‘কীভাবে মারবি?’ আমি গজালকে শুধোই। ও যখন ঠিক করেই ফেলেছে মারবে, তখন আমি বুঝে গেছি, লোকটার আয়ু লম্বা নয়। গজাল যা বলে তার নড়চড় হয়না। ভয়ানক জিদ্দি।
‘দেখি!’ ধুলোর ওপর কাঠি দিয়ে ইঁকিড়মিকিড় কাটতে কাটতে বলে গজাল। ‘ছুরিও হতে পারে, গুলিও হতে পারে।‘
‘গুলি মানে বন্দুক?’
‘না তো কি গুলি খেলার গুলি?’
‘পাবি কোথায়?’
‘মদনদার কাছে।‘
‘তোরে দেবে কেন?’
‘এমনি চাইলে দেবে না। যন্তর কোমরে গোঁজা থাকে, দেখেছিস? যে রাতে লতিকামাসির ঘরে নেশা করে ঘুমোবে, সরিয়ে ফেলব।‘
আমার বুক ঢিবঢিব করে ওঠে। মদনদা নামকরা মস্তান। গত ইলেকশনে লাইনে পরপর পেটো ঝেড়েছিল। একটা ভোটবাবুর কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যেতে সেকি চিল্লামিল্লি! জেল থেকে খালাস হয়ে এসেছে মাস দুয়েক। রোয়াবি যেন আরো বেড়ে গেছে তারপর।
‘ধরা পড়লে?’
‘ধুর বাল, ধরা পড়ব কেন? আমাদের ঘরের জানলার পাল্লাটা বন্ধ হয়না। আর তক্তপোষটাও এদিক ঘেঁষেই। এক্কেরে মাথা টিপ করে ঠুকে দেব। টুঁ করার সময় পাবে না। তারপর মুছে টুছে ফের মদনদার পাশে রেখে দিয়ে আসব। ধরা পড়লে ওই পড়বে, আমি না।‘
‘লতিকামাসিকে কীকরে পটাবি?’
‘মদনদা ওকে ঠিকঠাক পেমেন্ট দেয় না। ও ফের জেলে গেলে মাসি খুশিই হবে।‘
ঠোঁট চাটি। মানুষ মারা এত সোজা? আমি তো শালা একটা মুরগি আজ অবধি কাটতে পারিনি। হাত পা এমন জানি এলিয়ে যায়, ওদের কোঁকোঁ আর ডানা ঝাপটানোয়।
‘বলছি, না মেরে আর কিছু করা যায় না?’
‘আর কিছু মানে?’
‘মানে ভয় টয় দেখিয়ে পাড়া ছাড়া করলে?’
হাতের কাঠিটা দূরে ছুঁড়ে দেয় গজাল, ‘হবে না। মা ওকে রেজিস্টারি করে ফেলেছে।‘
গজালের মা রেজিস্টারি করেছে! হতভম্ব হয়ে যাই পুরো। মায়েরা আবার রেজিস্টারি করে নাকি? আট নম্বর বস্তীর মিল্টুদা হালদার বাড়ির সুপর্ণাকে নিয়ে পালিয়ে গেসল, ফেরার সময় হালদারখুড়ো ওদের বাড়ির মাকালীর খাঁড়া তুলে ‘মেরে ফেলব কেটে ফেলব’ বলে চেল্লাচ্ছিল। তখন সুপর্ণা খুব ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল ‘আমাদের রেজিস্টারি হয়ে গেছে’। জোঁকের মুখে নুন পড়ার মতো গুটিয়ে গেছিল হালদারখুড়ো। যবে থেকে আমার ঠোঁটের ওপরে হাল্কা লোম গজিয়েছে, তবে থেকে জানি ইয়ং ছেলেমেয়েরা প্রেম করে আর পালিয়ে রেজিস্টারি বিয়ে করে। গজালের মায়ের আবার রেজিস্টারি হলো কীকরে! তাও আবার এই লোকটার সাথে! গজালের মা পাঁচ বাড়ি ঠিকেঝিয়ের কাজ করে, গায়ের রং আমাদের সকলের চেয়ে পোস্কার, হাসলে আলিয়া ভাটের মত গালে টোল পড়ে। কিন্তু সে তো গজালের মা হয়! শুধু গজাল কেন, ওর ভাই বেণু আর বোন হাস্নুর-ও মা হয়। ওদের বাপ-কে অবশ্য আমি কোনোকালে দেখিনি। জিগ্যেস করলে গজাল বলেছিল, ‘কে জানে, মরে গেছে বোধহয়! আপদ গেছে, সবাইকে পেটাতো।‘
