পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

বয়সে ও ভয়েসে মিল

  • 23 February, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 253 view(s)
  • লিখেছেন : মালবিকা মিত্র
বাংলাভাষী হওয়ার অপরাধে প্রতিবেশী অবাঙালি রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু মিছিল ও হয়রানি। অথচ সিপিআইএম ও বিজেপির কোন হেল দোল নেই। বরং তাদের যুক্তি -- বাংলায় কাজ নেই বলেই নাকি বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক কে অন্য রাজ্যে যেতে হয়। যদিও তথ্য ভিন্ন কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গে কাজের খোঁজে ভিনরাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাইরে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লক্ষেরও বেশি।

সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একদম শুরুর বছরে নরেন্দ্র মোদি বিরোধী কংগ্রেস দলের সাংসদ জয়রাম রমেশকে আক্রমণ করে বলেছিলেন, এখনো কেন্দ্রীয় সরকারকে মনরেগার মতো প্রকল্প চালাতে হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, কংগ্রেস শাসনে দেশের উন্নতি হয়েছে কতটা। তিনি ১০০ দিনের কাজকে বিদ্রুপ করে বলেন, "গর্ত খোঁড়ার কাজ"। তিনি স্থায়ী সমাধান হিসেবে প্রতিবছর ২ কোটি বেকারের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য হলো মোদি শাসনের দশ বছর পর ২০২৫ - ২৬ সময়ে দেশের বেকারত্বের হার লেখচিত্রের শীর্ষে পৌঁছে গেছে।

নরেন্দ্র মোদির মোদির এই বক্তব্যের প্রতিধ্বনি শুনতে পাই, সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে যুব সাথী প্রকল্পে নাম নথিভুক্ত করতে মানুষের ভিড় দেখে, সিপিআইএম নেতা সুজন চক্রবর্তী সরকারি প্রকল্পটির প্রশংসা না করে বলেছেন, এত লক্ষ কোটি বেকারের উপস্থিতি প্রমাণ করে সরকারের ব্যর্থতা। এটাই বলতে চেয়েছেন যে তৃণমূল শাসনে চাকুরীর নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হয়নি। শুধুই দয়ার দান ভিক্ষা ভাতার প্রসাদ বিতরণ। আর ঢাকের বায়া আবাপ, ততোধিক চড়া সুরে বেজেছে -- কতো উচ্চ শিক্ষিত, গবেষণারত ছাত্র, তারাও এই দেড় হাজার টাকার অনুদানের লাইনে সামিল হয়েছে। আর কাঁথির অধিকারী, সে তো "মুখ্যমন্ত্রীর পদত্যাগ চাই" বলার জন্য মুখিয়েই আছে। আমার প্রশ্ন হল, শিক্ষিত বেকারদের এই সুদীর্ঘ লক্ষ লক্ষ যুবকের জমায়েত, এটা কি বিগত ১৫ বছরের তৈরি। এর আগে ১৯৭৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত ৩৪ বছরের সুদীর্ঘ শাসনের কি কোন ভূমিকা ছিল না? তারও আগে? সত্তরের দশকেই তো একটির পর একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে -- জন অরণ্য, সীমাবদ্ধ, প্রতিদ্বন্দ্বী, আপনজন, ইন্টারভিউ, ইত্যাদি। সবকটির পটভূমি ছিল শিক্ষিত জীবিকা হীন অ্যাংরি জেনারেশন। 

আমার ছানি পড়া ঝাপসা নিকট দৃষ্টিতে দেখতে পাই, বেলুড়ে নিস্কো (NISCO), উত্তরপাড়ায় হিন্দুস্তান মোটরস কারখানা, কোন্নগরে শ্রী দুর্গা কটন মিল, রিষড়ায় জেকে স্টিল, রিষড়া অ্যালকালি, শ্রীরামপুরে স্ট্যান্ডার্ড ফার্মাসিউটিক্যাল, ভদ্রেশ্বরে ব্রেথওয়েট ইঞ্জিনিয়ারিং, ব্যান্ডেলে ডানলপ, হিন্দুস্তান লিভার, জয়া ইঞ্জিনিয়ারিং, জেশপ, ঊষা, এসব তো মহান বামফ্রন্টের, বিপ্লবী মহতী শাসনে তালা বন্ধ হল। ১৯৭৩ এ আমরা পোস্টার লিখেছিলাম কুড়ি লক্ষ রেল শ্রমিকের কুড়ি দিনের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম। ওই সময়েই পিএনটি (Post and  Telegraph) তে ১২ লক্ষ কর্মচারীর লাগাতার আন্দোলন হয়। এখন রেল শ্রমিকের সংখ্যা ৬ লক্ষ। আর পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফ এর শ্রমিক সংখ্যা না বলাই ভালো। দু'লক্ষের কম। বিএসএনএল তথৈবচ। 

