পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

কথা বলব না কাগজ দেখাব না    

  • 20 February, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 676 view(s)
  • লিখেছেন : মহাশ্বেতা সমাজদার
এনআরসি, সিএএ,এনপিআর কি? আর কেনই বা বলা হচ্ছে কথা বলব না কাগজ দেখাব না ?

ঘোর তিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে

জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে।

দিল্লির শাহিনবাগ পথ দেখিয়েছে। সারা দেশে শত শত শাহিনবাগ জ্বলে উঠছে নিবিড় নিশীথে। জেগে উঠছে সহস্র মঙ্গলনয়ন। দ্বিতীয় স্বাধীনতার এই আন্দোলন শুরু হয়েছে ছাত্রদের হাত ধরে। ছাত্ররা পুলিশপ্রহৃত হওয়া মাত্রই নিমেষের মধ্যে আন্দোলনের পতাকা কাঁধে তুলে নিয়েছেন মুসলমান মায়েরা। তাঁদের কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ জনতা। কিন্তু যাঁরা পথে নামলেই এই আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হতে পারত, তাঁরা এখনও মিথ্যে নিশ্চিন্তির ঘেরাটোপে। হ্যাঁ, আমি বলছি হিন্দু মধ্যবিত্ত জনসমাজের কথা। এমন এক মিথ্যে নিশ্চিন্ততা তাঁদের গ্রাস করেছে, যে সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলার ক্ষমতা তাদের লোপ পেয়েছে। এই আন্দোলন শুরু হয়েছে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাশ হবার পর থেকে। এই আইন পাশ না হবার যথেষ্ট যুক্তি ছিল লোকসভায় ও রাজ্যসভায়, সেইসব যুক্তি যখন অযৌক্তিকভাবে নস্যাৎ হয়ে গেল, তখন রাস্তাই হয়ে দাঁড়াল এই ভয়ানক কালাকানুন বাতিল করানোর একমাত্র রাস্তা।

সি এ এ কেন কালাকানুন?

সি এ এ বা সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট একটি অসাংবিধানিক আইন। অর্থাৎ এটি সংবিধানকে লঙ্ঘন করে। প্রথমত, এটি প্রতিবেশী দেশের নিপীড়িত সেইসব জনতাকে নাগরিকত্ব দেয়, যারা ধর্মে অমুসলমান। ধর্মের ভিত্তিতে কোনও সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধান স্বীকার করে না। দ্বিতীয়ত, এই আইনে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান- কেবলমাত্র তিনটি প্রতিবেশী দেশের উল্লেখ আছে। তার মধ্যে আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের কোনও সীমানা নেই। পাক অধিকৃত কাশ্মীরের সঙ্গে আছে। এই আইনে নেপাল, ভুটান, মায়ানমার, শ্রীলঙ্কার কোনও উল্লেখ নেই। অর্থাৎ খেয়ালখুশি মতো তিনটি দেশকে এই আইনের আওতায় রাখা হয়েছে। এই ‘খেয়ালখুশি’ মাফিক কোনও কাজ অসাংবিধানিক। এই দুই কারণেই শুধু সি এ এ পাশ হওয়া অনুচিত। পাশ হয়ে গেলেও সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করলেই তা বাতিল হওয়ার যোগ্য। অথচ সুপ্রিম কোর্ট এখনও এত জরুরি একটি বিষয়ে সম্যকভাবে শোনারই সময় পায়নি।

সি এ এ করলে কী ক্ষতি?

প্রধান ক্ষতি দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার হত্যা। এই বিমূর্ত ক্ষয়ের থেকেও বড় ক্ষতি এন আর সি নামক ছাঁকনিতে যারা আটকা পড়বে তাদের ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে বা শরণার্থী তকমা দেওয়া হবে।

এটা খুবই দুর্ভাগ্যের যে ধর্মান্ধতা এবং ধর্মের নামে হিংসা ছড়াতে আমাদের শাসকশ্রেণি এতটাই সফল হয়েছে, যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনতা ভাবছে, আমি তো হিন্দু, বিজেপি হিন্দুর ক্ষতি করবে না। তাই যার যা খুশি হোক, আমার কোনও ভয় নেই। হে নিশ্চিন্ত হিন্দুবীর, ঠিক এখানেই আপনি ভুলটি করছেন এবং আখেরে নিজের এবং নিজের সন্তানের সর্বনাশ করছেন।

এন আর সি কী?

