যুদ্ধের বদলে যাওয়া চরিত্র এবং বিশ্বায়িত অর্থনীতির অভিঘাত
যুদ্ধকে আমরা প্রায়ই সীমান্ত, সেনাবাহিনী কিংবা অস্ত্রের সংঘর্ষ হিসেবে দেখি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে যুদ্ধের অভিঘাত যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক বাইরে বিস্তৃত। বিশ্বায়িত অর্থনীতিতে কোনো একটি অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে তার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং মূল্যস্তরের মাধ্যমে বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ হলেও ভারত তার বাইরে থাকে না। অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়ে, পরিবহণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়, উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়, যার শেষ ফল ভোগ করতে হয় সাধারণ মানুষকে মূল্যবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে। অর্থাৎ যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক ঘটনা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঘটনাও।
ইতিহাস বলছে, যুদ্ধের এই অর্থনৈতিক অভিঘাত নতুন নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪৩ সালের বাংলার মন্বন্তর তার অন্যতম নির্মম উদাহরণ। সেই দুর্ভিক্ষ কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফল ছিল না; বরং যুদ্ধকালীন ঔপনিবেশিক নীতির কারণে খাদ্য বণ্টন ব্যবস্থার ভাঙন লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনাহারের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্র বাংলায় ছিল না, কিন্তু যুদ্ধের অর্থনীতি বাংলার গ্রামীণ সমাজকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়। ৩০ লক্ষ লোক মারা গেছিল। এই ঘটনাই দেখায়, যুদ্ধের প্রভাব অনেক সময় গোলাবারুদের শব্দের আগেই মানুষের জীবনে পৌঁছে যায়।
আসলে যুদ্ধ ব্যাপারটা কিন্তু মানবসমাজে খুব আদিমকাল থেকে চলে আসছে। এমন নয় যে যুদ্ধটা খুব সাম্প্রতিক ব্যাপার বা বর্তমানে চলছে। এটা মানুষ যাযাবর বৃত্তি থেকে যখন এগ্রিকালচারে ঢুকল এবং শিখল কৃষি ব্যবস্থা এবং কমিউনিটি বা কমিউন গড়ে তুলল জায়গায় জায়গায়, তখন থেকেই কিন্তু শুরু হয়েছিল—একটা কমিউন আরেকটা কমিউনের ওপর আক্রমণ করত। অর্থাৎ একটা শক্তিশালী শক্তি একটা কম শক্তিশালী শক্তিকে, আঘাত করত এবং সেইভাবে যুদ্ধ শুরু হতো। পরবর্তী পর্যায়ে একটা ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে দেশের কনসেপশন গড়ে উঠল। সেই দেশগুলো বা সাম্রাজ্যগুলোর ভেতরেও বিভিন্ন পর্যায়ের ইতিহাসে আমরা সেই যুদ্ধের কথা পড়েছি, যেটা পুরাণ-মহাকাব্যেও রয়েছে, আবার বাস্তব ইতিহাসের মধ্যেও রয়েছে।
যুদ্ধটা খুব নতুন কিছু নয়। যুদ্ধটা সবসময় হয়েছে এবং যুদ্ধ হওয়ার কারণ হচ্ছে একটা ক্ষমতা বা আধিপত্যের বিস্তার। আর যার শক্তি আছে সে শক্তিহীন যে সমস্ত দেশগুলো রয়েছে বা জাতি রাষ্ট্র রয়েছে, সেখান থেকে লুণ্ঠন করা এবং নিজেদের অর্থনীতি বা নিজেদের সামাজিক যে গঠন, তাকে আরো শক্তিশালী করা। বিগত শতাব্দীতে আমরা দুটো বিশ্বযুদ্ধ দেখেছি। বিশ্বযুদ্ধ বলার কারণ হচ্ছে এই যুদ্ধে শুধু একটা দেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশ মুখোমুখি লড়াই করার জন্য যে যুদ্ধগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল, তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল। ফলে ওটা একটা বিশ্বের বৈশ্বিক চেহারা নিয়েছিল বলে ওটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রায় ২ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। তার ভেতরে ১ কোটি মানুষ হয়তো যুদ্ধরত সৈনিক, বাদবাকি ১ কোটি মানুষই ছিল কিন্তু সাধারণ নাগরিক। ফলে প্রাণ দিতে হয়েছিল সাধারণ নাগরিককে। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও যা হিসাব আমরা পাই, তাতে সাড়ে ৭-৮ কোটি মানুষ মারা গিয়েছিল। তার ভেতরে ৫ কোটি মানুষ ছিল সৈনিক, বাদবাকি সবটাই ছিল হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
