পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

অদৃশ্য কালিতে মুছে যাওয়া গণতন্ত্র

  • 06 October, 2026
  • 0 Comment(s)
  • 364 view(s)
  • লিখেছেন : শুভজিৎ বসাক
SIR-কে শুধু ভোটার তালিকা ‘পরিষ্কার’ করার একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ হিসেবে দেখলে বিষয়টির রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গভীরতা ধরা পড়ে না। ভোটার তালিকা কোনও সাধারণ সরকারি ডেটাবেস নয়। সেটি নাগরিকের নির্বাচনী অস্তিত্বের নথি। সেখানে নাম থাকা মানে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকার কার্যকর থাকা; নাম না থাকা মানে সেই অধিকারটি বাস্তবে প্রয়োগ করতে না পারা। ফলে একটি নাম মুছে দেওয়ার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রভাব একটি সাধারণ ডেটা-সংশোধনের চেয়ে অনেক বেশি।

ঢেউ উঠছে

গণতন্ত্রের সবচেয়ে অস্বস্তিকর মুহূর্ত ভোটের দিন নয়, ভোটের আগের মুহূর্ত। কারণ তখন নাগরিক শুধু ভোট দেওয়ার প্রস্তুতি নেন না, অনেক সময় তাঁকে প্রমাণ করতে হয়—তিনি আদৌ ভোট দেওয়ার অধিকার রাখেন কি না। এতদিন যে মানুষ ভোটার তালিকায় ছিলেন, ভোটার পরিচয়পত্র ছিল, আগের নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, তাঁর নাম, ঠিকানা, পারিবারিক পরিচয় বা পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্য না মেলার কারণে হঠাৎ তাঁকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হচ্ছে। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR তাই এখন শুধু ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; এটি নাগরিকের রাজনৈতিক অস্তিত্ব কীভাবে রাষ্ট্রের database-এ নির্ধারিত হবে, সেই প্রশ্নও।

২০২৫ সালে শুরু হওয়া SIR-এর বিভিন্ন পর্যায়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম draft electoral roll থেকে বাদ পড়েছে বা ASDD—Absent, Shifted, Dead, Duplicate—সহ বিভিন্ন কারণে চিহ্নিত হয়েছে। এই ১৩ কোটি মানুষকে চূড়ান্তভাবে ভোটাধিকারহীন ঘোষণা করা হয়েছে—এ কথা বলা ঠিক নয়। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক নাম একসঙ্গে খসড়া তালিকার বাইরে চলে যাওয়ার ঘটনাটিই নজিরবিহীন। রয়টার্সও প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার পর তৈরি হওয়া  রাজনৈতিক বিতর্কের কথা জানিয়েছে।

প্রশ্নটি তাই শুধু কতজনের নাম ফিরল, তা নয়। প্রশ্ন হল—ভুল ভোটার বাদ দেওয়ার জন্য প্রকৃত ভোটারদেরও কি প্রথমে সন্দেহের তালিকায় পাঠানো হল?

SIR-এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যায় আরও একটি শব্দ বারবার সামনে এসেছে—“ঘুষপেটিয়া”, “অনুপ্রবেশকারী” বা  বিদেশি নাগরিকদের নাম ভোটার তালিকায় থাকার বিষয়টি এসআইআরের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু এত বড় প্রক্রিয়ার পরেও সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রশ্নটির উত্তর স্পষ্ট নয়: এসআইআরের-এর মাধ্যমে ঠিক কতজনকে বিদেশি বা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে প্রমাণ করা হয়েছে?

দি ওয়ার এই প্রশ্নটি সরাসরি তুলেছে। কোটি কোটি নাম যাচাই ও বাদ দেওয়ার পরও অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর কোনও পৃথক, যাচাইযোগ্য সরকারি সংখ্যা প্রকাশ্যে নেই। ফলে “ঘুষপেটিয়া তাড়ানো” যদি এত বড় রাজনৈতিক যুক্তি হয়, তবে তার ফল কোথায়—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও প্রয়োজন।

