ভারতের নামজাদা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলির মধ্যে, দিল্লির জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাৎ জেএনইউ ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে এবং সমকালীন রাজনৈতিক আন্দোলনের কেন্দ্রে থাকা অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে জেএনইউ-তে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের ধারা অব্যহত রয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়েও, নানাবিধ প্রতিকূলতার উপস্থিতিতে, ছাত্রদের স্বার্থে জেএনইউ-এর ছাত্র ইউনিয়ন লাগাতার লড়াই করে চলেছে। সাম্প্রতিক সময় আবারো এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বিতর্কের মূলে উঠে এসেছে।
সম্প্রতি, জেএনইউ-এর উপাচার্য শান্তিশ্রী ধুলিপুড়ি পন্ডিত একটি পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে গিয়ে দলিতদের বিরুদ্ধে স্পষ্টত বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্য করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বর্ণবৈষম্য রোধ করার লক্ষ্যে ইউজিসির প্রস্তাবিত ২০২৬ সালের সমতা (বৈষম্য বিরোধী) নির্দেশিকাকে উনি 'অযৌক্তিক' এবং 'অপ্রয়োজনীয়' হিসেবে গণ্য করেন। তিনি আরো বলেন, "চিরকাল ভিক্টিম হয়ে থাকা বা 'ভিক্টিম কার্ড' খেললে কেউ এগোতে পারে না।" তাঁর এই বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায় জেএনইউ-এর পড়ুয়ারা। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো জানায়, এই মন্তব্য আসলে তাঁর বর্ণবিদ্বেষী-ব্রাহ্মণ্যবাদী মানসিকতার প্রতিফলন।
এতোমধ্যেই জেএনইউ-এর প্রাক্তন ছাত্র সংসদ সভাপতি ধনঞ্জয়, উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। তিনি National Commission for Scheduled Castes-এর চেয়ারম্যানের কাছে একটি বিস্তারিত অভিযোগপত্র জমা দেন। অভিযোগে বলা হয়, যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে উপাচার্যের এই ধরনের মন্তব্য দলিত ও অন্যান্য প্রান্তিক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে এবং এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অভিযোগে আরো বলা হয় যে, এই বক্তব্যের ফলে দলিত ও প্রান্তিক ছাত্ররা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে এবং তাদের হয়রানির আশঙ্কাও বাড়ছে। এই ধরনের মন্তব্য ভারতের সংবিধানের মূল্যবোধ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণার পরিপন্থী। সেইসঙ্গে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, উপাচার্যের বক্তব্য Scheduled Castes and the Scheduled Tribes (Prevention of Atrocities) Act, 1989-এর ধারা 3(1)(u)-এর আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। এই আইনের অধীনে এমন কোনো বক্তব্য বা আচরণ যা তফসিলি জাতি ও উপজাতির মানুষের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ায়, তা আইনত দণ্ডনীয়।
এই বিষয়ে আরেকটি অভিযোগ দায়ের করেন সমাজকর্মী সুরজ কুমার, যিনি 'মিশন আম্বেদকর' নামক একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর অভিযোগেও বলা হয়েছে যে উপাচার্যের মন্তব্য দলিত সম্প্রদায়ের সংগ্রামকে অবমূল্যায়ন করে এবং সামাজিক বৈষম্যের বাস্তবতাকে অস্বীকার করে।
