পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

চড়-থাপ্পড়-লাথি-ঘুষি : বাঙালির রাজনৈতিক নাড়ীস্পন্দন

  • 14 June, 2024
  • 0 Comment(s)
  • 566 view(s)
  • লিখেছেন : অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
সম্প্রতি কঙ্গনা রানাউতের গালে কষানো হয়েছে বিরাশি সিক্কার চড়। এও একটা হিংসা বৈকি! তা নিয়ে বাঙালি দুটো গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে – একদল সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন পৈশাচিক উল্লাসে আর আরেকদল নিন্দায় মুখর হয়েছেন। কিন্তু হিংসা দিয়ে কি সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব ?

সালটা ১৯৯৬। মে মাস, ভোটের দিন। দক্ষিণ কলকাতার কোনো এক পাড়ায় বাচ্চারা বল ভেবে বোমা নিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করেছিল। ফল দুজনের মৃত্যু। কবীর সুমন গান বেঁধেছিলেন ‘হাউ’স দ্যাট’। ২০২৪ সাল। মে মাস, ভোটের মরসুম। পান্ডুয়ার তিন্না নেতাজিপল্লি কলোনিতে পুকুরের ধারে খেলা করছিল কয়েকজন কিশোর। একটা বিকট শব্দ, মানুষ দেখল বোমার আঘাতে ছিটকে নানা দিকে পড়ে আছে শিশুরা। এক কিশোর মৃত। দুটো ঘটনার মধ্যে ব্যবধান ২৮ বছর। মনে পড়ে গেল পূর্ণেন্দু পত্রী লিখেছিলেন, ‘আক্রমণ কোনো নতুন শব্দ নয়/হিংসা কোনো নতুন শব্দ নয়’।

সম্প্রতি কঙ্গনা রানাউতের গালে কষানো হয়েছে বিরাশি সিক্কার চড়। এও একটা হিংসা বৈকি! তা নিয়ে বাঙালি দুটো গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে – একদল সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন পৈশাচিক উল্লাসে আর আরেকদল নিন্দায় মুখর হয়েছেন। চোখের আন্দাজে বলা যায় প্রথম গোষ্ঠিই সংখ্যাগুরু। তাঁদের অনেকে আবার জনৈক অফিসারের উদ্দেশে অর্থসাহায্যের ঘোষণাও করেছেন। আর ঠিক এইখানে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে, ২০১৯ সালে নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসের কথা। হায়দ্রাবাদে দিশা নামে এক যুবতীর নৃশংস ধর্ষণের ঘটনা সারা দেশে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। পুলিশ দ্রুততার সঙ্গে অপরাধীদের শনাক্ত করে পাকড়াও করলেও মানুষের মনের গনগনে আঁচ নিভছিল না। তাঁরা চেয়েছিলেন আরও বেশি কিছু। ঘটেওছিল তাই। পুলিশ কিছুদিন পরেই এনকাউন্টারে অভিযুক্তদের হত্যা করেছিল। তখন দেশজুড়ে সেই সব পুলিশদের প্রায় দেবতার আসনে চড়ানো হয়েছিল। ফুলবর্ষণ করা হয়েছিল। তারপরে অনেকেই আর সে ঘটনার খবর রাখেননি। বিচারব্যবস্থাকে তোয়াক্কা না-করে সেদিন পুলিশের তরফে ঘটানো ‘ফেক এনকাউন্টার’ যে আসলে একটা অপরাধ ছিল মানুষ সেটা ভুলে গিয়েছিলেন। কিন্তু আদালত ভোলেনি। এই বছর ২ মে আপাতত স্টে-অর্ডার পড়লেও অভিযুক্ত অফিসারদের মাথায় শাস্তির খাঁড়া এখনও ঝুলছে। জুলাই মাসে পরবর্তী শুনানি। কঙ্গনার চড় খাওয়ার ঘটনায় আবারও যাঁরা এই উন্মাদনা দেখাচ্ছেন তাঁরা এবারও ভুলে যাচ্ছেন যে, একবার যদি পুলিশ-সেনাদের লাঠি-বন্দুক চালানোটা ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের বিচারে মান্যতা পায়, তাহলে দেশে রক্তগঙ্গা বয়ে যেতে পারে। অনেকেই গুলির সঙ্গে চড়ের তুলনা টানাকে বাতুলতা বলে উপহাস করবেন কিন্তু দুটোই যে হিংসারই ভিন্ন রূপ তা বিস্মৃত হচ্ছেন। হ্যাঁ একথা ঠিক যে, কঙ্গনা মৌখিকভাবে যে-ধরণের বাক্য ব্যবহার করেছেন তা সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু তাই বলে তার জবাব শারীরিক নিগ্রহ কোনোদিনই নয়। গণতন্ত্রে প্রতিরোধের বিবিধ উপায় আছে, সভ্য সমাজ আশা করি সেটা ভুলবেন না। কেননা একবার তা ভুলে গেলে, ভোট-পরবর্তী যে-হিংসা রাজ্যজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, গুগল করলেই যে-সব শিরোনামের লম্বা ফিরিস্তি দেখা যাচ্ছে, সেগুলি প্রতিবাদযোগ্যতা হারিয়ে ফেলবে। আর সেটা গুণ্ডারাজের পক্ষে সুদিন ডেকে আনার নামান্তর হবে মাত্র। গণতন্ত্রে হিংসার বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াতেই হবে – তা যার বিরুদ্ধেই হোক – সেখানে ব্যক্তিগত পছন্দের রকমফেরে প্রতিবাদে বাছবিচার করা চলবে না।