যুদ্ধের ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিটি যুদ্ধ বিপুল সামাজিক সম্পদ ধ্বংস করে, অবকাঠামো ভেঙে দেয়, উৎপাদন ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে এবং একটি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ঠেলে দেয়। কিন্তু এর থেকেও গভীর ক্ষতি হয় পরিবেশের। আধুনিক যুদ্ধের বিস্ফোরক, রাসায়নিক উপাদান, তেলক্ষেত্রে অগ্নিসংযোগ, বনভূমি ধ্বংস এবং দূষণ মাটি, জল ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘস্থায়ী আঘাত হানে। এই ক্ষতির বড় অংশ কোনো অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না, অথচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তার মূল্য দিতে হয়।
এই বাস্তবতার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—যুদ্ধ কি অনিবার্য? ইতিহাসে বহু দার্শনিক, রাষ্ট্রচিন্তক ও শান্তিকামী মানুষ যুদ্ধহীন বিশ্বের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু যতদিন যুদ্ধের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলি অক্ষত থাকবে, ততদিন শান্তির আহ্বান একা যুদ্ধ থামাতে পারবে না। যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হলে যুদ্ধের দৃশ্যমান রূপের পাশাপাশি তার অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও বুঝতে হবে।
এই কারণেই যুদ্ধকে শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি একই সঙ্গে অর্থনীতি, রাষ্ট্রনীতি, পরিবেশ এবং মানবসমাজের ভবিষ্যতের প্রশ্ন। যুদ্ধ কেন ঘটে, কারা এর লাভবান হয়, আর কারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতেই আমাদের যুদ্ধের অর্থনীতির গভীরে প্রবেশ করতে হবে।
যুদ্ধের অর্থনীতি—পুঁজি, অস্ত্রশিল্প ও সম্পদের রাজনীতি
আধুনিক যুদ্ধকে বোঝার জন্য শুধু সীমান্ত রাজনীতি বিশ্লেষণ করলেই যথেষ্ট নয়; তার অর্থনৈতিক ভিত্তিও বুঝতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে আজ বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত পুঁজি এমন বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজে বেড়ায়, যেখানে লাভের সম্ভাবনা বেশি এবং চাহিদা দীর্ঘস্থায়ী। অস্ত্রশিল্প সেই ক্ষেত্রগুলির অন্যতম। কারণ খাদ্য বা ভোগ্যপণ্যের বাজারের মতো এর চাহিদা মানুষের ক্রয়ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং নিরাপত্তা, সংঘাত এবং যুদ্ধের ওপর নির্ভরশীল।
এই বাস্তবতা থেকেই রাষ্ট্র, সামরিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থার স্বার্থের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে “মিলিটারি–ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স”। রাষ্ট্র নিরাপত্তার যুক্তিতে অস্ত্র কেনে, সামরিক বাহিনী তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে এবং কর্পোরেট সংস্থাগুলি বিপুল মুনাফা অর্জন করে। ফলে যুদ্ধ কেবল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; অনেক ক্ষেত্রে এটি একটি বৃহৎ শিল্প ও বাজার ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডুয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার এই জোটের সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে বহু আগেই সতর্ক করেছিলেন।
