পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

৩ টি অণুগল্প

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 203 view(s)
  • লিখেছেন : খালিদা খানুম
আজ সহমনের গল্প বিভাগে থাকল, ৩ টি অণুগল্প

 

অণুগল্প -১

 

কোথায় পাবো তারে ! 

 

অনেকটা পথ হেঁটে আসার পর বালকটি দেখল নদী চরাচরে কেউ নেই। অথচ হিসেব মতো এখানে একদল মানুষের সাক্ষাত পাবার কথা। শূন্য নদীচরে চিকচিকে বালি। পা ফেলে হাঁটলে সামান্য দেবে যায় ভেজা বালি। তিরতির করে বয়ে চলছে নদীর জল। হয়তো কোমর অব্দি হবে । বালকটির কান্না পেল খুব । তবে কী গুরু মিথ্যা বলল! 

 

পিছনে তাকিয়ে দেখলো ফেরার রাস্তা নেই। রাস্তা নেই বলা ভুল। এই পিছনের রাস্তা মানে জঙ্গলের ঝোপঝাড় পেরিয়ে সে এসেছে। কিন্তু সেটাকে রাস্তা বলেনা। গুরু বলেছিল - সন্ধান কর, ওখানেই পাবি। জঙ্গল পার হয়ে নদীর ধারে কিছু মানুষ পাবি, তাদের কাছেই সন্ধান। 

 

- আমি কোথা থেকে এসেছি,  মৃত্যুর পর কী হবে ? এই প্রশ্নের জবাবে গুরু তাকে এই কথা বলেছে। বলেছে, প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সহজ নয়, তবে পাওয়া যায়। কষ্ট করলে পাওয়া যায়।

 

কিন্তু কেউ নেই এখানে। নদী চরাচরে যতদূর চোখ যায়, কেউ নেই। দূর দূর থেকে কোন আলোর রশ্মি দেখা যায় না। তাহলে কি গুরু ইচ্ছা করে এখানে পাঠিয়েছে ? কিন্তু আমি কোন পথে যাবো এবার ? প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে শুরু করে বালকের। 

 

বালক উত্তরে হাঁটে।

দক্ষিনে হাঁটে।

নদী পার হয়ে হাঁটে।

 

গাছের ফল পাকুড় খায় আর পথ খোঁজে বালক। বালক কিছু মানুষ খোঁজে। হন্যে হয়ে খোঁজে। 

 

কিছু মানুষের সাথে দেখা হয় বালকের একদিন। তারা জিজ্ঞেস করে - তুমিও কি আমাদের মতো মানুষ খোঁজ ?

 

অণুগল্প -২

 

ঐ দেখো গো বর্ষা এলো 

 

হাওয়ার দমকে তাল রাখা মুশকিল। বাতাস পশ্চিম থেকে পুবে যায়, দক্ষিণ থেকে উত্তর। লাউ ডগার মতো এদিক ওদিক হতে থাকে সরজমার শরীর। সরজমার সেদিকে খেয়াল নেই। সে মাঠের মাঝ দিয়ে হন হন করে হাঁটে আর চোখ সরু করে দূর দিগন্তে কাকে যেনো খোঁজে। 

জলভরা ভারি বাতাস তার শরীরের রোমে রোমে ছুটে যায় । গরম গুমোটের পর এমন জলো বাতাস পেয়ে শান্ত হয় শরীর। আনন্দ খেলা করে। সরজমার ওদিকে খেয়াল নেই। সে মাঠ পেরিয়ে ধানজমির দিকে যায়। 

ধান জমিতে ধানের রোয়া তুলছিল মেয়ে মরদরা। তারা সরজমাকে দেখে হেঁকে বলে - এতো বাদলার মধ্যে কই যাও গো। 

মাথার কাপড় উড়ে যাচ্ছে বাতাসে। আকাশ চিরে দিচ্ছে বিদ্যুৎ।  সরজমা বলে - বাছুরখান বাড়ি ফিরছে। গাই ডা ফেরেনি। বাছুর  খান হামলিয়ে বাড়ি মাথায় করে দিছে। এতো বাদলায় কুন খানে খুঁজি। 

- এদিকে দেখি নাই গো। তুমি আগুতে দেখো। 

 

সরজমা অন্য দিকে যায়। গাই বাছুর ছাড়া তার আছে বা কি! স্বামী থাকতেও নাই। তাকে বাঁঝা বলে অন্য মেয়েছেলেকে বিয়ে করেছে বছর কুড়ি আগে। সরজমার শরীরে তখন বর্ষার মেঘের সমাগম। ঝরে পড়বো, গড়িয়ে পড়বো, ভিজিয়ে দেবো বলেও সে মেঘ উড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিলো অন্য কেউ। তারপর  মেঘ বলতে কেবল ভয়। বাজের ভয়।  বন্যার ভয়। জলে কাদায় হাজা পচার ভয়। 

 

টুপ টাপ করে বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করে। বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা। মাথা তুলে আকাশের দিকে চেয়ে দেখে সরজমা। দুধ ভরা থনের মতো টসটস করছে মেঘের ভেতর পানি। সে আরো দ্রুত হাঁটে। রহমানের আম বাগানে খোঁজে, রহমানের আম বাগান থেকে মতিউর এর পুকুরের পাড় ঘুরে দেখে। 

