পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

সলিল-শতকে সলিল স্মরণ

  • 30 December, 2025
  • 0 Comment(s)
  • 359 view(s)
  • লিখেছেন : অনর্ঘ মুখোপাধ্যায়
কলেজে পড়ার সময়েই সলিল চৌধুরী মার্ক্সবাদীদের সান্নিধ্যে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা কালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট ১৯৪৩ সালে বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাকদ্বীপ-সংলগ্ন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সেখানে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, সেগুলোই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিল তাঁর অনেক কালজয়ী সংগ্রামী গানের ভিত্তি।

দেখতে দেখতে জন্মশতবার্ষিকীতে পা রাখলেন সলিল চৌধুরী, আর কালের নিয়মেই সেই শততম জন্মবর্ষও অতিক্রান্ত হতে চললো। ভারতের আধুনিক গানের জগতে তিনি এক কালজয়ী কম্পাস। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি বাংলা, মালয়ালম আর হিন্দি গানের জগতে গীত রচনা, সুর সংযোজন এবং সঙ্গীত পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হিসাবে কাজ করে গিয়েছেন। আর বাংলা গানের ক্ষেত্রে বলা যায় তিনি এক অনবদ্য বিপ্লব ঘটিয়েছেন। আবার, অন্যভাবে বলতে গেলে, সঙ্গীতের সমস্ত ক্ষেত্রে এমন একটা শূন্যস্থান তিনি রেখে গেছেন, যা আজ পর্যন্ত কেউ ভরাট করে তুলতে পারেননি। তাই তাঁর মৃত্যুর তিন দশক পরেও সিনেমার গান, আধুনিক গান বা গণসঙ্গীত নিয়ে যাকিছু আলোচনা হয়, সেখানে “সলিল চৌধুরী”-র নাম ঘুরে ঘুরে উঠে আসে। 

তাঁর জন্ম ১৯২৫ সালের ১৯শে নভেম্বর বর্তমান দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার গাজীপুর গ্রামে (যা এখন রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার অন্তর্গত)। তাঁর পিতার নাম জ্ঞানেন্দ্রনাথ, মাতার নাম বিভাবতী। সলিল চৌধুরীর তিন ভাই ও চার বোন ছিল। ভাইদের নাম সুনীল, সমীর, সুহাস; আর বোনেদের নাম লিলি, হাসি, কাজল ও মিন্টু। তাঁর পিতা পেশায় একজন চিকিৎসক ছিলেন এবং কর্মজীবনের একটা বড় অংশ আসামের একটি চা বাগানে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পিতা চা বাগানের কুলি এবং স্বল্প বেতনের কর্মচারীদের সাথে নাটক মঞ্চস্থ করতেন আর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড অনুষ্ঠিত করতেন। সলিলের শৈশব ও বাল্যকালের একটা অংশ পিতার কর্মস্থলে কেটেছে। সেখানে তাঁর পিতা জ্ঞানেন্দ্রনাথ এবং তাঁর আইরিশ সহকর্মী বন্ধু ডক্টর ম্যালোনির সংগ্রহে থাকা পাশ্চাত্যের শাস্ত্রীয় লোকসঙ্গীতের রেকর্ড শুনতেন। পিয়ানো, এসরাজ আর বাঁশিতে সেখানেই তাঁর হাতেখড়ি হয়। তার পরে তাঁর পিতা বাংলায় ফিরে এলে সলিলের পড়াশুনা আরম্ভ হয় তাঁর মাতুলালয়ের সন্নিকটে অবস্থিত হরিনাভি দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অ্যাংলো সংস্কৃত হাই স্কুলে। সেখান থেকেই তিনি ১৯৩৮ সালে সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে এন্ট্রান্স পাস করেন। এর পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আই. এ. পাস করেন এবং সেখান থেকে স্নাতক হয়েছিলেন। 

কলেজে পড়ার সময়েই তিনি মার্ক্সবাদীদের সান্নিধ্যে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলা কালীন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট ১৯৪৩ সালে বাংলার ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময়ে সলিল চৌধুরী অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে দক্ষিণ ২৪ পরগণার কাকদ্বীপ-সংলগ্ন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। সেখানে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, সেগুলোই পরবর্তীকালে হয়ে উঠেছিল তাঁর অনেক কালজয়ী সংগ্রামী গানের ভিত্তি। 

