পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

মা যাহা ছিলেন, যাহা হইয়াছেন

  • 07 January, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 1173 view(s)
  • লিখেছেন : সত্যকাম ধর
ম্যাক্সিম গোর্কির মা থেকে নাজিব আহমেদের মা হয়ে ঐশী ঘোষের মা, এই যাত্রাপথ কেমন তার অনুসন্ধান করার একটা চেষ্টা।
আশ্চর্য স্ববিরোধিতায় আমাদের কৈশোর কেটেছে। আশি নব্বইয়ের দশকের পশ্চিমবঙ্গে যারা লেখাপড়া জানা মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে উঠেছে, তাদের বাড়ির হাওয়ায় বামপন্থা থাক বা না থাক, পাভেল ভ্লাসফের মা পেলাগেয়া নিলভনাকে প্রায় সকলেই চিনত। ম্যাক্সিম গোর্কির অমর উপন্যাস ইংরেজি বা বাংলা অনুবাদে কখনো না কখনো পড়া হয়েই যেত। পাভেলের মা নিতান্ত অন্তরালে থাকা একজন নীরব মানুষ থেকে কিভাবে শেষপর্যন্ত আন্দোলনের পতাকা কাঁধে নেওয়া বিদ্রোহী হয়ে যান সে গল্প পড়ে আমাদের অনেকেরই রোমাঞ্চ হত। অথচ বাড়িতে বা পাড়ায় বাবা মিছিলে যাবেন, মা সংসার সামলাবেন --- এটাই স্বাভাবিক ছিল।
এই স্ববিরোধিতাকেই স্বাভাবিকতা বলে বিশ্বাস করতে করতে প্রথম যৌবনে আমাদের অতি প্রিয় চরিত্র হয়ে উঠল সমরেশ মজুমদারের 'কালবেলা' উপন্যাসের মাধবীলতা। আমাদের মধ্যে যারা বামপন্থী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হত, তারা মাধবীলতার মতন একটি প্রেমিকা পাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করত প্রায়শই। আমি দেশোদ্ধার করব, সে আমার জন্য সবরকম ত্যাগ স্বীকার করবে, পুলিশের দ্বারা নির্যাতিতও হবে, কিন্তু আন্দোলনে যোগ দেবে না। বরং নীরবে আমার সন্তানকে মানুষ করবে। এমন এক জীবনসঙ্গিনীর স্বপ্নে আমরা অনেকেই তখন বিভোর ছিলাম।
আমাদের বাবা-কাকাদের এই স্বপ্নিল চক্রান্তে মায়েরাও হয়ে উঠেছিলেন অতিমাত্রায় শান্তিপ্রিয়। ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে মহিলাদের জন্যে এক তৃতীয়াংশ সংরক্ষণের আইন হওয়ায় তৃণমূল স্তরের রাজনীতিতে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়ছিল, অথচ পারিবারিক চোখরাঙানিতে ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে তরুণদের অংশগ্রহণ কমছিল --- গ্রাম, শহর সর্বত্রই। পশ্চিমবঙ্গ সরকার 'আলোর ফুলকি' নামে শিশুসাহিত্যের এক মনোগ্রাহী সঙ্কলন প্রকাশ করেছিলেন ১৯৮০ সালে। সেখানে দীপঙ্কর চক্রবর্তীর 'মিছিল' নামে একখানা ছড়া ছিল। ছড়াটা এরকম:

বাপের ঘাড়ে চেপে যাব
কাল মিছিলে মা
মা বলছে --- 'না'।

বাপের সাথে মাঠে যাব
কাল মিছিলে মা
মা বলছে --- 'না'।

ঝান্ডা ঘাড়ে নিয়ে মিছিল
একাই করে সে
ভরদুপুরে ঘরের দাওয়ায়
আওয়াজ ভাসছে।

মাগো, সেদিন বাপ বলেছে
লেনিন ছিল আমার মত সোনা
আমায় তবে বল কেন
মিছিলে যাব না?


