ফুটবল এক রাজনৈতিক খেলা। ফুটবল মাঠের শক্তি শুধু খেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা বিশ্বজুড়ে সংঘাত ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক উজ্জ্বল প্রতীক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বড়দিনের প্রাক্কালে যুদ্ধের ভয়াবহতা ভুলে ব্রিটিশ ও জার্মান সৈন্যরা অস্ত্র জমা দিয়ে একসঙ্গে ফুটবল ম্যাচ খেলেছিল, যা মানবতার ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা। যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসের মাঝে তৈরি হয়েছিল ফুটবলার লুকা মদ্রিচ। উদবাস্তু হওয়া জীবন কাটিয়েছে। যুদ্ধে হারিয়েছে তাঁর দাদুকে এবং ছোট বেলার যুদ্ধের ভয়াবহতার কথা তুলে বারবার শান্তির বার্তা দিয়েছিলেন। রাশিয়া এবং ইউক্রেনের যুদ্ধ দেখে লুকা বলেছিল "আমি যুদ্ধের মধ্যে বড় হয়েছি এবং আমি এটা কারও জন্য কামনা করিনা। যেখানে নিরপরাধ মানুষ মারা যায়, সেখানে আমাদের অবশ্যই এই বোকামি বন্ধ করতে হবে। আমরা শান্তিতে বাঁচতে চাই।"
পোল্যান্ডের মতো দলগুলো প্রকাশ্যে জানিয়েছিল তারা যুদ্ধরত কোনো দেশের বিপক্ষে বাছাইপর্বের ম্যাচ খেলবে না। তবুও প্রশ্ন থেকে যায়। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া নিষিদ্ধ যদি হয় তবে আমেরিকা নয় কেন? এইতো বিশ্বকাপ চলাকালীন খেলা শেষে ইজিপ্টের সাবেক কোচ হোসাম হাসান মাঠের মাঝে তুলে ধরেছিলেন 'ফ্রী প্যালেস্টাইন' পতাকা। ইরানের ফুটবলাররা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বোমায় ক্ষতবিক্ষত হওয়া বাচ্চাগুলোকে বিশ্ববাসীকে স্মরণ করাতে হাতে নিয়ে এসেছিলো বাচ্চাদের স্কুল ব্যাগ। ফুটবল আসলে রাজনৈতিক খেলা। ফুটবল খেলা চর্চায় আসলে আফ্রিকা মহাদেশের বিভিন্ন ফুটবলার কথা উঠে আসে। সাদিও মানে থেকে দিদিয়ের দ্রগবা তাঁদের জীবনধারা বিশ্ব ফুটবলকে নতুন দিশা দেখিয়েছে। অথচ আমরা ইতিহাস বইয়ে পড়ি ' আফ্রিকা অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশ'। অদ্ভুত না? রবীন্দ্র ঠাকুর একটা আস্ত 'আফ্রিকা' লিখেছিলেন। সেই লাইন পড়তে পড়ে চোখে জল আসে। আবার আশার আলো জাগে। উফ! আফ্রিকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই লাইন?
"হায় ছায়াবৃতা,
কালো ঘোমটার নীচে
অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে।
এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে, নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে,
এল মানুষ-ধরার দল
গর্বে যারা অন্ধ তোমার সূর্যহারা অরণ্যের চেয়ে।
সভ্যের বর্বর লোভ
নগ্ন করল আপন নির্লজ্জ অমানুষতা।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এ যেনো সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ এবং মানবতার জয়গান। এতে আফ্রিকার সৃষ্টি, প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা, বিদেশি শক্তির অত্যাচার, এবং অবশেষে কবিগুরুর কলমে আশাবাদ ফুটে উঠেছে।
তবুও ফুটবল মাঝেমাঝে আশা জাগিয়েছে। পরাজিত করেছে হিংসাকে। আফ্রিকার এমনই আশা জাগানো ফুটবলার শান্তির দূতের নাম দিদিয়ের দ্রোগবা। দিদিয়ের দ্রোগবা (জন্ম: ১১ মার্চ, ১৯৭৮) আইভরি কোস্টের কিংবদন্তি ফুটবলার এবং চেলসি এফসি-র সর্বকালের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার। সম্প্রতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের বিদায়ের পর ভিএআর (VAR) ও রেফারিং নিয়ে সোচ্চার হওয়ার কারণে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছেন। তবে দ্রোগবার এর চেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিল তাঁর দেশ আইভরি কোষ্টের গৃহযুদ্ধ থামানোর জন্যে। সাল ২০০২ থেকে দ্রোগবার দেশ আইভরি কোস্টে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। সেই গৃহযুদ্ধের মধ্যে বিদ্রোহী দেশের বিদ্রোহী বাহিনী দখল করে নেয় আইভরি কোস্টের বহু জায়গা। দখল হয় রাজধানী আবিদজান। এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে ২০০৫ আসলে জার্মানিতে আয়োজিত হওয়া বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে আইভরি কোস্ট। খেলা মানুষকে হিংসা,বিদ্বেষ থেকে সহনশীল হতে শেখায়। সেই ছোট্ট বেলায় পড়েছিলাম 'চরিত্র গঠনে খেলাধুলার ভূমিকা'। একটা ফুটবল বিশ্বকাপ একটা দেশের গৃহযুদ্ধ আঁটকে দিয়েছিল। একটা ফুটবল টিম একটা দেশের মানুষকে হিংসা থামানোর বার্তা দিয়ে মাঠে নেমেছিল। একটা ফুটবল ম্যাচ একটা দেশের মানুষের বুকের মাঝে ভালোবাসার গোলাপ ফুটিয়ে ছিলো। যে গৃহযুদ্ধ থামাতে পারেনি বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। যে গৃহযুদ্ধ থামাতে পারেনি জাতিসংঘ। সেই গৃহযুদ্ধ থামিয়ে দিয়েছিল ফুটবল। ২০০৫ সালে আইভরি কোস্টের কিংবদন্তি ফুটবলার দিদিয়ের দ্রোগবা ও তাঁর সতীর্থরা জাতীয় টেলিভিশনে হাঁটু গেড়ে বসে যুদ্ধরত পক্ষগুলোকে অস্ত্র ত্যাগ করার এবং নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুরোধ জানান। তারা বলেন, "আফ্রিকার মতো এতগুলো দেশ নিয়ে গঠিত একটি সমৃদ্ধশালী দেশ গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হতে পারে না।" হাঁটু গেড়ে বসা নতমস্তক ফুটবলাদের ভালোবাসার বাণী মেনে নেয়ে দুই পক্ষ। মেনে নেয় আপামর দেশের সাধারণ মানুষ। ফুটবল: আ পলিটিক্যাল গেম। ফুটবলময় হোক পৃথিবী। কোটি কোটি মানুষ একসঙ্গে বলে উঠুক " গো...গো...গো...ল'। সেই ধ্বনিতে ঢেকে যাক যুদ্ধবাজ,সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বোমারু জাহাজ। পৃথিবী জুড়ে ফুটবলের মধ্য দিয়ে ভালোবাসার সাদা গোলাপ ফুটে উঠুক।