১৯৪৩ সালে মুম্বাইতে গঠিত হয় প্রগতিশীল নাট্য ও সঙ্গীত শিল্পীদের সংগঠন ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ বা IPTA (Indian Peoples' Theater Association)। তার পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৪ সালেই বাংলায় গণনাট্য সঙ্ঘের একজন সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন সলিল চৌধুরী। এই সময়ে গণসঙ্গীতের মাধ্যমে একজন দক্ষ গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন “বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা”, “হেই সামালো ধান হো”, “ও মোদের দেশবাসী রে” এবং “ও আলোর পথযাত্রী”-র মতো কয়েকটি বিশিষ্ট গণসঙ্গীতের মাধ্যমে। সেদিন থেকে শুরু করে আজ অবধি এই গানগুলির জনপ্রিয়তা বাংলার সঙ্গীতপ্রিয় শোতাদের কাছে এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয়নি। ভারত স্বাধীন হওয়ার কিছু দিন পরে, ১৯৪৮ সালে তেলেঙ্গানায় সশস্ত্র অভ্যুত্থানের ডাক দেবার ফলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি যখন নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়ে যায়, তখন অন্য অনেকের সঙ্গে সলিল চৌধুরীও দীর্ঘদিন আত্মগোপন করে ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টি সশস্ত্র সংগ্রামের ঘোষণা ছেড়ে সংসদীয় রাজনীতিতে যুক্ত হলে সেই নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। তখন তিনি আবার সঙ্গীত জগতে ফিরে আসেন “গাঁয়ের বধূ” গানের হাত ধরে। প্রথমত, এই গান সলিল চৌধুরীকে আপামর বাঙালীর কাছে পৌঁছে দিয়েছিল; দ্বিতীয়ত, এই গানের হাত ধরেই তৈরি হয়ে গেল সলিল চৌধুরী এবং হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের দীর্ঘস্থায়ী জুটি (যে জুটি বাঙালীকে দুই দশকের বেশি সময় ধরে উপহার দিয়ে গেছে “অবাক পৃথিবী”, “বিদ্রোহ আজ”, “রানার”, “পালকির গান”, “ঠিকানা”, “মনের জানালা ধরে”, “শোনো কোনো একদিন”, “পথে এবার নামো সাথী”, “দুরন্ত ঘুর্ণীর এই লেগেছে পাক” বা “আমায় প্রশ্ন করে নীল ধ্রুবতারা”-র মতো কালজয়ী গান); তৃতীয়ত, এই গানের মধ্যে থেকে সলিল চৌধুরীর সাঙ্গীতিক শৈলীতেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গেল। এর পর থেকেই সলিল চৌধুরীর গানের মধ্যে ক্রমাগত প্রকাশ পেতে থাকল রেনেসাঁ-উত্তরকালের পাশ্চাত্য সঙ্গীতের হার্মোনি, কাউন্টারপয়েন্ট, ট্রান্সপোজ়িশন, ক্রোম্যাটিক প্রোগ্রেশন বা অ্যাটোনাল অর্কেস্ট্রেশনের মতো বৈশিষ্ট্যসমূহ। উনি সাধারণত কখনও একটা গান পুরোপুরি শেষ করতেন না। অর্ধেক করে রেখে দিয়ে অন্য গানে চলে যেতেন বা কবিতা লিখতে বসে যেতেন। যখন রেকর্ডিংয়ের জন্য শিল্পী গানটা শিখতে আসতেন, তখন বাকি গানটা লিখে দিতেন।

সলিল চৌধুরীর সঙ্গীতের বহুমুখী গতিপথ বুঝতে গেলে শুরুতেই “রানার” গানটাকে বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। গানটা শুরু হল নির্ভেজাল মেজর স্কেলে। তারপরে “দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছোটে” বাক্যটায় উপস্থিত হয়েই সলিল চৌধুরী পিলু রাগের চলনের অংশ এবং মেজর ফ্রিজিয়ান (Major Phrygian) স্কেল ব্যবহার করলেন। তাই প্রথমবার উচ্চারিত “দিগন্ত” শব্দ রয়েছে মেজর স্কেলে, আর দ্বিতীয় “দিগন্ত” শব্দ রয়েছে মাইনর স্কেলে। তার অল্প পরিমাণে খাম্বাজ ঠাট ব্যবহার করে আবার তিনি ফিরে আসছেন মেজর স্কেলে। তারপর “রানার চলেছে বুঝি ভোর হয়-হয়” লাইনে প্রবেশ করছে ভৈরব রাগ আর তার পরের লাইন “আরও জোরে, আরও জোরে, হে রানার! দুর্বার, দুর্জয়” রাগ আহির ভৈরবকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। পরের দুটো লাইন যথাক্রমে ভৈরবী রাগ এবং রাগ বিভাসের ওপর সৃষ্ট। পরের স্তবকে রয়েছে খাম্বাজ ঠাট, রাগ আহির ভৈরব, ভৈরবী ঠাট এবং খুব ক্ষীণভাবে রয়েছে রাগ শিবরঞ্জনীর ছোঁয়া। এর পরের তালবিহীন অথচ মুক্তছন্দ-বিশিষ্ট স্তবকের (“এমনি করেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে….”) প্রথমার্ধে ভৈরব ঠাটের প্রয়োগ রয়েছে আর দ্বিতীয়ার্ধে রয়েছে ভৈরবী ঠাট। এই স্তবক শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথমবার ঘটে যাচ্ছে খরজ পরিবর্তন বা ট্রান্সপোজ়িশন (Transposition)। পরবর্তী স্তবকে আবার ফিরে আসছে তাল এবং ছন্দ, ফিরে আসছে গানের মূল লয়েই। এর পরের স্তবকের প্রথম লাইন “দরদে তারার চোখ কাঁপে মিটিমিটি”-থেকেই দ্বিতীয়বার খরজ পরিবর্তন ঘটেছে। এই স্তবকের শেষ লাইন “সময় হয়েছে নতুন খবর আনার”-এ সলিল চৌধুরী ক্রোম্যাটিক চলন (Chromatic Note Progression) প্রয়োগ করছেন কর্ণাটী মার্গসঙ্গীতের অন্যতম মেলকর্তা রাগ রত্নাঙ্গীর আদলে। তার পরের “রানার” শব্দটাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন মেজর স্কেলে। 

ক্রোম্যাটিক চলনের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল “চলে যে যায় দিন” গানটা। রাগান্বেষীরা হয়ত বহু কষ্টে ভৈরব, আহির ভৈরব আর পিলু রাগের ক্ষীণ উপস্থিতি অনুভব করবেন এই গানে, তবুও সেই অনুভূতি বাস্তবিকই ক্ষীণ। বরং, এই গানটায় বেশি করে ফুটে উঠেছে পাশ্চাত্য শৈলী— বিশেষত ক্রোম্যাটিক স্কেলের আবির্ভাব-তিরোভাবের খেলা আর অ্যাক্সিডেন্টাল নোট (Accidental Note) বা বিবাদী স্বরের প্রাচুর্য। গানটার আরেকটা উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল, গানটার টোনালিটি (Tonality)-র খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। অর্থাৎ, মাইনর স্কেলে নির্মিত গান হলেও, মাইনর স্কেল থেকে মেজর স্কেলে বারবার বদলে যায় গানটার চলন, আর, ক্রোম্যাটিক নোট প্রোগ্রেশন এবং অ্যাক্সিডেন্টাল নোটের ব্যবহার এই টোনালিটির পরিবর্তনকে সাবলীল করে তুলেছে।

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের “পালকির গান” কবিতায় সুরারোপ করার সময়ে সলিল চৌধুরী তাল পরিবর্তন করার মাধ্যমে পালকিবাহকদের চলার গতির হাস-বৃদ্ধি ফুটিয়ে তুলেছেন। গানটার মেলোডি মেজর স্কেলে নির্মিত হয়েছে, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাগ চারুকেশী, আশাবরি ঠাট, মেলোডিক মাইনর স্কেল এবং রাগ আহির ভৈরব। সব শেষে গানের স্কেল স্থানান্তরিত হয়ে যাচ্ছে টোড়ি ঠাটে। সলিল চৌধুরী পালকিবাহক বেহারাদের উপস্থিতি বুঝিয়েছেন কোরাসের মাধ্যমে। তাঁরা যে স্বর বিন্যাস অনুসরণ করে গান গাইছেন, তা আসলে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া প্রধান মেলোডির কাউন্টারপয়েন্ট হিসাবে কাজ করে।

