পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সময়ের মন্ত্রক ও গণতন্ত্র

  • 24 October, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 371 view(s)
  • লিখেছেন : উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই আজ আর শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, এটি পাসপোর্টের লড়াই। কে নাগরিক, কে অনুপ্রবেশকারী, কার নাম ভোটার তালিকায় থাকবে — এই তালিকা বানানোর মন্ত্রকই আজকের ক্ষমতা। মানুষকে সময়-প্রবাসী বানিয়ে বলা — তুমি আগে প্রমাণ করো তুমি কৃতজ্ঞ, তারপর তুমি নাগরিক। আজকের সময়ে অত্যন্ত জরুরি একটি লেখা।

কালিয়ান ব্র্যাডলির নামটা এক বছর আগেও সাহিত্যের পাদটীকায় ছিল। ব্রিটিশ-ক্যাম্বোডিয়ান, লন্ডনে জন্ম, অক্সফোর্ডে পড়া, মা ক্যাম্বোডিয়া থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থী — যিনি ১৭ এপ্রিল ১৯৭৫ থেকে ৭ জানুয়ারি ১৯৭৯, এই চার বছরের গণহত্যা পেরিয়ে এসেছিলেন। কালিয়ান ব্র্যাডলির প্রথম উপন্যাস The Ministry of Time বেরোল ২০২৪ সালের মে মাসে, লন্ডনের Sceptre থেকে। তিনশো চল্লিশ পাতার বই, সানডে টাইমসে ছাব্বিশ সপ্তাহ বেস্টসেলার, ওবামার প্রিয় বই, ব্রিটেনে বর্ষসেরা। কিন্তু বইটি শুধু সাফল্যের জন্য মনে থাকবে না। এটি মনে থাকবে কারণ এটি আমাদের বোঝায়, ফ্যাসিবাদ  ফিরে আসে শুধু বুটের শব্দে নয়, আসে একটি সুন্দর, পরিষ্কার, ডেটা-চালিত মন্ত্রক হয়ে।

উপন্যাসের প্রেক্ষাপট নিকট ভবিষ্যৎ। ব্রিটিশ সরকার গোপনে 'সময়' ফুটো করতে শিখেছে। তারা একটি নতুন দপ্তর খুলেছে — মিনিস্ট্রি। তাদের প্রথম পরীক্ষা, ইতিহাস থেকে পাঁচ জন মানুষকে তুলে আনা, ঠিক মৃত্যুর আগের মুহূর্তে। এমন মানুষ যাদের মৃতদেহ ইতিহাসে কখনও পাওয়া যায়নি, যাতে টাইমলাইন নড়ে না যায়। তাদের নতুন নাম এক্সপ্যাট। সাধারণ অর্থে প্রবাসী। এখানে সময়-প্রবাসী।

তালিকাটি ইচ্ছে করেই বানানো হয়েছে বৈচিত্র্যময় করে। ১৬৬৫ সালের প্লেগে আক্রান্ত লন্ডন থেকে এক কিশোরী, মার্গারেট কেম্বল। ১৬৪৫ সালের নেজবি যুদ্ধ থেকে এক সৈনিক। ১৯১৬ সালে সোমের যুদ্ধক্ষেত্র থেকে এক তরুণ ব্রিটিশ অফিসার, আর্থার রেজিনাল্ড-স্মিথ, যে যুদ্ধের ট্রমা আর নিজের সমকামিতা নিয়ে দ্বিধায় ভুগছে। আর প্রধান — কমান্ডার গ্রাহাম গোর। গোর কাল্পনিক নন। ১৮৪৫ সালে স্যার জন ফ্র্যাঙ্কলিনের নেতৃত্বে দুটি জাহাজ, ইরেবাস ও টেরর, আর্কটিকের বরফে হারিয়ে যায়। একশো উনত্রিশ জন নাবিকের কেউ ফেরেনি। গোর ছিলেন তাদের একজন, ইতিহাসে ১৮৪৭ সালে মৃত বলে নথিভুক্ত।

