পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

পড়শি যদি আমায় ছুঁতো যম যাতনা সকল যেত দূরে: লালন সাঁই

hhhhhhhhhhhhhh

যে পাঠ আমরা দিয়ে দিচ্ছি

  • 01 January, 1970
  • 0 Comment(s)
  • 204 view(s)
  • লিখেছেন : সুব্রত ঘোষ
এক অর্থে বিদ্যালয় একটি ক্ষুদ্র সমাজ। সেখানে যা ঘটে, শিশু সেটিকেই সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে গ্রহণ করে। এখন যদি সেই ক্ষুদ্র সমাজে শিশু দেখে যে বড়রা ক্ষোভ প্রকাশ করতে মারধর করেন, অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় রাস্তায়, এবং কর্তৃপক্ষকে অপমান করা যায় প্রকাশ্যে — তাহলে সে বড় হয়ে ঠিক তাই-ই করবে। কারণ সে তো সেটাই শিখেছে। আগে হিংসা ছিল স্থানীয়। যারা সামনে থাকতেন তারা দেখতেন। এখন হিংসা ভাইরাল সেই ভাইরাল হিংসা দেখে শিশু শেখে — এই কাজ করলে মানুষ হাততালি দেয়।

একজন শিক্ষককে দেরিতে আসার অভিযোগে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধে রাখা হয়েছে। ছবি উঠেছে। ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। অভিযোগকারীরা ক্যামেরার সামনে বলেছেন, "উচিত শিক্ষা দিয়েছি।"

অন্য একটি ঘটনায় মিড ডে মিলের হিসেবের গরমিলে শিক্ষককে সবার সামনে মারধর করা হয়েছে। সেখানেও ছিল ভিড়। সেই ভিড়ের মধ্যে ছিল শিশুরাও।

একটা নয়, একাধিক ঘটনা ঘটে চলেছে। জেলার নাম এখন আর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ নয়।

আমি শিক্ষকের অপরাধ নিয়ে কথা বলতে বসিনি। দেরিতে আসা অন্যায়। মিড ডে মিলের টাকায় কারচুপি আরও বড় অন্যায়। অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে শাস্তি হওয়া উচিত। সে নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই।

আমি কথা বলতে চাইছি সেই শিশুদের নিয়ে, যারা সেদিন দাঁড়িয়ে দেখেছিল। এবং যারা দূরে থেকেও সেই দৃশ্য দেখেছিল মোবাইল ফোনে।

মনোবিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে বলে আসছেন যে শিশুর শেখার সবচেয়ে গভীর মাধ্যম হলো দেখা। পাঠ্যবইয়ের অক্ষর নয়, জীবনের দৃশ্য। সে দেখে এবং ভেতরে ভেতরে একটা মানচিত্র তৈরি করে — পৃথিবী কীভাবে চলে, ক্ষমতা কোথায় থাকে, ন্যায় কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

আজকের শিশুরা কী দেখল?

দেখল যে একজন মানুষকে, যাকে তারা প্রতিদিন 'স্যার' বলে ডাকে, যার সামনে তারা উঠে দাঁড়ায়, তাঁকে ল্যাম্পপোস্টে বাঁধা যায়। দেখল যে রাগান্বিত মানুষের দল যখন একত্রিত হয়, তখন আইন-আদালত-প্রশাসন কোনো কিছুর অপেক্ষা করতে হয় না। দেখল যে প্রয়োজন হলে হাত তোলাই সমাধান। এই দেখাটা তাদের ভেতরে কোথাও গেঁথে গেল। পাওলো ফ্রেইরি তাঁর Pedagogy of the Oppressed-এ একটি কথা বলেছিলেন যেটা সচরাচর কম উদ্ধৃত হয়। তিনি বলেছিলেন, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের সম্পর্ক শুধু পাঠ্যক্রমের সম্পর্ক নয়, এটি একটি নৈতিক অনুশীলনের ক্ষেত্র। শিক্ষক ও শিক্ষার্থী একসঙ্গে কেবল জ্ঞান আদানপ্রদান করেন না, তারা একসঙ্গে শেখেন — সম্পর্ক কী, কর্তৃত্ব কী, সম্মান কী। এই অর্থে বিদ্যালয় একটি ক্ষুদ্র সমাজ। সেখানে যা ঘটে, শিশু সেটিকেই সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে গ্রহণ করে। এখন যদি সেই ক্ষুদ্র সমাজে শিশু দেখে যে বড়রা ক্ষোভ প্রকাশ করতে মারধর করেন, অভিযোগের নিষ্পত্তি হয় রাস্তায়, এবং কর্তৃপক্ষকে অপমান করা যায় প্রকাশ্যে — তাহলে সে বড় হয়ে ঠিক তাই-ই করবে। কারণ সে তো সেটাই শিখেছে।