একটু স্মরণ করুন ১৯৭৭ এর পূর্বে সিপিআইএমের যুব সংগঠন ডি ওয়াই এফ এর প্রধান স্লোগান ছিল "হাত আছে কাজ দাও, নইলে বেকার ভাতা দাও"। মনে আছে আমাদের সভা সমিতিতে দীনেশ মজুমদার, অশোক দাশগুপ্ত, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, অমিতাভ বসু এরা বলতেন, কমরেড, বেকার ভাতা কোন স্থায়ী সমাধান নয়। কিন্তু একটি সরকার, সে তার চাকরি দেওয়ার দায় স্বীকার করে, বেকারদের অধিকার কে প্রতীকী স্বীকৃতি দিচ্ছে, বেকার ভাতার মাধ্যমে। ১৯৭৯ তে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে বেকার ভাতা চালু করেছিল। তখন কিন্তু দয়ার দান হিসেবে দেখা হয়নি। বরং এটা সাফল্য ও কৃতিত্ব বলে প্রচার করা হয়েছিল। এ রাজ্যের সরকার বিরোধী দল যে লক্ষ লক্ষ বেকারদের ভিড় দেখছেন যুব সাথী ক্যাম্পে, এটা কি বিগত ১৫ বছরের সৃষ্ট? লক্ষ লক্ষ বেকারদের ভিড় কি শুধুমাত্র এই রাজ্যের চিত্র? 

নেট দুনিয়ার তথ্য ভান্ডার জানাচ্ছে যে : The unemployment rate in India (for persons aged 15 ) was reported at approximately 4.8% in December 2025. falling from a peak of 5.6% in mid-2025 to 4.7%–4.8% by the end of the year. As of the Oct-Dec 2025 period, West Bengal reported an unemployment rate of 3.6%, which was significantly lower than the national average. Kerala continues to face higher unemployment challenges compared to the national average, with some 2025-26 reports indicating it as one of the states with higher jobless numbers (roughly 7.0%–8.0% in early-to-mid 2025). সোজা বাংলায় দাঁড়ায় -- ১৫ বছর ও তদুর্ধ্ব বয়সীদের বেকারত্বের হার সারা ভারতে ডিসেম্বর ২০২৫-এ ছিল প্রায় ৪.৮% । ২০২৫ সালের মাঝামাঝি ৫.৬% এর শীর্ষ থেকে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ৪.৭% - ৪.৮% এ নেমে এসেছে। পক্ষান্তরে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৫ সময়কালে, পশ্চিমবঙ্গে  বেকারত্বের হার ছিল ৩.৬% । যা জাতীয় গড় থেকে উল্লেখযোগ্য ভাবে অনেকটাই কম। আরও উল্লেখ যোগ্য যে,  জাতীয় গড়ের তুলনায় কেরলে বেকারত্বের হার বেশি। ২০২৫ - ২৬ রিপোর্ট অনুসারে এই হার ২০২৫ সালের প্রথম থেকে মাঝামাঝি সময়ে প্রায় ৭.০% - ৮.০% । অর্থাৎ উচ্চ বেকারত্বের হার এমন রাজ্যগুলির মধ্যে একটি হলো কেরল। এই তুলনা করার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু যুব সাথী প্রকল্প নিয়ে সিপিআইএম বিজেপি ও গদি মিডিয়া যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, তার প্রেক্ষিতে উল্লেখ করতে হলো। 