এই পাঁচ জনের জন্য নিযুক্ত হয় পাঁচ জন ব্রিজ।

ব্রিজ কী? ব্রিজ মানে সেতু। কিন্তু এখানে সেতু মানে সংযোগ নয়, ম্যানেজমেন্ট। ব্রিজের কাজ — এক্সপ্যাটের সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে থাকা, তাকে অ্যাসিমিলেট করা — সে কীভাবে টিউবে ওয়েস্টার কার্ড ঠেকাবে, কীভাবে ওয়াশিং মেশিন চালাবে, কীভাবে স্পটিফাইতে গান শুনবে, কীভাবে নারীবাদ মেনে নেবে — আর প্রতি সপ্তাহে মন্ত্রকে গোপন রিপোর্ট লেখা — সে কতটা মানিয়েছে, কতটা অনুগত, কতটা বিপজ্জনক। ভালোবাসা ও ফাইলের এই অসম সহাবস্থানই উপন্যাসের প্রাণ।

বইয়ের বর্ণনাকারী সেই ব্রিজ। তাঁর নাম গোটা বইতে বলা হয় না। তিনি ব্রিটিশ-ক্যাম্বোডিয়ান, দ্বিতীয় প্রজন্মের অভিবাসী, একজন জুনিয়র সিভিল সার্ভেন্ট। কালিয়ান ব্র্যাডলি বলেছেন, তিনি প্রথমে নায়িকাকে সাদা ব্রিটিশ ভেবেছিলেন, কিন্তু পরে বুঝেছেন, এই গল্প কেবল একজন অভিবাসীই বলতে পারে। কারণ যে জানে কৃতজ্ঞতা প্রমাণের চাপ কী, সেই জানে মন্ত্রকের ভাষা। শরণার্থীদের কখনও জিজ্ঞেস করা হয় না, তুমি কৃতজ্ঞ কি না, জিজ্ঞেস করা হয়, তুমি কতটা কৃতজ্ঞ।

নায়িকার দায়িত্বে পড়েন গোর। প্রথমে কমেডি। গোর ওয়াশিং মেশিনকে বলেন, enslaved lightning — বন্দী বজ্রপাত। তারপর আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব, তারপর প্রেম। কিন্তু প্রেমই প্রশ্ন করতে শেখায়।

গোর একসময় রয়্যাল নেভির Preventative Squadron-এ ছিলেন, যার কাজ ছিল আফ্রিকার উপকূলে দাসবাহী জাহাজ আটকানো। ব্রিটিশ পাঠ্যবইতে একে মানবিক মিশন বলা হয়। নায়িকা তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, তোমরা যে দেড় লক্ষ মানুষকে "মুক্ত" করেছিলে, তাদের বেশিরভাগই ফেরার পথে মারা গিয়েছিল, রোগে, অনাহারে। তাদের মুক্তি কে লিখবে? এই প্রশ্ন দিয়েই কালিয়ান ব্র্যাডলি উপনিবেশের মিথ ভাঙেন। সাম্রাজ্যও মন্ত্রকের মতোই বলে, আমি তোমাকে বাঁচাচ্ছি, তাই তোমার জীবনের ওপর আমার অধিকার জন্মায়।

