আমাদের এই পর্বে আলোচনার মূল বিষয়গুলি হল দানবিক নিবর্তনমূলক আইনগুলি এবং জামিনের আবেদনের বিচারের সময় দেশের সাংবিধানিক আদালতগুলির দ্বিধাগ্রস্ততা। আলোচনার মূল অংশে যাবার আগে, মনে হয়, দেশে প্রবর্তিত নিবর্তনমূলক আইনগুলির ধারাবাহিকতা দেখে নেওয়া দরকার। মূলত পাঞ্জাবে উগ্রপন্থার বিস্তার রোধ করতে ১৯৮৫ সালে টেররিস্ট অ্যান্ড ডিসরাপটিভ অ্যাক্টিভিটিস অ্যাক্ট (TADA) চালু করা হয় এবং ১৯৮৭ সালে বেশ কিছু সংশোধনী এনে আইনটিকে শক্তপোক্ত রূপ দেওয়া হয়। আইনটি নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠার পর ১৯৯৫ সালে আইনটিকে রদ করে দেওয়া হল এবং ২০০২ সালে নতুন আইন আনা হয়, প্রিভেনশন অব টেররিসম অ্যাক্ট, ২০০২(POTA)। আবার অভিযোগ অভিসন্ধিমূলক ব্যবহারের। ২০০৪ সালে POTA বাতিল/রদ করে ১৯৬৭ সালের আন-লফুল অ্যাক্টিভিটিস (প্রিভেনশন) অ্যাক্ট কে শক্তপোক্ত করে, নানা ধারা উপধারা যোগ করে ২০০৪ এ চালু করা হল আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন ( অ্যমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০০৪ হিসাবে। অর্থাৎ পুরনো বোতলে নতুন মদ, আরো কড়া, আরো ঝাঁঝাঁলো। একেই বলে গণতান্ত্রিক রসিকতা! আগের দুটি আইন নিয়ে বিস্তর অভিযোগ ছিল নাগরিক অধিকার ভূলুন্ঠিত করা নিয়ে, তাই সেগুলো রদ করা হল। রদ করে, নতুন শক্তিশেল! ‘মুম্বাই সন্ত্রাস’এর পর ১৯৬৭ সালের আইনটিকে নতুন করে তৈরি করা হল। পাঠক, একটু খেয়াল করে দেখবেন। আগের দুটি আইনের নামের মধ্যে উগ্রপন্থা/সন্ত্রাসবাদের উল্লেখ থাকলেও, ২০০৪ এর নতুন সংশোধিত আইন গিয়ে দাঁড়াল আন-লফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন ( অ্যমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০০৪ । অর্থাৎ নতুন আইনের নামের মধ্যে কোথাও উগ্রপন্থা/ সন্ত্রাসবাদের উল্লেখ নেই। কী থাকল? আন-লফুল অ্যাক্টিভিটিস! আপনাকে বুঝতে হবে এসবের মধ্যে কত বড় গোপন অস্ত্র লুকিয়ে আছে। হ্যাঁ, এগুলোকে গোপন অস্ত্রই বলে। মনে করুন, এরপরে আপনি দলবল নিয়ে, ‘রক্তকরবী’ বা ‘মুক্তধারা’ বা ‘বিসর্জন’ নাটকের অভিনয় করতে গেছেন, সরকারের/রাষ্ট্রের যদি মনে হয়, এগুলো ‘আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস’, তাহলে আপনাকে বা আপনার গোটা দলকেই UAPA তে সোপর্দ করতে পারে। পথ অবরোধ, হরতাল, ইনকিলাব জিন্দাবাদ বলা, সবকিছুকেই আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস বলে দাগিয়ে দেওয়া যায়। আমরা পরে দেখাব, দিল্লি দাঙ্গা ২০২০ মামলাতেই এইসব অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।
এরপর, আমরা দেখে নেব, আনলফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন ( অ্যমেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট,২০০৮। মহা বিতর্কিত 43 D (5) ধারাটি এই সংশোধনীতেই যুক্ত করা হয়। সংসদে বিলটি পেশ করেছিলেন, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম। চলুন , ধারাটিকে হুবহু দেখে নেওয়া যাক।
Notwithstanding anything contained in the Code, no person accused of an offence punishable under Chapters IV and VI of this Act shall, if in custody, be released on bail or on his own bond unless the Public Prosecutor has been given an opportunity of being heard on the application for such release:
Provided that such accused person shall not be released on bail or on his own bond if the Court, on a perusal of the case diary or the report made under section 173 of the Code is of the opinion that there are reasonable grounds for believing that the accusation against such person is prima facie true.