কিন্তু বাঙালি কি পারবে তা? আমার মনে হয় পারবে না। কেননা হিংসা হল বাঙালির কাছে একটি রোম্যান্টিক শব্দ। বাঙালির রাজনৈতিক জীবন হিংসার লাবণ্যময়ী বাহুডোরে লালিতপালিত হয়েছে। নির্বাচন সেখানে কেবলই সেই ত্রাসের উৎসবমাত্র। নৃশংসতা এই সময় খোলস ত্যাগ করে। চতুর্দিকে দাপিয়ে বেড়ায় রক্তের আদিম ক্ষুধা, যার সামনে অবিনয়ী সূর্যের প্রখরতাও ম্লান ঠেকে। দার্শনিক থমাস হবস্‌ জানিয়েছিলেন, হিংসা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আর বাঙালির রাজনৈতিক পরিবেশ ও সংস্কৃতি এই প্রবৃত্তি দ্বারাই নির্মিত। বিপ্রতীপে অহিংসা হল প্রবৃত্তি দমনের কঠিন মার্গ। তাই গান্ধী বাঙালির আইকন নন। বাঙালি নেতাজির পূজারি। বাঙালির রাজনীতি চিরকাল বোমা-পিস্তল-ছুরির রোমাঞ্চে ঠাসা। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন অবিভক্ত বাংলায় সশস্ত্র রাজনীতির ঢেউ তুলেছিল। অনুশীলন সমিতি কিংবা যুগান্তর তৈরি হয়েছিল। উত্তরস্বাধীনতাকালেও ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ির উত্তাল আবহাওয়া পশ্চিমবঙ্গকে আলোড়িত করেছিল। বরাহনগর হত্যাকাণ্ড থেকে হেমন্ত বসুর হত্যার রক্তধৌত দিনগুলি বাঙালি আজও সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়নি।

