২০১৬ থেকে ২০২১ এই পর্বে বিজেপির বিপুল শক্তিবৃদ্ধি হয়। বিশেষ করে ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে আশাতিরিক্ত ফল করার পর উল্কার গতিতে বিজেপির উত্থান হয়। এই সময়েই বামপন্থীদের একাংশের মনে আশা জাগে বিজেপিকে দিয়ে তৃণমূলকে হারানোর। ২০১৬ সালে বামেদের নিজেদের প্রচেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ার পর থেকেই বাম সমর্থকদের মধ্যে বিজেপিকে সমর্থন করার ঘটনা লক্ষ্যনীয়ভাবে বেড়ে ওঠে। এই সময়েই ‘'আগে রাম পরে বাম” এই তত্ত্ব তৈরি হয়। বাম সমর্থকদের একাংশ বলতে শুরু করেন পশ্চিমবঙ্গে বামেদের দ্বারা সরাসরি তৃণমূলকে হারানো সম্ভব নয়। তাই বিজেপিকে আগে ক্ষমতায় আনতে হবে। তারপর সুযোগ বুঝে বাম সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য ঝাঁপানো উচিত। পাড়ায় পাড়ায় পরিচিত অনেক বামকর্মী এবং সমর্থকদের মুখে এই কথা অনেকেই শুনেছেন। ধীরে ধীরে বামেদের এই অংশ ‘রাম্বাম’ নামে পরিচিত হয়।
সিপিআইএম বিরোধী বামেদের অনেকেরই ধারণা হল সিপিআইএমের রাজ্য নেতৃত্ব বা জেলা নেতৃত্ব অত্যন্ত সচেতনভাবে নিজেদের ভোট বিজেপিকে হস্তান্তর করেছেন। এদের চোখে সিপিআইএম বিজেপির বিটীম, বিশ্বাসঘাতক, সিপিআইএমের জন্যেই বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে শক্তিশালী হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নির্মোহভাবে বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের এই বিষয়টিকে নিয়ে চর্চা করতে হবে। নইলে আমরা সামনে এগোনোর সঠিক রাস্তা তৈরি করতে পারব না।
১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর একটানা ৩৪ বছর সরকার চালিয়ে ২০১১ সালে হেরে যায় বামফ্রন্ট। ৩৪ বছর পরে আবার বামেদের এই অংশ সরকার বিহীন অবস্থায় পড়ে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি নতুন প্রজন্ম চলে এসেছে। ১৯৭৭ সালের বামপন্থী পার্টি আর২০১১ সালের বামপন্থী পার্টির মধ্যে ফারাক ছিল আকাশ আর পাতালের। ১৯৭৭ সালের আগে ১৯৬৭ আর ১৯৬৯-এ দুটি ক্ষণস্থায়ী যুক্তফ্রন্ট সরকার ছাড়া বাঙলায় বাম আন্দোলন কখনও সরকার নির্ভর ছিল না। কিন্তু ২০১১ সালে যে বামপন্থী পার্টিগুলি সরকার হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়াতে বাধ্য হল তারা ছিল গভীরভাবে সরকার নির্ভর। ফলে এই পার্টিগুলির মধ্যে লড়াকু মানসিকতা এবং লড়াকু শক্তি খুবই কম অবশিষ্ট ছিল। ৩৪ বছর সরকারে থাকার ফলে তাদের জীবনযাত্রা লক্ষ্যনীয়ভাবে পালটে গেছিল। ১৯৭৭ সালের পর যারা সরকারে থাকা বাম পার্টিগুলিতে রাজনীতি করতে এসেছিলেন তারা তো আক্রমণ মোকাবিলা করতে জানতেনই না, সে আক্রমণ রাষ্ট্রীয় হোক বা অরাষ্ট্রীয়। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৭ পর্যন্ত কংগ্রেস বিরোধী শক্তি হিসাবে একভাবে তাও শক্তিশালী ছিল। এই পর্বে কংগ্রেসের সাথে অনেক জায়গাতেই বামেদের সমানে সমানে সংঘর্ষ করতে হয়েছে। কিন্তু ১৯৮৭-র পর, বিশেষ করে নয়ের দশক থেকে বামেরা রাজ্য রাজনীতিতে একচ্ছত্র হয়ে পড়েন। পুলিস কেসের ভয় নেই। জেলে যাবার আশংকা নেই। সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনীর হাতে আক্রান্ত হবার ভয় নেই। এদিকে আর্থিক নিরাপত্তারও অভাব নেই। সরকারি চাকরি করে আর সামনে পুলিস পেছনে পুলিস, চতুর্দিকে নিজেদের লোকবল আর গুন্ডাবাহিনী নিয়ে এই সময়ে জায়গায় জায়গায় “দাপুটে নেতা” রা গড়ে ওঠে। এই সময়ে বামকর্মী এবং নেতাদের জীবন এক অন্য ধারায় চলেছে।
বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কমিউনিষ্ট আন্দোলনের কর্মীদের এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা করা উচিত। অনেকের ধারণা এই পরিবর্তন বোধহয় শুধুমাত্র CPIM, CPI জাতীয় পার্টিগুলির (যারা সরকারে ছিলেন) ক্ষেত্রেই হয়েছে। ব্যাপারটা মোটেই তা নয়। সরকারের বাইরে থাকা বামপন্থী পার্টিগুলির ক্ষেত্রেও তা হয়েছে। সরকারে থাকা আর না-থাকার মধ্যে ফারাক আছে। সুতরাং, হুবহু একই পরিবর্তন অবশ্যই হয় নি। কিন্তু সব পার্টিই এই পর্বে কোন না কোন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়েই গেছে। একটা পরিবর্তন আমরা নিশ্চিতভাবেই দেখতে পাই। তা হল সরকারের বাইরে থাকা সংগঠনগুলির ওপরও নিশ্চিন্ত মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রার বিপুল প্রভাব পড়েছে। এই পার্টিগুলিরও বহু কর্মী সরকারি চাকরি করেছেন, কেউ শিক্ষকতা করেছেন। গ্রামাঞ্চলে যারা ১৯৭৭-এর আগে ভূমিহীন ক্ষেতমজুর ছিলেন তারা পরবর্তীতে মধ্য কৃষক হয়েছেন। সিপিআইএমের ৩৪ বছরের শাসনকালে গ্রামে শহরে বিরোধী বামপন্থী শক্তিকে মূলত সামনা করতে হয়েছে তাদের মারমুখী ক্যাডারকুলকে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় আক্রমণ লক্ষ্যনীয়ভাবে অনুপস্থিত ছিল। পূর্ববর্তী কংগ্রেস জমানার তুলনায় অপেক্ষাকৃত আক্রমণহীন, অপেক্ষাকৃত শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতিতে এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের ফলে স্বচ্ছল মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনে অনেকটাই ডুবে গিয়েছিলেন এই পার্টিগুলিরও একটা বড় অংশ। ফলে আঘাত হানার এবং আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা এই পার্টিগুলিরও আগের থেকে অনেকটা কমে গিয়েছিল এই কথা কেউ যদি অস্বীকার করেন তাহলে তিনি সত্যের অপলাপ করবেন।