৫ মার্চ ২০২৬-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জেএনইউ-এর শিক্ষক সংগঠন Jawaharlal Nehru University Teachers' Association (JNUTA) কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে একটি খোলা চিঠি লিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যর বিতর্কিত মন্তব্য সম্পর্কে কেন্দ্রের অবস্থান জানতে চেয়েছে। শিক্ষক সংগঠনের অভিযোগ, পডকাস্টে করা উপাচার্যের মন্তব্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর এবং এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রকের স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন। চিঠিতে JNUTA দাবি করেছে, এই মন্তব্য এমন ধারণাই তৈরি করছে যে কেন্দ্র সরকার হয়ত উপাচার্যের মতামতের সঙ্গে একমত এবং এধরনের মন্তব্য সরকারও সমর্থন করছে। বিশেষত, ওই আলোচনার সময় উপাচার্য নাকি নিজের নিয়োগ প্রসঙ্গে শাসক দলের সঙ্গে রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। JNUTA উপাচার্যকে অপসারণেরও দাবি জানায়। শিক্ষক সংগঠনের অভিযোগ অনুযায়ী, এই উপাচার্যের প্রশাসনিক আমলে জেএনইউ-তে সামাজিক ন্যায়বিচার ও লিঙ্গ ন্যায়ের প্রশ্ন প্রতিনিয়ত দুর্বল হয়েছে। একইসাথে প্রশাসনে ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণ হয়েছে এবং নানা ক্ষেত্রে 'পছন্দমতো সিদ্ধান্ত' নেওয়ার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। চিঠিতে শিক্ষা মন্ত্রকের নীরবতারও সমালোচনা করা হয়েছে। তাছাড়া, ২৬ ফেব্রুয়ারি যখন জেএনইউ-এর ছাত্ররা শিক্ষা মন্ত্রকের দিকে মিছিল করার চেষ্টা করেছিল, তখন দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেয়। কিন্তু উপাচার্যের মন্তব্য নিয়ে কেন্দ্রের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি– এমন দ্বিচারিতার কারণ জানতে চেয়েছেন শিক্ষক-অধ্যাপকরাও। বিশ্ববিদ্যালয়ে সংরক্ষিত শিক্ষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে 'None Found Suitable' ধারার অপব্যবহার হয়েছে, পদোন্নতিতে বৈষম্য হয়েছে এবং তফসিলি জাতি উপজাতি সম্প্রদায়ের ছাত্র ও মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব কমে যাওয়া নিয়েও তাঁরা প্রশ্ন রেখেছেন।
২৬ ফেব্রুয়ারী উপরিউক্ত ঘটনার প্রতিবাদে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষা মন্ত্রকের দিকে একটি মিছিল সংগঠিত করে। সেই মিছিলের মূলতঃ দাবি ছিল, জেএনইউ উপাচার্য শান্তিশ্রী ধুলিপড়ি পন্ডিতের বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তাকে অপসারণ করতে হবে। ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে নেওয়া শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রত্যাহার করতে হবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য রোধে 'রোহিত অ্যাক্ট' লাগু করতে হবে। এবং ক্যাম্পাসে দ্রুত ইউজিসি-র সমতা সংক্রান্ত বিধি কার্যকর করতে হবে। ছাত্ররা জেএনইউ ক্যাম্পাসের সবরমতী টি-পয়েন্ট থেকে মিছিল শুরু করে শিক্ষা মন্ত্রকের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে দিল্লি পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে ব্যারিকেড দিয়ে তাদের আটকায়। এই সময় পুলিশ ও ছাত্রদের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। ৫১ জন ছাত্রকে টেনে-হিঁচড়ে আটক করা হয়। শান্তিপূর্ণ মিছিল থেকে দিন শেষে ১৪ জন শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়। সামাজিক মাধ্যমে সেই ছবি এবং ভিডিও আমাদের অনেকেরই দেখা। ১ মার্চ সকল শিক্ষার্থীরা জামিনে মুক্তি পেলেও তাদের উপর থেকে সমস্ত মামলা প্রত্যাহার হয়নি।