“গাঁয়ের বধূ” ভৈরবী রাগকে আশ্রয় করে নির্মিত হয়েছে। গানটা শুরু হচ্ছে মধ্যলয়ে ৬ মাত্রায়। তারপর দ্রুতলয়ে ৮ মাত্রার ছন্দে প্রবেশ করছে। এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে স্বরবিন্যাসে সলিলবাবু নিয়ে এসেছেন ক্রোম্যাটিক প্রোগ্রেশন— মালকোষ রাগের মাইনর পেন্টাটোনিক স্কেলের সঙ্গে শুদ্ধ ধৈবত স্বর সংযুক্ত করেছেন। শেষে গিয়ে গানের অন্তিম দুটো লাইন সম্পূর্ণভাবে তালবর্জিত হয়ে যাচ্ছে। এই গানটার চলনের কাঠামো অপেরার সঙ্গীতের আঙ্গিককে অনুসরণ করে।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা অনুসারে “ঠিকানা” গানটা তৈরি করার সময়ে সলিল চৌধুরী পুরোপুরি পাশ্চাত্যের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই গানে ব্যবহার করেছেন ব্যারোক পিরিয়ড (Baroque Period)-এর সঙ্গীতের শৈলী, আবার রোমান্টিক পিরিয়ড (Romantic Period)-এর সঙ্গীতের বৈশিষ্ট্যও রয়েছে অনেক অংশ জুড়ে (বিশেষত, বাদ্যযন্ত্রের কারুকার্যে)। সঙ্গে রয়েছে রিলেটিভ মেজর এবং রিলেটিভ মাইনর স্কেলের ব্যবহার; আছে তাল ও ছন্দের পরিবর্তন।

