পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

পরিবেশ দিবসে গাছগাছালি নিয়ে কিছু সাদামাটা কথা

  • 05 June, 2022
  • 0 Comment(s)
  • 638 view(s)
  • লিখেছেন : মিলন দত্ত
ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগটা জুড়ে প্রায়-উষ্ণমণ্ডলীয় যে সুখা অরণ্যে রয়েছে, সেখানে যে ফি বছর শীতের শেষে বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে মরা ডালে ডালে নবীন পাতার সমারোহ আর লালের উদ্ভাস নিয়ে একটা বিরাট ঘটনা ঘটে যায়, সেটাও বন দফতরের তেমন ভাবে দেখা হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে তেমন‌ কোনও কাজও হয়নি। আজ পরিবেশ দিবসে এই কথাগুলো কি আরও একবার ভেবে দেখা উচিৎ নয়?

এ বিশ্ব মানুষের বাসযোগ্য করে রাখতে গাছগাছালি যে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় তা একবাক্যে সবাই স্বীকার করেন। তারপরেও কিন্তু বৃক্ষ নিধন বন্ধ হয় না। যে গাছপালা আমরা সবাই এত ভালবাসি তাদের রক্ষা করব কীভাবে? সেই গাছ আমরা রক্ষা করতে পারছি নাই বা কেন?

এই কঠিন প্রশ্নের একটা সহজ উত্তর আছে। সেটাও আমাদের সবার জানা। তা হল, মানুষের লোভ। মানুষের লাগামছাড়া লোভ এবং উচ্চাশাই তার প্রিয় বাসভূমিকে সর্বনাশের শেষ সীমায় এনে দাঁড় করিয়েছে। এত দিনে এটাও বোঝা গেছে যে, এর থেকে মুক্তি নেই। এই গ্রহের টিকে থাকার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদন গাছ প্রতিদিন কমে আসছে। এমন নয় যে তার স্বাভাবিক বিনাস ঘটছে। মানুষই তার আর্থিক এবং বৈষয়িক লাভের জন্য গাছ কেটে শেষ করে দিচ্ছে। প্রতিদিন অরণ্য বিলুপ্ত হচ্ছে। একটা হিসেব দিলে ছবিটা পরিষ্কার হবে। ১৯৩০ ভারতে অরণ্যভূমি (Forest Cover) ছিল ২৬.৪ শতাংশ অর্থাৎ ৮৬৯০১২ বর্গ কিলোমিটার। ২০১৩ সালে ভারতের অরণ্য আচ্ছাদন কমে দাঁড়ায় ১৯.০ শতাংশে অর্থাৎ ৬২৫৫৬৫ বর্গ কিলোমিটারে। এবং অরণ্য ধ্বংস যে জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে সে তথ্যও আজ আর কারও অজানা নয়। জলবায়ু পরিবর্তন রোধে যে আন্তসরকারি প্যানেল তৈরি হয়েছে, তাদের হিসেব বলছে, কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসরণের প্রায় ৯০ শতাংশ ঘটছে অরণ্য ধ্বংস এবং জমির চরিত্র বদলের কারণে। এর বেশিরভাগটাই ঘটছে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষির সম্প্রসারণের জন্য। ভারতে অরণ্য আচ্ছাদন বা ফরেস্ট কভার বিষয়ে ২০১৫ সালে একটি গবেষণা পত্র জানাচ্ছে, গত আট দশকে ভারত ২৪৩৪৪৭ বর্গ কিলোমিটার (২৮ শতাংশ) অরণ্য হারিয়েছে। ফরেস্ট সার্ভে অব ইন্ডিয়া (এফএসআই)-র ২০১৫ সালের রিপোর্ট জানাচ্ছে, ভারতে অরণ্যভূমির পরিমাণ ১৯৮৭ সালের ৬৪০৮১৯ বর্গ কিলোমিটার থেকে বেড়ে হয়েছে ৭০১৬৭৩ বর্গ কিলোমিটার। এফএসআই-এর রিপোর্টে অবশ্য অরণ্যের চরিত্র বিচার করা হয়নি। কোথাও এক হেক্টর জমির ১০ শতাংশে গাছ থাকলেই তাকে জরিপের ন্যূনতম ইউনিট হিসেবে ধরা হয়েছে। আমাদের দেশে অরণ্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ নিয়ে ধন্দ্ব আজও কাটেনি। তবে মোটামুটি ভাবে এক হেক্টরের বেশি জায়গা জুড়ে দেশজ প্রজাতির ৫ মিটার উচ্চতার গাছপালার বনভূমি থাকলে তাকে অরণ্য বলা যাবে। বর্তমান জরিপে সেই শর্তটাও মানা হয়নি।