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভিত্তিক বৈষম্য এবং তার সঙ্গে যুক্ত ছাত্র মৃত্যুর ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সংসদে শিক্ষা মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে IIT, NIT, IISER এবং কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অন্তত ১২২ জন তফসিলি জাতি (SC), তফসিলি উপজাতি (ST) ও অনগ্রসর শ্রেণির (OBC) ছাত্র আত্মহত্যা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ছাত্রদের পরিবার, সহপাঠী এবং প্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংগঠনগুলি দাবি করেছে যে ক্যাম্পাসের ভেতরে জাতিভিত্তিক বৈষম্য, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা এই মৃত্যুগুলির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এই প্রসঙ্গে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির একটি হল রোহিত ভেমুলার মৃত্যু। ইউনিভার্সিটি অফ হায়দ্রাবাদের পিএইচডি গবেষক রোহিত ভেমুলা ২০১৬ সালের ১৭ জানুয়ারি হোস্টেল রুমে আত্মহত্যা করেন। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে বরখাস্ত করেছিল। কারণ তিনি ও তার সহপাঠীরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলছিলেন। তার মৃত্যুর পর সারা দেশে 'Justice for Rohith' আন্দোলন শুরু হয় এবং সার্বিকভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিরে বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সাধারণ ছাত্ররাও লড়াইতে সামিল হয়। এর পরের বছর, ২০১৭ সালে জেএনইউ-তে, মুথুকৃষ্ণান জীবননাথম নামের একজন দলিত ছাত্র এম.ফিল পড়াকালীন আত্মহত্যা করেন। তিনিও মৃত্যুর আগে সামাজিক মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে জাতিভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছিলেন। একই বছরে তামিলনাড়ুর দলিত ছাত্রী এস.আনিথার মৃত্যু দেশ জুড়ে আলোড়ন তোলে। তিনি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নীট পরীক্ষার নতুন ব্যবস্থার কারণে সুযোগ হারানোর পর প্রবল সামাজিক ও মানসিক চাপে আত্মহত্যা করেন। এই ঘটনাও শিক্ষা ব্যবস্থায় সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্নকে কাঠগড়ায় তোলে। ২০১৯ সালে মুম্বইয়ের চিকিৎসাবিদ্যায় স্নাতকোত্তর পড়ছিলেন আদিবাসী তরুণ চিকিৎসক পায়েল তাদভি। তার সিনিয়র সহকর্মীরা তাকে নিয়মিত বৈষম্যমূলক মন্তব্য করে অপমান করতেন এবং কর্মক্ষেত্রে হেনস্থা করতেন। ২০১৯ সালের মে মাসে পায়েল আত্মহত্যা করেন এবং তার মৃত্যুর পর ভারতে মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতিবৈষম্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। ওই বছর ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি মাদ্রাসের ছাত্রী ফাতিমা লাতিফের মৃত্যুও আলোচিত হয়। মৃত্যুর আগে তিনি একটি নোটে কয়েকজন অধ্যাপকের নাম উল্লেখ করেছিলেন এবং তার পরিবার অভিযোগ তোলে যে তিনি বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হয়েছিলেন। ২০২৩ সালে দর্শন শোলাঙ্কি নামের এক প্রথম বর্ষের ছাত্র ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বোম্বেতে আত্মহত্যা করেন। তিনিও নিজের ক্যাম্পাসে জাতিবৈষম্য ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়েছিলেন। এর আগেও ২০১৪ সালে একই প্রতিষ্ঠানে দলিত ছাত্র অনিকেত অম্বোরের মৃত্য ঘিরে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছিল। এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলি প্রমাণ করে যে ভারতের বহু উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সামাজিক স্তরবিন্যাস ও জাতিভিত্তিক বৈষম্যের প্রশ্ন এখনও একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান।