এই লোকটাকে দেখছি বছর খানেক হলো। শুনেছিলাম গজালের মায়ের দূরসম্পর্কের ভাই হয়। প্রথমদিকে গজাল মামা বলে ডাকতোও। তারপর যত বেশি লোকটা ওদের ঘরের সাথে জড়িয়ে যেতে লাগল, তত গজালের মুখ গম্ভীর হতে শুরু করল। অথচ, সিড়িঙ্গে লোকটাকে আমার নেহাত খারাপ লাগত না। দিব্যি বাজার করে দিচ্ছে, হাস্নুকে সাইকেলে চাপিয়ে ইস্কুলে ছেড়ে আসছে, এমনকি রাতে গজালের মাকে তরকারি কেটে দিতেও দেখেছি।
আমাদের বস্তীতে কে কার সাথে থাকলো আর কে কাকে নিয়ে ভেগে গেল, এসব নিয়ে কেউ তত মাথা ঘামায় না। দুবেলা খাওয়া জুটলেই হল। বড়জোর কলতলায় দুদিন মেয়ে-বৌরা একটু গাটেপাটেপি, হাসাহাসি করে। গজালের মায়ের ক্ষেত্রে তো সেটাও হয়নি। সবাই বলেছিল, খুব ভালো হয়েছে, সোমথ্থ মেয়েটার একটা ভরসা জুটেছে। অবশ্য কে কার ভরসা, কে জানে! গজালের মায়ের গায়ে হেব্বি জোর, একবার কোন কাজের বাড়ির বুড়ো জড়িয়ে ধরেছিল, তাকে নাকি এমন পিটিয়েছিল মালটা এখনো খুঁড়িয়ে হাঁটে। এ গল্প আমি গজালের মুখে শুনেছি। কিছু বছর আগেও নিজের চোখে দেখেছি, কাজের বাড়ি থেকে বাতিল করা আস্ত তক্তপোষ মাথায় তুলে আনতে। গজালরা এখন ওতেই ঘুমোয়। আর রেজিস্টারি করা লোকটাকে দেখলে মনে হয় ফুঁ দিলে উড়ে চলে যাবে।
‘আসি’ বলে উঠে গেল গজাল।
দিনকতক টেনশনে কেটে গেল আমার। গজাল আমার অনেক দিনের বন্ধু। ওর মা রেজিস্টারি করেছে শুনলে আমি কি আর স্বস্তিতে থাকতে পারি? একদিন গ্যারেজের বাবলাকে জিগ্যেস করলাম, ‘হ্যাঁরে, বলতে পারিস, কারো মা ফের রেজিস্টারি করলে তার কী হয়?’
বাবলা কিছুই বুঝতে না পেরে আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে। ‘কিসের রেজিস্টারি? জমিজায়গার?’
‘আরে না, রেজিস্টারি বিয়ে।‘
গুটি রেঞ্চ হাত থেকে ফেলে খ্যাঁকখ্যাঁক করে হেসে ওঠে বাবলা, ‘কী আবার হবে? একখান লতুন বাপ হয় রে, লতুন বাপ!’
‘আহ, সে তো জানি। বলি, তাতে অসুবিধা কী হয় বলতে পারিস?’
আমার মুখ দেখে একটু অবাক হয় বাবলা। হাসি থামিয়ে ফেলে চটপট। ‘অসুবিধে? তা হতে পারে বৈকি! মায়ের জমিজিরেত, ঘরবেসাতি থাকলে তাকে না দিয়ে লতুন লাগরকে লিখে দিতে পারে। তাছাড়া ফের যদি বাচ্চা বিয়োয়, তারেও সব দিয়ে দিতে পারে। সৎ বাপটা শয়তান হলে আগের পক্ষের ছেলেমেয়েগুলানরে উদুম ক্যালাতে পারে। এ সবই অসুবিধে। তা, কার মা রেজিস্টারি করছে শুনি? তোর?’