ইরাকে শতাব্দীর প্রথম দিকে, যে যুদ্ধ হয়েছিল, সেই যুদ্ধে আমেরিকা এবং তার সহযোগী ন্যাটো শক্তি অর্থাৎ ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলো একযোগে আক্রমণ করেছিল এবং ইরাকের অর্থনীতিকে ধ্বংস করেছিল। শুধু সাদ্দাম হোসেনকে খুন করেনি, ইরাকের মেসোপটেমিয়ার যে ঐতিহাসিক নৃতাত্ত্বিক যে সমস্ত রিলিক্সগুলো ছিল, সেগুলোকে ধ্বংস করা হয়েছে। অর্থাৎ একটা প্রাচীন সভ্যতাকে ধ্বংস করা হয়েছে, অর্থনীতিকে ধ্বংস করা হয়েছে, যার ফলে এখনো ইরাক সেইভাবে দাঁড়িয়ে উঠতে পারেনি। সেইখানে যে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল আক্রমণের কারণ হিসেবে, সেটা বলা হচ্ছে যে ইরাকে 'ওয়েপনস অফ মাস ডেস্ট্রাকশন' অর্থাৎ একটা বিশাল শক্তিশালী একটা ওয়েপনস সে তৈরি করছে ফর মাস ডেস্ট্রাকশন, তাকে ধ্বংস করার জন্য, পৃথিবীকে রক্ষা করার জন্য।
এই চার-পাঁচ বছর আগে বিবিসি-তে একটা ইন্টারভিউ হয়েছিল তখনকার প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের, যে ওখানে দাঁড়িয়ে বলেছিল যে, "হ্যাঁ, আমাদের ধারণা ছিল ওখানে একটা 'ওয়েপনস অফ মাস ডেস্ট্রাকশন' তারা তৈরি করার চেষ্টা করছে এবং ডিস্ট্যাবিলাইজ করার চেষ্টা করছে পৃথিবীকে, কিন্তু যুদ্ধ শেষে আমরা তার কোনো উদাহরণ খুঁজে পাইনি"। অর্থাৎ একটা স্লোগানকে তুলে ধরে গণমাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে একটা দেশকে শত্রু বানিয়ে তার ওপর আক্রমণ করে, যুদ্ধ করে, সেই সভ্যতাকে ধ্বংস করে, সেই দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করে, মানুষ হত্যা করে বলা হলো যে যে সন্দেহের কারণে আমরা যুদ্ধটা করেছিলাম, সেই সন্দেহের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রপুঞ্জের ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একটা মানবাধিকারের রিপোর্টে একটা রিপোর্ট বেরিয়েছল, যেখানে তারা দেখিয়েছিল—যে এই গাজা যুদ্ধ শুরু করার আগেই ইসরায়েল (শুধু গাজা নয়, গাজা, ইরাক, পরবর্তী পর্যায়ে লেবানন) এই যুদ্ধটা শুরু করার আগে আমেরিকার বাজার থেকে সরকারি বন্ড কিনেছিল ৩০ লক্ষ কোটি ডলারের। এবং আরো কতগুলো রাজ্য, আমেরিকার রাজ্য (আপনারা জানেন আমেরিকার রাজ্যগুলো ফেডারেল ক্যারেক্টারের, তাদের নিজস্ব বন্ড আছে) থেকেও ধার নিয়েছিল সমপরিমাণ টাকা এবং আরো কিছু টাকা তারা নিয়েছিল বিশাল বিশাল নামকরা ব্যাংকগুলো থেকে। তার ভেতরে ব্যাংক অফ আমেরিকা রয়েছে, মরগান স্ট্যানলি রয়েছে, মরগান চেজ রয়েছে বা সিটি গ্রুপস রয়েছে এবং ফ্রান্সের বিএনপি একটা বিরাট ব্যাংক, তারাও এই টাকাটা যুগিয়েছিল। অর্থাৎ এই টাকাটা নিয়ে কিন্তু যুদ্ধ শুরু হয়েছিল এবং অস্ত্র কেনা শুরু হয়েছিল। এই যে একটা অলস পুঁজি (পৃথিবী জুড়ে সমস্ত জায়গায় ব্যাংকে ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণে পুঁজি জমে আছে যা মানুষ নিচ্ছে না, ধার করছে না বা যেটা ব্যবহৃত হচ্ছে না—যাকে অলস পুঁজি বলে), যে পুঁজি ব্যাংকের হাতে জমা হয়ে আছে, সেই পুঁজিটাকে ঢালবার জন্য যুদ্ধ তৈরি করা, যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করা, তাকে স্লোগান দেওয়া অথবা সারা পৃথিবীর লোককে তার সহমতে নিয়ে আসা এবং নিয়ে আসার পরে সেই পুঁজি ব্যবহার করা—এটা একটা জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে ইসরায়েলের যুদ্ধ, যেখানে এইভাবে টাকাগুলো ব্যবহার হয়েছিল এবং রাষ্ট্রপুঞ্জও সেটাকে এক্সপোজ করেছে।