প্রসঙ্গত বলে রাখি, গানের স্কেলের টোনালিটি নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সলিল চৌধুরীর ছিল ব্যাতিক্রমী দৃষ্টিভঙ্গি। “এই জীবন এমনি করে আর তো সয় না”, “যা গেছে তা যাক”, “যাক, ধুয়ে যাক, মুছে যাক” বা “আমি ঝড়ের কাছে রেখে গেলাম”-এর মতো গানে যার অনবদ্য প্রকাশ। গানগুলোর বাণী পাঠ করলে সাধারণত করুণ রসের উদ্রেক হবে, কিন্তু সলিল চৌধুরী যেন সেই করুণ রসকে উপেক্ষা করতে চান। দুঃখের নাগপাশে আটকে পড়ে থাকা তাঁর সঙ্গীতবোধের ধাতে সয় না। তাই দুঃখের পাশাপাশি তিনি মোহভঙ্গের আনন্দকে প্রকাশ করতে চান। সেই বোধের ভিত্তিতে তাঁর গানের প্রিলিউড হয়ে উঠল স্বতন্ত্র এবং নৃত্যশীল। তাঁর সঙ্গীত শুনে বাঙালীর কান রাগ-রাগিনী আর লোকসঙ্গীতের সুরের পাশাপাশি সোনাটা (Sonata), সিম্ফোনি (Symphony), স্যুইট (Suite), কোয়ার্টেট (Quartet) বা কনচের্তো (Concerto)-র সুর শোনার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করল। তাঁর কথায় ও সুরে, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া “ঐ যে সবুজ বনবীথিকা” গানের ইন্টারলিউডে বিঠোফেনের ষষ্ঠ সিম্ফোনির ছোঁইয়া রয়েছে, ‘ছায়া’ সিনেমার থিম মিউজ়িকে বিঠোফেনের “Für Elise”-এর প্রভাব আছে এবং ঐ সিনেমারই কালজয়ী গান “ইতনা না মুঝসে তু পেয়ার বাঢ়া”-তে রয়েছে মোৎজ়ার্টের ২৫তম সিম্ফোনির প্রথম মুভমেন্টের সুরের স্পর্শ। দেশজ মেলোডির ওপর পলিফোনিক অর্কেস্ট্রেশনের যে কাজ শুরু হয়েছিল কয়েক দশক আগে থেকে পঙ্কজ কুমার মল্লিক, রাইচাঁদ বড়াল, অনুপম ঘটক, শচীনদেব বর্মণ বা কমল দাশগুপ্তর হাত ধরে, সেই কাজ আরও বহু দিক থেকে পরিপূর্ণ হয়ে উঠল সলিল চৌধুরীর গানে। শুধু তাই নয়, '৬০-এর দশক পেরোতে না পেরোতেই তাঁর বাদ্যযন্ত্রের তালিকায় এসে যুক্ত হতে লাগল বেস গীটার, ইলেক্ট্রিক গীটার, ইলেকট্রনিক কীবোর্ড, ড্রামস্, বঙ্গো বা কোঙ্গা। বাংলা তো বটেই, সমগ্র উপমহাদেশের গান তাঁরই হাত ধরে পূর্ণাঙ্গভাবে সাম্বা (Samba), সালসা (Salsa), বাচাতা (Bachata), ক্যালিপ্সো (Calypso) আর জ্যাজ়্ (Jazz)-এর স্বাদ পেল। তাঁরই তৈরি করা পথে পা বাড়িয়েছেন রাহুলদেব বর্মণ, হৃদয়নাথ মঙ্গেশকর, ইলাইয়ারাজা, অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবজ্যোতি মিশ্র, গৌতম চট্টোপাধ্যায় (‘মহীনের ঘোড়াগুলি’-র প্রতিষ্ঠাতা) বা কবীর সুমনের মতো দিকপাল সঙ্গীতজ্ঞরা। আধুনিক গানের ক্ষেত্রে পল্লীগীতি এবং রাগসঙ্গীতের ওপর কীভাবে পাশ্চাত্যের পলিফোনিক অর্কেস্ট্রেশন প্রয়োগ করতে হবে, তা নিয়ে তিনি বহু গবেষণাধর্মী বক্তৃতা দিয়েছেন। আধুনিক গান এবং গণসঙ্গীতের মধ্যে তিনি দার্শনিক মেলবন্ধন স্থাপন করেছেন সফলভাবে যার নিদর্শন হল “প্রান্তরের গান আমার”, “আজ নয় গুণগুণ গুঞ্জন প্রেমের” বা “নৌকা বাওয়ার গান”-এর মত কালজয়ী গান।

“সুরের এই ঝরো-ঝরো ঝর্ণা” গানটা সরাসরি পাশ্চাত্য সঙ্গীতের আঙ্গিককে খণ্ডন করে দিয়েছে। গানটার অন্তরায় সবার আগে কোরাস এবং ব্যাকিং ভোকালের শিল্পীরা স্তবকের প্রথম লাইনটা গাইছেন, মূল গায়িকা সবিতা চৌধুরী প্রবেশ করছেন তাঁদের পরে। গান কম্পোজ় করার এই পদ্ধতি তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষাপটে সত্যিই বৈপ্লবিক ছিল।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পরিসরে সলিল চৌধুরীর বিচরণ ছিল অবাধ বিচরণ। আলাহিয়া বিলাবল এবং খাম্বাজ রাগের ওপরে তিনি কম্পোজ় করেছেন “না, যেও না”, “যারে যা, যা ফিরে যা” গানে ব্যবহার করছেন রাগ জয় জয়ন্তী, কল্যাণ ঠাটের অন্তর্গত ইমন কল্যাণ এবং শ্যাম কল্যাণ রাগ ব্যবহার করে তিনি সৃষ্টি করেছেন “প্রান্তরের গান আমার” এবং “না, মন লাগে না”। ভৈরবী রাগে নির্মিত “আমি পারিনি, বুঝিতে পারিনি” গানে তিনি ভৈরবীর স্বরবিন্যাস বজায় রেখেই, স্রেফ কর্ড প্রোগ্রেশনের কারুকার্য করে দুই অন্তরায় মাইনর স্কেল থেকে রিলেটিভ মেজরে গিয়ে মাইনর স্কেলে ফিরে এসেছেন।