সিপিআইএম একদিকে ভাতা কে ভিক্ষা বলে সমালোচনা করেছে। তারা বলেছে চাকরি কোথায়? শিল্প কোথায়? শিল্প চাকরি পরিষেবা এগুলো হলো সমস্যার স্থায়ী সমাধান। অন্যদিকে বিজেপি এই ভাতা কে রেওরি বা দানসত্র খয়রাতি বলে নিন্দা করেছে। এই দান খয়রাতি বিজেপির ভাষায় দেশের অর্থনীতির পথ রুদ্ধ করে ২০২২ সালের বন্দেলখণ্ড এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধন করতে গিয়ে মোদীজি বলেন " it as a dangerous practice of distributing freebies to secure votes. He equates 'revri culture' to the irresponsible darkness for new India ..... he warned that this culture could push the country towards "darkness" and urged people, especially the youth, to guard against it ...... stated that the "revri culture" saddens honest taxpayers, as their hard-earned money is used for political handouts rather than infrastructure development. এটিকে কিছু রাজনৈতিক দলের ভোট সুরক্ষিত করার জন্য দান খয়রাতি বিতরণের একটি বিপজ্জনক অনুশীলন হিসাবে উল্লেখ করেছেন। তিনি 'রেভড়ি সংস্কৃতি'কে নতুন ভারতের জন্য "দায়িত্বজ্ঞানহীন অন্ধকারের" সাথে তুলনা করেছেন .... তিনি সতর্ক করেছেন যে এই সংস্কৃতি দেশকে "অন্ধকারের" দিকে ঠেলে দিতে পারে এবং মানুষকে, বিশেষ করে যুবকদের এর বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ...... বলেছেন যে "রেভড়ি সংস্কৃতি" সৎ করদাতাদের ব্যথিত করে, কারণ তাদের পরিশ্রমী অর্থ পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক কার্যসিদ্ধির জন্য ব্যবহৃত হয়।
স্মরণ রাখা দরকার এই বিজেপি সরকারই মহারাষ্ট্রে, দিল্লিতে, বিহারে, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানে "রেভড়ি সংস্কৃতি" ঘোষণা করেছিল ঠিক নির্বাচনের প্রাক মুহুর্তে। বিহারে মহিলাদের ব্যাংক একাউন্টে নির্বাচন ঘোষণার পরেও বেআইনিভাবে ১০ হাজার টাকা করে সরাসরি জমা দেওয়া হয় । মধ্যপ্রদেশ সরকার ২০২৩ সালে লাডলি বেহেনা যোজনার মাধ্যমে মহিলাদের ব্যাংক একাউন্টে সরাসরি টাকা জমা দেওয়ার প্রকল্প গ্রহণ করে। মহারাষ্ট্রে মুখ্যমন্ত্রী মাজি লডকি বহিন যোজনায় ২১ থেকে ৬৫ বছর বয়সী যোগ্য মহিলারা এই প্রকল্পের অধীনে প্রতি মাসে ১,৫০০ আর্থিক সহায়তা পান। উল্লেখযোগ্য এই সমস্ত প্রকল্পই পশ্চিমবাংলার কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভান্ডার, রূপশ্রী, সবুজ সাথী, প্রকল্পগুলি থেকে অনুসৃত হয়েছে। 

আর সিপিআইএম তো তার পার্টি কর্মসূচিতে সেই ১৯৫১ সালেই ঘোষণা করেছিল, তারা রাজ্য সরকারের অংশগ্রহণ করবে শুধুমাত্র আশু সমস্যাবলির প্রশমনের জন্য। কিছু রিলিফ জাতীয় কর্মসূচি গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে। .....pledged to carry out a modest programme of giving immediate relief to the people ....... while utilising all opportunities for forming such governments of a transitional character which give immediate relief to the people and thus strengthen the mass movement. কর্মসূচির ছত্রে ছত্রে ইমিডিয়েট রিলিফ এর কথা বলা হয়েছে। তারাই এখন প্রশ্ন তুলছে মমতা সরকারের বিরুদ্ধে যাদের নিজেদের দাবি ছিল বেকার ভাতা। 

বাংলাভাষী হওয়ার অপরাধে প্রতিবেশী অবাঙালি রাজ্যে বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু মিছিল ও হয়রানি। অথচ সিপিআইএম ও বিজেপির কোন হেল দোল নেই। বরং তাদের যুক্তি -- বাংলায় কাজ নেই বলেই নাকি বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক কে অন্য রাজ্যে যেতে হয়। যদিও তথ্য ভিন্ন কথা বলে। পশ্চিমবঙ্গে কাজের খোঁজে ভিনরাজ্য থেকে আসা পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ থেকে বাইরে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকের সংখ্যা ২২ লক্ষেরও বেশি। এই শ্রমিকরা মূলত বিহার, উত্তরপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশা থেকে এখানে আসেন।  আসলে সভ্যতার আদি থেকে পরিযান একটি সাধারণ সত্য। ইতিহাস বলে আফ্রিকার দক্ষিণ থেকে লক্ষ কোটি বছর আগে আদি মানবের পরিযান ঘটেছিল উত্তর আফ্রিকায় মিশরের দিকে। সেখান থেকে একটি গোষ্ঠী পরিযান করেছিল ইউরোপে। অন্য এক গোষ্ঠী পরিযান করে মধ্য এশিয়া দিয়ে, মেসোপটেমিয়া হয়ে, ভারতের দিকে। আরেকটি গোষ্ঠী মধ্য এশিয়া দিয়ে সোজা চীনের পথে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছায়। ভারতে আর্য আগমন, সেও তো এক পরিযান। সমালোচকরা নিশ্চয়ই জানেন মহারাষ্ট্র কেরল গুজরাট থেকে লক্ষ লক্ষ মানুষ আবুধাবি দুবাই আরব দুনিয়ায় বেশি মজুরির আশায় পাড়ি দেয়। ফলে ওই সমস্ত রাজ্যের মজুরের সংখ্যা কম ও চাহিদা বেশি। সেই চাহিদা মেটাতে এখান থেকে মজুর কাজের আশায় ওইসব রাজ্যে পরিযান করে। আবার উড়িষ্যা অন্ধ্র বিহার ঝাড়খন্ড উত্তরপ্রদেশের ঢের বেশি মানুষ এরাজ্যে পরিযায়ী হিসেবে আসে। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। 