পাঠক, আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবো, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ (proviso) এর ‘Court’ শব্দটির প্রতি। আমার আগেরদিনের লেখায় ভুল বাক্য গঠনের জন্য অনেকেরই ধারণা হয়ে থাকতে পারে, ‘ওয়াতালি’ মামলা থেকেই বোধহয় সাংবিধানিক আদালতগুলি UAPA মামলায় জামিনের আবেদনের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সাধারণীকরণের পদ্ধতি নিয়ে চিন্তিত। বস্তুত, বিষয়টি সম্পূর্ণত উলটো। ‘ওয়াতালি’ রায়ের পর থেকেই কোনো কোনো সাংবিধানিক বেঞ্চ, এই সংক্রান্ত মামলায় জামিনের আবেদনের নিষ্পত্তি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করতে শুরু করে।
দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালত, জাফুর ওয়াতালি-র জামিনের আবেদন খারিজ করেন, এই যুক্তি দিয়ে, ‘Court’ যতক্ষণ না সন্তুষ্ট হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত জামিন দেওয়া যাবে না। প্রশ্ন হল, এই ‘Court’ আদতে কোন কোর্ট? বুঝতে হবে ইউএপিএ আইনে যাকে নির্দিষ্ট করা আছে, ‘Court’ হিসাবে, উক্ত আইনের সবগুলি ধারাতেই সেই ‘Court’ কেই নির্দিষ্ট করা হচ্ছে। এরজন্য প্রয়োজন ইউএপিএ আইনের 2 (d) ধারাটিকে অনুধাবন করার।
2(d) - ‘Court’ means a Criminal Court having jurisdiction, under the Code, to try offences under this Act and includes a Special Court constituted under section 11 or under section 22 of the National Investigation Agency Act, 2008 ।
আমরা যদি এই আইনের ধারা 43 D(5) এবং 2 (d) একইসাথে দেখি , তাহলে ‘Court’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ফৌজদারী আদালত অথবা এন আই এ ২০০৮ আইনের বিশেষ আদালত এবং তাহলে ধরে নেওয়া যেতে পারে, ধারা 43 D(5) এ যে বিধিনিষেধ আরোপিত হয়েছে ‘Court’ এর ওপর, সেই বিধিনিষেধ দেশের সাংবিধানিকগুলির ওপর প্রযোজ্য হতে পারে না। ২০০৮ সালে ইউএপিএ আইনের বিল সংসদে পেশ করার সময় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যে বয়ান পেশ করেছিলেন, সেটি বরং এই সুযোগে দেখে নিই।
“…This is one provision that I would like to draw your kind attention. We are saying that if on a perusal of the case diary or the report under Section 173 that is the final report or what we call the challan the court is of the opinion that there are reasonable grounds for believing that the accusation against a person is prima facie true, then and then alone can be bail be refused…. Again, the High Courts and the Supreme Court have ample powers and this does not, in any way bind the High Courts and the Supreme Court, they will apply mainly to the trial court.” [Lok Sabha Debates: Combined discussion on the Motion for Consideration of the National Investigation Agency Bill, 2008 and the Unlawful Activities (Prevention) Amendment Bill, 2008 (Bills Passed)… on 17 December 2008] [ বাঁকা অক্ষরের নজরটান বর্তমান নিবন্ধকারের] ।
তাহলে বিষয়টা কী দাঁড়াচ্ছে? যে স্বাধীনতা দেশের সংসদ দিয়েছিলেন, দেশের গুরুত্ত্বপূর্ণ সাংবিধানিক আদালত সেই রক্ষাকবচ নিজেরাই খুলে ফেলছেন! সাংবিধানিক আদালত, একটি গভীর ভাবনার বিষয়। নাগরিক কোথাও স্থান না পেলে বিচারের জন্য সাংবিধানিক আদালতের শরণাপন্ন হয়। তাঁরা যাবেন কোথায়, যদি মহামান্য আদালত নিজের দায়িত্ব বিস্মৃত হন।
এরপর, বর্তমান পর্বে, ইউএপিএ আইনে অভিযুক্তদের নিয়ে কয়েকটি মামলার রায় নিয়ে আমরা দেখানোর চেষ্টা করব, আদালত কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংবিধানের ২১ নং ধারা এবং ইউএপিএ আইনের ৪৩ ঘ(৫) ধারার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন, তবে সেটা নিয়ে কোনো ধারাবাহিকতা তৈরি হয়নি, সেগুলির অনেকটাই মহামান্য বিচারপতির নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিসঞ্জাত। দায় নেওয়ার দায় ছিল দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালতের, কিন্তু কোথাও কোনো আলোর রেখা নেই।
(১) অ্যাঞ্জেলা সোনতাক্কে বনাম মহারাষ্ট্র সরকার, ২০১৬
অ্যাঞ্জেলা সোনতাক্কে নিষিদ্ধ সিপিআই-মাওবাদী গোষ্ঠীর গোল্ডেন করিডোর কমিটির সাথে যুক্ত থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী মাওবাদী মতাদর্শ ছড়ানোর অভিযোগে প্রায় পাঁচ বছর হেফাজতে ছিলেন। মুম্বাই হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিদ্বয় বিচারপতি গগৈ এবং বিচারপতি পান্তের বেঞ্চ ২০১৬ সালে সোনতাক্কেকে জামিন মঞ্জুর করে, এই মর্মে যে, অভিযুক্ত ব্যক্তি কারাগারে কতদিন কষ্ট ভোগ করেছেন এবং দ্রুত বিচার হওয়ার সম্ভাবনা কতটা, তার নিরিখে অপরাধটিকে বিচার করতে হবে। কার্যত, আদালত তার ১৯৯৬ সালের শাহীন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন মামলার রায়ের ভিত্তিতে ৪৩ডি (৫) ধারা থাকা সত্ত্বেও সোনতাক্কেকে জামিন মঞ্জুর করে। ওই রায়ে বলা হয়েছিল যে, বিশেষ ফৌজদারি আইনে কঠোর জামিনের শর্তগুলো কেবল তখনই ন্যায্য হতে পারে যদি দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়। যদি অস্বাভাবিক বিলম্ব হয়, তবে অভিযুক্তের ২১ অনুচ্ছেদের অধিকার লঙ্ঘিত হবে এবং জামিন মঞ্জুর করতে হবে। ২০১৭ সালে ভীমা কোরেগাঁও মামলার অভিযুক্ত সাগর তাত্যারাম গোর্খেকে জামিন দেওয়ার ক্ষেত্রেও একই নজির অনুসরণ করা হয়েছিল।
(২) ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেটিভ এজেন্সি বনাম জহুর আহমেদ ওয়াতালি, ২০১৯
দেশের শীর্ষ আদালতের দুই মাননীয় বিচারপতি খানউইলকার এবং মাননীয় বিচারপতি রাস্তোগি-র ডিভিশন বেঞ্চ রায় দেন। রায়ের পর কী দাঁড়াল? জামিন মঞ্জুর করার ক্ষেত্রে আদালতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীন ক্ষমতার উপর একটি বেশ সংকীর্ণ সীমা নির্ধারণ করে বেঞ্চ রায় দেন যে, জামিনের জন্য একটি প্রাথমিক মামলা বিদ্যমান কিনা তা নির্ধারণ করার সময় বেঞ্চকে যে ‘সন্তুষ্টির মাত্রা’ থাকতে হবে, তা অন্যান্য ফৌজদারি আইনের তুলনায় ইউএপিএ-এর অধীনে ‘কম। আরও বলা হয় যে, জামিন মূল্যায়নের সময় কোর্ট মামলার গুণাগুণ বা দোষত্রুটির গভীরে প্রবেশ করতে পারবে না। কার্যত এর অর্থ হলো, আদালতকে এনআইএ-এর ঘটনার বিবরণ মেনে নিতে হবে এবং এনআইএ অভিযোগ গঠনের পর জামিন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ আসামিপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যেকোনো নির্দোষ প্রমাণ মূল্যায়ন এর বিচার করাটা হবে মামলার গুণাগুণ তদন্ত করার শামিল।
(৩) ভারত সরকার বনাম কে এ নাজিব, ২০২১
শীর্ষ আদালত এই বিষয়টি নির্ধারণ করছিলেন যে, দীর্ঘ কারাবাসের কারণে অভিযুক্তের ক্ষেত্রে, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ায় তাকে জামিন দিয়ে কেরালা হাইকোর্ট কোনো ভুল করেছে কিনা। উল্লেখযোগ্যভাবে, কেরালা হাইকোর্ট ৪৩ডি(৫) ধারায় নির্ধারিত জামিনের শর্তাবলী নিয়ে কোনো আলোচনাই করেনি। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, এই বিধানটি ‘সংবিধানের তৃতীয় অংশ বা থার্ড পার্ট লঙ্ঘনের ভিত্তিতে সাংবিধানিক আদালতগুলোর জামিন মঞ্জুর করার ক্ষমতাকে বাতিল করে না’। এর মাধ্যমে, বেঞ্চটি ওয়াতালি রায়ে জামিনের বিধানের কঠোর ব্যাখ্যা থেকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও, সেই রায়কে বাতিল করেনি।
কিন্তু সমস্যাটা কোথায় থেকে গেল? দেশের শীর্ষ আদালত অভিযুক্তের বন্দীত্বকালের মেয়াদ অনুযায়ী জামিনের বিষয়টি বিবেচনার কথা ভাবলেন, কিন্তু, ‘ওয়াতালি’ মামলার রায়টি খারিজ করলেন না। তাহলে দেশের অন্য সাংবিধানিক আদালতগুলির কাছে দুটো রায়ই প্রিসিডেন্স হিসাবে থেকে গেল!
