টোলের গুরুমশাই ছিলেন গঙ্গাদাস পণ্ডিত। পণ্ডিতমশাই নবদ্বীপের গঙ্গানগরে বাস করতেন। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু খুব দ্রুত এখানে সংস্কৃত শাস্ত্র ও ন্যায়শাস্ত্রে পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি তাঁর পণ্ডিতমশাইকে পরাজিত করেন। টোলের অন্যান্য ছাত্রদেরকেও মহাপ্রভু নিজে পড়াতেন। এইভাবে তিনি নবদ্বীপের এক বিখ্যাত সর্বশাস্ত্রজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। নবদ্বীপ ছিল উচ্চ শিক্ষার কেন্দ্রস্থল। নিমাই ছাত্রদের সঙ্গে শাস্ত্র বিষয়ক তর্ক করতেন। তিনি কাশ্মীরি পণ্ডিত কেশব কাশ্মীরিকে তর্কবিদ্যায় পরাজিত করেছিলেন। পরবর্তীকালে, মহাপ্রভু ঈশ্বর পুরীর কাছ থেকে মন্ত্রদীক্ষা নেন।
মহাপ্রভুর দোল পূর্ণিমায় আবির্ভাব। সেদিনটা ছিল চন্দ্রগ্রহণ। বসন্ত উৎসব বা দোলযাত্রা রাধা-কৃষ্ণের লীলাকেন্দ্রিক। এই দিনে রাধা-কৃষ্ণ রঙ খেলায় মেতে ছিলেন। আর দোলের পাঁচ দিন পর পঞ্চম-দোলের দিন সুখ-সৌভাগ্য ও ঐশ্বর্যের প্রতীক কদম্ব ফুল কানে দিয়ে কৃষ্ণ রাধিকা দোলযাত্রা সম্পন্ন করেন। বাংলায় ভক্তি আন্দোলনের প্রবর্তক গৌর হরি সব ভেদাভেদ ভুলে দোল উৎসবকে নতুন মাত্রা দিয়েছিলেন। যা গৌড়ীয় বৈষ্ণব ঐতিহ্যের সাথে মিশে বিশেষ রূপ ধারণ করে।
'পতিত হেরিয়া কাঁদে..'
লোকপ্রিয় সন্ন্যাসী কলিযুগে জীবকে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে উদ্ধার করতে এসেছিলেন। পৃথিবী আজ হিংসায় উন্মত্ত। সর্বত্রই সংঘাত। তিনি বলেছিলেন কলিযুগে নামসংকীর্তনে সমস্ত মলিনতার অবসান হবে। কীর্তনের কৃত্ অর্থ প্রসংশা। ভক্তি ও প্রেমেই জীবের পরম মুক্তি।
লোকপ্রিয় সন্ন্যাসী মন্মহাপ্রভু সর্বদা শ্রীকৃষ্ণের প্রেমভক্তি ও দিব্য ভাবে আচ্ছন্ন থাকতেন। তিনি বাংলায় মূলত রাধা-ভাব ও শ্রীকৃষ্ণের অবতার রূপকে সংকীর্তনের মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী দিব্য উন্মাদনায় অশ্রুপাত করতেন জীবের জন্যে। মগ্ন থাকতেন কৃষ্ণ প্রেমে। যখন তিনি নীলাচলে জগন্নাথ মন্দিরে গরুড় স্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে দারুব্রহ্ম জগন্নাথকে দর্শন করতেন, দূর থেকে তখন বিগ্রহের মধ্যে পরমেশ্বর শ্রীকৃষ্ণের দর্শন পেতেন। জগন্নাথের মধ্যে বাঁশরীধারী কৃষ্ণরূপ রয়েছে গোটা নীলাচলে প্রচার করেন। তাঁর অনুভূতিতে জগন্নাথ এবং কৃষ্ণ অভিন্ন। নীলাচলেই নদিয়াবিহারীর অন্তর্ধান হয়। তিনি শ্রীশ্রীজগন্নাথষ্টকম রচনা করে লিখেছিলেন,
"ভুজে সব্যে বেণুং শিরসি শিখিপিচ্ছং কটিতট
দুকূলং নেত্ৰান্তে সহচর-কটাক্ষং বিদধতে।
সদা শ্ৰীমদ্বৃন্দাবন বসতি লীলা পরিচয়ো
জগন্নাথঃ স্বামী নয়নপথগামী ভবতু মে।"
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী রচিত 'শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত' গ্রন্থে পাওয়া যায় মহাপ্রভুর রচিত 'শিক্ষাষ্টক'। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, "তৃণাদপি সুনীচেন তরোরিব সহিষ্ণুনা। অমানিনা মানদেন কীর্তনীয়ঃ সদা হরিঃ।।" অর্থাৎ যে তৃণর থেকেও তুচ্ছ ভাবতে হবে, বৃক্ষের চেয়েও সহিষ্ণু, যে অপরকে উপযুক্ত সম্মান দেয়, কিন্তু নিজে অন্যের কাছ থেকে সম্মান চায় না, সেই হরিনাম-কীর্তনের যথার্থ অধিকারী।