rohith


ছোট্ট ছেলের বাবার সাথে মিছিলে যেতে চাওয়ার রোম্যান্টিকতা মুগ্ধ করার মত হলেও এ ছড়ায় স্পষ্ট যে মায়ের মিছিলে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। তাঁকে কেউ যেতে বলছে না --- ছেলেও নয়, তার বাবাও নয়। আবার মা চাইছেন না ছেলে মিছিলে যাক।
মুশকিল হল ব্যাপারটা নেহাত ছেলে ভোলানি ছড়ায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সন্তান স্কুল পেরিয়ে কলেজের দিকে পা বাড়ানো মাত্রই মায়েরা পই পই করে বলে দিতেন “মনে রাখবে, কলেজে পড়াশোনা করতে যাচ্ছ, পলিটিক্স করতে নয়।” পলিটিক্স ব্যাপারটা যে অ্যাপেনডিক্সের চেয়েও নিকৃষ্ট তা নিয়ে সন্দেহ করার আর অবকাশ থাকত না। বলা বাহুল্য তথাকথিত বিপ্লবী বাবারাও এক্ষেত্রে মায়েদের কথায় সায় দিতেন। ফলে ছাত্র রাজনীতি, এবং শেষ অবধি বৃহত্তর রাজনীতি, লুম্পেনদের জায়গা হয়ে দাঁড়াল।
সেই নিরাশা, আলোহীনতার দিনগুলো পেরিয়ে মধ্যবয়সের দোরগোড়ায় এসে প্রথমে দেখতে পেলাম রোহিত ভেমুলার মা রাধিকা ভেমুলাকে, যিনি পুত্রশোক অতিক্রম করে রাজনৈতিক আন্দোলনের সমতলে নেমে আসেন। তারপর দেখলাম নাজিব আহমেদের মা ফতিমা নাফিসাকে, যিনি নিখোঁজ সন্তানের সন্ধান করতে করতে ক্রমশ প্রতিবাদের মুখ হয়ে ওঠেন। আর এখন, শতাধিক বছরের রেকর্ড ভেঙে দেওয়া দিল্লীর শৈত্যপ্রবাহে দেখলাম শাহিনবাগের মায়েদের। সন্তানদের গায়ে হাত পড়লে তাঁরা নিজেদের কাঁধেই তুলে নেন প্রতিবাদের দায়িত্ব, জ্যাঠা বাবা কাকাদের অপেক্ষায় থাকেন না। প্রতিবাদে প্রক্সির যুগ শেষ করে দিলেন তাঁরা।
যা আরো বেশি উৎসাহব্যঞ্জক তা হল কেবল মায়েরা নয়, সব বয়সের মেয়েরা সি এ এ - এন আর সি – এন পি আর বিরোধী আন্দোলনের সামনের সারিতে। জামিয়া মিলিয়ায় পুলিশ আর মিলিশিয়ার সামনে পুরুষ আন্দোলনকারীকে ঘিরে দাঁড়াচ্ছে দুজন মেয়ে। আঙুল উঁচিয়ে ধমকাচ্ছে। কলকাতার মিছিলে স্লোগান তুলছে কোন মেয়ে, গলা মেলাচ্ছে পুরুষ মহিলা সকলে। বেঙ্গালুরুতে, কলকাতায় মেয়েরা মিছিল ডেকে নেমে পড়ছেন রাস্তায়। কোন পুরুষের অভিভাবকত্বের দরকার পড়ছে না।
মেয়েরা যখন কেবল মা হয়ে থাকতে চান না, মানুষ হিসাবে সমানে সমানে লড়াই দেন তখন মৌলবাদী শাসকের ভয় না পেয়ে উপায় থাকে না। অতএব মেয়েদের হোস্টেলে ঢোকো, তাদের মারো। কারা যেন বলেছিল “weaker sex”? সেকথাই শিরোধার্য করে ভয় দেখাও, মাথা ফাটাও, হাত-পা ভাঙো। তাহলেই বেরিয়ে যাবে সব জারিজুরি। মৌলবাদী কী করেই বা জানবে যুগ বদলে গেছে? কেমন করে সে আশঙ্কা করবে রোগা-সোগা ঐশী ঘোষ ফাটা মাথা আর ভাঙা হাত নিয়ে পরদিনই সাংবাদিক সম্মেলনে এসে জোর গলায় বলবে সব আঘাত ফিরিয়ে দেওয়া হবে?


দিন বদলে গেছে। এরপর যা-ই হোক, এই দেশ আর আগের মত হবে না। হয়ত মায়েরা আর আঁচল দিয়ে আগলাবেন না সন্তানকে। হয়ত ঐশীর মায়ের মত বলবেন, আন্দোলন ছেড়ো না।

 



0 Comments

Post Comment