একটা সময় ছিল যখন কমিউনিষ্ট আন্দোলনে এই বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে চর্চা হত। বিগত দীর্ঘ সময় জুড়ে এই চর্চাগুলো পার্টি নির্বিশেষে কমিউনিষ্ট আন্দোলন থেকেই উবে গেছে। আজকালকার কমিউনিষ্ট প্রজন্ম এই চর্চাগুলি সম্পর্কে অবহিতও নন। ফলে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের মধ্যে সুবিধাবাদের উৎপত্তি এবং বেড়ে ওঠার বিষয়টিকে তারা মার্কসবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখতে সক্ষম নন। তাদের নেতাদেরও একই হাল। ফলে সকলেই সুবিধাবাদের প্রশ্নটিকে তারা অমুক বা তমুক ব্যক্তির সমস্যা বা অমুক বা তমুক পার্টির সমস্যা বলেই মনে করেন। যার ফলে বুদ্ধবাবু কত ভালো কিংবা বুদ্ধবাবু কত খারাপ এই ব্যাপক তর্ক বিতর্ক চলতে থাকে। কিংবা সিপিএম কতটা বিজেপি কিংবা নকশালরা কতটা তৃণমূলপন্থী (‘'চটিচাটা”) এই নিয়ে গগনবিদারী ঝগড়া চলতে থাকে। কিন্তু ১৯৭৭ সাল থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এই তিরিশ বছরের সময়পর্বটা পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে কীভাবে এবং কতটা প্রভাবিত করেছে তার কোনো মার্কসবাদী ব্যাখ্যা বা গবেষণা আজ পর্যন্ত আমার নজরে পড়ে নি।
আমি এই প্রসঙ্গে আমার এই লেখাটি যাদের নজরে পড়েছে তাদের মধ্যে যারা সিরিয়াস কমিউনিষ্ট কর্মী তাদের লেনিনের The Collapse of the Second International লেখাটি আর একবার পড়ে দেখার অনুরোধ করব। এই পর্বে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের বেইমানি, সুবিধাবাদ এবং পতন নিয়ে লেনিনের অন্যান্য লেখাগুলোও পড়ার অনুরোধ করব। এতে আমরা পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত সময়কালকে কীভাবে ব্যাখ্যা করব তা বুঝতে আমাদের সুবিধা হবে। ঐ প্রবন্ধে লেনিন লেখেন, “It is generally agreed that opportunism is no chance occurrence, sin, slip, or treachery on the part of individials, but a social product of the entire period of history.”
এই লেখাতেই লেনিন দেখিয়েছিলেন যে, পার্টি যখন একটা আপাত শান্তির পরিস্থিতি অতিক্রম করে তখন সেই পরিস্থিতি যে সুযোগ দেয় কমিউনিষ্ট কর্মীরা যদি সেই সুযোগে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, সেই সুযোগগুলি ছাড়া (কমিউনিষ্ট হিসাবে) বাঁচতেই পারে না, চলতেই পারে না তাহলে হয় কী, সহসা যখন সেই শান্তির পর্ব শেষ হয়ে যায়, সমাজ যখন একটা ঝঞ্জাক্ষুব্ধ সময়ে প্রবেশ করে তখনও কমিউনিষ্ট কর্মীরা সেই সুযোগগুলি হাতছাড়া কররে চান না। এইখান থেকে গড়ে ওঠে শ্রেণি সমঝোতা, এইখান থেকে গড়ে ওঠে সুবিধাবাদ। এই সুবিধা, স্বচ্ছলতা, নিশ্চিন্ততা যে অংশের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশি থেকেছে তাদের মধ্যে সুবিধাবাদের প্রকোপও বেশি দেখা যায়। কিন্তু সুবিধাবাদ পার্টি নির্বিশেষে কমিউনিষ্ট আন্দোলনের মধ্যেই চারিয়ে যায় পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে না নিতে পারার অক্ষমতা থেকেই।