প্রাকৃতিক সম্পদও বহু আন্তর্জাতিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, বিরল খনিজ, কয়লা কিংবা লিথিয়ামের মতো সম্পদের নিয়ন্ত্রণ আজ রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত শক্তির অন্যতম ভিত্তি। অর্থনীতিতে “মিনারেল রেন্ট” বলতে খনিজ উত্তোলনের ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে তার মূল্যের পার্থক্যকে বোঝায়। এই ব্যবধান যত বেশি, সম্পদের অর্থনৈতিক গুরুত্বও তত বাড়ে। ফলে সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চলকে ঘিরে প্রতিযোগিতা ও সংঘাতের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
এই প্রতিযোগিতা শুধু খনিজ সম্পদে সীমাবদ্ধ নয়। জলও ভবিষ্যতের অন্যতম কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। আন্তঃসীমান্ত নদীর জলবণ্টন, বাঁধ নির্মাণ বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে জলের সংকট বিভিন্ন অঞ্চলে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে। যদিও সব বিরোধ যুদ্ধের রূপ নেয় না, তবু সম্পদের প্রশ্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ক্রমশ জটিল করে তুলছে।
অর্থনৈতিক সংকটও কখনো কখনো সংঘাতকে উসকে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া, কর্মসংস্থানের সংকট বা সম্পদের ঘাটতি কিছু রাষ্ট্রকে অভ্যন্তরীণ সমস্যা থেকে জনদৃষ্টি সরানোর জন্য আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণে উৎসাহিত করতে পারে। যদিও প্রতিটি যুদ্ধের ক্ষেত্রে এই ব্যাখ্যা প্রযোজ্য নয়, তবু অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক সংঘাতের সম্পর্ককে অস্বীকার করা যায় না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধের লাভ ও ক্ষতি সমানভাবে বণ্টিত হয় না। অস্ত্রশিল্প, সামরিক ঠিকাদার এবং কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান যুদ্ধ থেকে লাভবান হতে পারে, কিন্তু মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। ধ্বংস হয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা। তাই যুদ্ধকে শুধু সামরিক কৌশল হিসেবে নয়, একটি অর্থনৈতিক কাঠামো হিসেবেও বিশ্লেষণ করা জরুরি।
যুদ্ধের স্থায়ী বিকল্প শান্তি হতে পারে তখনই, যখন অস্ত্রনির্ভর মুনাফার অর্থনীতি, সম্পদের দখলদারিত্ব এবং ক্ষমতা বিস্তারের রাজনীতিকে প্রশ্ন করার মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা গড়ে উঠবে। অন্যথায় যুদ্ধের কারণ বদলালেও যুদ্ধের চক্র অব্যাহত থাকবে।
বিশ্বযুদ্ধের যুগে যুদ্ধের অভিঘাত ও শান্তির অসম্পূর্ণ স্বপ্ন
আধুনিক পৃথিবীতে যুদ্ধ কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের ঘটনা নয়, যা আমরা আগে আলোচনা করেছি। একটি পণ্যের কাঁচামাল এক দেশে, প্রযুক্তি অন্য দেশে, উৎপাদনের অংশ তৃতীয় দেশে এবং বাজার অন্য কোথাও হতে পারে। ফলে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা বা রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব শুধু যুদ্ধরত দেশগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। জ্বালানি, খাদ্য, পরিবহণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে সাধারণ মানুষও তার মূল্য দেয়। এই বাস্তবতা দেখায় যে যুদ্ধের প্রশ্ন কেবল সামরিক কৌশলের বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক ন্যায়ের প্রশ্নও। যারা যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সাধারণত ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকে, কিন্তু যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য বহন করে শ্রমিক, কৃষক, ছোট ব্যবসায়ী এবং অনিশ্চিত আয়ের মানুষরা।