সরকারি তদন্ত অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের গা বাঁচাতে আত্মহত্যার নির্দিষ্ট কারণ হিসেবে সরাসরি জাতিবৈষম্যকে চূড়ান্তভাবে স্বীকার করেনা। তবুও ছাত্র সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী এবং বহু গবেষক এই ঘটনাগুলিকে কোনো সাধারণ আত্মহত্যা নয়, বরং 'প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা' বলেই মনে করেন। তাঁদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক পরিবেশ এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে লুকিয়ে থাকা বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি প্রান্তিক সম্প্রদায়ের ছাত্রদের ওপর গভীর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। এই কারণেই গত এক দশকে ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সমতা, সংরক্ষণ নীতি, এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন ক্রমাগত আরো জোরালো হয়ে উঠেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জেএনইউ-এর ছাত্রদের লড়াই কি কেবল উপাচার্যের বিরুদ্ধে? এই ঘটনা কি আদৌ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা? দেশ জুড়ে জেএনইউ সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পড়ুয়ারা বৈষম্য বিরোধী সংগ্রামে পথে নামছে। জাত-পাত, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বৈষম্য সামাজিক ব্যাধি। বরাবরই তাই নতুন প্রজন্মের কাঁধে জঞ্জাল সাফ করার ভার থাকে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ তাদের অনেক বেশি মুক্তচিন্তার পরিসর দেয়। একে অপরের সাথে আলোচনা-তর্ক-বিতর্ক চালিয়ে নিজের চেতনায় ধার দেওয়ার সুযোগ দেয়। কিন্তু বিজেপি-আরএসএস'এর শাসনে ক্যাম্পাসগুলোর চিত্র আগের চেয়ে অনেকখানি বদলে গেছে। এখন সিলেবাস, সেমিনার থেকে সংস্কৃতি– সবক্ষেত্রে বিদ্বেষের বীজ ছাত্রদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়ার সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতম রাস্তা সঙ্ঘীরা খুঁজে নিয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রকে কার্যত বাজারে পরিণত করেছে বিজেপি সরকার। সরকারি স্কুলশিক্ষার অবনতি, পরিকাঠামোর অনুন্নয়ন প্রবল সংকটের দ্বারে। নয়া শিক্ষানীতি ২০২০ পড়ুয়াদের মধ্যে বিভাজন প্রকট করেছে৷ ড্রপ আউট শিক্ষার্থীর হার উর্ধ্বমুখী। গত ২৫ বছরে সর্বোচ্চ বেকারত্ব চলছে দেশে৷ বলাবাহুল্য, ছাত্রদের শিক্ষান্তে যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাওয়ার আশাতেও এক সমুদ্র পানি ঢেলে দিয়েছে এই সরকার। ইদানীংকালে, চরম হতাশা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ তাই নতুন প্রজন্মকে আরো বেশি সমাজের অগণিত সমস্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। তবুও আজও ইতিকথায় লিখে ফেলা যায়, "একঝাঁক আলো, তিমির আঁধার পেরিয়ে কড়া নাড়ে- দরজায়।"
ফেরা যাক জেএনইউ-এর ঘটনায়। এই ঘটনার কিছুদিন আগে জেএনইউ কর্তৃপক্ষ জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়নের (JNUSU) চারজন নির্বাচিত পদাধিকারী– সভাপতি, সহ-সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদককে সাসপেন্ড করে। তাঁদের জন্য ক্যাম্পাস সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। একই শাস্তি দেওয়া হয় প্রাক্তন জেএনইউএসইউ সভাপতি নীতিশ কুমারকেও। বর্তমান সভাপতি অদিতি মিশ্র, সহ-সভাপতি গোপিকা বাবু, সাধারণ সম্পাদক সুনীল যাদব, যুগ্ম সম্পাদক দানিশ আলি এবং প্রাক্তন সভাপতি নীতিশ কুমার– এই পাঁচজনকে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা দিতে বলা হয়। এমনকি সেমিস্টার দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আইসা-এসএফআই'এর মতো বাম ছাত্র সংগঠনগুলো জানায় এই নজিরবিহীন শাস্তি আসলে প্রতিহিংসার প্রতিভাস। প্রতিবাদী পড়ুয়ারা মনে করেন, এরূপ শাস্তির মূল কারণ ইউজিসি-র প্রস্তাবিত 'ইকুইটি রুলস'-এর বিরুদ্ধে জেএনইউএসইউ-এর দৃঢ় অবস্থান। এতকিছুর পরেও ছাত্ররা একজোট হয়ে ন্যায্য দাবি নিয়ে পথে নেমেছে। আন্দোলনকারী পড়ুয়ারা এ'বারও আদালত থেকে ফিরে নিজেদের বক্তব্যে সোচ্চারে বলেছেন– তারা আম্বেদকর, ফাতিমা শেখ, সাবিত্রী বাঈ ফুলেদের উত্তরাধিকার। ছাত্র-স্বার্থে মরণপণ লড়াই তাদের একমাত্র ধর্ম। মিথ্যে মামলা দিয়ে তাদের আন্দোলন রুখে দেওয়ার চেষ্টাকে তারা আবারো ব্যর্থ করার শপথ নিয়েছেন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস' অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি নেহা এই আন্দোলনের অন্যতম মুখ। তিনি বলেন, জেএনইউ সবসময়ই ক্ষমতা কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করেছে। ওবিসি সংরক্ষণের বাস্তবায়ন থেকে শুরু করে ফি-বৃদ্ধি বিরোধী আন্দোলন– প্রতিটি ক্ষেত্রেই জেএনইউ-র ছাত্ররা সকলের জন্য সুলভ শিক্ষার দাবিতে লড়াই করে এসেছে। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর আন্দোলনে অংশ নেওয়া বা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের নিলম্বিত করা এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়, জেএনইউ, এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় সহ একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজেপি সরকারের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে ছাত্রদের সঙ্গে এই ধরনের ঘটনা ঘটছে। তিনি আরো বলেন, উপাচার্য মহাশয়া নিজেকে আরএসএস-এর গর্বিত সদস্য বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁর উপাচার্যত্বের পুরো সময়কাল জুড়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা জেএনইউ-র সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের স্বার্থের চেয়ে আরএসএস-এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকেই ক্যাম্পাসে অনেক বেশি পুষ্টি জুগিয়েছে। হোস্টেলের ফি বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন, এবং এমন এক স্বৈরাচারী সিপিও ম্যানুয়াল চালু করেছেন যা উন্নত শিক্ষার দাবিতে যেকোনো প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং শাস্তিযোগ্য বলে দাগিয়ে দেয়। তিনি 'গর্বের সঙ্গে' দাবি করেছেন, জেএনইউ-এর 'বামপন্থী ঘাঁটি' বা 'দেশবিরোধী বিশ্ববিদ্যালয়' হিসেবে যে ভাবমূর্তি তৈরি হয়েছিল, তা তিনি বদলে দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে এই বক্তব্য জেএনইউ এবং জেএনইউ-এর ছাত্রদের প্রতি অবিচার, কারণ জেএনইউ-কে 'দেশবিরোধী' হিসেবে চিহ্নিত করে কলঙ্কিত করার কাজটা করে আরএসএস এবং তার সমগ্র প্রচারযন্ত্র; যাদের উদ্দেশ্য ছিল জেএনইউ-তে প্রগতিশীল রাজনীতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া। নেহা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, জেএনইউ আজও সিপিও ম্যানুয়ালের বিরুদ্ধে এবং ছাত্রদের বহিষ্কার ও দমনমূলক শাস্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। শাস্তি, বহিষ্কার বা এমনকি কারাবাস– কোনোকিছুই পড়ুয়াদের দৃঢ় সংকল্পকে ভাঙতে পারেনি। ক্যাম্পাসে জাতিভিত্তিক বৈষম্য রোধে কঠোর বিধিনিষেধ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন এখনও চলমান, এবং এই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই আরো শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
এখন দেখার পালা, ক্ষমতার সাথে পাল্লা দিয়ে এই লড়াই কি ক্যাম্পাসে পড়তে আসা প্রান্তিক ছাত্রদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারবে? অসম লড়াইতে কার জয় নিশ্চিত? বাম-প্রগতিশীল রাজনীতি না হিন্দুত্বের রাজনীতি? আদর্শ না প্রতাপ?