ফ্রেইরি আরও বলতেন, নিপীড়িত মানুষ যখন ক্ষমতা পায়, তখন সে প্রায়ই নিপীড়কের ভাষাতেই কথা বলতে শুরু করে। কারণ সে ক্ষমতার অন্য কোনো ভাষা জানে না। রাজনৈতিক পালাবদলের পর পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষকদের উপর যে আক্রমণগুলো হচ্ছে, তার মধ্যে এই বিষয়টি আমাকে ভাবায়। যে হাত একদিন নিজে মার খেয়েছে, সে হাতই আজ অন্যকে মারছে এবং ভাবছে এটাই ন্যায়।

কিন্তু শিশু সেই সূক্ষ্ম ইতিহাস জানে না। সে শুধু দৃশ্যটা মনে রাখে।

একটা উপমা দিই।
মা আর বাবার মধ্যে তীব্র ঝগড়া হচ্ছে। হয়তো কারণও আছে। হয়তো একজন সত্যিই ভুল করেছেন। কিন্তু সেই কলহ যদি শিশুর সামনে হয়? চিৎকার, অপমান, হাত তোলা: তাহলে শিশু কী বুঝবে? সে বুঝবে না কার দোষ বেশি। সে বুঝবে, ঘর মানে বিপদজনক জায়গা। মানুষ মানে অবিশ্বস্ত সত্তা। এবং সম্পর্কের সংকট মেটানোর উপায় হলো শক্তি প্রয়োগ।

বিদ্যালয়ে শিক্ষকের নিগ্রহ ঠিক এইভাবেই কাজ করে। শিক্ষক ও অভিভাবক — এরা দুজনেই শিশুর নিরাপত্তার দুটি স্তম্ভ। একটি স্তম্ভ যখন অপরটিকে ভাঙে বা আঘাত করে, শিশু নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। সে বিদ্যালয়কে আর আশ্রয় মনে করতে পারে না। এবং দীর্ঘমেয়াদে সে রাষ্ট্রকেও আশ্রয় মনে করতে পারে না। কারণ রাষ্ট্রের প্রাথমিক পাঠশালা তো বিদ্যালয়ই। কিন্তু এই সময়ে আরও একটি মাত্রা যোগ হয়েছে, যেটা না বললে ছবিটা অসম্পূর্ণ থাকে। ঘটনাস্থলে যে শিশু ছিল না, সে-ও আজ দর্শক। কারণ ভিডিও আছে। সোশ্যাল মিডিয়া আছে।

একটা দৃশ্য কল্পনা করুন। একটি শিশু বাড়িতে বসে মায়ের ফোনে ভিডিও দেখছে। সে দেখছে — তার মা হাসতে হাসতে তার শিক্ষককে ডিম ছুড়ে মারছে। ক্যামেরার সামনে উৎসবের ভঙ্গিতে মারছে। আশেপাশের লোকজনও হাসছে।

এই মুহূর্তে সেই শিশুর ভেতরে কী ঘটছে?

সে বিভ্রান্ত। কারণ মা তার কাছে ভালোবাসার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস। আর শিক্ষক তার কাছে জ্ঞান ও কর্তৃত্বের প্রতীক। এই দুটি বিশ্বস্ত জগৎ আজ একটি স্ক্রিনে সংঘর্ষে লিপ্ত। এবং মা হাসছেন — যার মানে এটা উপভোগযোগ্য। সে বুঝতে পারছে না কাঁদবে না হাসবে। এবং সম্ভবত সেও মায়ের সঙ্গে হাসছে। কারণ সেটাই তার জন্য নিরাপদ। কিন্তু সেই হাসির ভেতরে কোথাও একটা ফাটল তৈরি হয়ে গেল। শিক্ষকের প্রতি যে সামান্য বিস্ময় ও শ্রদ্ধা ছিল, সেটা চুরমার হয়ে গেল। এবং এই ঘটনাটা কেউ খেয়ালও করল না। কারণ ভিডিওটা ততক্ষণে আরও পাঁচশো শেয়ার পেয়ে গেছে।

আগে হিংসা ছিল স্থানীয়। যারা সামনে থাকতেন তারা দেখতেন। এখন হিংসা ভাইরাল। এবং ভাইরাল হিংসার একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে — সে বিনোদনের মোড়ক পায়। লাইক পড়ে। শেয়ার হয়। মন্তব্যে "উচিত হয়েছে" লেখা হয়। ফলে যে কাজটি একটু আগেও বর্বরতা ছিল, সে কাজটি সামাজিক অনুমোদন পেয়ে যায়। এবং শিশু শেখে — এই কাজ করলে মানুষ হাততালি দেয়।

এই মুহূর্তে একটা পুরনো দার্শনিক প্রশ্ন মনে পড়ে।

সক্রেটিসের বিচার চলছে। প্লেটো Apology তে লিখেছেন, Meletus অভিযোগ করছেন: সক্রেটিস সমাজের ক্ষতি করছেন, যুবকদের নষ্ট করছেন। জবাবে সক্রেটিস একটি সরল প্রশ্ন তোলেন: কেউ কি সচেতনভাবে নিজের ক্ষতি চায়? আমি যদি সমাজেরই মানুষ হই, সমাজকে নষ্ট করলে আমি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হব। অতএব ইচ্ছাকৃতভাবে আমি তা চাইতে পারি না। এবং যদি অজ্ঞতাবশত কোনো ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক প্রতিক্রিয়া হবে শাস্তি নয়, সংশোধন।

এই যুক্তিটা আজ অদ্ভুতভাবে উল্টো দিক থেকে প্রযোজ্য।

যিনি শিক্ষককে ল্যাম্পপোস্টে বেঁধেছেন, যিনি হাসতে হাসতে ডিম ছুড়েছেন — তিনিও নিশ্চয়ই নিজের ক্ষতি চান না। তিনি মনে করছেন তিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করছেন। কিন্তু সেই শিশু যে দাঁড়িয়ে দেখল, বা স্ক্রিনে দেখল — সে তাঁরই সন্তান। তাঁরই ভবিষ্যৎ। সেই ভবিষ্যতের ভেতরে আজ যে বিষবৃক্ষ রোপণ হলো, তা একদিন অঙ্কুরিত হবেই। হয়তো তাঁর দিকেই সেই আঘাত ফিরে আসবে অন্য কোনো উপলক্ষ্যে।

এই ডিম ছোড়ার দৃশ্যটা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এটা নকল করা হচ্ছে।

যখন কোনো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশ আদালতে নিয়ে যায়, তখন ভিড় জমে। কেউ জুতো ছোড়ে, কেউ ডিম। ক্যামেরা উপস্থিত থাকে। ভিডিও ভাইরাল হয়। লাইক পড়ে, শেয়ার হয়। একটা বার্তা তৈরি হয় — এইভাবে ক্ষমতাবানকে জবাব দেওয়া যায়, এটাই প্রতিবাদের ভাষা। সমাজ সেই ভাষা শিখে নেয়।

কিন্তু সমস্যা হলো, সেই ভাষা ব্যবহার করতে গেলে সামনে একজনকে চাই। এবং রাজনৈতিক নেতা সবসময় হাতের নাগালে থাকেন না। থানায় গেলে ভয়। ব্লক অফিসে গেলে আমলাতন্ত্রের দেওয়াল। কিন্তু স্কুল? স্কুল তো পাড়ার মোড়েই। সরকারি প্রতিষ্ঠান বলতে গ্রামের মানুষ যা সবচেয়ে কাছ থেকে চেনে, সেটাই স্কুল। এবং সেখানে শিক্ষক একা এবং নিরস্ত্র।