এখানে সুপ্রিম কোর্টের ২৭ মে ২০২৬-এর SIR-সংক্রান্ত রায় গুরুত্বপূর্ণ। আদালত কমিশনের এই ভোটার তালিকা সংশোধন করার ক্ষমতা বহাল রেখেছে, কিন্তু নাগরিকত্বের চূড়ান্ত বিচার আর ভোটার তালিকায় নাম তোলার বিষয়টিকে এক করে দেখেনি। নির্বাচন কমিশন সীমিত প্রাথমিক তদন্ত করতে পারে; কাউকে চূড়ান্তভাবে অ-নাগরিক ঘোষণা করার ক্ষমতা তার নেই। নাগরিকত্বের চূড়ান্ত প্রশ্ন অন্য কোনও সঠিক বা যোগ্য সংস্থার। অর্থাৎ রাজনৈতিক ভাষণে “সন্দেহভাজন ভোটার” থেকে “বিদেশি” হয়ে যাওয়ার যে সহজ পথ তৈরি হয়, আইনের কাঠামো তা অনুমোদন করে না।

পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর বাস্তব অভিঘাত আরও স্পষ্ট। প্রায় ৬০.০৬ লক্ষ ভোটারকে-কে যৈক্তিক অসঙ্গতির ভিত্তিতে বিচারাধীন-এর আওতায় আনা হয়েছিল। বিচার প্রক্রিয়ার পরে ২৭.১৬ লক্ষ নাম বাদ যায়। তাঁদের মধ্যে ২২.২১ লক্ষ নিজেদের নাম ফেরানোর জন্য আবেদন  করেন। একই সময়ে আরও ১৬.১০ লক্ষ আবেদন করা হয় ইতিমধ্যে অন্তর্ভুক্ত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার দাবিতে। অর্থাৎ মোট আবেদন দাঁড়ায় প্রায় ৩৮.৩১ লক্ষ।

এই সংখ্যার একটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২৭.১৬ লক্ষ মানুষকে বাদ দেওয়ার পর তাঁদের প্রায় ৮২ শতাংশই আবেদন করেছেন। অর্থাৎ এটি নিছক কয়েক হাজার ভুলের ঘটনা নয়; বাদ যাওয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে মানুষ আইনি প্রতিকার চাইতে বাধ্য হয়েছেন।

কিন্তু প্রতিকার পাওয়ার সময়? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৯টি ট্রাইবুনাল গঠন করা হয়েছিল। পাঁচ মাস কাজ করার পরও সেপ্টেম্বরের কমিশনের তথ্য অনুযায়ী ৩৮.২০ লক্ষ আবেদনের মধ্যে মাত্র ১.০২ লক্ষ নিষ্পত্তি হয়েছিল এবং ৯২% ভোটারের নাম আবার লিস্টে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে; ৩৭.১৮ লক্ষ তখনও বাকি।  

এখানে গণতন্ত্রের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়ায়: নাগরিক ভোট দেওয়ার অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য আবেদন করলেন। কিন্তু আবেদনের সিদ্ধান্ত যদি ভোটের পরে আসে, তবে সেই আইনি প্রতিকার বাস্তবে তাঁর কোন অধিকার ফিরিয়ে দেয়?

এটি কোনও তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়। এপ্রিলের নির্বাচনের সময় ২৭.১৬ লক্ষ বাদ যাওয়া ভোটারদের মধ্যে ১৪.২৮ লক্ষের নাম প্রথম পর্যায়ের নির্বাচন শুরু হওয়ার মুখে ফ্রিজ হয়ে যাওয়ায় সেই নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

অর্থাৎ নাম ফেরানোর দরজা ছিল, কিন্তু দরজাটি খোলার সময় এবং ভোটের সময় এক ছিল না।

তারপর এল “যৈক্তিক অসঙ্গগতি”।

এই শব্দটির মধ্যেই SIR-এর প্রযুক্তিগত বিপদটি লুকিয়ে আছে। দিল্লিতে ৩৩ লক্ষের বেশি voter notice পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ১৯.৩৩ লক্ষকে যৈক্তিক অসঙ্গগতি এবং ১৩.৭৯ লক্ষকে ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে না মেলার কারণে চিহ্নিত করা হয়েছে।  অনুসন্ধানে নামের বানান, বাবার নাম, বয়সের ব্যবধানের মতো বিষয়ও  অসঙ্গগতি তৈরি করেছে। এমন ঘটনাও সামনে এসেছে যেখানে ২০০২ সালে যাঁর বয়স ভোটার হওয়ার মতোই হয়নি, তাঁকেও পুরনো তালিকার সঙ্গে mismatch-এর কারণে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে।

তাহলে প্রশ্নটি খুব স্বাভাবিক: যে system নাগরিকের তথ্যের অমিল খুঁজছে, সেই system-এর ভুল খুঁজবে কে?