দ্বিতীয় ইতিহাস আরও কাছের।

খমের রুজ কী? ১৯৭৫ সালের ১৭ এপ্রিল ফনম পেন দখল করে পল পটের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনী ক্ষমতায় আসে। তারা ঘোষণা করে Year Zero — সময়কে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে। শহর খালি করো, সবাইকে গ্রামে পাঠাও, টাকা বাতিল, ধর্ম নিষিদ্ধ, চশমা পরলেই তুমি বুদ্ধিজীবী, অতএব তোমাকে মারতে হবে। ১৯৭৯ সালের ৭ জানুয়ারি ভিয়েতনামি সেনা ফনম পেন দখল করে তাদের উৎখাত করার আগে প্রায় সতেরো লক্ষ থেকে ত্রিশ লক্ষ মানুষ মারা যায়, যাকে পৃথিবী চেনে Killing Fields নামে। নায়িকার মা সেই মাঠ পেরিয়ে এসেছেন। কালিয়ান ব্র্যাডলির সবচেয়ে শান্ত একটি প্যারায় লেখা — খমের রুজের গল্পে সবচেয়ে কঠিন হল almost আর maybe শব্দ দুটি। সে almost বেঁচে গিয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে আমাশয়ে মারা গেল। সে maybe ওই গণকবরে শুয়ে আছে। এই almost নিয়েই একটা প্রজন্ম বাঁচে। লেখিকা জানেন, রাষ্ট্র যখন বলে, আমি তোমাকে নতুন মানুষ বানাব, তখনই সে সবচেয়ে বেশি মানুষকে মুছে দেয়।

এখানেই জলবায়ু ফ্যাসিবাদের প্রসঙ্গটি আসে। উপন্যাসের শেষে আমরা জানি, মন্ত্রকের রহস্যময় বস আদেলা আসলে নায়িকারই ভবিষ্যতের রূপ। যে ভবিষ্যৎ থেকে সে এসেছে, সেখানে লন্ডন প্রায় ডুবে গেছে, আবহাওয়া ভয়াবহ, গণতন্ত্র ভেঙে ফ্যাসিবাদ ফিরেছে। সময়-ভ্রমণ আসলে সেই ভবিষ্যতের পালানোর চেষ্টা। যে রাষ্ট্র নিজের বর্তমানকে বাঁচাতে পারে না, সে অতীত থেকে মানুষ চুরি করে ভবিষ্যৎ নিয়ে পরীক্ষা করে। আজকের পৃথিবীর মতোই — যখন বন্যা, খরা, দাবানল বাড়ছে, তখন রাষ্ট্র ব্যস্ত কে নাগরিক, কার নাম তালিকায় থাকবে, কাকে প্রমাণ করতে হবে সে এই দেশের। মানুষকে সময়-প্রবাসী বানিয়ে তার অধিকার কেড়ে নেওয়া — এটাই জলবায়ু ফ্যাসিবাদের নতুন কৌশল।

আর এখানেই জেন জি-র সঙ্গে বইটির সেতু তৈরি হয়। অনেকে জেন জেড বলেন, কিন্তু সঠিকটি জেন জি। Gen Z — ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্মানো প্রজন্ম। ব্রিটিশ ইংরেজিতে Z-কে জেড বলা হয়, আমেরিকান ইংরেজিতে জি। আন্তর্জাতিকভাবে জেন জি-ই প্রচলিত।

২০২৪-২৫ সালে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু, জাকার্তা থেকে নাইরোবি যে নতুন প্রতিবাদ আমরা দেখলাম, তার ভাষা আগের মতো নয়। তারা জানে, মন্ত্রকের ক্ষমতা চলে ন্যারেটিভ দিয়ে। তাই তারা মন্ত্রকের ভাষাকেই ব্যঙ্গ করেছে — মিম, রিল, ব্যঙ্গাত্মক গান, লাইভ লোকেশন, ওপেন সোর্স ডেটা দিয়ে। তারা প্রশ্ন করেছে, তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ, তাই তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকতে হবে — এই হিসেব কে ঠিক করল?

এই জায়গাটা সিনেমার মতো। দুটি ক্লাসিক ছবি মনে পড়ে। এক, ক্রিস মার্কারের La Jetée, ১৯৬২। মাত্র আঠাশ মিনিটের ফরাসি ছবি, প্রায় পুরোটাই স্থিরচিত্রে বানানো। ভবিষ্যতের ধ্বংসপ্রাপ্ত পৃথিবীর সরকার অতীত থেকে মানুষ তুলে আনে পরীক্ষার জন্য। কালিয়ান ব্র্যাডলির উপন্যাসের আদি-পুরুষ। দুই, The Lives of Others, ২০০৬। ১৯৮৪ সালের পূর্ব বার্লিন। একজন স্টাসি অফিসার এক নাট্যকারের ওপর আড়ি পাততে পাততে তাঁর প্রেমে পড়ে যায়। নজরদার যখন শ্রোতা হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের প্রজেক্ট ফাটতে শুরু করে। ব্রিজ ও গোরের গল্পও তাই।