শেষের প্রশ্নটা গলা নামিয়ে করলেও ঝাঁট জ্বলে যায় আমার। এটুকু শুনেই এমন হচ্ছে, তাহলে সত্যি সত্যি রেজিস্টারি হয়ে যাওয়ায় গজালের মেজাজ কতটা খারাপ হতে পারে, টের পাই। না, লিখে দেবার মতো বিষয়সম্পত্তি কিছু নেই গজালের মায়ের। আমরা সবাই বস্তীর ঘরে ভাড়া থাকি, তাই মাঝেমাঝে বাকি পড়ে যায়। বাচ্চাও আর বিয়োবে না, হাস্নু জন্মাবার সময়েই অপারেশন করিয়ে নিয়েছে। আমি জানি, কারণ তিনটে ছেলেমেয়ে শুনে হাসপাতালের ডাক্তার বলেছিল, কাটিয়ে দিচ্ছি। আমি আর গজাল সামনেই ছিলাম তখন। বাকি রইল গিয়ে ক্যালানো। সিড়িঙ্গে লোকটা গজালকে ক্যালাবে ভেবেই হাসি পেয়ে যায় আমার।
দিন পনেরো এভাবেই কেটে যায়। ফের জেলে যায় মদনদা। গজালের বন্দুক সরিয়ে ফেলার আগেই। গুম হয়ে থাকে গজাল। লোকটা সকালবেলা বেরিয়ে যায়, রাত করে ফেরে। রোববারে হাস্নুকে অঙ্ক কষাতে বসায়। বেণুর সাইকেল ঘষেমেজে ঝকঝক করে দেয়। গজালের মা বসে রাঁধে, লোকটা পাশে মোবাইলে গান চালায়। গজালের মা কী একটা কথায় হেসে ওঠে, গালে আলিয়া ভাটের মতো টোল পড়ে। গজাল হিশহিশিয়ে বলে, ‘মালটার চায়ে ফলিডল ঢেলে দেব।‘
‘কোথায় পাবি?’
‘জোগাড় করব। বাজারের শাকওয়ালাকে বলে রেখেছি।‘
‘সন্দেহ করেনি?’
‘বলেছি, বাড়িতে খুব ইঁদুর হয়েছে, খাঁচায় পড়ছে না।‘
দেখতে দেখতে বর্ষা কেটে রোদ উঠতে শুরু করে। শাকওয়ালা বুড়ো উচ্ছেদ হয়ে যায় ফুটপাথ থেকে। ওখানে নাকি শপিংমল হবে। আর ফলিডল আনা হয়না। বস্তীর ঘরে জনগণনার লোক আসে, আমি তাদের পেছুপেছু গজালদের ঘর অব্দি গিয়ে কান খাড়া করে রাখি। গজালের মা বলে, ‘বাড়িতে আমরা পাঁচ জন, আমি, উনি, আর তিন ছেলেমেয়ে।‘ আমার বুক ধকপুক করে ওঠে। আমিও গজালের মতো ভীষণ রেগে যাই। মায়েদের কি রেজিস্টারি করতে আছে? ছিঃ! তারপর গ্যারেজের বিশ্বকর্মা পুজোয় লোকটা পাঁচশ টাকা চাঁদা দিয়ে বসে। চারদিকে ধন্যি ধন্যি পড়ে যায়। আমরা এক সারিতে বসে মাংসভাত খাই। আমি আঙুল চাটতে থাকি, লোকটা কাঠি দিয়ে খুঁচিয়ে নলির ভেতর থেকে জুস বার করার চেষ্টা করে, গজাল আগুনচোখে দেখে। সেদিকে তাকিয়ে আমি বিষম খাই, মনে হয় রফিকের চপারটা পেলে ও এখানেই লোকটাকে কিমা বানিয়ে ফেলবে।
দুর্গাপুজো যেতে না যেতেই আরেক ক্যাঁচাল। লোকটা কোথা থেকে একটা কাজের খবর এনেছে গজালের জন্য, সেই কেরালা না কোথায় চলে যেতে হবে, ত্রিশ হাজার টাকা মাসমাইনে, থাকা ফ্রি। আলিয়া ভাট, থুড়ি গজালের মায়ের সে কী উৎসাহ! গজাল আমাকে বলে, ‘এবার মালটাকে মেট্রো রেলের তিন নম্বর লাইনে ঠেলে দেব।‘
আমি শিউরে উঠি, ‘ধরা পড়ে যাবি যে!’