যুদ্ধের সময় রাষ্ট্রের অগ্রাধিকারের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি দেশের সম্পদ সীমিত। সেই সম্পদ কতটা মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত হবে এবং কতটা সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যয় হবে—এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। নিরাপত্তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের জীবনযাত্রার নিরাপত্তা ছাড়া শুধু অস্ত্রের শক্তি কোনো সমাজকে প্রকৃত অর্থে নিরাপদ করতে পারে না।
যুদ্ধ ও গণতন্ত্রের সম্পর্কও জটিল। প্রচলিত ধারণা হলো, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলি তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ। কিন্তু ইতিহাসে দেখা যায়, শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিও বহু সামরিক অভিযানে অংশ নিয়েছে। আবার অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধের পথে হেঁটেছে। ফলে যুদ্ধের কারণকে শুধু রাষ্ট্রব্যবস্থার ধরন দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে ভূরাজনীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত।
গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শুধু নির্বাচন ব্যবস্থায় নয়; বরং রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে প্রশ্ন করার অধিকার, মুক্ত মত প্রকাশ এবং জনসাধারণের অংশগ্রহণের মধ্যেও নিহিত। যুদ্ধের কারণ নিয়ে গবেষণা দেখায়, কোনো একটি কারণ সব সংঘাতকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কোথাও সম্পদের প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কোথাও রাজনৈতিক আধিপত্য, কোথাও নিরাপত্তার যুক্তি, আবার কোথাও ঐতিহাসিক বিরোধ। তাই যুদ্ধকে বোঝার জন্য তার তাৎক্ষণিক কারণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও বিশ্লেষণ করা জরুরি।
এই কারণেই চার্লি চ্যাপলিনের The Great Dictator চলচ্চিত্রের শেষ ভাষণ আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছিলেন— “I’m sorry……
…….. Greed has poisoned men’s souls, has barricaded the world with hate, has goose-stepped us into misery and bloodshed…….. We think too much and feel too little. More than machinery, we need humanity. More than cleverness, we need kindness and gentleness. Without these qualities, life will be violent and all will be lost….
…. Even now, my voice is reaching millions throughout the world—millions of despairing men, women, and little children—victims of a system that makes men torture and imprison innocent people….
…..Soldiers! Don’t give yourselves to brutes—men who despise you, enslave you, who regiment your lives, tell you what to do, what to think and what to feel! Who drill you, diet you, treat you like cattle, use you as cannon fodder! Don’t give yourselves to these unnatural men—machine men with machine minds and machine hearts! You are not machines! You are not cattle! You are men! You have the love of humanity in your hearts! You don’t hate! Only the unloved hate—the unloved and the unnatural!
Soldiers! Don’t fight for slavery! Fight for liberty!......