দিল্লি ( ন্যাশনাল ক্যাপিটাল টেরিটরি) সরকার বনাম দেভাঙ্গনা কলিতা, ২০২১
২০২১ সালের জুন মাসে দিল্লি হাইকোর্ট ইউএপিএ-এর অধীনে উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গা বৃহত্তর ষড়যন্ত্র মামলায় উস্কানি দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া তিন ছাত্র কর্মীকে জামিন মঞ্জুর করে। হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করে যে, ওয়াতালি মামলার রায় অনুযায়ী বেঞ্চ জামিনের শুনানিতে মামলার গুণাগুণ নিয়ে আলোচনা করতে পারে না, তেমনি চার্জশিটের প্রমাণের ভিত্তিতে এনআইএ কর্তৃক টানা সিদ্ধান্তগুলো নিয়েও আলোচনা করতে পারে না। সুতরাং, বেঞ্চকে প্রকৃত প্রমাণ থেকে সিদ্ধান্তগুলোকে আলাদা করতে হবে। একটি বিরল রায়, যেখানে এই ভিত্তিতে জামিন মঞ্জুর করা হয়েছিল যে এনআইএ আসামিদের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে কোনো মামলা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। উপরে যেমন উল্লেখ করা হয়েছে, সাধারণ প্রবণতা হলো বিচারের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে জামিন মঞ্জুর করা, ফলে আসামিদের জামিন পাওয়ার আগে বছরের পর বছর হেফাজতে কাটাতে হয়।
পরে এই মামলার রায় সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ হলে, সুপ্রিম কোর্ট জামিনের আদেশে হস্তক্ষেপ করেনি, তবে এটি রায়ের সেই অংশের প্রয়োগ স্থগিত করেছে যা ধারা ৪৩ডি(৫)-এর ব্যাখ্যা দেয়। সুপ্রিম কোর্ট আরো বলেন, এই ধারার বৈধতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের এই রায়কে নজির হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
সুপ্রিম কোর্ট জামিনের আদেশে হস্তক্ষেপ করেনি, তবে এটি রায়ের সেই অংশের প্রয়োগ স্থগিত করেছে যা ধারা ৪৩ডি(৫)-এর ব্যাখ্যা দেয়। সুপ্রিম কোর্ট এর বৈধতা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত না নেওয়া পর্যন্ত হাইকোর্টের এই রায়কে নজির ( প্রিসিডেন্স) হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না।
সেই প্রিসিডেন্স! কেন ব্যবহার করা যাবে না? এই নিয়েই তো তাহলে একটা পুরো পর্ব লিখে ফেলতে হয়! সেটা তো সম্ভব না! শুধু মনে করিয়ে দিতে চাই, এই নিদানগুলি আসছে, দেশের সর্ব্বোচ্চ আদালতের কাছ থেকে! তবু সংক্ষিপ্ত করে লিখি।
‘এই রায়কে নজির বা প্রিসিডেন্স হিসেবে গণ্য করা যাবে না’—এই বাক্যটি ভারতীয় বিচারব্যবস্থার একটি সাধারণ অংশে পরিণত হয়েছে। আইনের দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টি কিন্তু সম্পূর্ণভাবে আইনের পরিপন্থী। যখন একটি সাংবিধানিক আদালত (এবং হাইকোর্টগুলো সাংবিধানিক আদালত) কোনো বিষয়ে একটি যুক্তিযুক্ত রায় দেয়, তখন একটি আপিল আদালতের কাজ কেবল এটি নির্ধারণ করা যে সেই রায়টি আইনকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করেছে, নাকি ভুলভাবে করেছে। বাতিল না হওয়া পর্যন্ত, একটি সাংবিধানিক আদালতের রায়ের আইনগত শক্তি থাকে। তাই অন্য একটি সাংবিধানিক আদালতের রায় যেন অস্তিত্বহীন বা কখনো দেওয়া হয়নি—এমনভাবে কাজ করার অধিকার মহামান্য সুপ্রিম কোর্টেরও নেই, এবং আরও খারাপ হলো, একটি যুক্তিহীন নির্দেশ জারি করা যে অন্য সব আদালতও এই নির্দেশে অংশ নেবে।
এই আদেশের প্রভাবটিও উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ: এর অর্থ হলো, যদিও দেভাঙ্গনা কলিতা সহ আরো দুজনকে কারাগারে ফেরত পাঠানো হবে না (যতদিন না সুপ্রিম কোর্ট হাইকোর্টের রায়ের সঠিকতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে), এর মানে হলো যে, অন্য কারো নাগরিক অধিকারের ক্ষেত্রে আদালতগুলোকে (এবং হাইকোর্টের অন্যান্য বেঞ্চকে) নির্দেশবলে দিল্লি হাইকোর্টের রায়টি স্পষ্টভাবে উদ্ধৃত( মেনশনিং) করা থেকে বিরত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একটি সাংবিধানিক আদালতের রায়টি বাতিল না হলেও অন্যরা এটি উদাহরণ হিসাবে নেবে না। এটি আইনের শাসনের জন্য সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক। আলোচনার একেবারে প্রথম পর্বেই লিখেছিলাম, আদতে মহামান্য শীর্ষ আদালতের সঠিক পথ প্রদর্শকের ভূমিকা পালনে ব্যার্থ হওয়াতে অন্যান্য সাংবিধানিক আদালতও সঠিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।
দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালত এবং সাংবিধানিক আদালতগুলিকে অনুভব করতে হবে, দেশের নাগরিক, অপরাধী প্রমাণিত হওয়ার আগে বিনা বিচারে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দী হওয়ার জন্য এই দেশে জন্মাননি। সম্মিলিতভাবে বলার সময় এসেছে, হয় বিচার করুন না হয় জামিন দিয়ে বিচার প্রক্রিয়া চালু করুন। ‘দেভাঙ্গনা কলিতা’ বা ‘নাতাশা নারওয়াল’ বা ;কবীর কলা মঞ্চ’ এর রায়গুলি বিশ্লেষণ করে একটা সরলরৈখিক পথ খুঁজে বের করা যেত, নিম্নের সিদ্ধান্তগুলির ওপর দাঁড়িয়ে।
(১) ইউএপিএ একটি বিশেষ আইন, যা একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়েছে, এবং এর প্রয়োগকে সাধারণ আইনের সাথে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
(২) ফৌজদারি আইনগুলিকে সর্বদা সংকীর্ণভাবে( লিমিটেড) ব্যাখ্যা করতে হবে এবং এর শর্তাবলীকে যথাযথ সুনির্দিষ্টতা দিতে হবে।
(৩) (১) এবং (২)-এর সমন্বিত অর্থ হলো, ইউএপিএ-তে ব্যবহৃত ‘সন্ত্রাসবাদ’ শব্দটিকে এমন একটি নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হবে যা ভারতের প্রতিরক্ষার( State security) সাথে সম্পর্কিত এবং জনশৃঙ্খলার অপরাধ ( public disturbance) থেকে এটিকে আলাদা করা যায়।
(৪) ইউএপিএ-এর অধীনে একজন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের একটি প্রাথমিক মামলা প্রতিষ্ঠা করার জন্য, অভিযোগগুলি অবশ্যই ব্যক্তিগত, বাস্তব এবং সুনির্দিষ্ট হতে হবে। একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে এবং প্রকৃত ঘটনাগুলির মধ্যেকার ব্যবধান অনুমান বা জল্পনা দ্বারা পূরণ করা যাবে না ( filling the gap by drawing inferences or speculation)।
(৫) যতক্ষণ পর্যন্ত এই ফাঁকফোকরগুলো না বোজানো যাচ্ছে অর্থাৎ অভিযুক্ত এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কস্থাপন করা যাচ্ছে ততক্ষন এবং জামিনের সাধারণ নীতিগুলি প্রয়োগ হবে, ইউএপিএ আইনের ৪৩(ডি)(৫) প্রযোজ্য হবে না।
(৬) বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে, যখন অভিযোগগুলি প্রতিবাদ সংগঠিত করা এবং তাতে অংশগ্রহণের সাথে সম্পর্কিত, যেগুলি সংবিধানের অধীনে নিশ্চিত অধিকার। আদালত ইউএপিএ-এর মতো আইন ব্যবহার করে প্রতিবাদ, প্রতিবাদের সময় সংঘটিত বেআইনি কার্যকলাপ এবং সন্ত্রাসবাদের মধ্যেকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করা থেকে বিরত থাকতে বিশেষভাবে সতর্ক থাকবে।
এতকিছু লেখার উদ্দেশ্য একটাই। দমনমূলক আইনের অধীনেও, যেমন ইউএপিএ ২০০৪ বা এন আই এ ২০০৮ আইনের বিচারের সময়ও আদালতগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ – এবং অপরিহার্য – ভূমিকা পালন করার সুযোগ থাকে, যদি তাঁরা সংবিধানের সতর্ক প্রহরী হিসেবে সেই ভূমিকা পালন করতে চান।
দ্বিতীয় পর্বের এই লেখাটি গুছিয়ে নেওয়ার দিনই, দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালত, দিল্লি দাঙ্গা, ২০২০ মামলায় উমর খালিদ এবং সার্জিল ইমাম – দুজনের জামিনের আবেদন খারিজ করে রায় দিয়েছেন, আগামী এক বছর তাঁরা আর জামিনের আবেদন করতে পারবেন না! সুতরাং, সেই রায়ের ওপরও কিছুটা আলোচনা থাকল পাঠকদের জন্য।
মোট ১৪২ পাতার রায়, মোট ৪৪৪ টি অনুচ্ছেদ । ৪৪৪ টি অনুচ্ছেদ এবং ১৪২ টি পাতাব্যাপী দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালত, দিল্লি দাঙ্গা’ ২০২০ এর অপরাধীদের মধ্যে পাঁচজনকে আপাতত জামিন দিয়েছেন , বাকি দুজনের জামিনের আবেদন খারিজ করেছেন। ‘অপরাধী’ কথাটা ভুল হল, কেননা এই মামলায় এখনো পর্যন্ত কেউ অপরাধী সাব্যস্ত হয় নি, কিন্তু বন্দীত্বের সাড়ে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত! ‘অনেক দীর্ঘ সময়’ মানে ঠিক কতটা দীর্ঘ সময়? আর ‘দিল্লি দাঙ্গা ২০২০ লেখাটাও মনে হয় ভুল , কারণ , উমর খালিদ , সার্জিল ইমাম বা অন্যান্যদের বিরুদ্ধে যে মামলা সেটা হল , দিল্লি দাঙ্গা , বৃহত্তর ষড়যন্ত্র ২০২০ মামলা। কারণ , ওই বৃহত্তর ষড়যন্ত্র কথাটি যোগ না করলে , উমর খালিদ বা অন্যান্যদের ফাঁসানো মুস্কিল।
সে যাক্গে। আমরা বরং দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালতের রায়টি খানিক বুঝে দেখার চেষ্টা করি ।
বিলম্বিত বিচারপদ্ধতি সংক্রান্তঃ