চলচ্চিত্রের গান এবং আবহসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও সলিল চৌধুরী নিজের অভিনবত্ব দেখিয়ে গেছেন। তিনি বাংলা চলচ্চিত্র জগতে সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে আবির্ভূত হন ১৯৪৯ সালে 'পরিবর্তন' সিনেমায়। তারপর, ‘বরযাত্রী’, ‘পাশের বাড়ি’ এবং ‘বাঁশের কেল্লা’ সিনেমায় বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় সুর উপহার দিয়েছেন। পরবর্তী কালে ‘রিকশাওয়ালা’, ‘রাতভোর’, ‘একদিন রাতে’, ‘বাড়ি থেকে পালিয়ে’, ‘গঙ্গা’, ‘রায় বাহাদুর’, ‘কিনু গোয়ালার গলি’, ‘মর্জিনা আবদুল্লা’, ‘কবিতা’ বা ‘সিস্টার’-এর মতো সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। হিন্দি ছবিতে তাঁর আগমন হয় ‘দো বিঘা জ়মিন্’ সিনেমার মাধ্যমে। হিন্দিতে ‘বিরাজ বহু’, ‘জাগতে রহো’, ‘মধুমতি’, ‘কাবুলিওয়ালা’, ‘ছায়া’, ‘পিঞ্জরে কে পঞ্ছি’, ‘হাফ টিকিট’, ‘পরখ’, ‘চান্দ্ অর সুরজ্’, ‘আনন্দ্’ বা ‘অন্নদাতা’ তাঁর সঙ্গীত পরিচালনার অন্যতম নিদর্শন। ‘পিঞ্জরে কে পঞ্ছি’-র পরিচালক এবং ‘পরখ’ সিনেমার গল্পকার ছিলেন স্বয়ং সলিল চৌধুরী। ‘কানুন’ সিনেমায় কোনো গান না থাকলেও, তাঁর সৃষ্ট আবহসঙ্গীত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ১৯৬৫ সালে ‘চেম্মীন’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি পদার্পণ করেন মালয়ালম ছবির জগতে। এরপর ‘রাসলীলা’, ‘থমাসলীহা’, ‘প্রতীকশা’, ‘দেবদাসী’ বা ‘থুম্বোলি কাদপ্পুরম’ সিনেমায় সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার হিসাবে অভিনব নিদর্শন তৈরি করেছেন। এছাড়াও, বহু ওড়িয়া, অসমীয়া, মারাঠি, তামিল কন্নড় ও তেলুগু ছবিতে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসাবে কৃতিত্বের নিদর্শন রেখে গেছেন। এই ভাবেই এক বঙ্গসন্তান আপন প্রতিভা বলে সর্বভারতীয় সঙ্গীতকার হয়ে উঠেছেন। এরকম উদাহরণ তাঁর পরে আর খুব বেশি তৈরি হয়নি।

সলিল চৌধুরীর গানের প্রধান আকর্ষণ সুরের জটিল বিন্যাসে। গান তৈরি করার সময় সলিল একই সুরের ওপরে তিনটে আলাদা অ্যারেঞ্জমেন্ট করতেন। ধরা যাক, মূল বাংলা গানের সুরে যদি গায়কীতে লোকসঙ্গীতের ছোঁয়া থাকে, সেই একই গানের হিন্দি রূপান্তরে থাকবে লাস্যের ভাব। আবার সেই সুর যখন দাক্ষিণাত্যের ছবিতে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে মিশে যায় কর্ণাটকী সঙ্গীতের উপাদান।