পশ্চিমবঙ্গে CPIM কর্মীদের এবং সমর্থকদের একটা বড় অংশের মধ্যে এই ‘রাম্বাম’ অংশটি গড়ে ওঠার পেছনে রয়েছে এই সুবিধাবাদেরই একটা বহিঃপ্রকাশ। ২০০৮ সালটা ছিল বিশ্ব রাজনীতির এবং অর্থনীতির সহসা পরিবর্তনের একটা সন্ধিক্ষণ। এই সময়ে পুঁজিবাদী বিশ্ব-অর্থনীতিতে যে ভয়ঙ্করতম সংকট আত্মপ্রকাশ করল তার ধাক্কায় গোটা পৃথিবীর রাজনীতি ক্রমশ দক্ষিণদিকে হেলতে থাকল। এবং ধীরে কিন্তু নিশ্চিত গতিতে নয়া ফ্যাসিবাদের দিকে এগোতে শুরু করল। সিপিআইএম পার্টির নেতাকর্মীদের ধারণা হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সিঙ্গুরের কারখানা হতে দেন নি আর ২০১১-তে বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পেছনে আছে একটা রামধনু জোট আর সাম্রাজ্যবাদীদের মদত। এর মত অগভীর আর ছেলে ভুলানো ব্যাখ্যা মার্কসবাদীদের মধ্যে সাধারণত দেখা যায় না। ২০০৮-এর মহামন্দা আর ২০১১-তে বামফ্রন্টের পরাজয়ের মধ্যে একটা যোগাযোগ আছে সেটা নিশ্চয়ই চিন্তাশীল কমিউনিষ্ট কর্মীরা উপলব্ধি করবেন। ২০০৬ সাল থেকে বামফ্রন্ট প্রচন্ড গতিতে পুঁজিবাদী বিকাশের ঠিক সেই রাস্তাই অনুসরণ করছিল যা ২০০৮ সালে মুখ থুবড়ে পড়ল বিশ্ব অর্থনীতির রঙ্গমঞ্চে। প্রকৃত প্রস্তাবে বামফ্রন্ট হেরে গেছিল ২০০৮ সালেই। ২০১১ সালে তার ঘোষণা হল মাত্র।
২০১১-তে তৃণমূল এল। এসেই বাম কর্মীদের ওপর নামিয়ে নিয়ে আসল তীব্র আক্রমণ। বহু গুরুত্বপূর্ণ নেতা কর্মী খুন হলেন, ঘরছাড়া হলেন বহু, পার্টি অফিস দখল করে নেওয়া হল। যারা রুখে দাঁড়াতে চেষ্টা করেছিলেন তাদের ওপর মামলার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হল। ৩৪ বছর সরকারে থাকার পর, সামনে পেছনে পুলিস নিয়ে মিছিল করতে আর সশস্ত্র গুন্ডাবাহিনীর সাহায্যে গ্রামে শহরে দাপট দেখাতে অভ্যস্ত বাম কর্মীদের সেই আক্রমণ ঠেকানোর কোনো ট্রেনিং ছিল না। সরকারে থাকাকালীন যারা দু পয়সা কামিয়েছিলেন তারা সম্পত্তি বাঁচাতে আর গুন্ডাবাহিনী তাদের জান বাঁচাতে দ্রুতই ভেগে গেছিল তৃণমূল শিবিরে। পার্টির প্রতি অনুগত বাম কর্মীরা ২০১৬-র নির্বাচন পর্যন্ত যুঝেছিলেন কিন্তু তারপর অনেকেই আর পেরে উঠলেন না। তৃণমূলের হাতে মার খেয়ে এরা বিজেপির দিকে সরতে শুরু করলেন। জেলা নেতারাও গ্রামে কিংবা শহরে এদের রক্ষা করতে সমর্থ ছিলেন না। ফলে এই অংশটা বিজেপিতে সরে যাচ্ছে দেখেও তাদের ক্ষমতা ছিল না সেই স্রোত আটকানোর। বরং বহু ক্ষেত্রে তারা চেয়েছেন গ্রামে নগরে প্রতিরোধ করতে গিয়ে প্রাণ যাওয়ার চাইতে আপাতত বিজেপি বাড়ুক। ততদিনে মোদি কেন্দ্রের ক্ষমতায় চলে এসেছে। বিজেপি তখন এলেবেলে নয়, তারা হয়ে উঠেছে কেন্দ্রের শাসক পার্টি।