এখানেই ইসিআইনেট-এর প্রশ্ন।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্তে প্রকাশ পেয়েছে, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু এবং বিবেক যোশী দশ মাসে অন্তত ১৪ বার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন। আপত্তির বিষয়গুলির মধ্যে ছিল ফর্ম ৬ পরিবর্তন, ভোটার নথিকরণ এবং বাদ যাওয়া, বাংলার আবেদন, ভোটার তালিকার- নিয়ন্ত্রণ । দুই কমিশনারের কিছু নথিতে এমন পদক্ষেপকে “unauthorised” ও “illegal” বলেও উল্লেখ করা হয়েছিল।

এখানে মূল প্রশ্নটি ব্যক্তিগত মতপার্থক্য নয়। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভিতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি।

একটি তিন সদস্যের সাংবিধানিক কমিশনের দুই সদস্য যদি একই ধরনের বিষয়ে বারবার লিখিত আপত্তি করেন, সেই আপত্তির সম্পূর্ণ নথি কি জনসমক্ষে থাকা উচিত নয়?

আর ইসিআইনেট নিয়ে প্রশ্নটি আরও গুরুতর, কারণ এটি নিছক অফিস সফটওয়ার নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, কেন্দ্রীভূত সফটওয়ার নীচের তলার আধিকারিকদের কাজকে প্রভাবিত  করতে পারে; গোয়াতে ৯৭ জন ভোটারের ক্ষেত্রে এমন ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে, যেখানে তাঁদের ভোটার হিসেবে যোগ্য বলে অনুমতি দেওয়ার পরও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁদের নাম পাওয়া যায়নি এবং গোয়ার মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক একাধিকবার কমিশনকে-কে তাঁদের নাম পুনর্বহালের জন্য লিখেছিলেন।

তার মানে প্রশ্নটি এখন আর “একজন বিএলও ভুল করলেন কি না” তে সীমাবদ্ধ নেই।

মাঠের নির্বাচনী কর্মীর সিদ্ধান্ত এবং কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত যদি পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, শেষ কথা কে বলবে?

ফর্ম ৬ এর ঘটনাও এই প্রশ্নকে আরও কঠিন করেছে। দুই কমিশনারের-এর আপত্তির নথিতে এই পরিবর্তনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তদন্ত আরও জানিয়েছে, বাংলায় প্রায় ১৬.১০ লক্ষ appeal এমনভাবে তৈরি হয়েছিল যার বৈধতা নিয়েও দুই কমিশনার প্রশ্ন তুলেছিলেন।

এখানে গণতন্ত্রের একটি অদ্ভুত উল্টো ছবি তৈরি হয়।

নাগরিককে নিজের ভোটার পরিচয় প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু সেই নাগরিকের নাম নিয়ে যে কেন্দ্রীয় সফটওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ পথ নাগরিক জানবেন না।

নাগরিকের জন্য স্বচ্ছতা, কিন্তু তথ্যভান্ডার অস্বচ্ছ এই ভারসাম্য কি গণতন্ত্রে গ্রহণযোগ্য?

ফর্ম ৭-এর ঘটনাও তাই গুরুত্বপূর্ণ। দিল্লিতে বিজেপি বিএলএ দুদিনে ৩৫টি বাদ দেওয়ার আবেদন জমা দিয়েছিলেন বলে দি হিন্দু-র রিপোর্ট উদ্ধৃত করে দি ওয়ার জানিয়েছে। বিএলএ' র ক্ষেত্রে দৈনিক সীমা থাকলেও ইসিআইনেটে-এ সাধারণ নাগরিক হিসেবে 'আধার' ব্যবহার করে আবেদন করার পথ ছিল। একই অনুসন্ধানে এমন ঘটনাও পাওয়া যায় যেখানে একজন তরুণের নিজের নামের বিরুদ্ধেই তাঁর মৃত্যুর কারণ দেখিয়ে ফর্ম ৭ জমা পড়েছিল।

আইনে যদি একটি সীমা থাকে, কিন্তু সফটয়ারে সেই সীমা কার্যকর না করে, তাহলে প্রশ্নটা শুধু প্রযুক্তির নয়।

বাস্তবে তখন নিয়ন্ত্রণ করছে কে—আইন, নাকি সফটওয়ার?