গণনাট্য সঙ্ঘের গোড়ার যুগে, সুরের ঠিক এই রকম প্রয়োগ নিয়ে বাংলার আর এক প্রখ্যাত গণসঙ্গীত হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সঙ্গে সলিল চৌধুরীর এক বিখ্যাত তর্ক হয়েছিল। হেমাঙ্গ বিশ্বাস বলেছিলেন যে গণসঙ্গীত যারা শুনবে, শুনে উদ্বুদ্ধ হবে, তারা হচ্ছে মাটির কাছের মানুষ। তাদের কাছে দেশজ সুরের মাধ্যমে মেসেজ পৌঁছবে তাড়াতাড়ি। সলিল নির্মিত গানের সুরের এই পশ্চিমি চলন তাঁর একেবারেই না-পসন্দ ছিল। পাশাপাশি, সলিল চৌধুরীর বক্তব্য ছিল যে তাঁরা সঙ্গীতের মঞ্চে যাদের বিরুদ্ধে লড়ছেন, তারা ফর্মের দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে রয়েছেন। যেমন আধুনিক কামান-বন্দুকের মতন যুদ্ধাস্ত্রের বিরুদ্ধে লাঠি টাঙি বল্লম জাতীয় দেশজ অস্ত্র দিয়ে লড়াই চালানো যায় না, তেমনই গানের লড়াইও করতে হবে যেখানে যেরকম আধুনিক উপায় আছে — সে সব ব্যবহার করে। পশ্চিমি চলনে বাঁধা গান সুন্দরবনের প্রত্যন্তে মানুষ শুনছেন, উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তাছাড়া লোকসঙ্গীত তো আছে এবং থাকবে। কিন্তু আমাদের গানের ইমারত শুধু সেখানেই আটকে থাকবে?

সলিল চৌধুরীর শিল্পীসত্তা শুধু সঙ্গীতের জগতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কথা সাহিত্যিক হিসাবেও তিনি তাঁর সৃজনশীল ক্ষমতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। ‘এক গুচ্ছ চাবি’, ‘ইউলিসিস’, ‘ফাঁদ’, ‘কবিতা’, ‘শৃঙ্খলা বিশৃঙ্খলা’, ‘বয়স’ বা ‘শপথ’-এর মতো কবিতায় তিনি তুলে ধরেছেন বাস্তবতা, জীবনবোধ, মতাদর্শ এবং নৈতিকতার কথা। তাঁর লেখা ‘ড্রেসিং টেবিল’ বা ‘রিকশাওয়ালা’-র মতো ছোটোগল্প আজও পাঠকের মনকে আন্দোলিত করে দেয়। সেই সময় বিমল রায়ের সহকারী ছিলেন গুলজার। তিনি এক সময় বলেছেন, সলিলদার লেখা বড়ই সিনেম্যাটিক। আসলে গল্প বলার একটা অসামান্য দক্ষতা ছিল ওঁর। কখনও তার প্রকাশ হত গানের কথায়, আবার কখনও বা গল্পে, কবিতায়। এ ব্যাপারে সলিল চৌধুরী নিজে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “আমি জানি না, কোনটা নিয়ে চলব: কবিতা, গল্প লেখা, অর্কেস্ট্রেশন, না ফিল্মের গান কম্পোজ় করা। ক্রিয়েটিভিটি নিয়েই আমার কাজ। যখন যেটা সেই মুহূর্তটায় বা আমার মানসিক অবস্থার সঙ্গে খাপ খায়, সেটা নিয়ে কাজ করি।”

সলিল যে গীতিকার সত্তার থেকে স্বতন্ত্র কবিত্বসত্তার অধিকারী, তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘একগুচ্ছ চাবি’ কবিতায়:
“…আসল কথা কী জানিস
ওই সব চাবিগুলো হল সত্যের সততার যুক্তির নিষ্ঠার
আজকাল ওই সব চাবি দিয়ে কোনো দরজা খোলে না
তবু তুই ফেলে দিস না
যত্ন করে তুলে রেখে দিস।
তুইও যখন চলে যাবি
তোর সন্তানের হাতে দিয়ে যাস
ওই সব চাবির গুচ্ছ
হয়তো তাদের হাতে আবার একদিন
ওইসব চাবি দিয়ে
ওইসব দরজাগুলো খুলে যাবে।”

অথবা স্মরণ করা যাক ‘ইউলিসিস’ কবিতার কথা:
“এক বড় ঝড়কে পোষ মানিয়ে
হাতপাখা নাম দিয়ে ঘরে এনেছি
দুরন্ত বন্যাকে কোণঠাসা করে
একটি গেলাসে তাকে পান করেছি
সূর্যের পিঠে আমি হাত বুলিয়ে
কিছু তার তেজ এনে আলো জ্বেলেছি
তারা ভরা বিশ্বকে অক্ষর করে
ছোট এক বই লিখে পড়ে ফেলেছি।”