২০১১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত তৃণমূলের শাসনটা ছিল ২০০৬-এর বামফ্রন্টের নয়া উদারবাদ থেকে ২০২৬-এর বিজেপির নয়া ফ্যাসিবাদে যাবার পথে একটা ট্রানজিসন্ —- একটা অতিক্রমণমূলক পর্যায়। এই পর্যায় দীর্ঘস্থায়ী হতে পারত না। কিন্তু এটিকে দীর্ঘস্থায়ী করারই চেষ্টা চালাচ্ছিল বিজেপি বিরোধী উদারবাদীরা এবং দিশাহীন বামপন্থীরা, যদিও তারা জানত না এই ক্ষণস্থায়ী অতিক্রমণমূলক পর্যায়টি পার করে ঠিক কোথায় তারা পৌঁছতে চায়। এটি ছিল এই রাজনীতির সীমাবদ্ধতা এবং বন্ধ্যাত্ব। অন্য একটি সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল প্রতিক্রিয়ার সর্বাপেক্ষা লুম্পেন অংশটির মধ্যে থেকে, নয়া ফ্যাসিবাদের দিকে তাদের মনভোলানো সুমিষ্ট আহবানের মধ্যে যা ভাষা পেয়েছিল। আর একটি সম্ভাবনা হতে পারত একেবারেই অন্যরকম, জনগণের অর্থনীতি ভিত্তিক বাম ও গণতান্ত্রিক এক রাজনীতি এবং সমাজনীতির নির্মাণ। খেটে খাওয়া মানুষের প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র এবং সমবায় ভিত্তিক গণ-উদ্যোগ যার ভিত্তি। সমস্যা ছিল এই পথে আগে কেউ হাঁটে নি। এই পথ ও ভাবনা হতে পারত নতুন এবং uncharted, যা লেখাজোখা ছিল না কোনো পুঁথিতে। কিন্তু যার বহু উপাদান পাওয়া সম্ভব ছিল পশ্চিমবঙ্গের বাম শাসনের প্রথম পনের বছরের ইতিহাস থেকে, কেরালা আর ত্রিপুরার বাম শাসনের কিছু পলিসি থেকে, দক্ষিণ আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলির অনেকগুলি পদক্ষেপ থেকে, আমাদের দেশের শ্রমিক আন্দোলনের, কৃষক আন্দোলনের, আদিবাসী ও দলিত আন্দোলনের, এবং লিঙ্গ ও পরিবেশ আন্দোলনের দাবিসনদ থেকে। আর পাওয়া যেত একটা মর্যাদাসম্পন্ন জীবন সম্পর্কে সচেতন মেহনতী মানুষের এবং চিন্তাশীল কমিউনিষ্ট কর্মীদের কল্পনা আর স্বপ্ন থেকে।
কিন্তু এতটা ভেবে দেখতে, সাহস দেখাতে, ঝুঁকি নিতে রাজি ছিল না কেউই। প্রতিটি বামপন্থী পার্টি কোনো না কোনো চলতি রাস্তাতেই হাঁটার চেষ্টা করেছিল। পরিস্থিতি যখন দাবি করছে নতুন ভাবনা, নতুন কর্মপদ্ধতি তখনও পুরনো পথে চলা এবং ভাবার জাড্যও আসলে সুবিধাবাদ। লেনিন বর্ণিত অপেক্ষাকৃত শান্তির সময়ে যে নিশ্চিন্ততার প্রস্তর-প্রাসাদ গড়ে ওঠে ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সময়ে তা ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে না পারা যেমন সুবিধাবাদ, তেমনই চালু ভাবনাচিন্তাও একপ্রকার তত্ত্বনির্মিত সুখী গৃহকোণ তৈরি করে যেখান থেকে প্রয়োজনের সময়ে বেরিয়ে আসতে না পারা একপ্রকার সুবিধাবাদ। ২০১১ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পার্টি নির্বিশেষে পশ্চিমবঙ্গের কমিউনিষ্ট আন্দোলন এই সুবিধাবাদের মধ্যেই ছিল। নিজস্ব বিকল্প গঠনের চেষ্টা হাতে না নিয়ে কেউ চেয়েছে তৃণমূলের আক্রমণের সামনে বিজেপিকে দিয়ে ঢাল তৈরি করতে, আর কেউ চেয়েছে বিজেপিকে আটকাতে তৃণমূলকে ঢাল করতে। সব ধরণের বামপন্থীরাই নিজেদের প্রকৃত দায়িত্ব অস্বীকার করেছিল —- এই সত্য যদি আজ উপলব্ধি করতে না পারি তাহলে কখনই আমরা ঘুরে দাঁড়াতে পারব না।