কী নিয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন আবেদনকারীরা ? সংবিধানের ২১ নং ধারা মোতাবেক স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য । ইতিমধ্যে সাড়ে পাঁচবছর অতিক্রান্ত । ঠিক কতদিন বিনা বিচারে বন্দী করে রাখা যায় দেশের নাগরিকদের? সংবিধানের ২১ নং ধারা কিন্তু দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির অধিকার স্বীকার করে নিয়েছে (right to speedy disposal) । দেশের শীর্ষ আদালতই বারেবারে সেই অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন । এই জামিনের আবেদনের মামলায় দেশের শীর্ষ আদালত প্রথম প্রসঙ্গটি এনেছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে। আর এই মহামান্য আদালতই ( নাজিব বনাম ভারত সরকার) মামলায় স্বীকার করে নিয়েছিলেন, বিচারের জন্য দীর্ঘ সময় কেটে গেলে তা অবশ্যই সংবিধানের ২১ নং ধারাকে অমান্য করছে। বর্তমান জামিন আবেদন মামলায়, বিচারের জন্য দীর্ঘ সময়ের বিষয়টিকে নিয়ে মহামান্য আদালত, অভিযুক্তদের দিকে দায় ঠেলেছেন। রায়ে বলেছেন, মূল ফৌজদারী মামলায় বারে বারে মুলতুবী চাওয়া, নতুন নতুন আপত্তি ( অবজেকশন) দিতে চাওয়া ইত্যাদি নিয়েও অনেক সময় গেছে। মহামান্য আদালত কিন্তু পরিষ্কার করে বলেননি , সাড়ে পাঁচ বছরের মধ্যে ঠিক কতটা দেরী উপরোক্ত কারণগুলির জন্য হয়েছে! আর একটা বিষয় বোঝার দরকার আছে । সরকার বা প্রসিকিউশন যদি রোজ রোজ নতুন এভিডেন্স দায়ের করতে থাকে তাহলে সেগুলোর বিরুদ্ধে আপত্তি বা অবজেকশন দায়ের করা তো আইনের স্বীকৃত পদ্ধতি!
দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়া নিয়ে মহামান্য শীর্ষ আদালত আরো একটি যুক্তি দিয়েছেন। অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিচারের কাল বিলম্বিত হতে পারে। জানিনা, এই যুক্তিটি আইনসঙ্গত কিনা। অপরাধের মাত্রা অনুসারে জামিনের আবেদন বিবেচনা করা যেতে পারে কিন্তু অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী ২১ নং ধারা মোতাবেক ‘দ্রুত বিচার’ এর বিপ্রতীপে কাজ করা যায় কি? আর একটি কথা আগেও বলেছি। কেবল দেশের মহামান্য শীর্ষ আদালতই নয়, অন্যান্য সাংবিধানিক আদালতগুলির ক্ষেত্রেও একই ঘটনা দেখা যাচ্ছে। সেটা হল কো-অর্ডিনেট বেঞ্চের রায়কে মান্যতা না দেওয়া। ‘সেখ জাভেদ ইকবাল বনাম উত্তরপ্রদেশ সরকার’ মামলায় দেশের শীর্ষ আদালতের অপর একটি দুই সদস্যের মাননীয় বেঞ্চ মন্তব্য করেন, অপরাধের মাত্রা যত বেশি তত দ্রুত বিচার নিষ্পন্ন করতে হবে। আর আজ দেশের সেই শীর্ষ আদালতেরই আর একটি কো-অর্ডিনেট বেঞ্চ মনে করছেন, অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিচার বিলম্বিত হবে!
উগ্রপন্থার ব্যাখ্যাঃ
বর্তমান জামিন আবেদন মামলায় মহামান্য আদালত দ্বিতীয় যে বিষয়টি নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করেছেন , সেটি হল UAPA আইনের ১৫ নং ধারায় উগ্রপন্থার ব্যাখ্যা। আলোচিত আইনটির সর্বাপেক্ষা দানবিক ধারাটি হল ৪৩ ঘ(৫) বা 43 D(5)। এই ধারাটি সংযোজিত হয় ২০০৮ সালের সংশোধনী আইনে, যেখানে বস্তুত বলা হল সরকার বা প্রসিকিউশন যদি মনে করে, প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান (prima facie proved) অপরাধ সংযোগ আছে তাহলে আদালত জামিনের আবেদনের শুনানীতে মূল মামলা নিয়ে আলোচনা করতে পারে না। তাহলে প্রয়োজন হয়, মামলার অভিযুক্তরা আদৌ এই আইনের ১৫ নং ধারা অনুসারে উগ্রপন্থার সঙ্গে সংযুক্ত কিনা, সেটার প্রাথমিক বিচারের। তাহলে দরকার হয় ‘অপরাধের উপাদান’ বা ‘ingradients of offence’ এর বিশ্লেষণ করার , যেটা বর্তমান জামিনের আবেদন মামলায় কোনো স্তরেই করা হয় নি। ১৫ নং ধারায় বলা আছে , অস্ত্রশস্ত্র ছাড়াও গণ্ডগোল করার মত অন্যান্য বস্তু( by any other means of whatever nature ), যেটাকে বর্তমান ক্ষেত্রে বিস্তৃত করে বলা হল , যা কিছু সামাজিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটাতে পারে , যদি সেক্ষেত্রে শারীরিক সংঘর্ষের ঘটনা না থাকে তাহলেও সেটা উগ্রপন্থার মধ্যে ধরা যেতে পারে! আইনের ছাত্ররা তো অবশ্যই জানেন এবং স্বাভাবিকভাবেই মহামান্য শীর্ষ আদালতের বেঞ্চের কাছেও অগোচর নয়, ‘রাম মনোহর লোহিয়া’ মামলার রায় । কী বলা হয়েছিল সেই মামলায়? বিখ্যাত ‘কনসেন্ট্রিক সার্কেল’ তত্ত্ব অনুসারে বলা হয়েছিল , দৈনন্দিন সামাজিক ব্যবস্থায় বিঘ্ন বা জনরোষের সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিঘ্ন ( public space disorder vs State security disorder) , দুটি বিষয়কে পৃথক করে দেখতে হবে। বর্তমান জামিন মামলায় মহামান্য আদালতের রায় বস্তুত, দেশের শীর্ষ আদালতেরই প্রদত্ত ‘কনসেনট্রিক সার্কেল’ তত্ত্বের বিরোধিতা করছে। তাহলে, ‘ ধর্না’ থেকে শুরু করে ‘চাক্কা জ্যাম’ যে কোনো ঘটনাকেই উগ্রপন্থা হিসাবে বিবেচনা করা হবে এর পর থেকে। তাহলে যে কোনো ‘অসহযোগ’ বা ‘ আইন অমান্য’ আন্দোলনকেই UAPA আইনের আওতায় এনে ফেলা যায় বা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্দী করে রাখা যায়। হ্যাঁ, চাক্কা জ্যাম যদি অতি প্রয়োজনীয় সরবরাহের ক্ষেত্রে বাধা হয়, সেক্ষেত্রে UAPA আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।
