লেখাকে শ্রেণীবদ্ধ করা, যেগুলোকে স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম প্ল্যাটফর্মের নিয়ম লঙ্ঘনের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। প্রতিদিন তাকে প্রায় ৮০০টি ভিডিও এবং ছবি দেখে সেগুলোর বিচার-বিশ্লেষণ করতে হয়, যা অ্যালগরিদমকে নেট দুনিয়ায় সহিংসতা, নির্যাতন এবং ক্ষতিকারক বিষয়বস্তু শনাক্ত করতে প্রশিক্ষণ দেয়।
এই কাজটি রয়েছে মেশিন লার্নিংয়ের সাম্প্রতিক যুগান্তকারী সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে, যা প্রতিষ্ঠিত যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অর্থাৎ এআই ঠিক ততটাই ভালো, যতটা ভালো ডেটা দিয়ে তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ভারতে এই প্রশিক্ষণের কাজটি ক্রমবর্ধমানভাবে নারীরাই করছেন, যাদের প্রায়শই 'অদৃশ্য কর্মী' হিসাবে বর্ণনা করা হয়। মনশুমি জানান, “প্রথম কয়েক মাস আমি ঘুমাতে পারতাম না। চোখ বন্ধ করলেও দেখতাম স্ক্রিনটা লোড হচ্ছে।” সেই নির্মম দৃশ্যগুলো তার স্বপ্নেও আসত - মারাত্মক দুর্ঘটনার, পরিবারের সদস্যদের হারানোর এবং এমন যৌন সহিংসতার চিত্র যা তার মনস্তত্ত্ব এড়াতে পারেনি। সেই দুঃসহ রাতগুলি তার মা জেগে তার পাশে বসতেন থাকতেন।
মনশুমি জানান, আজ সেই দৃশ্যগুলো তাঁকে আর আগের মতো যন্ত্রণা দেয় না। “শেষে আপনি আর অস্বস্তি বোধ করেন না – আপনি অনুভূতিশূন্য হয়ে যান।” এখনও কিছু কিছু রাতে সেই স্বপ্নগুলো ফিরে আসে। তিনি বলেন, “তখনই আপনি বুঝতে পারেন যে সেই কাজটি আপনার মধ্যে বিরাট একটা পরিবর্তন এনেছে।”
মূর্মূর ভয় ছিল, তার পরিবার যদি তার কাজের কথা জানতে পারে, তাহলে গ্রামের অনেক মেয়েদের মতো তাকেও বেতনভুক্ত চাকরি ছেড়ে বিয়ে করতে বাধ্য করা হবে। মাসে প্রায় ২৬০ পাউন্ড বেতনের এই চুক্তির আর মাত্র চার মাস বাকি ছিল। বেকারত্বের আশঙ্কা তাকে তার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করতে বাধা দিয়েছে। এই স্থায়ী কাজটির চেয়ে অন্য চাকরি খোঁজার চিন্তাটাই তাকে বেশি ভাবায়।
মনস্তাত্বিক গবেষকদের মতে, এই মানসিক অসাড়তা, এই অনুভূতিশূন্যতা—যার পরে বিলম্বিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব হিসেবে দেখা দেয়—কন্টেন্ট মডারেশন কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের এক প্রধান বৈশিষ্ট্য। সমাজবিজ্ঞানী মিলাগ্রোস মিসেলি, যিনি ‘ডেটা ওয়ার্কার্স এনকোয়ারি’ নামক একটি প্রকল্পের শীর্ষে রয়েছেন, তার মতে, “এমন মডারেটরও থেকে থাকতে পারেন যারা হয়ত সত্যিই মনস্তাত্ত্বিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পান, কিন্তু সে বিষয়ে আমি এখনও কোন প্রমাণ দেখিনি।" তিনি বিশদে জানান, “ঝুঁকির দিক থেকে, কন্টেন্ট মডারেশন বিপজ্জনক কাজের শ্রেণিতে পড়ে, যা যেকোনো প্রাণঘাতী শিল্পের সাথে তুলনীয়।” বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, কন্টেন্ট মডারেশন দীর্ঘস্থায়ী জ্ঞানীয়, মানসিক ও শারীরিক চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে প্রায়শই আচরণগত পরিবর্তন দেখা যায়। কর্মীরা নিজেদের অতিরিক্ত সতর্কতাজনিত অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা, উদ্বেগ এবং ঘুমের সমস্যার কথা জানান। গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত কন্টেন্ট মডারেটরদের উপর একটি সমীক্ষায়, যেখানে ভারতের কর্মীরাও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, ট্রমাটিক স্ট্রেসকে সবচেয়ে প্রকট মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য সচেতনার স্বার্থে হস্তক্ষেপ এবং সহায়তার ব্যবস্থা থাকলেও, উল্লেখযোগ্য পরিমাণে মানসিক চাপ ছিল।