নাগরিকপঞ্জী অর্থাৎ নাগরিকদের তালিকা তৈরি। এখানে একটা কথা বলে রাখি, পশ্চিমবঙ্গে যে মুসলমানরা বাস করেন, তাঁদের অধিকাংশই প্রথম থেকে এ বঙ্গের বাসিন্দা এবং তাঁদের জমির দলিল থাকার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু এ-রাজ্যের হিন্দুদের অনেকেই এসেছেন পূর্ববঙ্গ থেকে। তাঁরা এন আর সি-র মাধ্যমে অনাগরিক হবেন এবং সি এ এ-র মাধ্যমে শরণার্থী হবেন। তাহলেই বুঝুন ছিলেন নাগরিক, হবেন শরণার্থী। আর অধিকাংশ মুসলমানরা যেমন ছিলেন, তেমন থাকবেন। ফলে যারা মুসলমান তাড়িয়ে তাদের চাকরি, জমি, ব্যবসা হাত করবার দিবাস্বপ্ন দেখছেন তাঁরা এবার জেগে উঠুন।

মনে রাখুন

সংবিধানের 326 ধারা অনুযায়ী এদেশের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেন আঠেরো বছরের বেশি বয়স্ক ভারতীয় নাগরিক। অর্থাৎ যাদের ভোটে এই সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তারা সবাই নাগরিক। ভোটে নির্বাচিত হয়ে নির্বাচকদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার এক্তিয়ার কোনও নির্বাচিত সরকারের নেই। নির্বাচক যদি অনাগরিক হন, তবে তাদের দ্বারা নির্বাচিত সরকারও অবৈধ।

এন পি আর-ই এন আর সি-র প্রথম ধাপ

আজ্ঞে হ্যাঁ। এন আর সি-তে নাম ওঠাতে আপনাকে কোথাও যেতে হবে না। এন পি আর কর্মীকে মুখে মুখে প্রশ্নের উত্তর দিলেই এন আর সি-র জমি তৈরি হয়ে যাবে। এই কথা স্পষ্টভাবে সরকারি নথিতে লেখা আছে। এবার আসি, যাঁরা ভাবছেন, আমার তো সব ডকুমেন্ট ঠিকই আছে, আমার কোনও ভয় নেই, তাঁদের কথায়। এন পি আর কর্মী তাঁর শিক্ষা, মতি এবং বোধবুদ্ধি অনুসারে আপনার কথা শুনে আপনার তথ্য টুকে নেবে। আপনাকে সেটা সই করে দিতে হবে। কী নিশ্চয়তা আছে, ওই কর্মীটি যা লিখলেন, তা নিখুঁত? কী নিশ্চয়তা আছে যে ওই কর্মীর কোনও বানান ভুল আপনার নজর এড়িয়ে যাবে না? কী-ই বা নিশ্চয়তা আছে যে লক্ষ লক্ষ তথ্য যখন সঙ্কলিত হবে তখন উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চড়বে না? সরকারি নথিতে নামের নানারকম বানানের অভিজ্ঞতা কি আমাদের নেই? এতদিন এইসব ভুল ছিল সংশোধনযোগ্য। এইবার এইসব ভুল আপনার, আপনার সন্তানের নাগরিকতাকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেবে। আপনার প্রশ্নের উত্তর শুনে যদি সরকারি কর্মীর কোনও কারণে সন্দেহ হয়, তাহলেই সে আপনার নামের পিছনে ‘D’ অক্ষরটি জুড়ে দেবেন। ব্যস, আপনি হয়ে গেলেন সন্দেহজনক নাগরিক। এইবার আপনাকে কোর্টে দৌড়ে যাবতীয় কাজকর্ম ছেড়ে হয়তো বা ঘরবাড়ি বেচে কোর্টের খরচ তুলে প্রমাণ করতে হবে আপনি নাগরিক। এতে কদিন লাগবে খোদায় মালুম। প্রমাণ করতে পারলে এ-যাত্রায় বেঁচে গেলেন। না পারলে আপনি বিদেশি। এইবার সি এ এ-র মাধ্যমে শরণার্থীর তকমা পেতে আপনাকে আবেদন করতে হবে। সেই আবেদনের প্রথমেই লিখতে হবে ‘আমি বাংলাদেশ বা পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের নাগরিক’।