‘কেরালার থেকে জেলে থাকা ভালো!’
রাতের ঘুম ছুটে যায় আমার। ওদিকে পাড়াশুদ্ধ মানুষ লোকটাকে বাহবা দিতে শুরু করেছে, সৎ ছেলের জন্য কে আজকাল এত করে? সত্যি, লোকটা নিজেই তো চাকরিটা নিয়ে নিতে পারে, তাহলে আপদ বিদায় হয়। ওখানে লাইনঘরে থাকবে, ইডলি-চাটনি খাবে, মাসে মাসে টাকা পাঠাবে। আমি আর গজাল মাঝরাত অবধি শীতলাতলায় গোঁজ হয়ে বসে থাকি। আজকাল আমিও বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, সিড়িঙ্গে লোকটার ওই লাজুক হাসির পিছনে একটা হাড়হারামী লুকিয়ে আছে। ইশ, কেন যে গজালের মা রেজিস্টারি করতে গেল! এমনি আসত, খেত, শুতো, কেউ কিছু বলত না। অমন আকছার ঘটে আমাদের বস্তীতে। এমনকি, কেউ কেউ কালীমন্দিরে গিয়ে ডগডগে সিঁদুর, শাখা-পলা পরে চলে আসে, মাসের পর মাস ঘর করে, আবার তুলকালাম ঝগড়া হয়ে ছাড়াছাড়ি কাটাকাটিও করে ফেলে। ফের অন্য কারো সাথে থাকতে শুরু করে কয়েক মাস পর থেকে। তা না, রেজিস্টারি!
‘যেদিন নাইট ডিউটি থাকবে মালটার, সেদিন গলির মোড়ে পিছন থেকে গলায় গামছা জড়িয়ে টান দেব, বুঝলি!’ গজালের এবারের প্ল্যান।
‘লোকটা তো তোর থেকে প্রায় এক হাত লম্বা, নাগাল পাবি?’
গজাল আমার দিকে এমন হিংস্র ভাবে তাকালো, মনে হল, পারলে আমার গলাতেই হ্যাঁচকা টান বসায়! ঠিক হয়, সামনের হপ্তায় নাইট ডিউটি পড়লেই আমরা মালটাকে নিকেশ করব।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর ঘটে এক। দুদিন পরেই আচমকা মাঝরাতে দরজায় ধাক্কা। দরজা খুলতেই উস্কোখুস্কো গজাল ঝাঁপিয়ে পড়ে, ‘কাকা,কাকী শিগগির চলো, মা কেমন করছে!’ আমরা সবাই ছুটে যাই ওদের ঘরে। দেখি, বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কাটা ছাগলের মত ছটফট করছে আলিয়া ভাট, থুড়ি গজালের মা। বেণু-হাস্নু হতভম্বের মতো ঘরের কোণে দাঁড়িয়ে। আমার মা চটপট গজালের মায়ের মাথা কোলে তুলে নেয়, ‘কীরে বউ, কোথায় কষ্ট হচ্ছে?’ তলপেটের দিকে ইশারা করে ওর মা। আমার মা অনেক দিন ধরে আয়ামাসীর কাজ করছে, প্রচুর বুদ্ধি, রোগী ঘেঁটে অভ্যস্ত। গজালকে বলে, ‘শিগগির তোর বাপরে ডাক দে, হাসপাতাল নিতে হবে।‘ আমরা কেউ ইয়ার্কি মেরে লোকটাকে বাপ বললে গজাল খিস্তি দিয়ে শেষ করত, আর এখন চুপচাপ ফোন বার করে। বস্তীর সবাই মিলে সাইকেল ভ্যান ঠিক করতে না করতেই চলে আসে লোকটা। ওই সিড়িঙ্গে, কিন্তু পাঁজাকোলা করে গজালের মাকে তুলে দেয় ভ্যানে। আমরা সবাই যে যেমন ভাবে পারি ছুটতে থাকি হাসপাতালের দিকে। কপাল ভালো, অত রাতেও ডাক্তার জেগে ছিল। একবার