পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

আরোগ্য সেতুতে কি আরোগ্য হবে না নজরদারি হবে?

  • 12 April, 2020
  • 0 Comment(s)
  • 1829 view(s)
  • লিখেছেন : সুমন সেনগুপ্ত
যারা আধার বানিয়েছিল, সেই নন্দন নিলেকনি কিন্তু এই আরোগ্য সেতুর পিছনে অন্যতম মাথা। তাঁরাই ভারতবর্ষে ওই ‘বাহন’ বলে মোবাইল অ্যাপলিকেশন তৈরি করেছিল, যার সাহায্যে দিল্লি দাঙ্গার মতো ঘটনায় বেশ কিছু গাড়ি পোড়ানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। তাহলে আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য একটি কেন্দ্রীভুত তথ্য ভান্ডার বানানো যার মধ্যে দিয়ে সে শুধু নাগরিকদের নজরদারি করবে আর কিছু নয়।

 

সারা বিশ্বে যখন করোনা মোকাবিলা নিয়ে আলোচনা চলছে, ঠিক সেই সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার নিয়ে এলো একটি মোবাইল অ্যাপলিকেশন যার নাম ‘ আরোগ্য সেতু’। তারপর থেকে বিভিন্ন সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল সহ বিভিন্ন জায়গায় বিজ্ঞাপণ, এটাই নাকি বাঁচার অন্যতম রাস্তা। এটা দিয়েই নাকি বোঝা যাবে যে কোনও মানুষের আশেপাশে করোনা সংক্রামিত কোনও মানুষ এসেছেন নাকি? ইংরেজিতে এই পদ্ধতির নাম ‘কন্টাক্ট ট্রেসিং’।

প্রথমে জেনে নেওয়া যাক এই আরোগ্য সেতুটি কি সে সম্পর্কে। যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করেন তাঁদের মোবাইলে অনেক ধরনের মোবাইল অ্যাপলিকেশন থাকে, দিনে কত ক্যালরি খাবার খাওয়া জরুরী, কত ক্যালরি হেঁটে বা দৌড়িয়ে পোড়ানো উচিৎ, কত ব্লাড প্রেশার বা কত সুগার এরকম হাজারো আছে। এগুলো ব্যবহার করলে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় কি না, তা সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও অনেকেই এই মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করেন। বলা হয়েছে এর মধ্যে দিয়ে কোনও ব্যক্তি কোনও করোনা আক্রান্ত মানুষের সংস্পর্শে এসেছেন কিনা সেটা বোঝা যাবে। কিভাবে যাবে? মোবাইলের ব্লুটুথ এবং জিপিএস চালু রাখতে হবে, তার মধ্যে দিয়ে বোঝা যাবে আশেপাশে কোনও করোনা আক্রান্ত মানুষ আছেন কিনা? সুতরাং সঙ্গে সঙ্গে সরকারের কাছে তথ্য পৌঁছে যাবে যে অমুক অঞ্চলে একজন বা একাধিক করোনা আক্রান্ত মানুষ আছেন। এর পাশাপাশি কি করা হল বিভিন্ন স্কুলের মাধ্যম দিয়ে একটি নির্দেশ পাঠানো হল যে অভিভাবকেরা যেন তাঁদের মোবাইলে এই অ্যাপটি ইন্সটল  করে নেন। সিঙ্গাপুর এবং চিনে এই ধরনের মোবাইল অ্যাপ যদিও ব্যবহিত হয়েছে কিন্তু এই আরোগ্য সেতু অ্যাপ নিয়ে কিন্তু বেশ কিছু প্রশ্ন উঠে গেছে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া এই পদ্ধতি মেনেই কিছুটা সংক্রমণ প্রশমিত করেছে, কিন্তু ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এই পদ্ধতি কি খুব কার্যকর হবে?

যেই সব দেশে স্মার্ট ফোনের ব্যবহার খুব বেশী সেই সব দেশে তাও এই পদ্ধতি চলতে পারলেও ভারতের মতো দেশে যেখানে এর ব্যবহার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশের মধ্যে সেখানে কি এই আরোগ্য সেতু কাজ করবে? এখন প্রাথমিক ভাবে বলা হচ্ছে যে এটি স্বেচ্ছামূলক, কিন্তু অচিরেই এটিকে বাধ্যতামূলক করা হবে, ঠিক  যেভাবে আধারকে করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এবং নীতি আয়োগ থেকে এটা করার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে তাতে অন্য কিছু কি মনে হতে পারে? যেহেতু জিপিএস এবং ব্লুটুথ লাগে, তাই সাধারণ ফোনে এই অ্যাপ কাজ করবে না, তাই এরপরেই হয়তো শোনা যাবে সাধারণ ফোনের জন্যেও নতুন কোনও প্রযুক্তি আনা হবে, ঠিক যেভাবে ইউপিআই বা পেমেন্ট সিস্টেমের জন্য ওটিপি আসবে, ইত্যাদি প্রভৃতি।