ভাবতে অবাক লাগে, যে বামপন্থীরা বকেয়া মহার্ঘ ভাতার জন্য এত দাবী করছে, সেই মহার্ঘ ভাতাও কিন্তু একটি ভাতা। বাজারদরের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চাকুরীজীবীদের  বেতনের একটি অংশ বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হল মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধি। প্রশ্ন হল বাজারদর বৃদ্ধি পেলে চাকুরীজীবীর মহার্ঘ ভাতা বৃদ্ধির প্রয়োজন এটা যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু যেটা যুক্তির অগম্য, অবোধ্য, তা হল -- বাজারে কি শুধুমাত্র চাকুরিজীবিরাই ক্রেতা এবং ভোক্তা ? একই বাজারে অন্য কোটি কোটি ভোক্তা ও ক্রেতাকে আর্থিক সহায়তা দেবে কে? আশ্চর্যের বিষয় যারা মহার্ঘভতার দাবি করেন তারাই কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে ভাতা বন্টনের বিরোধিতা করেন। ভাবটা যেন সরকারি রাজকোষ শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারীর পৈতৃক অধিকার। 

দ্বিতীয় কথা হল, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন দেশের করদাতা জনগণ এর বিরোধিতা করেন এবং ব্যথিত হন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী মুষ্টিমেয় আয়কর দাতা জনগণের কথা বলছেন। ভাবটা যেন দেশের শতকোটি জনতা কেবল ভক্ষণ করে এবং গেলেন মুষ্টিমেয় আয়কর দাতার অর্থ। এ দেশের একজন ভিক্ষুকও করদাতা। কারণ তিনি বাজারে পণ্য সামগ্রী কেনেন, সেই পণ্যের ওপর পূর্বেই কর ধার্য করা আছে। অতএব প্রতিটি নাগরিকই এদেশে করদাতা এই বিপুলসংখ্যক করদাতার কাছে কিছু সরকারি সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই সমস্ত প্রকল্প। কারণ অন্যান্য পরিকল্পনার বেনিফিশিয়ারি কোটি কোটি জনতা নয়। কেতুগ্রাম, ভরতপুর বা রায়নার একজন চাষী কলকাতার মেট্রো রেল চাপতে আসেন না। 

তৃতীয় কথা হল, দেশের কোষাগারের অর্থ বিনিয়োগের অজুহাতে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা শিল্পপতিদের ঋণ দেওয়া হয় এবং সেই ঋণ অনাদায়ী থেকে যায়। এমনকি যুক্তি হিসেবে বলা হয়, এই অনাদায়ী ঋণ মুকুব না করলে নতুন করে লগ্নি হবে না। অর্থনীতি স্থবির হয়ে যাবে। এভাবেই কোষাগারকে মুষ্টিমেয়র স্বার্থে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। রাইট অফ এর নামে অনাদায়ী ঋণ মকুব করা হয়। তা নিয়ে সরকারের কোন উদ্বেগ নেই বরং সেটাকে যুক্তিসম্মত করার চেষ্টা চলে। চাকুরীজীবী জনতাও সেটা নিবিবাদে মেনে নেয়। 

চতুর্থ কথা হলো, যে পরিকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে সেই পরিকাঠামো সরকারি অর্থে মানে জনগণের করের পয়সায় প্রস্তুত করা হয়। শেষাবধি কিছু কর্পোরেট পুঁজির হাতে তুলে দেওয়া হয় অলাভজনক হিসেবে। সরকার রেল সড়ক পরিবহন বন্দর বিমানবন্দর বেতার দূরদর্শন টেলিফোন আধুনিক করবে আমাদের টাকায়। আর সেই আধুনিক শিল্প ৫ বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ব্যক্তিগত মালিকানায় জলের দরে বিক্রি করা হয়। আর এটার নাম হল উন্নয়ন। আর জনস্বার্থে যোজনার মানে হল এই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি। চমৎকার যুক্তি। এই কুযুক্তিতে বিজেপি সিপিএম সকলেই শামিল। 