১৯৭৭ সালে পশ্চিমবঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এক অন্য সমাজ যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বলেছিলেন ‘দলগত সমাজব্যবস্থা’। বাঙালি তখন স্ট্যালিন-মাও-গেভেরার ভক্ত। ‘গেরিলা লড়াই’ চিরকাল তার যুযুৎসার অনুপ্রেরণা। ব্যক্তি নয়, ব্যষ্টি নয়, যেখানে ‘দল’ সর্বময় কর্তা। সেই সময়ে বিচ্যুতির অবকাশ ছিল আয়াসসাধ্য। বেয়াদপির শাস্তি ছিল কড়া। ১৯৯৩ সালের ৭ জানুয়ারি আর ২১ জুলাই, তার অমোচনীয় দৃষ্টান্ত। এছাড়া মরিচঝাঁপি, আনন্দমার্গী হত্যা, সুচপুর, নন্দীগ্রাম সবই একেকটি হিংস্রতার মাইলস্টোন। ২০১১কে ভাবা হয়েছিল পরিবর্তনের ঐশ্বরিক দূত। কিন্তু মাত্র ন’মাসের মধ্যে জানা গিয়েছিল তা আসলে যথার্থ উত্তরাধিকার। ৫৬ জন সিপিএম সদস্যের হত্যা ঘোষণা করেছিল ঐতিহ্যরক্ষার যোগ্যতা। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন মানুষকে সন্দেহহীন করেছিল। পশ্চিমবঙ্গে ও বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে হিংসা তাই কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটা ইতিহাসগতসূত্রে প্রাপ্ত দৈনন্দিন যাপনের অংশ। দীর্ঘদিনের চর্চা ও চর্যা বাঙালির রাজনীতিকে হিংস্রতার অন্তর্গত করেছে। আদর্শ, সমাজবদলের স্বপ্ন, বিপ্লব ইত্যাদি শব্দগুলি শুকিয়ে গেলেও হিংসা সজীব-শুদ্ধ প্রবাহের মতো আজও টিকে গিয়েছে।

বাঙালির চৈতন্য হিংসার পরিখা দ্বারা আবৃত। শারীরিক আক্রমণ শুধু নয়, এখানে কুবাক্যের দ্বারাও মনবমনকে রক্তাক্ত হতে হয় নিত্যদিন। অফিসে, ঘরে, ট্রেনেবাসে, পাড়ায় ও টিভিতে চতুর্দিকে কেবলই হিংসাত্মক বাক্যের চপেটাঘাত, জীবনের উপর অনর্গল নিগ্রহ। কথাতেই বাঙালি জানিয়েছে, ‘হাতে না পারি, ভাতে মারব’। অর্থাৎ যেভাবেই হোক বাঙালি মার ও পাল্টামারের বাইরে বেরোবে না। দাঙ্গা, খুন, জাতিবিদ্বেষ হল ‘আকস্মিক হিংস্রতার’ স্মারক, সে অভিজ্ঞতাও আমাদের ডিএনএতে আছে। খেয়াল করে দেখবেন, ট্রাফিক সিগন্যালে বা রাস্তায়ঘাটে বাইক-গাড়ি-অটোচালকরা কত তাড়াতাড়ি অধৈর্য হয়ে ওঠেন, আর কী চমৎকার সুবাক্য অনর্গল নির্গত হয়। এছাড়া খেলার মাঠ, বাজার, অফিস সর্বত্র বাঙালির মৌখিক সহিষ্ণুতার সাক্ষী রোজ মেলে। ৪ জুনের পরে বামফ্রন্টের বড় শরিক সিপিএম তো নিত্যদিন ফেসবুকে ও অন্যত্র বাংলার ‘লক্ষ্মীশ্রী’ প্রাপক মেয়েদের কত-না-অপশব্দে জর্জরিত করছে তার ইয়ত্তা নেই। পরাজয় থেকে উদ্ভূত ক্রোধের এই যে প্রকাশভঙ্গি তা কি হিংসা নয়? এগুলিকে ‘দৈনন্দিন হিংস্রতা’ বললে অত্যুক্তি হবে না। এর জবাবে যদি কোনো সুসন্তান মায়ের অপমান সহ্য করতে না-পেরে কোনো এক জেএনইউ কিংবা জেইউ ফেরত নেতানেত্রীকে বাঁ-পায়ে একটি লাথি মারেন তা কি খুব সমর্থনযোগ্য হবে? হবে না, কেননা এও হিংসার জবাবে প্রতিহিংসাই। প্রয়োজনে মান-হানির মামলা হোক, তাই বলে হিংসাকে সমর্থন করা যায় না। কিন্তু বাঙালিকে থামাবে কার সাধ্য! আর এখন তো প্রাক্‌, মধ্য ও উত্তর নির্বাচনী হিংসা হল সত্তারূঢ় দলের কাছে একটা নিয়মিত কৌশল। এখানে সহিংস্রতা না-গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার একটি আয়ুধ। ভয়ের পরিবেশই নির্বাচনে জেতার একটা জরুরি পরিমিতি।