দেশের বিশিষ্ট আইটি শিল্প সংস্থা 'ন্যাসকম'-এর মতে, ২০২১ সালের শুরুতেই ভারতে আনুমানিক ৭০,০০০ মানুষ তথ্যভাষ্যের কাজে নিযুক্ত ছিলেন, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার (১৮০ মিলিয়ন পাউন্ড)। এই আয়ের প্রায় ৬০% আসত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এবং ভারত থেকে আসত মাত্র ১০%। তথ্যভাষ্যভিত্তিক কাজ এবং কন্টেন্ট মডারেশন শ্রমিকদের প্রায় ৮০% গ্রামীণ অথবা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে আসেন। থার্ড-পার্টি সংস্থাগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট শহর ও মফস্বল থেকে তাদের কাজ পরিচালনা করে, যেখানে শ্রমের দাম কম এবং প্রথম প্রজন্মের স্নাতক পাশ করার একটা বড় অংশের ছাত্রযুব স্থায়ী চাকরির সন্ধান করছে। এই কর্মশক্তির প্রায়-সম্পূর্ণ দায়ভার তুলে দেওয়া হয়েছে নারীদের কাঁধে। সংস্থাগুলির কাছে নারীদের নির্ভরযোগ্যতা, খুঁটিনাটি বিষয়ে মনোযোগী হওয়া এমন গৃহভিত্তিক বা চুক্তিভিত্তিক কাজের ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় করে তোলে। নারীরাও সেই কাজে আগ্রহী হতে বাধ্য হন যা সমাজে 'নিরাপদ' বা 'সম্মানজনক' বলে বিবেচিত হতে পারে এবং যা তাদের স্থানান্তরিত করেও স্থায়ী আয়ের উপায় সুনিশ্চিত করে। এই কেন্দ্রগুলোতে কর্মরত শ্রমিকদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দলিত এবং আদিবাসী সম্প্রদায়ের মহিলা। তাদের অনেকের জন্য, যেকোনো ধরনের ডিজিটাল কাজ সামাজিক উত্তরণের একটি জ্বলন্ত প্রতীক; যা তাদের কাছে কৃষি বা খনির কাজের চেয়ে অনেক পরিচ্ছন্ন, নিয়মিত এবং ভালো বেতনের চাকরি।
কিন্তু বাড়ি থেকে বা বাড়ির কাছাকাছি কাজ করলেও তা একপ্রকার নারীদের প্রান্তিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে থাকে, এমনটাই মনে করেন প্রিয়ম ভাদালিয়া, যিনি মূলত এআই এবং তথ্যভিত্তিক শ্রম নিয়ে কাজ করেন। তার মতে কাজটির সম্মানজনক অবস্থান এবং এটি যে পরিমান পারিশ্রমিকসহ কর্মসংস্থানের এক দুর্লভ উৎস হিসেবে গ্রামীণ মহিলাদের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছায়, তা প্রায়শই এক ধরনের কৃতজ্ঞতা ও উচ্চাকাঙ্খার প্রত্যাশা তৈরি করে। সেই প্রত্যাশাই একদিন কর্মীদের এই কাজের ফলে তৈরি হওয়া চূড়ান্ত পর্যায়ের মানসিক ক্ষতি নিয়েও প্রশ্ন তুলতে নিরুৎসাহিত করে।
ভাদালিয়া জানান, এই ধরনের চাকরির বিজ্ঞাপনে খুব কমই ব্যাখ্যা করা থাকে যে আসলে কী কাজ করতে হবে। মানুষকে অস্পষ্ট লেবেলের অধীনে নিয়োগ করা হয়, কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার এবং প্রশিক্ষণ শুরু হওয়ার পরেই তারা বুঝতে পারেন যে আসল কাজটা কী। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে রিমোট এবং পার্ট-টাইম কাজগুলিকে অনলাইনে 'সহজ টাকা' অথবা 'বিনা বিনিয়োগে উপার্জনের সুযোগ' হিসেবে আগ্রাসীভাবে প্রচার করা হয়। ইউটিউব ভিডিও, লিঙ্কডইন পোস্ট, টেলিগ্রাম চ্যানেল এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের পরিচালিত টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে এই কাজগুলোকে নমনীয়, স্বল্প-দক্ষতার এবং সর্বোপরি নিরাপদ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