নাড়ি ধরেই এমার্জেন্সিতে ভর্তি নিতে বলল। ততক্ষণে গজালের মা প্রায় নেতিয়ে পড়েছে, শ্বাস নিচ্ছে কিনা তাও বুঝতে পারছি না। আমার মা ছাড়া আর কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেয়নি। লোকটা পায়চারি করছে আর একটার পর একটা বিড়ি ধরাচ্ছে। আমি গজালের পাশে বসে ওর পিঠে হাত রাখি। গরম নেই, তবু ঘেমে ভিজে গেছে জামাটা।
একটু পরে মায়ের সাথে বেরিয়ে আসে একজন সাদা জামা পরা নার্সদিদি। ‘শুক্লা হাজারির বাড়ির লোক কে আছে?’ একসাথে গজাল আর লোকটা ছুটে যায়। গজালের মায়ের নাম এই প্রথম শুনলাম আমি। ‘এখুনি অপারেশন করতে হবে। ভাগ্যিস তাড়াতাড়ি এনেছিলেন, আরেকটু দেরি হলেই চাপ ছিল। এই তো অনেক দলবল দেখছি। সবাই বাইরে অপেক্ষা করুন, রক্ত লাগতে পারে। তখন চম্পট দেবেন না যেন। কাগজে সই করতে হবে কয়েকটা। আত্মীয় কে আছেন এখানে?’
কাঁপা কাঁপা হাতে লোকটা কাগজ আর পেনটা ধরে। আমি অবাক হয়ে দেখি, গজাল চুপ। ‘কে হন আপনার?’
‘আমার ইস্ত্রি!’
তাও গজাল বোবা। লোকটা বিনা বাধায় সই করে কাগজটা নার্স্দিদির দিকে এগিয়ে যায়। ভ্রু কুঁচকে নার্স বলে ওঠে, ‘শুক্লা হাজারির বর মাহফুজ আলম? ঠিকঠাক বলছেন তো নাকি? পরে কোনো গোলমাল হবে নাতো? আপনি বরং বাড়ি থেকে ওনার আধার কার্ড নিয়ে আসুন। এসব প্যাঁচালে হাসপাতাল নেই বাপু। আমরা ততক্ষণ অপেক্ষা করছ নাহয়।‘
আচমকা এক ধাক্কায় লোকটাকে সরিয়ে নার্সদিদির সামনে চলে যায় গজাল। ‘আপনার কী সমস্যা বলুন তো? নামে? এই যে, আমি শুক্লা হাজারির ছেলে। আর উনি মাফুজ আলম, ওনার বর। রেজিস্টারি করা বর। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড সব নিয়ে এসে জমা দিয়ে যাব। এখন আগে কাটাছেঁড়া চালু করুন শিগগির। বললেন তো দেরি হলে বিপদ আছে। অত সন্দ হয় তো রেজিস্টারির কাগজ মুখের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে যাব। যদিও ওসব দেখা আপনার কাজ নয়। আপনার যেটা কাজ সেটা আগে শুরু করুন। গোলমাল কিছু হলে পুরো বস্তী এসে তোড়ফাড় করে দিয়ে যাবে কিন্তু।‘
অপারেশনের ঘরের লাল আলোটা এখনো জ্বলছে। আমাদের মহল্লার লোকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি আর গজাল গাছের নীচে বেদীটায়। লোকটাও বসে আছে খানিক দূরে। আমি গজালের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিশফিশ করে বলি,’এদিকপানে কেউ দেখছে না। একটা থান ইট তুলে মারবি নাকি মাথায়?’ এত টেনশনের মধ্যেও ফিক করে হেসে ফেলে গজাল। আকাশ আস্তে আস্তে পরিস্কার হয়ে যাচ্ছে।