ফলে প্রতিবাদের ভাষাটা থাকল, লক্ষ্যটা বদলে গেল। এইখানেই ফ্রেইরির কথাটা আবার ফিরে আসে — নিপীড়িত মানুষ যখন ক্ষমতার ভাষা রপ্ত করে, সে প্রায়ই বুঝতে পারে না যে সে আসলে নিপীড়কেরই অনুকরণ করছে। সে ডিম ছোড়া শিখেছিল দুর্নীতিবাজকে লক্ষ্য করে কারো ডিম ছোঁড়া দেখে। যে হাত একদিন ভয়ে গুটিয়ে ছিল সেই একই হাত এখন ডিম ছুড়ছে শিক্ষকের দিকে। এবং সেই দৃশ্য দেখছে শিশু — যে এইভাবে শিখে যাচ্ছে প্রতিবাদ মানে কাছের দুর্বল মানুষকে আঘাত করা।

সক্রেটিস বলেছিলেন, অজ্ঞতাবশত ক্ষতি হলে শাস্তি নয়, দরকার সংশোধন। কিন্তু এখানে যা ঘটছে তা আরও জটিল — যিনি শাস্তি দিচ্ছেন, তিনি জানেনই না যে তিনিও একটি ক্ষতি করে চলেছেন। এবং সেই ক্ষতির শিকার তাঁর নিজের সন্তান। এখানে একটা paradox আছে, যেটা না বললে লেখাটা অসম্পূর্ণ থাকবে। শিক্ষার্থীদের চোখের সামনেই, বা স্ক্রিনের মধ্যে দিয়ে, উন্মত্ত জনতা একটা পাঠ দিয়ে দিচ্ছেন। আইনের চেয়ে পেশিশক্তি বড়। প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ভিড় বড়। প্রক্রিয়ার চেয়ে রাগ বড়।

এই পাঠ একবার শেখা হলে ভোলানো কঠিন।

আমি জানি, আইনের পথে বিচার পাওয়া এই রাজ্যে এই সময়ে সহজ নয়। প্রশাসনিক ব্যর্থতার একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে, এবং সেই ব্যর্থতা ঢাকতেই আজ অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া হচ্ছে কোথাও কোথাও। প্রশাসন নিষ্ক্রিয় হয়ে দেখছে, কারণ তা না হলে রাগটা সেদিকে ঘুরে যেতে পারে। হতাশ জনগণ দিকে দিকে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছে।

কিন্তু হতাশার জবাব কি শিশুর সামনে শিক্ষককে বেঁধে রাখা বা ডিম ছোঁড়া?

একটা সমস্যার প্রতিক্রিয়ায় আমরা যখন আরেকটা সমস্যা তৈরি করি, এবং সেই সমস্যাটা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভেতরে বাসা বাঁধে, তখন কার ক্ষতি হয়?

শিক্ষকের? হয়তো সাময়িকভাবে হয়।

শিশুটির? হ্যাঁ, সম্ভবত সারাজীবন সে ওই ক্ষত বহন করে।

শেষে একটাই কথা।


শিক্ষককে শাস্তি দিতে চাইলে দিন। অভিযোগ করুন, আন্দোলন করুন, প্রশাসনের দরজায় কড়া নাড়ুন। প্রয়োজনে রাস্তায় নামুন। কিন্তু শিশুকে ঘরে রেখে যান। এবং ভিডিওটা তার ফোনে পাঠাবেন না। কারণ সে যা দেখবে, তাই শিখবে। এবং সে যা শিখবে, তা দিয়েই একদিন সে পৃথিবী চালাবে।

সেদিন আমরা কি চাইব যে সে ক্ষমতার ভাষা হিসেবে বলপ্রয়োগকেই চিনুক? নাকি আজই তাকে শেখানো জরুরি যে, ক্ষমতা প্রয়োগের একাধিক গণতান্ত্রিক উপায় আছে?

0 Comments

Post Comment