প্রধানমন্ত্রী যাকে গর্ত খোঁড়ার কাজ বলে বিদ্রুপ করছেন, সেটা আসলে অর্থনীতির একটি গভীর অনুধাবনযোগ্য তত্ত্ব। সহজ উদাহরণ দিয়ে বলি, নলকূপে জল যখন নির্দিষ্ট স্তর থেকে নেমে যায় নলকূপের ওয়াসার টি হাঁস ফাঁস শব্দ তুলে হাওয়া বের করতে থাকে, জল নয়। তখন ওই নলকূপে বাইরে থেকে কিছুটা জল ঢেলে খানিকক্ষণ পাম্প করলে জল উঠে আসে। কলের মুখ দিয়ে গড়িয়ে জল পড়তে থাকে। ঠিক তেমনি দেশের অর্থনীতি যখন গভীর সংকটের মুখে তখন মানুষের মধ্যে চাহিদা জাগিয়ে তোলার উপায় হল মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি করা ও তার হাতে বাইরে থেকে কিছু নগদ অর্থ পৌঁছে দেওয়া। সেই অর্থ সে সঞ্চয় করে না। বরং ভোক্তা হিসেবে ব্যয় করে, তার জরুরী প্রয়োজনগুলি মেটায়। এর ফলেই তো নিচতলা থেকে বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হয় ও বাজার তেজি হতে শুরু করে। কেইনসের কথায়, মানুষকে গর্ত খোঁড়ার কাজ করিয়ে অর্থ জোগাতে হবে। আবার সেই গর্ত বোজানোর কাজ দিয়ে অর্থ দিতে হয়। এটা অর্থনীতির একটা তত্ত্বকথা। উচ্চ বেতন ভোগীর মহার্ঘ ভাতা বাড়লে সেটা বাজারে ফিরে আসে না। বরং সেটা জিপিএফ বা মিউচুয়াল ফান্ডের অন্যত্র ট্রান্সফার হয়ে যায়। নিচু তলার বাজার সচল না হলে অর্থনীতির দৈন্যদশা কিছুতেই ঘুঁচবে না। 

যে যতই যুব সাথী প্রসঙ্গে ভিক্ষা রেভরি ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করুন না কেন, বর্তমানে রিলিফ বা ত্রাণের রাজনীতিকে চালু রাখতেই হবে, এটা অর্থনীতির সূত্র। আমি নিজে জানি এক বৃদ্ধা মহিলা, তফশিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত। তিনি বারোশো টাকা লক্ষ্মীর ভান্ডার পান। তিনি ওই টাকা পেয়ে ৫০০ টাকা খরচ করতেন আর ৭০০ টাকার রেকারিং ইনভেস্টমেন্ট করেন পোস্ট অফিসে। পাঁচ বছর পরে একসাথে যে অর্থটা পেলেন, সেটা দিয়ে তার চা তেলেভাজা মুড়ির দোকানটাকে আরেকটু শক্ত সমর্থ্য করলেন। না, কাঁচের দরজা করেননি ঠিকই, কিন্তু খোলা ঝুড়িটার বদলে একটা শোকেস বানিয়েছেন ছোট করে। যে ডালের বড়ি বিক্রির দিদিমাকে আমি নিয়মিত অর্থ সাহায্য করতাম, যার ছেলেটা অকালে মদ খেয়ে মরে গেছে, বিধবা ছেলের বউ আর দুটো নাতনিকে নিয়ে সংসার চালায়। সেদিন তিনি এসেছিলেন। আমি তাকে বললাম, অনেকদিন হলো তুমি টাকা নিতে আসো না। তিনি বললেন, আজকেও টাকা নিতে আসিনি গো। এখন বৌমা বিধবা ভাতা আর লক্ষ্মীর ভান্ডার পায়, আমিও বার্ধক্য ভাতা পাই। বিনা পয়সার রেশন টা আছে। বাচ্চাদের পড়াশোনারও কোন খরচ নেই। সরকারি দোকান থেকে ওষুধ কিনে মোটামুটি ঠিক মতোই চলে যাচ্ছে। আমার জন্য চিন্তা কোরো না। 

এটাই আমার চোখে জনকল্যাণকারী অর্থনীতি ও ওয়েলফেয়ার স্টেটের ধারণা।

0 Comments

Post Comment