সলিল চৌধুরী কবিতায় কল্পচিত্র নির্মাণ করার ক্ষেত্রেও বেশ দক্ষ। ‘শৃঙ্খলা-বিশৃঙ্খলা’ কবিতায় তার নিদর্শন পাওয়া যায়:
“একটা চার দেওয়ালে বদ্ধ গা বমি করা ভ্যাপসা গন্ধ।
একটা টাকমাথা সংস্কৃত পন্ডিতের চাবুক আস্ফালন।
মন্ত্রীদের রেডিও ভাষণ,
পায়ে পা ফেলে সৈন্যদের মার্চ।
শৃঙ্খলা কথাটার মধ্যে একটা চালাকি অাছে।
কথাটা সমান জমিতে দাড়িঁয়ে বলা যায় না।
উচুঁ প্লাটফর্মে উঠতে হয়।
শ্রোতারা সবসময় নিচু শ্রেণীর
আর উপদেষ্টা হলেন বক্তা।
বিশৃঙ্খলা কথাটা কিন্তু শৃঙ্খলার ঠিক বিপরীত নয়।
শৃঙ্খল থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়,
ওর মধ্যেও শৃঙ্খলের একটা ঝনঝন আছে
তবে সেটা বাজে বেতালায়।
ওর মধ্যে একটা ইচ্ছাকৃত অনিচ্ছা আছে।
আগাছার বেপরোয়া গন্ধ।
ওটা যদি স্বতঃস্ফূর্ত হতো,
তাহলে ওর মধ্যে অরণ্যের সম্ভাবনা ছিলো।”

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় একবার বলছিলেন, “আমরা তো অনেক রঙিন বিপ্লবের কবিতা লিখেছি। কিন্তু শুধু মাত্র ‘শপথ’ লিখে সলিল বুঝিয়ে দিয়েছে ও কত বড় মাপের কবি…” অথচ বাংলার প্রগতিশীল সাহিত্যের আলোচনায় আজও তেমন করে তাঁর নাম উচ্চারণ করা হয় না! দুঃখজনক সত্যটা হল, ‘সুরকার’ সলিল চৌধুরীর প্রতিভার দীর্ঘ ছায়ায় বারবার ঢাকা পড়ে যান কবি সলিল, গল্পকার সলিল, চিত্রনাট্যকার সলিল। 

দীর্ঘ কর্মজীবনে সলিল চৌধুরীর সম্ভারে রয়েছে ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড, রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক, বি.এফ.জে.এ. পুরস্কার, আলাউদ্দিন স্মৃতি পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার, মহারাষ্ট্র গৌরব পুরস্কার। ২০১৩ সালে ভারত সরকার তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে ডাকটিকিট প্রকাশ করেছে।

এতো প্রতিভা এতো অবদান, কিন্তু যদি প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির কথা বলি, তবে সেটা বলতে গেলে তিনি একটা জিনিস পাননি, সেটা হল তাঁর নিজের রাজ্য থেকে কোনো রাষ্ট্রীয় পুরস্কার। এই পুরষ্কার না পাওয়ার ব্যথা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি একবার বলেছিলেন, “আমার কোনো খেদ নেই জানো। গান আমাকে বিশ্বজুড়ে ভালোবাসা পাইয়ে দিয়েছে। কতো কিছুই পাইনি, শেষে সব ভুলে যাই যখন কেউ আমার গান শুনে বলে আপনি চোখে জল এনেছেন। আমি কোথাকার কে ভাই, ঈশ্বরের যিনি বরপুত্র, সেই মোৎজ়ার্ট সারা জীবনে কী পেয়েছিলেন — বঞ্চনা, বঞ্চনা আর বঞ্চনা।”

১৯৯৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর সলিল চৌধুরী প্রয়াত হন। কিন্তু তাঁর বহুমুখী প্রতিভার মাধ্যমে তিনি আজও চিরজীবী — তাঁর সঙ্গীত এবং সাহিত্যকীর্তি তাঁকে কালোত্তীর্ণ করে রেখেছে।

0 Comments

Post Comment