প্রথমত যারা এই অ্যাপটি নিজেদের মোবাইলে স্থাপন করবেন, তাঁদের নাম, বয়স, লিঙ্গ এবং ফোন নম্বর দিয়ে নিজেকে নথিভুক্ত করতে হবে। সেই মানুষটির যদি কোনও শারীরিক অসুবিধা থাকে, ধরা যাক তিনি হার্টের রুগী বা ডায়াবেটিক বা অন্য কোনও সমস্যা আছে, সেগুলোও জানাতে হবে। তারপর বলা হবে যে তাঁর ফোনকে চালু রাখতে হবে সারাক্ষণ, যাতে এটা বোঝা সম্ভব হয় যে সেই মানুষটি কোথায় কোথায় যাতায়াত করছেন। এছাড়াও আরও একটি বিশেষ প্রযুক্তি এর মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকবে যা কিনা সেই মানুষটিকেও এই করোনা বিষয়ে সচেতন করবে। বলা হয়েছে যে আপাতত প্রত্যেকটি মানুষের তথ্য সেই মোবাইলেই জমা থাকবে, যদি কোনও মানুষ করোনা আক্রান্ত হন তখন সেই তথ্য সরকারের কাছে দেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত এটা এখনও জানা নেই যে এই তথ্য কতদিন কার কাছে থাকবে? অনেকে এই প্রশ্নও করছেন যে এই করোনা সংক্রান্ত অসুবিধা কবে মিটবে যেহেতু জানা নেই, সুতরাং এই তথ্য সরকার মুছবে কবে ? অনেকে এই অ্যাপটির সাহায্যে এনপিআর করানোর প্রক্রিয়া  চালু করা হবে বলতে চাইছেন কিন্তু সেটা হয়তো সত্যি নয় এখনও।

কিন্তু এই প্রযুক্তি দিয়ে যে নজরদারি হবে না সেই কথাটা কি একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায়? যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রীয় পরিকাঠামোতে স্বাস্থ্য রাজ্যের আওতাভুক্ত, কিন্তু এক্ষেত্রে রাজ্যগুলোও সম্পূর্ণ অন্ধকারে।  রাজ্য সরকারগুলি এখনও এরকম কোনও নির্দেশিকা পায়নি যে এই আরোগ্য সেতু সবাইকে নিতে হবে, তাই তাঁরা কি করবে সেটাও এখনও স্বচ্ছ নয়।

তৃতীয়ত এবং সবচেয়ে জরুরী যে বিষয়টি নিয়ে অনেকেই কথা বলেননি, তা হল এই অ্যাপটি একটি সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রযুক্তি। আমাদের মতো দেশে যেখানে শুধু করোনা আক্রান্ত এই সন্দেহে একেক জন মানুষকে গ্রাম ছাড়া করা হয়, বা অবসাদে কোনও কোনও মানুষ আত্মহত্যাও করছেন এই খবরও পাওয়া যাচ্ছে সেখানে এই ‘আরোগ্য সেতু’ অ্যাপটি কি মানুষে মানুষে আরও দূরত্ব বাড়াবে না? একজন মানুষ যদি জানতে পারেন তাঁর পাশের মানুষটি করোনা আক্রান্ত তাহলে কি মব লিঞ্চিঙ বা গণপিটুনির ঘটনা ঘটবে না সেই নিশ্চয়তা দেওয়া যায়? যে দেশে শুধু খাদ্যাভাসের কারণে একের পর এক গণহত্যা ঘটে, সেখানে কে করোনায় আক্রান্ত, কে সংখ্যালঘুদের কোন সমাবেশে হাজির ছিল সেটাও যদি বোঝা যায় তাহলে একজন নাগরিকের জীবন কি অসুবিধায় পড়তে পারে না?

পরিশেষে কিছু কথা ঃ যারা আধার বানিয়েছিল, সেই নন্দন নিলেকনি কিন্তু এই আরোগ্য সেতুর পিছনে অন্যতম মাথা। তাঁরাই ভারতবর্ষে ওই ‘বাহন’ বলে মোবাইল অ্যাপলিকেশন তৈরি করেছিল, যার সাহায্যে দিল্লি দাঙ্গার মতো ঘটনায় বেশ কিছু গাড়ি পোড়ানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। তাহলে আসলে কেন্দ্রীয় সরকারের উদ্দেশ্য একটি কেন্দ্রীভুত তথ্য ভান্ডার বানানো যার মধ্যে দিয়ে সে শুধু নাগরিকদের নজরদারি করবে আর কিছু নয়।

 

 

 

0 Comments

Post Comment