বছর দুয়েক আগে, ‘আসিফ ইকবাল তানহা বনাম ভারত সরকার’ মামলায় দিল্লী আদালত মত দেন , জনজীবনে সাধারণ বিঘ্ন ঘটা বা আইন অমান্য ধরণের আন্দোলনগুলি থেকে উগ্রপন্থাকে পৃথক করে বিচার করতে হবে। সেই রায়েরই নির্দিষ্ট অংশ তুলে ধরছি
“the extent and reach of terrorist activity must travel beyond the effect of an ordinary crime and must not arise merely by causing disturbance of law and order or even public order; and must be such that it travels beyond the capacity of the ordinary law enforcement agencies to deal with it under the ordinary penal law. (para 49)
“The making of inflammatory speeches, organising chakkajams, and such like actions are not uncommon when there is widespread opposition to Governmental or Parliamentary actions. Even if we assume for the sake of argument, without expressing any view thereon, that in the present case inflammatory speeches, chakkajams, instigation of women protesters and other actions, to which the appellant is alleged to have been party, crossed the line of peaceful protests permissible under our Constitutional guarantee, that however would yet not amount to commission of a ‘terrorist act’ or a ‘conspiracy’ or an ‘act preparatory’ to the commission of a terrorist act as understood under the UAPA. (para 47) ।
সেই জামিনের মামলা মহামান্য শীর্ষ আদালতে পৌঁছলে শীর্ষ আদালতের বেঞ্চ মন্তব্য করেন, এই রায়কে প্রিসিডেন্স বলে মানা যাবে না। আমরা কম জানা লোক , তবু প্রশ্ন করতে ইচ্ছা করে, একটি সাংবিধানিক আদালতের রায় খারিজ না হলে , তাকে “প্রিসিডেন্স বলে গ্রাহ্য করা যাবে না” , এইটি কি আদৌ আইনের পরিভাষায় মান্যতা পায়! দেশের শীর্ষ আদালত কি অন্য সাংবিধানিক আদালতগুলির মর্যাদা হানি করছেন না!
এই মামলার তথ্য
এই মামলায় উমর খালিদের অবস্থান কোথায়? দিল্লি দাঙ্গা২০২০ এর সময় উমর দিল্লিতেই ছিলেন না। বেশ। ধরে নেওয়া গেল দিল্লিতে না থেকেও দাঙ্গায় অংশগ্রহণ করেছেন। উগ্রপন্থার কী কী উপাদান পাওয়া গেছে তাঁর কাছ থেকে। কিচ্ছু না। পাওয়া গেছে কিছু হোয়াটসঅয়াপ মন্তব্য , কিছু ভাষণ দেওয়ার ছবি বা ভিডিও। সেইজন্যই মামলাটি আর কেবল ‘দিল্লি দাঙ্গা,২০২০’ মামলা নয় , দিল্লি দাঙ্গা বৃহত্তর ষড়যন্ত্র মামলা। ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব উপস্থাপিত করতে না পারলে মামলাটিই দাঁড়ায় না। ট্রায়াল কোর্টে এমনকি, ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শ্লোগানটিকেও উগ্রপন্থার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে।
বর্তমান রায়টিতে ৯৮ অনুচ্ছেদে এসে মহামান্য আদালত বলেছেন, “the prosecution material comprises direct, corroborative, and contemporaneous evidence, including recoveries, digital communication trails, and statements indicative of managerial responsibility.” মহামান্য আদালত একবারের জন্যও খোলসা করলেন না, কিসের প্রমাণ। কোথা থেকে উদ্ধার হল, কার কাছ থেকে। আগেই বলেছেন, একমাত্র প্রমাণ হল, ‘চাক্কা জ্যাম’! এই রায়েরই ২১৫ নং অনুচ্ছেদে বলছেন , সেরকম কিছু প্রমাণ উদ্ধার করা যায় নি! তাহলে ৯৮ নং অনুচ্ছেদে কী উদ্ধারের কথা বলা হল? এই কথা বলেই ফের লেখা হচ্ছে, ষড়যন্ত্রের উপাদান বা প্রমাণ বিষয়গুলি ভারতীয় পেনাল কোডের মামলায় বিবেচনা করা যেতে পারে, যেখানে UAPA আইনের বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের মামলায় আরো অনেক কিছু বিবেচ্য!!!!!( বাধ্য হয়ে অনেকগুলি বিস্ময়চিহ্ন দিয়ে ফেললাম)।
রায়ের ২১১ নং অনুচ্ছেদে এসে লেখা হল, “It asserts a phased progression: mobilisation and indoctrination; institutionalisation through committees and digital platforms; expansion of protest sites into permanent blockades; preparation for escalation; and culmination in coordinated chakka jams and widespread violence.” । শেষ দুটি শব্দবন্ধ বাদ দিলে বাকিগুলি তো UAPA এর আওতাতেই আসে না। তাহলে বাকি দুটি প্রমাণ করতে হলে আগের mobilisation , indoctrination ইত্যাদি শব্দের সাথে ওয়াইডস্প্রেড ভায়োলেন্সের সংযোগসাধন করতে হয়। কোথায় সেই সংযোগ? সেই সংযোগের প্রমাণ চাইলেই বলা হচ্ছে , ধারা ৪৩ঘ(৫) অনুযায়ী জামিন মামলায় সেসব বিচার্য নয়!