আমাদের দেশের অরণ্যে উদ্ভিদের প্রায় পুরোটাই ইতিমধ্যে জরিপ করা হয়েছে বা তার তথ্য সমূহ নথিভুক্ত হয়েছে। কিন্তু আমাদের গাছপালার সঙ্গে তার চারপাশের প্রাণীদের সম্পর্ক এবং তার বাস্তুতন্ত্র বিষয়ে আমরা এখনও অনেকটাই অন্ধকারে। এর জন্য আমাদের বন দফতরই দায়ী। কারণ অরণ্য এবং গাছপালা কীভাবে আছে, সে বিষয়ে আমাদের জানানো বা শেখানোর ন্যূনতম উদ্যোগও তাদের নেই। তাছাড়া অরণ্য নিয়ে যে কোনও রকম স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক গবেষণার ব্যাপারে তাঁদের বৈরীতা স্পষ্ট। এ অত্যন্ত লজ্জার।

ফলে ভারতীয় অরণ্যের বাস্তুতন্ত্র এবং বন্যপ্রাণী এবং বনবাসী মানুষের সঙ্গে তার আর্ম্তসম্পর্ক জানার অনেক কাজই আমরা শুরুই করতে পারিনি। ভারতীয় উপমহাদেশের বেশিরভাগটা জুড়ে প্রায়-উষ্ণমণ্ডলীয় যে সুখা অরণ্যে রয়েছে, সেখানে যে ফি বছর শীতের শেষে বসন্ত আসার সঙ্গে সঙ্গে মরা ডালে ডালে নবীন পাতার সমারোহ আর লালের উদ্ভাস নিয়ে একটা বিরাট ঘটনা ঘটে যায়, সেটাও বন দফতরের তেমন ভাবে দেখা হয়ে ওঠেনি। এ নিয়ে তেমন‌ কোনও কাজও হয়নি।

গাছ কেবল গাছ নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। গাছ আমাদের বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। কারণ বৃক্ষরাজি বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শুষে নিয়ে আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে। অরণ্যে কেবল গাছ থাকে না, থাকে জীববৈচিত্র্যের আশি শতাংশ উপাদান। গোটা বিশ্বে ত্রিশ কোটিরও বেশি মানুষ অরণ্য নির্ভর জীবনযাপন করে। গাছ তার ডালপাতা বিস্তার করে ছায়া দিয়ে ভূমির তাপকে প্রশমিত করে। গাছ বৃষ্টিপাতের সহায়ক। বড় কোনও অরণ্য আঞ্চলিক আবহাওয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। নদীর অববাহিকায় বড় গাছ যেমন ভূমিক্ষয় রোধ করে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে, তেমনই সে বড় ক্ষতির হাত থেকে বাঁচায় সেই এলাকাকে। গাছ কেবল ভূমিক্ষয়ই রোধ করে না, সে ভূজলেরও সংরক্ষণ করে। বনভূমি অনেকটা বিশালাকার স্পঞ্জের মতো। বর্ষার বাড়তি জল শুষে নিয়ে সে তার অগণিত শিকড় বাকড়ের মারফত মাটির নীচে জলস্তরে পৌঁছে দেয়। এই ভাবে বনভূমি আমাদের মাটির নীচের জলস্তরকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। ভূস্তরের মাটির দূষণ রোধেও বৃক্ষাদি বা অরণ্যের একটা বড় ভূমিকা আছে। অরণ্য যে বাতাসতে পরিশুদ্ধ করে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গাছ শব্দ দূষণও প্রতিহত করে। গাছ কেবল আমাদের আহারের সংস্থান করে না, সে আমাদের নানা রকমের ওষুধেরও প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ উপাদান যোগান দেয়। ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে পারে এমন আমাদের জানা ৭০ শতাংশ উদ্ভিদ বৃষ্টি অরণ্যে পাওয়া যায়। ‌আরও কত ভাবে যে গাছ আমাদের ঋণি করে রেখেছে তার হিসেবও করা সম্ভব নয়। সেই গাছ আমরা কারণে অকারণে কেটে ফেলি। গাছ যেন এখন মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।