…… Then in the name of democracy, let us use that power! Let us all unite! Let us fight for a new world—a decent world that will give men a chance to work, that will give youth a future and old age a security.
By the promise of these things, brutes have risen to power. But they lie! They do not fulfill that promise. They never will! Dictators free themselves, but they enslave the people! Now let us fight to fulfill that promise! Let us fight to free the world! To do away with national barriers! To do away with greed, with hate and intolerance! Let us fight for a world of reason, a world where science and progress will lead to all men’s happiness.
Soldiers, in the name of democracy, let us all unite!”
চ্যাপলিনের ৮০ বছর আগে এই আহ্বান আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
এই কারণে যুদ্ধের মূল্যায়ন শুধু সামরিক বিজয় বা পরাজয়ের হিসাব দিয়ে করা যায় না। প্রশ্ন করতে হবে—এই যুদ্ধ সাধারণ মানুষের জীবনকে কী দিল? কত মানুষ তাদের ঘর হারাল? কত শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হলো? কত সম্পদ মানুষের উন্নয়নের বদলে ধ্বংসের পেছনে ব্যয় হলো? এই প্রশ্নগুলি বাদ দিলে যুদ্ধের প্রকৃত হিসাব অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তাই যুদ্ধকে শুধু দূরের কোনো দেশের সমস্যা বলে ভাবার সুযোগ নেই। পৃথিবীর এক প্রান্তের অস্থিরতা অন্য প্রান্তের সাধারণ মানুষের জীবনেও পৌঁছাতে পারে। তাহলে প্রশ্ন হলো—যুদ্ধ কি অনিবার্য? ইতিহাস বলছে, যুদ্ধ মানবসভ্যতার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িয়ে আছে। কিন্তু ইতিহাস একই সঙ্গে এটাও দেখায় যে মানুষ সহযোগিতা, চুক্তি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে শান্তি রক্ষার জন্য। সমস্যাটি হলো, যতদিন পর্যন্ত ক্ষমতা, সম্পদ এবং মুনাফার প্রশ্ন মানবিকতার ওপর প্রাধান্য পাবে, ততদিন সংঘাতের সম্ভাবনাও থেকে যাবে। শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; শান্তি মানে এমন একটি সমাজব্যবস্থা যেখানে মানুষ নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়ের সঙ্গে বাঁচতে পারে। ক্ষুধা, বৈষম্য, বেকারত্ব এবং সম্পদের অসম বণ্টনের মধ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। কারণ মানুষের মৌলিক সমস্যাগুলির সমাধান ছাড়া শুধু অস্ত্রবিরতি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি আনতে পারে না।
শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের প্রশ্ন আমাদের সভ্যতার সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে—আমরা কি এমন এক পৃথিবী তৈরি করব যেখানে মানুষের সৃষ্টিশীল শক্তি জীবনকে উন্নত করবে, নাকি এমন এক পৃথিবী যেখানে সেই শক্তি ধ্বংসের অস্ত্রে পরিণত হবে? চ্যাপলিন তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, মানুষের মধ্যেই রয়েছে পরিবর্তনের শক্তি। সেই শক্তি যদি ঘৃণা ও বিভাজনের বদলে সহযোগিতা ও মানবিকতার পথে পরিচালিত হয়, তবেই একটি ভিন্ন ভবিষ্যৎ সম্ভব। যুদ্ধের ইতিহাস দীর্ঘ, কিন্তু শান্তির আকাঙ্ক্ষাও ততটাই পুরনো। সেই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে প্রতিষ্ঠা করাই আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাবানরা, কিন্তু তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। তাই শান্তির প্রশ্ন আসলে শুধু রাষ্ট্রের প্রশ্ন নয়, এটি মানুষের প্রশ্ন—জীবনের প্রশ্ন, ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
(কৃতজ্ঞতা স্বীকার: AWBSRU, কম. প্রদীপ কুমার রায় এবং অধ্যাপক শৈবাল কর)