মোদ্দা কথা হল, UAPA আইনে এই মামলা দাঁড় করাতে হলে ব্যাপক সহিংসতার প্রমাণ দিতে হয় এবং তার সাথে অভিযুক্তদের সংযোগ প্রমাণ করতে হলে ব্যাপক ষড়যন্ত্রের তত্ত্ব উপস্থাপিত করতে হয়।বর্তমান মামলায় সেটাই করা হচ্ছে সরকার পক্ষ থেকে বা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। প্রসিকিউশনের যা ফাঁকফোকর তা বোজানো হচ্ছে,’বৃহত্তর ষড়যন্ত্র’ এর তত্ত্ব দিয়ে।
সবথেকে আকর্ষণীয় হল ২৩৯ নং অনুচ্ছেদ। সমগ্র রায়টিতে মহামান্য আদালতের বেঞ্চ বলেছেন, তাঁদের বিচার্য বিষয় হল সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের যোগসাধন করে UAPA আইনের ১৫ নং ধারানুসারে বিষয়টি উগ্রপন্থার সঙ্গে যুক্ত কিনা আর ২৩৯ অনুচ্ছেদে এসে বললেন , জামিন স্তরে এসে UAPA আইনের ১৫ নং ধারাটি বিবেচনায় আনা যায় না।
বিষয়টি সহজভাবে বললে: ইউএপিএ আইনের জন্য “ব্যাপক সহিংসতা” ঘটানোর (ষড়যন্ত্র) প্রয়োজন হয়। অন্য ধরণের প্রমাণ এমন কিছু প্রতিষ্ঠা করার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রসিকিউশন এখন দাবি করছে যে, প্রমাণ এবং কাজের মধ্যে এই শূন্যস্থানটি “ষড়যন্ত্র” দ্বারা পূরণ করা হয়েছে। আদালত বলছে যে, এই (প্রমাণবিহীন) দাবিটি পরীক্ষা করা থেকে তারা বিরত রয়েছে। একটি উদাহরণ হিসেবে, ২১৮ নম্বর অনুচ্ছেদটি বিবেচনা করুন:
এই পর্যায়ে, আদালত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে না যে প্রতিটি বৈঠক ষড়যন্ত্রমূলক ছিল কিনা। কিন্তু যেখানে সপ্তাহ ও মাস ধরে একাধিক বৈঠকের অভিযোগ আনা হয়েছে, এবং যেখানে সাক্ষীর বক্তব্য ও ইলেকট্রনিক রেকর্ড ব্যবহার করে একই অভিযুক্তকে এই ধরনের কয়েকটি ঘটনার সাথে যুক্ত করা হয়েছে, সেখানে আদালত ধারাবাহিকতাকেই একটি প্রাসঙ্গিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখবে । প্রসিকিউশনের বর্ণনায় একজন অংশগ্রহণকারী এবং একজন সংগঠকের মধ্যে সংযোগ হল এই ধারাবাহিকতা।
কিন্তু, আবারও সেই একই প্রশ্ন করতে হয়: কিসের ধারাবাহিকতা? কী করার ধারাবাহিকতা? আগের অনুচ্ছেদে আদালত নিম্নলিখিত “সিদ্ধান্তের বিষয়গুলো” (কিসের সিদ্ধান্ত?) উল্লেখ করেছে:
... ০৮.১২.২০১৯ তারিখের জাংপুরা বৈঠক; ডিসেম্বরের মাঝামাঝি জামিয়া পর্ব; সংহতি তৈরির কাঠামো হিসেবে জেসিসি/জেএসিটি-র গঠন ও কার্যক্রম; তথ্য প্রচারের প্রক্রিয়া হিসেবে ডিএসপিজি-র সৃষ্টি ও পরিচালনা; আইএসআই, গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন এবং শাহীন বাগের বৈঠকগুলো; এবং জানুয়ারির সীলমপুর পর্ব, যেখানে পরিস্থিতি আরও গুরুতর করার প্রস্তুতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
তাহলে বলতে হয়, এই বৈঠকগুলোতে সহিংসতা ঘটেনি। উমর খালিদের বিরুদ্ধে প্রকৃত প্রমাণ এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের মধ্যে সর্বদা একটি স্থায়ী ব্যবধান রয়েছে, এবং রায়ে যতই বহু-অক্ষরের শব্দ ব্যবহার করা হোক না কেন (“স্থাপত্যিক”, “ধারণাগত নেতৃত্ব”, “পরিস্থিতি গুরুতর করার স্থপতি (“architectural”, “conceptual leadership”, “architect of escalation””), এই ব্যবধানটি অপূর্ণই থেকে যাবে, কারণ প্রসিকিউশন এবং বিচার বিভাগের কল্পনার প্রচেষ্টা ছাড়া এগুলি পূরণ করা সম্ভব নয়।
চূড়ান্ত ইঙ্গিতটি আসে ২৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে। রায়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই কথা জোর দিয়ে বলার পর যে, তাদের কাজ হলো অপরাধের উপাদানগুলোর সাথে যুক্তিসঙ্গত সম্পর্ক আছে কিনা তা দেখার জন্য প্রমাণাদি পরীক্ষা করা, আদালত অবশেষে উমর খালিদের মামলার বিশ্লেষণ এই বলে শেষ করে: “জামিনের পর্যায়ে, আদালত এই সিদ্ধান্ত নেয় না যে এই অভিযোগগুলো শেষ পর্যন্ত ১৫ ধারার অধীনে একটি “সন্ত্রাসী কার্যকলাপ”-এর উপাদানগুলো পূরণ করে কিনা।”
কিন্তু তাহলে, আমরা এখানে কী করছি? আদালত যদি অভিযোগগুলো অপরাধের উপাদানগুলো পূরণ করে কি না, সেই প্রশ্নটিও না তোলে, তাহলে সে কী করবে? তার আর করার কী বাকি থাকে?