সর্বশাস্ত্রজ্ঞ ও সন্ন্যাসী মন্মহাপ্রভু কৃষ্ণের অবতার তত্ব স্বহস্তে লিখেছিলেন। যেখানে ছিল আটটি শ্লোক। যার নাম শ্রীকৃষ্ণাস্টক। সেই পাণ্ডুলিপিতে শ্রীকৃষ্ণের স্তুতিমূলক আটটি শ্লোক লেখা আছে। যাতে কৃষ্ণের ঐশ্বরিক রূপ, গুণ ও লীলার বর্ণনা রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, এই অষ্টক প্রতিদিন পাঠ করলে ভক্তিলাভ হয়। ক্রোধ ও অহংকার ত্যাগ হয়। শ্রীকৃষ্ণের দিব্য গুণগুলো এখানে লিপিবদ্ধ।
শ্রীকৃষ্ণাস্টকের শ্লোকগুলো বাংলায় অনুবাদ করলে অর্থ হয় যে, যিনি ব্রজমণ্ডলের ভূষণ, সমস্ত পাপের বিনাশকারী, ভক্তের চিত্তরঞ্জন, হাতে সুমধুর বেণু ধারণকারী, বহুবিধ নাম সেই শ্রীকৃষ্ণকে প্রণাম করি। হে জগদীশ! তোমাকে প্রণাম করি। জন্মে জন্মে যিনি গোবর্ধন ধারণ করেছিলেন সেই কৃষ্ণকে প্রণাম করি ইত্যাদি আটটি শ্লোক জপ করা হয়। মহাপ্রভু তখন শ্রীধামে ব্যাকরণ ও অলঙ্কার শাস্ত্রে অসাধারণ পাণ্ডিত্য অর্জন করে ফেলেছেন। ততদিনে মুকুন্দ পণ্ডিতের চণ্ডীমণ্ডপে নিজের একটি টোল খুলেছেন। জ্ঞানচর্চার একটি কেন্দ্র ছিল মুকুন্দ পণ্ডিতের চণ্ডীমণ্ডপটি। যা মহাপ্রভুর অন্যতম স্মৃতিবিজড়িত স্থল। এই চণ্ডীমণ্ডপটি যেখানে ছিল সেই স্থানটি গঙ্গার ভাঙনে তলিয়ে গেছে। সেখানেই তিনি নিয়মিত ব্যাকরণ পড়াতেন ছাত্রদের। মহাপ্রভুর হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত সুনিপুণ। গবেষকরা মনে করেন যা তাঁর শৈল্পিক দক্ষতার পরিচয় দেয়। তালপত্রে তাঁর হাতে লেখা শ্রীমদ্ভাগবতের পাণ্ডুলিপির নথি পাওয়া যায়। যা সাহিত্যের এক সম্পদ।
একসময় কৃষ্ণ প্রেমে মগ্ন হয়েই মহাপ্রভু ১৬শ শতাব্দীতে সংস্কৃততে রচনা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণাস্টক। নিজের হাতে লেখা এই অষ্টকের প্রতিলিপি পাওয়া যায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব তীর্থক্ষেত্র শ্রী ভগবতাচার্য রঘুনাথ উপাধ্যায়ের শ্রীপাটে। যা সাধারণত অত্যন্ত বিরল। এখানে তাঁর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটির প্রতিলিপিতে আটটি শ্লোক নিহিত। শোনা যায়, মহাপ্রভু নিজের রচিত পাণ্ডুলিপি নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। এক সহচর বলেছিলেন, নিমাই পণ্ডিতের এই লেখা সবাই পড়লে ধন্য ধন্য করবে। তাঁর লেখা আর কেউ পড়বে না। তাই মহাপ্রভুর পুঁথির সংখ্যা ইতিহাসে খুবই সীমিত। ভক্তি ধর্ম প্রচারের মাহাত্ম্য একসময় বাংলার পোড়ামাটি মন্দির স্থাপত্যেও ফুটে ওঠে। চৈতন্য যুগের পরবর্তীতে বিভিন্ন মন্দির স্থাপত্যের অলংকরণে কৃষ্ণলীলা, জগন্নাথ, শ্রীচৈতন্যের হরিনাম-কীর্তন, দশাবতারের মত বহু চিত্র পোড়ামাটির ফলকে ফুটিয়ে তোলা হতো। চৈতন্য দর্শন বাংলার ললিতকলাকে পরিপূর্ণ করেছে।
মহাপ্রভু প্রচারিত অচিন্ত্য ভেদ-অভেদ তত্ত্ব অত্যন্ত জনপ্রিয়। ঠিক তেমন আটটি শ্লোক বিশিষ্ট অষ্টক ও শ্লোকগুলোর মাধ্যমেই তিনি ভক্তি প্রচারের দর্শন রেখে গেছেন। বাংলার এই মানবতাবাদী ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যই বাঙালিকে যুগ যুগ ধরে চির-জাগ্রত ও সমৃদ্ধ করে রেখেছে।
তথ্যসূত্র:
তত্ত্বরসামৃত জ্ঞানমঞ্জরী
শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত