নিজ ভূমে পরবাসী —SIR-এর আয়নায় আমাদের বিবেক
সংবাদমাধ্যমে দেখা একটা দৃশ্য মাথা থেকে সরছে না। এক বৃদ্ধা। গ্রামের মাটির মানুষ। এই দেশের মাটিতেই জন্ম, কর্ম, এই দেশের ভোটকেন্দ্রেই লাইন দিয়েছেন আজীবন। সব নিয়ম মেনেছেন, দেশের নাগরিক হিসেবে যা যা করার — সব করেছেন। অথচ আজ তাঁর নাম নেই ভোটার তালিকায়। SIR-এর ঢেউ এসে মুছে দিয়েছে তাঁর পরিচয়।
আর সেই বৃদ্ধা — বয়সের ভার বহন করে, আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে — নিজের নাতির বয়সী এক সাংবাদিকের পা ধরছেন। বলছেন, "বাবা, আমার নামটা লিস্টে তুলে দাও।"
এই একটা দৃশ্য। এই একটা মুহূর্ত। এর ভেতরে গোটা একটা সভ্যতার প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
SIR — একটি প্রক্রিয়া না একটি প্রহসন ?
Special Intensive Revision বা SIR, অর্থাৎ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন — কাগজে-কলমে একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। উদ্দেশ্য মহৎ — ভোটার তালিকা পরিষ্কার করো, ভুয়ো ভোটার সরাও, প্রকৃত নাগরিকদের অধিকার সুনিশ্চিত করো। কিন্তু বিহারে যখন এই প্রক্রিয়া চলেছিল, তখন থেকেই একটা প্রশ্ন মাথা তুলেছিল — যাদের সরানোর কথা, তারা কি সরছে, নাকি যাদের রাখার কথা, তারা সরে যাচ্ছে?
আর এখন পশ্চিমবঙ্গে সেই প্রশ্নটাই আরও তীক্ষ্ণ হয়ে ফিরে এসেছে। লক্ষ লক্ষ বৈধ ভারতীয় নাগরিক — যাঁরা কখনও বিদেশ যাননি, কখনও অন্য রাজ্যে যাননি, যাঁদের ঠিকানা বদলায়নি, যাঁদের নথিপত্র যথাযথ আছে — তাঁরা আজ প্রমাণ করতে বাধ্য হচ্ছেন যে তাঁরা এই দেশেরই মানুষ। আর সব কাগজ জমা দিলেই কি তালিকায় নাম উঠছে? মোটেও না । ভুতুড়ে ভোটার শব্দটা আমরা জানতাম এখন দেখা যাচ্ছে ভোটার তালিকাই হয়ে উঠছে ভুতুড়ে, কি মন্ত্রে তাতে নাম থাকবে আর কেনই বা নাম কাটা যাবে, সে প্রশ্ন করা অর্থহীন কারন জবাব দেওয়ার কেউ নেই। ভাবুন একবার একজন সাধারন ভোটারের জন্যএই অপমান কতটা ভারী।
পশ্চিমবঙ্গে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে মোট প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যার মধ্যে প্রথম দফায় বাদ পড়েছিল প্রায় ৫৮ লক্ষ ২০ হাজার, এবং পরবর্তী পর্যায়ে বিচার বিভাগীয় প্রক্রিয়ায় আরও প্রায় ২৭ লক্ষ নাম বাদ দেওয়া হয় নেহাতি ছেঁদো যুক্তি দিয়ে যার পোশাকি নাম লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি বা যুক্তিগত অসঙ্গতি। চূড়ান্ত তালিকা অনুযায়ী, রাজ্যে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৪ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৮৪-এ, যা আগের ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ থেকে প্রায় ১০.৯% কম। কলকাতার মতো জেলায় প্রায় ৭ লক্ষ ভোটার বাদ পড়েছে, যেখানে মুর্শিদাবাদ, উত্তর ২৪ পরগনা, মালদহ, নদিয়া, এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় সর্বাধিক সংখ্যক নাম বাদ পড়ার ঘটনা ঘটেছে। এই বিপুল সংখ্যক নাম বাদ পড়ায় রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে উদ্বেগ এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে অসহায়ত্ব এবং প্রশ্ন উঠেছে এদের ভবিষৎ ভোটাধিকার তথা নাগরিক অধিকার নিয়ে।
যদিও নর্বাচন কমিশন নাম বাদ যাওয়া ভোটারদের আবেদন শুনতে ১৯টি ট্রাইবুনাল চালু করেছে, কিন্তু কি ভাবে সেই ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হয় তা এই বৃদ্ধার মতন সাধারন মানুষ জানেনা। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের কাজকর্ম এমনই ধীরগতিতে চলছে যে এবারের বিধানসভা ভোটের আগে ট্রাইবুনালে আবেদন জানিয়ে আবার ভোটার তালিকায় নাম তোলার সম্ভাবনা একেবারেই কম। ‘বিচারাধীন’ হিসেবে রয়েছেন এমন ভোটাররা, তবু শেষ আশা হিসেবে ট্রাইব্যুনালের দিকে তাকিয়ে বসে আছেন। ট্রাইব্যুনাল যদি তাদের নামগুলোর নিষ্পত্তি না করে এবং সবুজ সংকেত না দেয়, তবে এই মানুষগুলোর নাম ভোটার তালিকায় থাকলেও তাঁরা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন না। এবারের গণতন্ত্রের উৎসবে তাঁদের প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে গেছে।
SIR কি তাহলে ঘৃণার উৎসব ?