কোথাও নেই! তাহলে কি গাই  কেউ চুরি করে নিয়ে গেল নাকি! গাই চুরি করে করলে তার সংসার চলবে কী করে।  দুধ বেচা টাকাই তো তার ভরসা। 

গাঁয়ের শেষে বাঁশ ঝাড়। তারপর কবরস্থান। তাহলে কি ওই খানে কেউ নিয়ে গিয়ে বেঁধে রাখলো! পরে বৃষ্টি থামলে নিয়ে চলে যাবে অন্য কোন খানে। 

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে সরজমা বাঁশঝাড়ের দিকে যায়। মেঘ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে তখন। পানির স্রোত ভিজিয়ে দিচ্ছে তার শরীর। বাঁশঝাড়ের মধ্যে কিছুটা ঢুকে দেখে তার গাই । চুপ করে গলা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।  অন্য পাড়ার লাল ষাঁড় তার গা ঘেঁষে। গাইটা কে ডাকতে গিয়েও থেমে যায় সরজমা। কাল থেকে যে গাইটা ছটপট করছিল, সে কথা ভুলেই গিয়েছিল সে। থাক ওরা, নিজের মতো ভিজুক।

বর্ষা আসে। ভিজতে থাকে সবাই।

 

অণুগল্প -৩

ভুবন মন্ডলের মাঠ

 

দড়ির খাটিয়া পেতে শুয়ে আছে ভুবন মন্ডল। মাথার উপর উল্টানো আকাশ , সামনে ঝাঁকড়া বেলগাছ। পা এর নীচে ধু ধু জমিন, জমিন বলতে অনাবাদী ফাঁকা প্রান্তর । দিকবিদিক শুন্য প্রান্তরে মাঝে মাঝে আকন্দ ফুলের ঝাড়, খেজুর বন । এই প্রান্তর কোথায় গিয়ে ঠেকেছে ভুবন মন্ডল জানে না।  

 

শুশুনি গাঁয়ের শেষ মাথায় তার বাড়ি। সে একবার ভেবেছিল - কুথা বটে শেষ হয় জানি এই মাঠ প্রান্তর। শুরু যখন হইছে শেষ হবে বটে। 

সে গুড় বাতাসা মুড়ি চিড়া নিয়ে হাঁটা শুরু করেছিল প্রান্তরের শেষ দেখতে। ভুবন হাঁটে । খেজুর গাছের ঝোপ , আকন্দ বনের ঝাড় । প্রান্তর আর শেষ হয় না । ঘুরপাক খায় হাঁটে। হাঁটে আবার ঘুরপাক খায়। কিছুক্ষন পর পূর্ব পশ্চিম হারিয়ে ফেলে। মাথায় হাত দিয়ে বলে - হায় ভগবান ! প্রান্তরটার শেষ কুথা বটে । কি ব্যানায়ছ। যিদিকি চাই হুই দিকি প্রান্তর ।

মাথার উপর গনগনে সূর্য। যেদিকে দ্যাখে সেদিকেই শুন্য জিরান ভূমি। কুল নাই, দিক নাই। 

 

ভুবন মন্ডল খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে শুন্য প্রান্তররে চেয়ে চেয়ে দ্যাখে , কেউ কি কাছাকাছি পথ হাঁটে। কেউ যদি আসে তো, দু দন্ড গল্প করা যায়। কত দিন কারো সাথে গল্প করেনি সে। সুখ দুঃখের কথা বলেনি। মনটা আইঢাই করে একটু কথা বলার জন্য। কিন্তু কেউ আসে না এই পথে। সে অপেক্ষা করে একটা মানুষের ।

 

সন্ধ্যা নামলেই রাত শুশুনি গ্রামে। রাতের অন্ধকারে কেউ ঘরের বাইরে আসে না। রাস্তায় চলাচল তো দুরের কথা। গাঁয়ের শেষ প্রান্তে মস্ত বড় বেল গাছটা জেগে উঠে তখন । গাছের নীচে কবেকার মাটির একচালা ঘরে কি যেন নাড়া চাড়া করে উঠে । বহুকাল কোন আলো জ্বলেনি ওই ঘরে । ভাঙা চালের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এলে দেখা যায় প্রায় ছিন্ন একটা একটা দড়ির খাটিয়া, শত প্রলেপ ধুলো পড়া একটা ঘটি আর জং ধরা একটা লোহার রড । এক পশলা বাতাস বেল গাছের ডাল পালা যেন নাচাতে থাকে, ছুটে বেড়ায় খেজুর বন আর আকন্দ ফুলের ঝাড়ে। 

গ্রামের সবাই জানে - ভুবন মন্ডল এমনি তে কারো ক্ষতি করে না , কেবল দু দন্ড কথা বলার মানুষ খোঁজে। গাঁয়ের শেষ মাথা থেকে শুরু হয় ভুবন মন্ডলের মাঠ, যে মাঠে গেলে কেউ আর জ্যান্ত ফিরে আসে না।

 

 

 

 

0 Comments

Post Comment