এই গল্পই এখন পর্দায় আসছে। বিবিসি ওয়ান ও বিবিসি আইপ্লেয়ারের জন্য A24 প্রযোজনা করছে ছয় পর্বের সিরিজ। চিত্রনাট্য লিখছেন Alice Birch, যিনি Normal People-এর চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। পরিচালক Aneil Karia। প্রধান দুটি চরিত্রে — নামহীন ব্রিজ, যাকে সিরিজে নাম দেওয়া হয়েছে সোফি, অভিনয় করছেন Aoife Hinds, এবং গ্রাহাম গোরের চরিত্রে Billy Howle। আদেলার চরিত্রে অস্কার মনোনীত Hong Chau, হ্যান্ডলারের চরিত্রে Adeel Akhtar, এবং সোফির বাবা-মায়ের চরিত্রে Ciarán Hinds ও Hélène Patarot। লন্ডনে শুটিং শুরু হয়েছে ২০২৬ সালে। কালিয়ান ব্র্যাডলি নিজে বলেছেন, ছয় বছর আগে যদি কেউ তাঁকে বলত, এই মেরু-অভিযাত্রী একদিন বিবিসির পর্দায় আসবে, তিনি ভিক্টোরিয়ান কায়দায় মূর্ছা যেতেন।

ভারতের গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই আজ আর শুধু ভোটের অঙ্ক নয়, এটি পাসপোর্টের লড়াই। কে নাগরিক, কে অনুপ্রবেশকারী, কার নাম ভোটার তালিকায় থাকবে — এই তালিকা বানানোর মন্ত্রকই আজকের ক্ষমতা। মানুষকে সময়-প্রবাসী বানিয়ে বলা — তুমি আগে প্রমাণ করো তুমি কৃতজ্ঞ, তারপর তুমি নাগরিক।

আমরা সবাই কোনও না কোনওভাবে ব্রিজ। আমরা জানি পাঠ্যবই বদলে যাচ্ছে, ভিন্ন মতকে দেশদ্রোহী বলা হচ্ছে, প্রতিবেশীকে অপর বানানো হচ্ছে। তবু আমরা চাকরি, ইএমআই, পাসপোর্টের ভয়ে প্রতি সপ্তাহে রিপোর্ট লিখে যাই। বলি, আমি রাজনীতিতে নেই। কালিয়ান ব্র্যাডলি মনে করিয়ে দেন, মন্ত্রকের ভেতরে থেকে নিরপেক্ষ থাকা মানেই মন্ত্রকের পক্ষে থাকা।

উপন্যাসের শেষে নায়িকা মন্ত্রকের সার্ভার থেকে সব ফাইল মুছে দেন, টাইম-পোর্টাল ভেঙে ফেলেন। গোর ও ম্যাগি পরিচয় বদলে আলাস্কায় পালিয়ে যায়। নায়িকাও চাকরি ছেড়ে তাদের খুঁজতে বেরোন। কোনও বিপ্লব নয়, কোনও ঘোষণাপত্র নয়। ছোট, ব্যক্তিগত, জেদি একটি সিদ্ধান্ত — আমি আর রিপোর্ট লিখব না।

হয়তো গণতন্ত্রও তাই। কোনও মন্ত্রকের দান নয়। কোনও একক ইতিহাস, একক বিশ্বাস, একক ভাষা নয়। গণতন্ত্র হল রোজকার অভ্যেস — অপরকে অপর না ভেবে, সময়-প্রবাসীকে নিজের ফ্ল্যাটে একটু জায়গা দেওয়ার জেদ। জেন জি সেই জেদটাই নতুন করে শিখিয়েছে।

0 Comments

Post Comment