শুধুই ইথানল খলনায়ক নয়
ভারতে চিনি বরাবরই একটি রাজনৈতিক পণ্য। খুচরা মূল্যবৃদ্ধির ফলে এটি আরও বেশি রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। খুচরা চিনির দাম প্রতি কেজি প্রায় ৪৫-৪৮ টাকা থেকে তীব্রভাবে বেড়ে ৫৮-৭০ টাকা হয়েছে,যা উৎসবের মরসুমের আগে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।এই বৃদ্ধির পেছনে নানা মুনির নানা মত রয়েছে।তবে কোনো একটি একক কারণ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন হ্রাস, আবহাওয়া জনিত ক্ষতি, মরসুমি চাহিদা, ইথানলের অপব্যবহার, বিশ্বব্যাপী সরবরাহের চাপ এবং ফাটকাবাজি জনিত মজুতদারি— এই কারণগুলোই মুল কারণ হিসেবে ভাবা হয়েছে। এখন মূল বিষয়টি হলো, এই কারণগুলো কীভাবে একে অপরের সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া করছে তা চিহ্নিত করা এবং কেন বর্তমান এই মূল্যবৃদ্ধি স্বাভাবিক বৃদ্ধির চেয়ে বেশি তীব্র, তা নির্ধারণ করা। এ বিষয়ে প্রথমেই যে নামটি উঠে আসে তা হল ইথানল। চিনিকে ইথানলের দিকে সরিয়ে নিলে তা খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য উপলব্ধ পরিমাণ কমিয়ে দেয়, যা উৎপাদন ঘাটতির সময় অভ্যন্তরীণ সরবরাহের উপর চাপ বাড়ায়। ইথানলের জন্য অপসারিত চিনির পরিমাণ ২০১৯-২০ অর্থবছরের ০.৮ মিলিয়ন টন থেকে বেড়ে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩ মিলিয়ন টনেরও বেশি হয়েছে , যার ফলে মজুত কমে আসছে। উৎপাদনের সম্ভাবনা দুর্বল হয়ে পড়ায় সরকার কাঁচামালের বহিঃপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে, যার মধ্যে আখের রস এবং হেভি মোলাসেসের ওপর ১৭ লক্ষ টনের একটি সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ অন্তর্ভুক্ত।আখ থেকে উৎপাদিত ইথানলের অংশ ২০২০-২১ সালের ৮৬.২% থেকে কমে ২০২৪-২৫ সালে ৩১.৫%-এ নেমে এসেছে , কারণ ভুট্টা এবং অন্যান্য শস্যভিত্তিক কাঁচামাল ক্রমবর্ধমানভাবে এই শূন্যস্থান পূরণ করছে।ইথানল একটি বিতর্কিত বিষয়, ইথানলের অবৈধ ব্যবহার চিনির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে, কিন্তু এর হ্রাসপ্রাপ্ত অংশ এবং সরকারি বিধিনিষেধ থেকে বোঝা যায় যে, বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে শুধু এটিই যথেষ্ট নয়।ইথানল-মিশ্রিত পেট্রোল কর্মসূচির জন্য এই দাম বেড়েছে এমন একটা কথা বলা হচ্ছে বটে,তবে, আসল সত্যটা আরও জটিল এবং তিক্ত। ২০২৫-২৬ সালে ডিস্টিলারিগুলো থেকে তেল বিপণনকারী সংস্থাগুলোকে সরবরাহ করা ইথানলের মাত্র ২৭.৫ শতাংশ আখের রস এবং মোলাসেস থেকে উৎপাদিত হচ্ছে; বাকিটা আসছে বিভিন্ন শস্যদানা থেকে। এছাড়াও, ইথানল তৈরির জন্য যে আনুমানিক ৩০ লক্ষ টন চিনি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে, তা ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া বছরে মোট ৩০.৯ মিলিয়ন টন উৎপাদনের দশ ভাগের এক ভাগেরও কম হবে। এর আগের চার বছরেও যথাক্রমে ৩৫ লক্ষ টন, ২৪ লক্ষ টন, ৪৩ লক্ষ টন এবং ৩৬ লক্ষ টন চিনি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তাতে দাম বেড়ে যাওয়ায় মত কিছু ঘটেনি। সুতরাং,এখানে শুধুই ইথানল খলনায়ক নয়।
চিনির অর্থনীতি