বস্তুত, শারজিল ইমামের জামিন নাকচের ক্ষেত্রেও একই প্রশ্ন ওঠে। সংবিধান অনুযায়ী, বক্তৃতা ততক্ষণ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক সুরক্ষিত থাকে যতক্ষণ না তা আসন্ন সহিংসতায় উস্কানি দেয়; ইমামের বক্তৃতা ট্রায়াল কোর্ট কোনস্তরেই পরীক্ষার আওতায় ফেলে নি। সুপ্রিম কোর্টের সামনে ইমামের আইনজীবী এই যুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন। আর আদালত ১৬২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলেছেন:
প্রতিপক্ষ যুক্তি দিয়েছে যে, বক্তৃতায় সহিংসতায় সরাসরি কোনো উস্কানি নেই এবং এটি সুরক্ষিত। এই পর্যায়ে প্রতিপক্ষ যেভাবে চাইছে, সেভাবে সেই যুক্তি বিচার করা যায় না। আইনগত অনুসন্ধানটি এই নয় যে, আদালত একটি পূর্ণাঙ্গ বিচারের পর প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করবে কি না। অনুসন্ধানটি হলো, প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যাটি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য (prima facie true) কি না এবং অন্যান্য সংযোগগুলোর সাথে সম্মিলিতভাবে পাঠ করলে তা পরিকল্পিত বিশৃঙ্খলার একটি সুসংগত বিবরণে অবদান রাখে কি না।
অন্য আপিলকারীদের জামিনের আদেশগুলো পড়লে একটি বেশ অদ্ভুত চিত্র ফুটে ওঠে: মনে হয় যেন অন্য ব্যক্তিরা সবাই যন্ত্রমানব, যারা শারজিল ইমাম বা উমর খালিদের কাছ থেকে উপর থেকে আসা আদেশগুলো যান্ত্রিকভাবে পালন করছে। আমাদের সামনে এমন কিছু শব্দবন্ধ তুলে ধরা হয়েছে যেমন, “স্বায়ত্তশাসিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার অভাব,” “সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ,” “স্তরভিত্তিক অংশগ্রহণ,” “ক্ষেত্র পর্যায়ের অংশগ্রহণকারী যার উপস্থিতি ও আচরণ মূলত অন্যদের দ্বারা কথিত নির্দেশাবলী থেকে অর্থ লাভ করে,” “ধারণাগত নেতৃত্ব,” “বহুস্তরীয় সংহতি কাঠামো,” “তথ্যের বাহক,” “কার্যকরী বাস্তবায়ন,” ইত্যাদি( absence of “autonomous decision-making authority,” “limited to coordination,” “layered participation,” “site level participant whose presence and conduct derive meaning primarily from directives purportedly issued by others,” “conceptual command,” “multi-layered mobilisation architecture,” “conduit for information,” “operational execution,”)
মনে হচ্ছে না একগুচ্ছ কর্পোরেট জারগন শুনছি! এই শব্দবন্ধগুলো কর্পোরেট শাসনের ক্ষেত্র থেকে ধার করা হয়েছে বলে মনে হয় । এই ধরণের শব্দবন্ধ কর্পোরেট জগতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে, যাতে আসলে কিছুই বোঝা যায় না।
তাই আমরাও কর্পোরেট আইনের একটি শব্দবন্ধ ব্যবহার করতে পারি , piece of veil । যখন আপনি এই বহু-অক্ষরের শব্দগুলো দিয়ে তৈরি পর্দাটি ভেদ করবেন, এবং যখন আপনি সেই আসল প্রমাণগুলো পরীক্ষা করতে ফিরে যাবেন যা শারজিল ইমাম ও উমর খালিদের কাজকে অন্যদের কাজ থেকে আলাদা করে, তখন নথিপত্রে এমন কিছুই পাওয়া যায় না যা একটি বিশাল ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে বসে থাকা দুই ব্যক্তির এই ভীতিকর চিত্রকে সমর্থন করে। যারা অধস্তনদের নির্দেশ দেয় এবং তারা তা নির্বিচারে পালন করে। এই চিত্রটি সম্পূর্ণরূপে এমন কিছু দাবির উপর ভিত্তি করে তৈরি যা এই শীতের সকালের গাঢ় কুয়াশার মত। এই ফাঁকগুলি বোঝাবার মত রসদ রাষ্ট্রের হাতে নেই।
এই মামলার ট্র্যাজেডি শেষ পর্যন্ত এখানেই নিহিত যে, এই ফাঁকগুলো যাচাই করার পরিবর্তে, আদালতগুলো – সব স্তরেই – সেগুলো পূরণ করার পথ বেছে নিয়েছে। ইউএপিএ আইনের 43D(5) ধারায় জামিন হয় না বলার অর্থ হল UAPA আইন দেশের সংবিধানের থেকেও শক্তিমান। UAPA আইনের 43D(5) ধারায় যে আদালতের কথা বলা আছে আর ওই আইনের 2(d) ধারায় যে আদালতের কথা বলা আছে , সেদুটি পৃথক ধারণা। 43D(5) ধারায় আদালত মানে ট্রায়াল কোর্ট , সেটি সাংবিধানিক আদালত নয়। এই পার্থক্যটা ২০০৮ এর 43D(5) সংক্রান্ত সংশোধনী পেশ করার সময়েই বলা হয়েছিল, সাংবিধানিক আদালত মনে করলে যে কোনো স্তরেই , এমনকি জামিনের স্তরেও মূল অভিযোগের পর্যালোচনা করতে পারে। সেই ২০০৮ এর সংসদীয় প্রতিবেদন আমার কাছে আছে, চাইলে পেশ করতে পারি। এগুলো আগেও বলেছি , আবারও বলছি, তার কারণ একজন উমর খালিদ নয়, একজন সার্জিল ইমাম নয়, গুলফিশা ফতিমা বা সুধা ভরদ্বাজ বা জি সাইবাবা নয়, আসলে জরুরী অবস্থা ঘোষণা না করেও দেশের সাংবিধানিক কাঠামো নষ্ট করা হচ্ছে। মামলার বিস্তর ফাঁকফোকর বোজানোর চেষ্টা হচ্ছে আদালতের অনুগ্রহে। আতঙ্কের কথা এগুলোই।