২০২৪ সাল থেকে CPIM নেতৃত্ব এই ‘রাম্বাম’ অংশের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচেষ্টা শুরু করেন এবং বিজেপিতে চলে যাওয়া বাম ভোটকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রচারে সেই একই পুরনো পথের কথা, সেই একই ‘শিল্পায়ন’, সেই একই চর্বিত চর্বন —- যা বাঙলার জনগণকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম ছিল না। বর্তমান পরিস্থিতিটার সঠিক বাম ট্রানজিশান কী হতে পারে সেই ভাবনাটা খুব একটা গুরুত্ব পায় নি তাদের কাছে। অথচ এটাই ছিল বামেদের সামনে এগোনোর মূল চাবিকাঠি। নইলে কে না জানে যে, বিগত বছরগুলিতে যতগুলি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে তার সবেতেই বামেদের উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। কিন্তু তাতে করেই সব হয় না। যাই হোক, আমরা চেয়েছিলাম যতই যাই হোক বামেদের ভোট যাতে বাড়ে তার জন্য প্রচার করতে। সেই মর্মে কয়েকটি সংগঠন এবং ব্যক্তিবর্গ মিলে একটি মঞ্চ তৈরি করে বামপন্থী প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার করেছিলাম। ISF কে সমর্থন আমাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয় নি। আমরা শুধু বাম প্রার্থীদের জন্যই প্রচার করেছিলাম। আমাদের আশা ছিল বামেদের ভোট এবারে কিছুটা বাড়বে। তৃণমূলের প্রতি বিরাট সংখ্যক মানুষের প্রবল ক্ষোভ আমরা টের পাচ্ছিলাম। তার সাথে SIR-এ নব্বুই লক্ষ মানুষের নাম পরিকল্পনা মাফিক বাদ দেওয়া এবং তীব্র সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ মিলিয়ে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। আশা ছিল একমাত্র বাম ভোট বাড়লে তবেই বিজেপিকে আটকানো যাবে। কিন্তু এতদিনে ‘রাম্বাম’রা অনেক বেশি সংহত হয়ে গেছে এবং তারাও এবারে রক্তের গন্ধ পেয়ে গেছিল। এই অংশ পরিষ্কার সাবোটাজ করেছে, তারা তাদের নিজেদের প্রার্থীকেও ভোট দেয় নি। অনেকগুলি কেন্দ্রের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে তা পরিষ্কারভাবে ধরা পড়ে। শূন্যের খরা কাটলেও সামগ্রিকভাবে বামেদের ভোট বাড়ে নি, বরং সামান্য হলেও আরও কিছুটা কমে গেছে। ফলে বিজেপি প্রথমবার রাজ্যের ক্ষমতায় আসীন হয়েছে।
এখন সময় নতুন পথ খোঁজার। নতুনভাবে পথ চলার।
উপসংহার
এখন প্রশ্ন দাঁড়াল, তাহলে কী করতে হবে। আগের পাঁচটি পর্বে যে পর্যালোচনা করতে শুরু করেছিলাম তার মধ্যেই বলা আছে যে, কী করতে হবে। তবু উপসংহারে এসে কয়েকটি কথাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে নেওয়া জরুরী।
প্রথমত, একটা কথা আমাদের স্পষ্ট বুঝে নেওয়া প্রয়োজন যে, রাজ্যের ক্ষমতায় বিজেপির উত্থান বামপন্থী এবং গণতান্ত্রিক শক্তির কাছে একটা দুঃসময়। রাজ্যের বিপুল মেহনতী মানুষ এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘু তথা দলিতদের ওপর, প্রান্তিক মানুষদের ওপর, নিপীড়িত লিঙ্গের মানুষের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন নামিয়ে নিয়ে আসবে এই সরকার। ফ্যাসিবাদ মানেই হল জঙ্গী প্রতিবিপ্লব। সুতরাং, এক কঠোর এবং নির্মম সংগ্রামের মধ্যে আমরা চাওয়া না-চাওয়া নির্বিচারে ঢুকে পড়েছি। ‘ফুল খেলবার’ দিন আর নেই, এটা বুঝতে হবে। কিন্তু হতাশা, ডিপ্রেশন, অবসাদ বা নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকার বিলাসিতা আমাদের নেই। প্রতিটি কালো মেঘেরই যেমন রূপালী রেখা থাকে তেমনি ভারতে ব্রাহ্মণ্যবাদী গৈরিক ফ্যাসিবাদের উত্থানেরও একটা রূপালী রেখা আছে। খুব গাঢ় অন্ধকার মানেই হল উষার আগমনী বার্তা বাজতে খুব দেরি নেই। এটি কথার কথা নয়, ফাঁকা কথাও নয়। ভালো করে খেয়াল করে দেখুন, ভারতে আরএসএস বিজেপির উত্থান কিন্তু কমিউনিষ্ট স্বপ্নকেও উস্কে দিয়ে গেছে। এখন কেউই আর বলতে পারবে না যে, সমাজতন্ত্র বা সমানতা ভিত্তিক একটি সমাজ একটা কল্পনামাত্র —- তা কখনই বাস্তবে হতে পারে না। সারা দুনিয়া চোখের সামনে দেখছে কল্পনা বাস্তব হয়ে ওঠে, আলবত হয়।
মনে করে দেখুন, একটা সময় ছিল যখন রাম মন্দির প্রতিষ্ঠার কথা বললে লোকে হাসাহাসি করত। ভারতে একদিন হিন্দুরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হবে —- বললে লোকে পাগল ভাবত। কিন্তু এখন এসবই ঘোরতর বাস্তব। আজকের গৈরিক ফ্যাসিবাদীদের গুরু সাভারকার যখন মারা যাচ্ছেন তখন RSS একটি ধিকৃত শক্তি। চরম হতাশার মধ্যে সাভারকারের জীবন শেষ হচ্ছে। সেই সময়ে কেউ কল্পনাও করতে পারত না, একদিন সাভারকারের শিষ্যরাই দেশের একচ্ছত্র শাসকে পরিণত হবে। আর সাভারকারদের দীর্ঘদিনের লালায়িত হিন্দুরাষ্ট্রের স্বপ্ন এবং কল্পনা ভারতের মত দেশে সত্যি হয়ে দেখা দেবে।
এই অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলাটা এমনি এমনি হয় নি। এর পেছনে আছে হার না-মানা এক অনবদ্য জেদ। অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশেও নিজেদের স্বপ্নকে গোপনে হৃদয়ের গভীরে লালন করতে পারার এক অসাধারণ কমিটমেন্ট। প্রতিদিন একটু একটু করে কাজ করে যাওয়া। একটা বড় কাজকে অসংখ্য ছোট ছোট কাজের মধ্যে দিয়ে রূপদান করার এক অদ্ভুত সৃজনশীলতা। এসবই আমাদের নতুন করে শেখার আছে আমাদের সবথেকে দৃঢ়চিত্ত শত্রুর কাছ থেকেই। এই গুণগুলি কমিউনিষ্টদের কাছে বিজাতীয় নয়। বরং উল্টোটাই