কিন্তু হিংসকরা খেয়াল করেন না যে, হিংসার দোসর হল শোক। প্রতিটি হিংসা যতখানি শিরোনাম হয়, ততটাই নিভৃতে থেকে যায় পরিবারের আর্তনাদগুলি। মায়ের বুকফাটা চিৎকার, স্ত্রীর বিবর্ণ মুখ আর শিশুর আচমকা বুঝে ওঠা ‘অনাথ’ শব্দের অর্থ ইত্যাদি থেকে যায় পাতালের অন্তরালে। বুলডোজার সংস্কৃতি থেকে অনার-কিলিং ভিন্নরূপে বহন করে শোকের দ্যোতনা। হিংসা যত বেশি ভীতি চাগাড় দিয়ে রাখার নিয়ামক হিসাবে জনপ্রিয়তা লাভ করে, ততই আতঙ্ক ও শোকের স্মৃতি অমলিনতর হয়। এই মুহুর্তে বুদবুদের মতো জেগে উঠছে একটি ভয়ের ব্যক্তিগত স্মৃতি। আট বছর আগের কথা। সেদিন আমি দেখেছিলাম কীভাবে মাত্র হাজার টাকার জন্য রাজনৈতিক দলের মদতপুষ্ট বিশেষ ধর্মের কিছু উন্মত্ত যুবক আমাদের বাড়ি ঘিরে ফেলেছিল। মুখে সাদা কাপড় জড়ানো, হাতে দা আর কণ্ঠে গর্জিত নিমন্ত্রণ – ‘বাইরে আয়!’ সঙ্গে বাড়ির দরজায় মুহুর্মুহ লাথি, জানলায় ইটবর্ষণ, কাচের ঝনঝন করে ভেঙে পড়া। আমার সত্তরোর্ধ দিদা যখন ওদের পা ধরল, আমি টের পেয়েছিলাম রাগান্বিত, বিরক্ত, অতৃপ্ত, অশান্ত এই মানুষগুলোর হিংস্রতা আসলে অস্তিত্বের সংগ্রাম। দলের চোখে যোগ্য হয়ে ওঠার জীবনযুদ্ধ। তাই শুয়োর যেমন পাঁক ছাড়া থাকে না, তেমনই বাঙালির রাজনীতিও হিংসা ব্যতীত মৃত। এ আঁধারই আমাদের রাজনীতির প্রকৃত আধার।

চড় আমিও খেয়েছি। তার আওয়াজ এখনও আমার কানে বাজে। ২০১১ সালে কলেজে পড়ার সময়, দখলিকৃত কলেজ ইউনিয়নের জিএস-কে আমি ‘চিনি না’ বলায় বেধড়ক মার খেতে হয়েছিল। এবং যত বড় হয়েছি, চারপাশে তাকিয়ে দেখেছি, ইতিহাস জেনেছি, দৃঢ় ও নিশ্চিত হয়েছে এই সিদ্ধান্ত যে, হিংসামুক্ত নির্বাচন ও রাজনৈতিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা যতই থাক, বাস্তবে তার প্রয়োগ অলীক।

 

0 Comments

Post Comment