চিনির দাম মাকড়সার জালের মতো একটি পুনরাবৃত্তিমূলক চক্র অনুসরণ করে, উচ্চ মূল্য চাষাবাদে উৎসাহ জোগায়, কিন্তু পরবর্তীতে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দাম ও কৃষকের আয় কমে যায়। আখ, ক্ষেতে পেকে উঠতে প্রায় ১২-১৮ মাস সময় লাগে , তাই কৃষকদের জমি চাষের সিদ্ধান্ত বাজারে সরবরাহের উপর যথেষ্ট পরেই প্রভাব ফেলে। বর্ধিত চাষাবাদের ফলে অবশেষে অতিরিক্ত চিনি তৈরি হয়, যা অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমিয়ে দেয় এবং চিনি কলগুলোকে কৃষকদের পাওনা পরিশোধ করতে সমস্যায় ফেলে। কৃষকদের আয় কমে যাওয়ায় অর্থ পরিশোধের সমস্যা বাড়ছে, যার ফলে শুধু ২০২৪-২৫ সালেই আখ চাষিরা প্রায় ৩,৪৪৯ কোটি টাকার বকেয়ার সম্মুখীন হয়েছেন। কম লাভের কারণে কৃষকরা আখ চাষের জমি বজায় রাখতে নিরুৎসাহিত হন, ফলে সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয় যা পরবর্তীতে দামকে তীব্রভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া ২০২২-২৩ অর্থবছরে আখের উৎপাদন ৪৯১ মিলিয়ন টন থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪৫৬ মিলিয়ন টনে নেমে আসায় বর্তমান সরবরাহ ঘাটতি আরও তীব্র হয়েছে।আখের ঊর্ধ্বগতি ও অন্যান্য দেশের তুলনায় ন্যায্য ও লাভজনক মূল্য (এফআরপি) এবং রাষ্ট্রীয় নির্ধারিত মূল্য (এসএপি) বৃদ্ধি পাওয়ায় আখের দাম বেড়েছে, যা চিনি শিল্পের ওপর ব্যয়ের চাপ আরও বাড়িয়েছে। বর্তমান চিনি উৎপাদন আনুমানিক ৩০.৬ মিলিয়ন টন, যা প্রাথমিক অনুমান ৩৪.৩ মিলিয়ন টনের চেয়ে প্রায় ১১% কম, ফলে এর প্রত্যাশিত প্রাপ্যতা তীব্রভাবে হ্রাস পেয়েছে।কিন্তু কেন? এর উত্তরে রয়েছে নানা কারণ।প্রথম, ফসলের রোগ। যেমন রেড রট এবং টপ বোরারের আক্রমণে আখের ফসলের ক্ষতি হয়েছে এবং প্রত্যাশিত চিনি উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া রয়েছে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত।প্রধান উৎপাদন এলাকাগুলোতে ভারী বৃষ্টিপাত ও জলাবদ্ধতার কারণে ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায় যে অতিরিক্ত ও অপর্যাপ্ত উভয় বৃষ্টিপাতই চিনির উৎপাদনকে প্রভাবিত করতে পারে। এল নিনো-সম্পর্কিত শুষ্ক সময়কাল এবং দুর্বল মৌসুমী বায়ুর কারণে জলের যোগান কমে গিয়েছিল, কিন্তু অনুরূপ কোনও কারণ ছাড়াই পূর্ববর্তী উৎপাদন হ্রাস পায়। এরই মধ্যে রয়েছে উৎসবের চাহিদা। উৎসবের মরসুমে মিষ্টি প্রস্তুতকারক এবং মিষ্টান্ন বিক্রেতাদের মধ্যে চিনির ক্রয় বৃদ্ধি পায়, যা ইতিমধ্যেই সীমিত অভ্যন্তরীণ সরবরাহের উপর চাহিদার চাপ আরও বাড়িয়ে তোলে। তার উপরে রয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহের চাপ। ২০২৬-২৭ সালে বিশ্বব্যাপী চিনির আনুমানিক ৩৩ লক্ষ টন ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক মূল্য অভ্যন্তরীণ মূল্যের উপর আরও চাপ সৃষ্টি করেছে।
সরকারি ব্যবস্থাপনা
অভ্যন্তরীণ সরবরাহ বাড়াতে এবং মূল্যচাপ কমাতে কেন্দ্র শেষ পর্যন্ত মনোযোগ দিতে এক রকম বাধ্য হয়েছে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ১০ লক্ষ টন অপরিশোধিত চিনি আমদানির অনুমতি দিয়েছে। অতিরিক্ত মজুদ নিরুৎসাহিত করার জন্য ডিলার এবং পানীয় প্রস্তুতকারক সহ বৃহৎ পাইকারি ক্রেতাদের উপর মজুদ সীমা আরোপ করা হয়েছে। চিনি রপ্তানি ইতিমধ্যেই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, যার ফলে উপলব্ধ সরবরাহ কেবল ভারতের চাহিদা মেটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণগুলো শনাক্ত করতে সরকার চিনির দাম, উৎপাদন, মজুত এবং বাজারের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে মন্তব্য করেছে। সরবরাহ সংকটের সময় এই ব্যবস্থাগুলোর লক্ষ্য হলো কৃষক ও চিনি কলগুলোর আর্থিক স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা। আখের উন্নততর মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রধানত আনুমানিক ব্যয়ের ওপর নির্ভর না করে প্রকৃত চাষাবাদের খরচও বিবেচনা করা।উচ্চতর কৃষি উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ২০২০-২১ সাল থেকে আখের উৎপাদনশীলতা হেক্টর প্রতি প্রায় ৮৩ টনে স্থির রয়েছে , যার ফলে কৃষকদের উন্নততর লাভের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অধিক ব্যবহার প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। মহারাষ্ট্র, কর্ণাটক এবং তামিলনাড়ুর মতো প্রধান আখ উৎপাদনকারী অঞ্চলগুলিতে ড্রিপ সেচ ব্যবস্থার প্রসার ঘটালে জলের ব্যবহার ৪০% পর্যন্ত কমানো যেতে পারে ।এতে দাম কম হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি।
চরম নীতিগত ব্যর্থতা
বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হলো চিনির উৎপাদন খোদই অনেক কমে যাওয়া — নভেম্বরে আখ মাড়াই শুরুর সময় করা প্রাথমিক পূর্বাভাস ছিল ৩৪.৪ মিলিয়ন টন মোট উৎপাদনের। এই ৩.৫ মিলিয়ন টনের ঘাটতি আরও অনেক আগেই অনুমান করা উচিত ছিল — অন্তত ফেব্রুয়ারির মধ্যেই, যখন উত্তর প্রদেশ ও মহারাষ্ট্রের চিনিকলগুলো আখ পেতে হিমশিম খাচ্ছিল এবং এমনকি মাড়াই কার্যক্রমও বন্ধ করে দিচ্ছিল। সরকার প্রতিক্রিয়া জানাতে দেরি করে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে তারা রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। যখন জুলাই মাস থেকে কারখানার দাম সত্যিই বাড়তে শুরু করে, কারণ জুনের অপর্যাপ্ত বর্ষার ফলে আখের ফলন এবং আসন্ন ২০২৬-২৭ চিনি বর্ষের উৎপাদন সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দেয়, তখন সরকার আরও তৎপর হয়ে ওঠে। সমস্ত ডিলারদের উপর ৪০০ টনের মজুত সীমা আরোপ করা হয় এবং ৩০ দিনের বেশি চিনি মজুত না রাখার শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়। এছাড়াও, মজুত যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চিনিকলগুলোকে সেই সমস্ত পাইকারি গ্রাহকদের বিবরণ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়, যাদের কাছে তারা ৫০০ টন বা তার বেশি চিনি বিক্রি করেছে। এই হঠকারী আতঙ্কিত পদক্ষেপগুলো আগুনে কেবল ঘি ঢেলেছে।সরকারের সবচেয়ে সহজ কাজটি ছিল আমদানির সুযোগ খোলা রাখা। রপ্তানি নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে, এপ্রিল মাসের মধ্যে কাঁচা ও সাদা চিনি উভয় প্রকার আমদানির উপর শুল্ক ১০০ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনা যেত, যখন বেশিরভাগ চিনিকল আখ মাড়াই বন্ধ করে দিয়েছিল। চিনি শিল্প হলো নিয়ন্ত্রণের এক চিরায়ত উদাহরণ—যেখানে সরকার আখের দাম নির্ধারণ থেকে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট মাসে প্রতিটি চিনিকল খোলা বাজারে কী পরিমাণ বিক্রি করতে পারবে, সবকিছুই ঠিক করে দেয়—এবং এই নিয়ন্ত্রণগুলো ব্যর্থ হতে বাধ্য। এই চিনি সংকটটি সরকারের বাজার সম্পর্কিত তথ্যে বিনিয়োগ না করা এবং সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য রক্ষার কাজটি বাজার শক্তিকে করতে না দেওয়ারই ফল। সংক্ষেপে, এটি একটি চরম নীতিগত ব্যর্থতা।অথচ তার দায় নিতে হচ্ছে আমাদের, পকেট খালি করে, চরা দামে চিনি কিনে।