সত্যি। একদিন এই গুণগুলিই অন্যেরা শিখেছে আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে থেকে। অপেক্ষাকৃত অনুকূল পরিস্থিতিতে আমরা ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের সহজাত এই বৈশিষ্ট্যগুলি, যা ফ্যাসিবাদীরা ধরে রেখেছিল তাদের নিজেদের মত করে। এই কারণেই আজ ওরা সফল। আজ আমরাও যদি আমাদের এই হারিয়ে যাওয়া গুণগুলি পুনরুদ্ধার করতে পারি তাহলে একদিন আমরাও পারব আমাদের কল্পনা, স্বপ্ন এবং ইউটোপীয়াকে বাস্তবে রূপদান করতে। কমিউনিষ্ট আন্দোলন আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের মধ্যে আদান-প্রদান এবং সংযোগ বাড়াতে হবে। এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের মধ্যেকার বিতর্কগুলিকে ভুলে যেতে হবে, ছেড়ে দিতে হবে। কারণ এই তর্কগুলি ছাড়া খোদ আন্দোলনটাই উন্নত হতে পারবে না। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, বামপন্থীরা পরষ্পরকে শত্রু জ্ঞান করে আর চলতে পারবে। পশ্চিমবঙ্গে যে বাম ইকোসিস্টেম এখনও বেঁচে আছে তাকে রক্ষা করতে হবে। কেউ যদি মনে করে যে ঐ ইকোসিস্টেমটা ছাড়াই আমি একাই আমার পার্টির বিকাশ ঘটিয়ে ফেলব তাহলে আমি তাকে সিংহাসনে বসিয়ে পুজো করতে রাজি আছি এবং সে যদি এটা করে দেখাতে পারে তাহলে তাকে আমি বিশ্বগুরু মানতেও রাজি আছি। ফ্যাসিবিরোধী রাজনীতিতে বামপন্থীদের ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি একান্তভাবেই আজ প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, কমিউনিষ্ট পার্টিগুলিকে এটা বুঝতে হবে যে, মার্কসীয় আন্দোলন কোনো ধর্মীয় আন্দোলন নয়। গতকাল যা বলেছি, যা করেছি তা আজকেও করার আগে পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা জরুরী। এক ভুল বারবার করা চলবে না। ভুল শোধরাতে হবে, সময়ের সাথে নিজেদের পাল্টাতেও হবে। লক্ষ্য স্থির থাকবে। কিন্তু পথ ও পদ্ধতি নির্দিষ্ট পরিস্থিতির নির্দিষ্ট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ক্রমাগত পাল্টাবে —- এই চিরায়ত সত্যে ফিরতে হবে।
চতুর্থত, কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে শ্রমিক কৃষক মেহনতী, দলিত, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি হয়ে উঠতে হবে। লিঙ্গসাম্যের লড়াই, নারীমুক্তির লড়াই, পরিবেশ ও প্রকৃতি বাঁচানোর লড়াইকে কেন্দ্রীয় গুরুত্ব দিতে হবে। দেশকে বুঝতে হবে, কমিউনিষ্ট আন্দোলনকে দেশের জল হাওয়া থেকে উঠে আসা আন্দোলনে পরিণত করতে হবে।
শেষ কথায় এবং মোদ্দা কথায়, Intellectual Bankruptcy নিয়ে সফল কমিউনিষ্ট আন্দোলন আর করা যাবে না। সে দিন চলে গেছে।
আগের পর্বের সূত্র ঃ
অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির করুণ পরিণতি (চতুর্থ ভাগ)