পশ্চিমবঙ্গের ফর্ম ৭ এর পরিসংখ্যানও আলাদা করে তদন্ত দাবি করে। ৬.৩৯ লক্ষ ফর্ম ৭ আবেদনের  মধ্যে ৫.৭২ লক্ষের সম্পূর্ণতার  দিকে গিয়েছিল এবং ১৪, ৫০৬টি হয়নি। অন্যদিকে ফর্ম ৬-এর ক্ষেত্রে বিপুল সংখ্যক ঝুলে বা বাতিল ছিল।

এখানে কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না। কিন্তু একটি প্রশ্ন অবশ্যই করা যায়:

নাগরিককে তালিকায় ঢোকানোর প্রক্রিয়া এবং নাগরিককে তালিকা থেকে বের করার প্রক্রিয়া কি সমানভাবে দ্রুত, সমানভাবে স্বচ্ছ এবং সমানভাবে accountable?

আর SIR-এর সামাজিক অভিঘাতের প্রশ্নটিও এখানেই।

UN-এর Special Rapporteurs minority communities, বিশেষ করে মুসলিম ও Bengali-speaking মানুষের উপর সম্ভাব্য discriminatory impact, automated irregularity detection-এর bias এবং transparency নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটি কোনও আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়; কিন্তু আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো থেকেও একই ধরনের প্রশ্ন ওঠা বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দেয়।

তারপর ২ অক্টোবর।

যে বিতর্ক এতদিন আদালত, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং সংবাদমাধ্যমে ছিল, তা রাস্তায় চলে আসে। মুম্বইয়ের শিবাজী পার্ক এবং দিল্লির যন্তর মন্তরে এসআইআর ও মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের ভূমিকা নিয়ে প্রতিবাদ হয়। দিল্লিতে আইসা সহ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন, আপ ও নাগরিক সমাজের বহু মানুষ আটক হন; বহু পরিচিত মুখও আটক হন। পরে দিল্লি পুলিশ তিনটি এফআইআর দায়ের করে। রয়টার্স আন্দোলনের মূল অভিযোগ হিসেবে ভোটার তালিকা নিয়ন্ত্রণ এবং যোগ্য ভোটারদের বাদ পড়ার প্রশ্নটি উল্লেখ করেছে।

এই প্রতিবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি কোনও স্লোগান নয়:

রাষ্ট্র যদি নাগরিকের ভোটার পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, নাগরিক রাষ্ট্রের ভোট-প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন করলে তাঁর জায়গা কোথায়?

এই প্রশ্নে আইনজীবীদের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ। Senior Advocate Dushyant Dave SIR এবং Supreme Court-এর ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে তীব্র সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলেছেন। ২ অক্টোবর Lawyers’ Association for Constitution পাঁচ প্রাক্তন বিচারপতিকে নিয়ে একটি independent commission গঠন করেছে SIR-এর constitutional validity, methodology এবং impact পরীক্ষা করার জন্য।

এখানেই সুপ্রীম কোর্টকে ঘিরে নানান প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

কারণ সুপ্রীম কোর্ট এসআইআর মূল ক্ষমতা কমিশনের আছে বলে মেনেছে। পরে সেই একই আদালত দিল্লির নোটিসের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে কমিশনের ভিতরেই দুই কমিশনারের ১৪টি আপত্তির কথা প্রকাশ্যে এসেছে আর এখন আদালত নিজেই বলছে তাঁরা নাকি কিছুই জানত না।  মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃ প্রণোদিত নেয়নি যদিও  কোনও যোগসাজশ যে নেই তাও কি বলা যায়? 

কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল:

যদি যোগসাজশ না থাকে, তবে স্বাধীন, পূর্ণাঙ্গ এবং প্রকাশ্য অডিট-এর দাবি কেন অস্বস্তিকর হবে?

কারণ গণতন্ত্রে আস্থা তৈরি হয় প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে নয়, প্রতিষ্ঠানের নথি পরীক্ষা করার সুযোগে।

১৩ কোটি মানুষের পর এখন তাঁদের খুঁজে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিপুল সংখ্যক মানুষের electoral status পুনরায় যাচাই করতে হচ্ছে। এই বাস্তবতা অন্তত একটি প্রশ্ন তো করেই:

প্রথমে বাদ দেও্যার প্রযুক্তি যদি এত বড় হয় যে পরে বাদ পড়াদের খুঁজে ফেরানোর জন্য আবার বিশেষ প্রযুক্তি তৈরি করতে হয়, তবে প্রশ্ন উঠবে বাদ দেওয়া হয়েছিল কেন? 