স্টেশনে স্টেশনে টিনের ছাউনি করার জন্য দুর্মূল্য গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। রাস্তা চওড়া করার নামে কাটা পড়ছে হাজার হাজার গাছ। আমাদের বিশুদ্ধ বাতাসের উৎস যেমন বিলুপ্ত হচ্ছে, তেমনই আমাদের মাথার ওপর থেকে ছায়া যাচ্ছে সরে। তপ্ত দুপুরে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কোনও ছায়া থাকছে না পথিকের মাথার ওপর। আমাদের অতি প্রাচীন এবং অত্যন্ত পরিচিত যশোহর রোডের দুপাশ ছিল শিশু, শিরিষ, মেহগিনি, আম, জাম গাছে জমজমাট। সেই সব গাছের বেশিরভাগই কেটে ফেলা হয়েছে। এখন হাবড়া থেকে বনগাঁ সীমান্ত পর্যন্ত যশোহর রোড চওড়া করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। তার আগেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে পথের দুপাশে সব গাছ কেটে ফেলার। দশ থেকে পনেরো হাজার গাছ কাটা পড়বে। তার বেশিরভাগের বয়স একশো বছরের কাছাকাছি। কিছু দিন আগেই পানাগড়ে তিন হাজার, দুর্গাপুরে ১২৩০০, বরাকরে তিন হাজার গাছ কাটা পড়েছে সরকারি নির্দেশে। কয়েক বছর আগেই সরকারি উদ্যোগেই সামাজিক বনসৃজনে পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন থেকেছে এক নম্বরে। আর আজ উন্নয়নের নামে গাছ কেটে সাবাড় করে দিচ্ছে সরকারই।

পথের পাশে বট, অশ্বত্থ, শাল, তমাল, তাল গাছ ছিল কত! সে সব আর নেই। পথের পাশে এখন সোনাঝুড়ি আর ইউক্যালিপটাস গাছ। সে গাছ না দেয় ছায়া, না দেয় ফল। উলটে মাটির জল নিঃশেষ করে টেনে নিয়ে শুকনো করে দেয়। এমনকী পাখিদেরও আশ্রয় দিতে পারে না সে গাছ। আশোক, অর্জূন, কুচিলা গাছও প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। পথের পাসে প্রচুর ডুমুর গাছ দেখা যেত। তাদের আর দেখা মেলে না। জামরুল বা ফলসার মতো দেশি ফলের গাছ কোথায় গেল? কমে আসছে বকুল গাছও। পতিত জমির ঝোপঝাড় জঙ্গল সাফ করে নগরায়ন হচ্ছে। উন্নয়ন হচ্ছে। ফলে বাংলার নিজস্ব ভেষজ শতমুখী, সর্পগন্ধা, ঈশ্বরমূল, বাঘনখ, কুঁচ, হাতিশুঁড়, গুলঞ্চ, অনন্তমূল, অশ্বগন্ধা, বাসব, গাঁদাল, নাটাজিল প্রভৃতি গুল্মজাতীয় গাছ হারিয়ে যাচ্ছে। যেন এই সব দরকারি গাছপালা বাঁচিয়ে রেখে নগরায়ন সম্ভব নয়। প্রকৃতির সঙ্গে যেন নগরায়নের শত্রুতার সম্পর্ক। এমনকী গ্রামাঞ্চলেও পতিত জমি এবং চারণভূমি দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে। যে প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ খাল বিল পুকুর ডেবা থেকে দেশি মাছ লোপাট করে হাইব্রিড মাছে ভরিয়ে দিয়েছে, একই কারণে সে আগাছা সাফ করার নামে গুল্মজাতীয় দুর্মূল্য সব ভেষজ গাছপালা লোপাট করেছে। আর প্রায় খুঁজে পাওয়া যায় না করমচা, কামরাঙা, কদবেল, বাবলা, পোঁটা বাবলা, কদম গাছ। কয়েক দশক আগেও পুরুলিয়ায় বনভূমি বা অরণ্য আচ্ছাদন ছিল ৮৮ শতাংশ। এখন কমে দাঁড়িয়েছে দশ শতাংশে।

পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক এলাকার মাত্র ১৩.৩৮ শতাংশ অরণ্য আচ্ছাদিত। রাজ্য সরকারের হিসেব মতো রাজ্যে মোট নথিভুক্ত বনভুমি ১১,৮৭৯ বর্গকিলোমিটার। বেশিভাগটাই অবশ্য সুন্দরবন এবং উত্তরবঙ্গে ডুয়ার্সের বনভূমি। আর খানিকটা অরণ্য আছে পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে।

আজকের দুর্দমণীয় বিবেকহীন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শত্রু জল-জঙ্গল-গাছপালা-প্রকৃতি। উন্নয়নের বুলডোজারের নীচে তারা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

0 Comments

Post Comment