এই বিপন্ন কালে আবার চারপাশে দেখি একদল মানুষ উল্লসিত। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাদের উল্লাস দেখলে অবাক লাগে। একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষ হয়রান হচ্ছেন — এটাই তাদের আনন্দের উপলক্ষ। তারা ভাবছেন এটা "শিক্ষা দেওয়া" হচ্ছে, "জব্দ করা" হচ্ছে।
কিন্তু যে বৃদ্ধা সাংবাদিকের পা ধরছেন — তিনি কোনো সম্প্রদায়ের নন। তিনি কোনো ধর্মের নন। তিনি শুধু একজন মানুষ, একজন নাগরিক, যাঁর অধিকার আজ ধুলোয় মিশে গেছে।
SIR কোনো ধর্মের বিচার করে না। দারিদ্র্য বোঝে না। বার্ধক্য দেখে না। কাগজহীন মানুষের অসহায়তা বোঝার ক্ষমতা এই প্রক্রিয়ার নেই। তাই যারা উল্লাস করছেন, তাদের জন্য সত্যিই করুণা হয়। শুধু ঘৃণাকে সম্বল করে যে মানুষ বাঁচে — সে মানুষ আনন্দের সন্ধান পায় অন্যের কষ্টে। এই দীনতা, এই আত্মিক দারিদ্র্য — মানব সভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে করুণ পরিনতি
নীরবতা — আরেক অপরাধ
কিন্তু শুধু উল্লাসকারীরাই কি দোষী? আমরা যারা দেখছি, জানছি, বুঝছি — এবং চুপ করে আছি? আমরা যারা ভোটার তালিকায় নাম টিকিয়ে রাখতে পেরেছি, আমাদের কাগজপত্র ঠিকঠাক আছে, আমরা নিরাপদ — আমরা কি একটিবারও ঘুরে তাকিয়েছি পাশের মানুষটার দিকে? সত্যি কথা হলো — আমরা তাকাই না। যতক্ষণ না বিপদ আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। এই নীরবতা কিন্তু নিরীহ নয়। এই নীরবতা একটি সম্মতি — অন্যায়ের প্রতি, অবিচারের প্রতি, অপমানের প্রতি। ইতিহাস একটা কথা বারবার বলেছে। ঘৃণার আগুন কোনো নির্দিষ্ট বাড়ি জ্বালিয়ে থামে না। বিভেদের বিষ কোনো একটা সম্প্রদায়কে গ্রাস করে তৃপ্ত হয় না। সর্বগ্রাসী ঘৃণা একদিন সবাইকেই গেলে। আজ যে বৃদ্ধা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন — তিনি সংখ্যালঘু নন। তিনি কোনো "টার্গেট" নন। তবুও তিনি শিকার। কারণ এই প্রক্রিয়া যখন অন্ধ হয়ে চলে, যখন ব্যবস্থা মানবিক বিবেচনা হারায় — তখন সে কোনো পরিচয় দেখে না। সে শুধু দেখে কে দুর্বল, কে কাগজহীন, কে অসহায়। এবং দুর্বলেরা — তারা সব ধর্মে, সব সম্প্রদায়ে, সব ভাষায় আছে।
একটাই পথ — একসাথে দাঁড়ানো
তাহলে এখন কী করা? প্রশ্নটা সহজ। উত্তরটাও আসলে সহজ — যদিও বাস্তবায়ন কঠিন।
যার নাম আজ ভোটার তালিকায় উঠেছে, সে যেন ভুলে না যায় — যার নাম ওঠেনি, সে তার সহ নাগরিক; যে নিরাপদ, সে যেন সরে না দাঁড়ায় — যে বিপদে, সে একা নয়
"নিজ ভূমে পরবাসী" করে দেওয়ার এই চক্রান্তকে রুখতে হবে — একসাথে, এককণ্ঠে
আমরা যদি সকলে সকলের পাশে থাকি — শুধু কথায় নয়, কাজে; শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় নয়, বাস্তবে — তাহলে হয়তো কিছু পাল্টাবে। হয়তো সেই বৃদ্ধার মতো আর কাউকে সাংবাদিকের পা ধরতে হবে না, হয়তো!
সেই বৃদ্ধার মুখটা আমার চোখে ভাসছে। তাঁর চোখের জল, তাঁর কাঁপা হাত, তাঁর আকুতি — এগুলো শুধু একজন মানুষের যন্ত্রণা নয়। এগুলো আমাদের সমাজের আত্মার ছবি। একটি সমাজ, যে সমাজ তার বৃদ্ধদের মর্যাদা দিতে পারে না, তার নাগরিকদের পরিচয় রক্ষা করতে পারে না — সেই সমাজের কাছে আর কী প্রত্যাশা থাকে?
তবু আশা ছাড়ি না। কারণ আশাই একমাত্র অস্ত্র, যা ঘৃণার কাছে হার মানে না। সহমর্মিতাই একমাত্র শক্তি, যা বিভেদকে পরাজিত করতে পারে। সেই বৃদ্ধার পাশে, সেই বৃদ্ধার মত প্রতিটি সহনাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর এখনই সময়। বলার সময় আমরা এ দেশের নাগরিক, আমরা আছি। আমরা থাকব।
— একজন উদ্বিগ্ন সহ নাগরিকের কলম থেকে