SIR-এর সমর্থনে মৃত, duplicate বা shifted ভোটার বাদ দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক নেই। কিন্তু গণতন্ত্রে সাফল্য শুধু কতজনের নাম বাদ দেওয়া হল, তা দিয়ে মাপা যায় না।

মাপতে হয়—

কতজন প্রকৃত ভোটার ভুল করে বাদ পড়লেন।

কতজন সময়মতো আবেদন করতে পারলেন।

কতজনের আবেদন ভোটের আগেই নিষ্পত্তি হল।

কতজন ভোট দেওয়ার সুযোগ হারালেন।

কতগুলি বাদ যাওয়া পরে ভুল বলে প্রমাণিত হল।

কতজনকে “বিদেশি” সন্দেহ করা হয়েছিল এবং তাঁদের মধ্যে কতজন শেষ পর্যন্ত আইনগতভাবে বিদেশি হিসেবে প্রমাণিত হলেন।

কতগুলি ফর্ম ৭ সত্যিই ঠিক ছিল।

কতগুলি ফর্ম ৬ আটকে ছিল।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—এই সমস্ত সিদ্ধান্তের ডিজিটাল অডিট ট্রেইল কোথায়?

কারণ ভোটার তালিকা কোনও সাধারণ তথ্যভান্ডার নয়। সেখানে একটি নাম থাকা মানে নাগরিকের রাজনৈতিক অস্তিত্বের স্বীকৃতি। সেই নাম মুছে যাওয়া শুধু একটি অস্তিত্ব মুছে যাওয়া নয়; এর অর্থ একজন মানুষ নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বাইরে চলে যেতে পারেন যা অসাংবিধানিক।

তাই SIR-এর আসল প্রশ্ন “কতজন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়ল?”-এর মধ্যেও সীমাবদ্ধ নয়।

প্রশ্ন হল—

কতজন প্রকৃত নাগরিককে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হল?

এবং সেই সন্দেহের দায় কে নেন?

যে লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি তৈরি করেছে, তার পরীক্ষা হবে কি?

যে আধিকারিক নাম বাদ দিয়েছেন, তাঁর শাস্তি পাওয়া দেখা যাবে কি?

যে নাগরিক আবেদন করেছেন, কত দিনে নিষ্পত্তি হবে?

যে মানুষকে “বিদেশি” বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত প্রমাণ কোথায়?

যে দুই নির্বাচন কমিশনার আপত্তি করেছেন, তাঁদের সম্পূর্ণ নথি প্রকাশ হবে কি?

সমস্ত কিছু কি প্রকাশ্যে পরীক্ষা করা হবে?

গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি এখানেই।

নাগরিক ভোট দেন। রাষ্ট্র সেই ভোট সুরক্ষিত রাখে।

রাষ্ট্রের কাজ নাগরিককে অনন্তকাল ধরে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে বলা নয়; রাষ্ট্রের নিজের সিদ্ধান্তেরও প্রমাণ, যুক্তি এবং জবাবদিহি থাকতে হয়।

কারণ আজ যে মানুষের নাম “যৌক্তিক অসঙ্গতি”-তে আটকে গেছে, কাল সেই জায়গায় অন্য কেউ থাকতে পারেন। আজ যে তথ্যভান্ডার অন্যের নাম নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, কাল আপনার নামও তার সামনে আসতে পারে।

তাই এসআইআর কোনও একটি নির্বাচনের গল্প নয়।

এটি একটি বৃহত্তর প্রশ্নের গল্প—

রাষ্ট্র কি নাগরিককে চেনে, নাকি নাগরিককে তথ্যভান্ডারের কাছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে হয়?

১৩ কোটি নামের, পশ্চিমবঙ্গের ২৭.১৬ লক্ষ বাদ যাওয়া, ২২.২১ লক্ষ আবেদন, ৩৭ লক্ষের বেশি ঝুলে থাকা আবেদন, ইসিআইনেট নিয়ে ১৪টি প্রশ্ন, ফর্ম ৬ ও ৭ নিয়ে প্রশ্ন,  লক্ষ লক্ষ শুনানির নোটিশ, এবং ২ অক্টোবরের রাস্তায় নেমে আসা প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে প্রশ্নটি এখন আর চুপ করে রাখার মতো ছোট নয়।

আমি ভোটার।

প্রমাণটা কি আমাকে দিতে হবে?

নাকি রাষ্ট্রকেই প্রমাণ করতে হবে যে সে আমার ভোট সুরক্ষিত রেখেছে?

ঢেউ উঠছে।

 

0 Comments

Post Comment