এতে প্রথমেই আপনি রাষ্ট্রের সামনে মিথ্যাচারী প্রমাণিত হবেন, মেনে নিতে হবে প্রথমে এন আর সি-তে নাম তুলতে আপনি নিজেকে ভারতীয় বলে যে ঘোষণা করেছিলেন সেটি মিথ্যে কথা।

এত কাঠখড় পোড়ানোর পর যখন শরণার্থীর তকমা পাবেন, তখনও কিন্তু আপনার পরিশ্রমের অর্জন আপনার বাড়ি, জমি, চাকরি, ব্যবসার কী অধিকার থাকবে সে-ব্যাপারে এখনও কেউ স্পষ্ট করেনি।

আর যদি সব ভালোয় ভালোয় মিটে যায় এবং আপনি নাগরিকত্বের পরীক্ষায় পাশ করে এন আর সি-তে নাম তুলেও ফেলেন, তাহলেও কাহিনিতে ট্যুইস্ট আছে। যে-কোনও সময় আপনার প্রতিবেশী, ভাড়াটে বা বাড়িওয়ালা বা পুরনো কোনও শত্রু তার নাম গোপন রেখে আপনার নামে সরকারের কাছে নালিশ করতে পারেন যে আপনি বিদেশি। ব্যস, আপনি তক্ষুনি ‘D’ ভোটার।

তাহলে এই বিপদের থেকে বাঁচার উপায় কী?

এন পি আর করতে দেব না সারা দেশের সবাই যদি এন পি আর-এ সহযোগিতা করতে অস্বীকার করে, তাহলে এন পি আর হতে পারবে না এবং স্বভাবতই এন আর সি-ও হবে না। তাই কাগজ নেই দিখায়েঙ্গেরও আগে আমাদের শপথ হোক আমরা এন পি আর করতে দেব না। এন পি আর কোনও আইন নয়। এটি একটি নিয়ম। এবং নাগরিকের অধিকার আছে অহিংসভাবে কোনও নিয়ম অমান্য করার।

হাতে সময় খুব কম

  ১লা এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় সরকার এন পি আর কর্মসূচি শুরু হবে বলে ঘোষণা করেছে। আশার কথা, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায় রাজ্যে এন পি আর হবে না- এই মর্মে প্রস্তাব পাশ হয়েছে। আমাদের তাও সচেতন থাকতে হবে, কোনও পরিস্থিতিতে কোথাও লুকোছাপা করেও যেন এন পি আর শুরু না হয়ে যায়। আসুন আমরা শপথ নিই এন পি আর কর্মীর সঙ্গে আমরা কথা তো বলবই না, আমাদের চারপাশের বাজারে, চায়ের দোকানে মানুষজনকে বোঝাবো কেন এন পি আর-এ কথা বললে বিপদ বাড়বে। আরও একটা কথা মনে রাখবেন এন পি আর, এন আর সি কিছুই হবে না, যদি সি এ এ বাতিল করা যায়। তাই যে-কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, হিন্দু আবালবৃদ্ধবণিতা আসুন পথে নামি, আমরাও পাড়ায় পাড়ায় গড়ে তুলি শাহীনবাগ। আমরা মা-মাসিরা জেগে থাকি যাতে আমাদের বাচ্চারা সুস্থ দেশ পায়, সুস্থ পরিবেশ পায়। এই হিংসাদ্বেষপূর্ণ পরিবেশ নিপাত যাক। সি এ এ প্রত্যাহৃত হোক।

 


 

0 Comments

Post Comment