এহেন ঝুকিপূর্ণ কাজের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলির দ্বারা মানসিক সহায়তা প্রাপ্তি নিয়ে ভাদালিয়া জানান, যেখানে সহায়তা পাওয়া যায়, সেখানে কর্মরত ব্যক্তিকেই তা খুঁজে নিতে হয়, অর্থাৎ নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের পরিচর্যার ভার দিনের শেষে কোম্পানিগুলি কর্মীদের উপরেই চাপিয়ে দেয়। অনেক ডেটা কর্মী, বিশেষ করে যারা সমাজের প্রান্তিক স্তর থেকে এসেছেন, তাদের হয়তো নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করার মতো ভাষাও নেই, এবং সেই বাস্তবতার উপর দাঁড়িয়েই কোম্পানিগুলি পরিমানের অধিক শ্রম নিংড়ে নেওয়ার পরই নিজস্ব দায় ঝেড়ে ফেলে। ভাদালিয়ার মতে, ভারতের বর্তমান শ্রম আইনে মানসিক ক্ষতির আইনি স্বীকৃতির অভাবও শ্রমিকদের কোনরকম অর্থপূর্ণ সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করে।
কন্টেন্ট মডারেটর এবং ডেটা কর্মীরা কঠোর গোপনীয়তা চুক্তিতে (NDA) আবদ্ধ থাকেন, যা তাদের পরিবার ও বন্ধুদের সাথেও নিজেদের কাজ নিয়ে কোনরকম আলোচনা করতে বাধা দেয়। এই চুক্তি লঙ্ঘন করলে চাকরিচ্যুতি বা আইনি ব্যবস্থা খাঁড়া ঝুলতে থাকে তাদের উপর। এমত অবস্থায় বিচ্ছিন্নতার কারণে মানসিক চাপ আরও তীব্র হয়। প্রান্তিক স্তরের মহিলাদের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনাকে হাতিয়ার করে তাদের উপর পুঁজিবাদী শোষণের মাত্রা তীব্রতর হয়।
এআইয়ের কাজের অফার সামগ্রিকভাবে মহিলাদের মনে একটি সামাজিক উত্তরণের স্বপ্ন হয়ে আসে, কিন্তু অচিরেই তা পরিণত হয় পুঁজিবাদী শোষণের বেড়িতে। যে কাজ সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী মহিলাদের ঘরের মধ্যে অবস্থান ও অস্তিত্ব নিয়ে 'নিরাপত্তা'কে সংজ্ঞায়িত করে, তা আদৌ মহিলাদের স্বাধীকার ও বেঁচে থাকার পক্ষপাতী নয়। এখানেই পুঁজিবাদের অসামান্য মেলবন্ধন পিতৃতান্ত্রিক মানসিকার সাথে। মহিলারা ঘরে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে আবদ্ধ থাকল, এহেন নির্মম কাজ ছাড়ার ক্ষেত্রেও আইনি জটিলতা বিদ্যমান, তাছাড়া মহিলাদের তো নিজের মানসিক মর্যাদা অবজ্ঞা করতে ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয়; অতএব মহিলারা কাজের প্রতিও আবদ্ধ থাকল এবং সেটিও যথেষ্ট কম অথচ স্হায়ী মজুরিতে। অর্থাৎ মহিলাদের বাড়িতে আবদ্ধ রেখেই, তাদের শ্রম শোষণ করে উদ্বৃত্ত মূল্যও হাসিল করা গেল। পুঁজিবাদ এখানেই জিতে যায়, কারণ নানাবিধ বেড়াজালে আবদ্ধ মহিলাদের মগজধোলাই পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তিলে তিলে করেই এসেছে, যা এই একই কাজ করতে চাওয়া পুঁজিবাদের পথকে সুগম্য করে। মহিলারা নিজেদের মানসিক স্বাস্থ্য, স্বার্থ ও স্বাধীকার নিয়ে ভাবতে ভুলে যায়; পিতৃতন্ত্র ও পুঁজিবাদের শৃঙ্খলের ভেঙে বেরোনোর আশা ছেড়ে, তারা শোষণের মধ্যে উত্তরণের মিথ্যে স্বপ্ন দেখে, তাদের দৈহিক শ্রমের মত আজ তাদের জ্ঞানীয় শ্রমও পর্যবসিত হয় শোষণকারী যন্ত্রের জন্য উদ্বৃত্ত মূল্য ও মুনাফা সংগ্রহের কাজে।